Wednesday, November 23, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৭ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। কুতুব শাহের মছলিপত্তনম যাত্রা
মীর মহম্মদের দক্ষতা, সংগঠনের প্রজ্ঞা, কাজের দূরদর্শিতার প্রতি সুলতানের ধারণা আরও গভীর হল, তিনি যখন রাজধানী থেকে মছলিপত্তনমের (বন্দরইমুবারক) দিকে যাত্রার সমস্ত ব্যবস্থা তাঁকে করতে বললেন(২৯ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর ১৬৩৯)।

উপকূলের দিকে যাত্রা করবেন এই সদিচ্ছায় সুলতান, জনাব আসফদৌরান মীর মহম্মদকে নির্দেশ দিলেন যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় যত কিছু কারখানা থেকে সংগ্রহ করার এবং রাস্তায় এবং ছাউনিতে অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্র জোগাড় করা এবং যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ঝামেলা মেটানোর জন্য। এই যাত্রার জন্য রাস্তা তৈরি করা, জঙ্গল কাটা, যাত্রাপথের মধ্যবর্তী চৌদ্দটি স্থানে শিবির ফেলার কাজ করতে হবে। মহল আর বাউতাতের(বাড়ির) সুবিধের জন্য, তিনি সমগ্র বিষয়টি মানসিকভাবে ছকে নিয়ে তিনি খুব ছোট বড় সব ধরণের ঝমেলা ছকে মিটিয়ে ফেললেন। সুলতান সরইখাহিলকে নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন রাজপথের মহালদের নির্দেশ দেন, তাঁর যাত্রা কালে রাজধানী থেকে মছলিপত্তনম পর্যন্ত রাস্তায় যেন পর্যাপ্ত খাবার এবং বিচালি যোগাড় ও সঞ্চয় করা থাকে। সোনার সিংহাসনে চড়ে তিনি তাঁর মা, মহিলারা, পেশোয়া, উজির, পরামর্শদাতারা এবং অভিজাতরা, ইরাণ এবং ভারতের নানান এলাকার বিদেশি রাজদূত(হাজিব), বিভিন্ন সেনা – পদাতিক, গোলান্দাজ, ঘোড়সওয়ার, হাতিসওয়ারদের নিয়ে উপকূলের উদ্দেশ্যে যাবেন। মীর মহম্মদকে একটা ফর্মান দিয়ে রাজধানী ত্যাগ করে যাওয়া ইরাণের রাজদূত ইমাম কুলি বেগকে ফিরিয়ে আনতে পাঠানো হল। এই বিপুলাকায়, যাত্রার দুটি লুকোনো উদ্দেশ্য ছিল, প্রথমত বাগী জমিদারদের সুলতানের ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করানো, দ্বিতীয়ত বিদেশি ব্যবসায়ীদের একটু সমঝে দেওয়া।

সম্রাটের চাহিদা মত মীর মহম্মদের সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইরাণি এক জোতির্বিদ জানালেন ১২ রজম মঙ্গলবার, ২৯ অক্টোবর ১৬৩৯ দিনটি শুভ। এই ঘটনার সময় হায়াতাবাদএ(হায়াতনগর, ১-৯ নভেম্বর) উপস্থিত থাকা ঐতিহাসিক নিজামুদ্দিন আহমদ শিরাজি, মীর মহম্মদের সংগঠনের দক্ষতা সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা পোষণ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় সেনা ও অসামরিক মানুষ নিয়ে কাফেলায় থাকা ৫০০০ মানুষ তাঁদের চাহিদামত খাদ্য, পণ্য এবং প্রয়োজনীয় সেবা পেয়েছেন – এবং এ সবই হয়েছে আসফজাইর সাংগঠনিক প্রতিভায়। মুনাগালা কসবার হাবিলদার (১৫ নভেম্বর) সৈয়দ মীর রুস্তম এই বিপুল বাহিনীর খোরাক পৌছে দিয়েছেন নবাব আল্লামি, মীর মহম্মদ আর হাকিমুল মুল্ককে। পরের দিন নবাব সেখান থেকে পাহাড়ি দুর্গ অনন্তগিরিতে পৌঁছে, চূড়ায় ওঠেন মীর মহম্মদ, হাকিমুল মুল্ক এবং অন্যান্যদের নিয়ে।

