Sunday, November 27, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা১৯ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

তৃতীয় অধ্যায়
কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসন
১। কর্ণাটক বিজয়ে মীর জুমলার আবিসংবাদী আধিপত্য
অসম্ভব বীরত্ব, অসাধারণ শক্তি স্ফূর্তি, এবং গভীর কূটনৈতিক দক্ষতা, বিশাল প্রশিক্ষিত বাহিনী এবং ইওরোপিয় গোলান্দাজদের সহায়তায় মীর জুমলা পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা – মাদ্রাজ এবং পূর্ব কর্ণাটকই দখলই শুধু করেন নি, বিজাপুরি কর্ণাটকেও তাঁর দাঁত ফুটিয়েছিলেন। তাত্ত্বিকভাবে ৩০০ মাইল লম্বা আর ৪০ থেকে ২০০ মাইল চওড়া বহু হিরের খনির, বছরে ৪৩ লক্ষ টাকা রাজস্বের, বহু সুরক্ষিত গড়ের এই অঞ্চল আবদাল্লা কুতুব শাহের হাতে এসে পড়ল। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি তাঁর নতুন প্রাপ্তিতে খুবই উচ্ছসিত হয়ে, বিশেষ করে গণ্ডিকোটা দখল করার পর তাঁর মূল সেনাপতিকে নওরোজইখিলাত উপাধি দেন তা আগের অধ্যায়ে বলেছি। এ ছাড়াও তিনি কর্ণাটকের বহু ওয়াকফ গ্রামের মুতাওয়ালি তাঁকে দান করেন। তিনি তাঁর সেনাপতির ক্ষমতায় এতই বিশ্বাস করতেন যে তিনি মীর জুমলাকে কর্ণাটক সরকারের তরফদারের পদটিও দান করেন।
অন্তত কয়েক কাল ধরে মীর জুমলার আচরণ ছিল যেন সরইলস্কর বা সুলতানের সেনাধ্যক্ষ। তিনি সুলতানকে লিখলেন, ‘প্রায় সব উজির জমিদার, মানিওয়ার এবং সর্দার এবং মধ্যসত্ত্বভোগী এই অভিযানে তাদের শেষ ক্ষমতা টুকু দিয়েছেন। আপনি যে উপহারগুলি পাঠিয়েছেন, তাঁর সবইটাই তাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা আপনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করেছেন। প্রত্যেকেই আপনার কৃপাদৃষ্টি অর্জন করতে চায়, এবং প্রত্যেকজন যুদ্ধের মাঠে তার ক্ষমতা দেখিয়ে সেই কৃপাদৃষ্টির যোগ্য হয়ে উঠুক। আর আমার বিষয় নিয়ে বলি, আমি এই অঞ্চলের প্রশাসন, তাকে গড়ে তোলা, ছোট থেকে বড় সকলের ভালবাসা অর্জন, সেনার সুখ আর প্রজাদের শান্তি প্রদান এবং শত্রুকে পরাজিত করার কাজে ক্ষান্তি দেব না। আমি আমার ক্ষমতার সব কিছু উজাড় করে দিয়েছি। আমার বিনীত প্রার্থনা, আপনি আমায় সবসময় পথ প্রদর্শন করুণ।’ ১৭ জানুয়ারি ১৬৫১ সালের ব্রিটিশ কোম্পানি ওয়াল্টার লিটন আর ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে নবাবের কাছে দৌত্যে পাঠিয়েছিল। তারা সেখানে আবিষ্কার করে, নবাব(মীর জুমলা)বছরে ২০ লক্ষ প্যাগোডা পরিমান রাজস্ব রাজার (সুলতান) কাছে পাঠাচ্ছে।
কূটনৈতিক দক্ষতায় এবং সুতচুর পদক্ষেপে মীর জুমলা ক্রমে ক্রমে বিজিত এলাকার সমস্ত ক্ষমতার দখল নিজের তাঁবেতে নিয়ে আসেন। সেন্ট জর্জ দুর্গের কুঠিয়াল দেখছেন(৪ জানুয়ারি, ১৬৪৭)), ‘যুদ্ধ পরবর্তী মন্বন্তর এই এলাকায় গেড়ে বসেছে। আনা বব(নবাব) মীর জুমলা পুলিকান(পুলিকট) আর সেন্ট থোম দখল করে সারা দেশ কব্জা করে নিয়েছে...’। আদতে এটা কুতুব শাহের কূটনৈতিক চাল। তিনি পুলিকটে ডাচেদের নির্দেশ(হাসবুল হুকুম) দিয়ে বলেন মীর জুমলার সাথে সম্পাদিত চুক্তি পালিন করতে হবে, ‘যাতে তিনি কসবা, গড়টি আর পুলিকট বন্দরটি তার প্রশাসনের আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।’ মীর জুমলা মাদ্রাজের ওপর ব্রিটিশদের দখলের ১৬৩৯ সালে দেওয়া দারমালা ভাইদের আর ১৬৪৫ সালের দেওয়া শ্রী রঙ্গার পাট্টা বজায় রাখলেন।
সুলতানের সঙ্গে তার সেনাপতির অদর্শনে বিচ্ছেদ বাড়তে থাকায়, মীর জুমলা নিজে কর্ণাটককে নিজের খাস তালুক বানাতে নতুন করে যুদ্ধে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন। পারস্যের উজির খালিফাইসুলতানকে লেখা এক চিঠিতে মীর জুমলা লিখছেন, ‘এই অঞ্চলের(অর্থাৎ কর্ণাটকের) সব রাজা, বিদ্রোহী আমার আওতায় এসেছে।’ দেখা যাচ্ছে, চন্দ্রগিরির রাজ মুকুট প্রথমে কুতুব শাহ নিজের মাথায় তুলে নিলেও, তা পরে স্বেচ্ছায় এবং চাতুর্যের সঙ্গে মীর জুমলা নিজের মাথায় পরাচ্ছেন।
২। মীর জুমলার প্রশাসন
মীর জুমলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা তার রাজত্বের দ্বৈতসত্ত্বা চরিত্রের প্রকাশ। তিনি পূর্ব কর্ণাটকের প্রাক্তন বিজয়নগর রাজ্যের প্রধান হয়ে উঠেছিলেন, এবং সেই রাজ্যের এবং নায়কদের যে প্রশাসন তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, তাতে তিনি কিছুটা পরিবর্তন আনেন – রাজা পরিবর্তন হলে প্রশাসনের চরিত্র ও কর্মশক্তিরও বদল হয়। এছাড়াও কুতুব শাহী জায়গিরের প্রধান হওয়ায় তিনি সেগুলিকে স্বাধীন রাজ্যে রূপান্তরিত করেন এবং গোলকুণ্ডায় যে প্রশাসনের স্বাদ তিনি পেয়েছিলেন, সেটি সেখানে প্রয়োগ করার উদ্যোগ নিলেন।
(চলবে)
Post a Comment