মুস্তাফানগর(কোণ্ডাপল্লি, ১৯ নভেম্বর) মীরের নিজের প্রশাসনিক তালুক। সেখানে তিনি নানান সেবা আরও সুখকরভাবে সামলেছেন। পরের দিন পাহাড়ের ওপরের প্রাসাদে মীর দেখতে গেলেন, দুর্গের প্রাসাদটি সত্যিই সুলতানের পক্ষে বাসযোগ্য আছে কি না। এবং নবাব আল্লামি আর হাকিমউলমুল্ককে নির্দেশ দিলেন সুলতান সত্যিই পাহাড় থেকে নিরাপদভাবে নামতে পারবেন কি না তা দেখার। তিনি সুলতানের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ আমন্ত্রণী জলসার ব্যবস্থা করলেন। ২১ তারিখ পাহাড় থেকে মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে নেমে সুলতান দুর্গটি তাঁর অন্তরঙ্গ সভাসদ আর অমাত্যদের(মাকারবানইআজম) নিয়ে পাক দিয়ে দেখতে শুরু করলেন। নিরাপত্তার জন্য সুলতান নির্দেশ দিলেন হাজারো বন্দুকচি, নাইকার এবং কোতোয়ালকে তৈরি রাখতে হবে; পাহাড় প্রমান খাদ্য তৈরি করতে হবে; তোপখানা নতুন করে গড়তে হবে; রাতের সময় খাসাইখাইলের ফৌজ, ক্রীতদাস এবং নাইকরেরা বন্দুকবাজদের সঙ্গে শ্বাপদ সঙ্কুল জঙ্গলের আশেপাশে জেগে থাকবে, যাতে কোন রকম উতপাত না হয়। সুলতানের সঙ্গে আসা আমীরেরাও রাত পাহারা দেবে। এমতাবস্থায় মীর মহম্মদ সৈয়দকে সারা দিন রাত তৎপর থেকে সুলতানের চাহিদার দিকে নজর রাখতে হয়েছে।

বেজোয়াদায়(২২ নভেম্বর) তিনটি ইওরোপিয় কম্পানি – ব্রিটিশ, ডাচ এবং ডেনের কুঠিয়ালেরা তাঁদের অনুচর নিয়ে মছলিপত্তনম থেকে উপস্থিত হলেন। তারা সুলতানের অনুমতিতে ব্যবসা করছেন। তারা সুলতানের সঙ্গে কথা বললেন।

ওয়েয়ুরে(২৪ নভেম্বর) পৌঁছে সুলতান মীর মহম্মদকে নির্দেশ দিলেন, ফারাকসানার ওহুদাদার চতুর খাঁকে এবং অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়ে বন্দর শহর ইনগণ্ডুর(এনগোডুর)এ শিবির ফেলতে হবে। যেহেতু বন্দরটি মীরের প্রশাসনের অধিকারে ছিল, সেহেতু তিনি পোর্টের দরজা থেকে ব্যাঙ্কসাল পর্যন্ত রাস্তার সমস্ত ব্যবস্থাপনা এবং নীতি নির্ধারণ করলেন(কেন? যাতে মিছিলটা ভাল হয়?)। বন্দরে বণিকদের বাড়িঘরগুলি কাপড় এবং অন্যান্য নানান দ্রব্য দিয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মীরকে পাশে নিয়ে হাতিতে চড়ে সুলতান ব্যাঙ্কশালের দিকে এগোতে থাকলে, মীর, সুলতানের সমস্ত প্রশ্ন মর্যাদা সহকারে উত্তর দিতে থাকলেন। ব্যাঙ্কশাল বাড়িতে বিশেষ একটি মজলিস(ব্যক্তিগত বন্ধুদের নিয়ে সভা) শেষ করে সুলতান বন্দরটি ঘুরে দেখলেন, সমুদ্রে ধোবিঘাটের দিকে এগোতে শুরু করলেন।

২৭ তারিখ সুলতান আবার বন্দরের দিকে গেলেন এবং পরের দিন ইওরোপিয় কুঠিগুলি ঘুরে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। ইচ্ছে হয়ত সেখানের বণিকেরা তাঁর সঙ্গে থাকা মহিলাদের কাপড় এবং সারাদেশ থেকে জোগাড় করা নানান পণ্য দেখাক। কুঠিওয়ালাদের সুলতান বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধে দিলেন। ২৯ তারিখ সুলতান মহিলা, বিদেশি ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরদোর দেখতে গেলেন। তিনি সেখানে আন্তরিকভাবে কাজ করা আমলাদের অনেক প্রশ্রয় এবং সুযোগ দিলেন এবং সরইসিমতকেও বেশ কিছু সুবিধে দেওয়ার কথা বললেন। ৩ ডিসেম্বর ধোবিঘাটে মীর মহম্মদ সম্রাট আর তাঁর সঙ্গীদের আমোদ দিলেন সমুদ্রে মাছ ধরা দেখিয়ে। দেখা গেল একজোট হওয়া ধীবরেরা তাঁদের জালে প্রচুর ছোট বড় মাছ ধরেছেন।

পরের দিন পেশকাশের সময় মীর মহম্মদ সৈয়দ সুলতানকে বন্দরের এবং এখানকার আধিবাসীদের অবস্থা অবগত করান। তিনি সেখানে থাকা বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িকে নানান সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন – ১) বন্দরের গেটে প্রত্যেক পণ্যের জন্য জাকাত দেওয়া থেকে, দেশি বিদেশি সব ধরণের ব্যবসায়ীদের মুক্তি দিলেন, ২) এছাড়া গয়নাগাটির জন্য ব্যবসায়ীদের থেকে যে বিপুল পরিমানে রাজস্ব নেওয়া হয়, তাতেও তিনি ছাড় দিলেন। সুলতানের জাকাত সংক্রান্ত নির্দেশ (ফর্মান) একটা শিলালিপিতে লিখে বন্দরের জামা মসজিদে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হল, যাতে আগামী দিনের হাকিম আর আমিলেরা এ ধরণের কর আদায় এবং তাঁর জন্য সর্বশক্তিমানের অভিশাপ পাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবে। এছাড়া যে সব ব্যবসায়ী পেগু থেকে রুবি আমদানি করে, তাদেরও ছাড় দেওয়া হল।সুলতানের এই সুবিধে দানের খবর দ্রুতগতিতে বালাবাদ আর জেরবাদে ছড়িয়ে গেল এবং এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী আর রত্নকারেরা খুশি বোধ করলেন।

সাধারণ মানুষের অবস্থার উন্নতির জন্য বহু নতুন পুরোনো বাসিন্দা নির্বিশেষে অভাবি মানুষ, সৈয়দ, আলিম, ধর্মপ্রান ব্যক্তি, জীবিত কবিদের মাসোহারা এবং দান দেওয়ার, জমি অথবা আর্থিক ভর্তুকি দেওয়ার কথা বললেন। এছাড়াও সুলতান ওয়াজিফা থেকে শুরু করে সৈয়দদের, বিশেষ করে মীর মৈনুদ্দিন মহম্মদ শিরাজি এবং মীর মহম্মদ হুসেইনকে যে দান দেওয়া হচ্ছে, তা চালিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। শেষে মীর মহম্মদ সুলতানের প্রশস্তি গাইলেন এবং সুলতানের মহত্ত্বের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানালেন। সুলতান পেশকাশ গ্রহণ করে স্থানীয় একটি লবন কারখানা ঘুরতে গেলেন।

বন্দর ছাড়ার দিন(৭ ডিসেম্বর), সুলতান মীর মহম্মদকে নিজের গলা থেকে চাদর খুলে এবং চার-কোব(এক ধরণের জামা) পরিয়ে সম্মান জানালেন। এই সম্মান জানানো হয় সেই ব্যক্তিকে যিনি সরইখাহিল দপ্তর থেকে বিদায় নিচ্ছেন। এছাড়াও তাকে একটা রত্ন খচিত খাপওয়ালা তরোয়াল, একটি রূপোর জালে মোড়া যুদ্ধ হাতি, একটি রূপোর জালে মোড়া, অন্যটিতে রত্নখচিত জিন, লাগাম আর জাল দিয়ে মোড়া দুটি ইরাকি ঘোড়া দিয়ে সম্মান জানালেন সুলতান। এছাড়াও রাজ্যকে সেবা করে যে সব ইওরোপিয় সাহায্য করেছেন, তাদেরও সুলতান সম্মান জানান।
(চলবে)
Post a Comment