Wednesday, November 23, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

২। গোলকুণ্ডায় কর্ম জীবন আরম্ভ
ভাগ্য দেবতার প্রিয় পাত্র ছিলেন মীর মহম্মদ। যদিও তাঁর বংশ গৌরব খুব বলার কিছু নয়, কিন্তু তাঁর দক্ষতা ছিল ক্ষুরধার, আশা আকাশ্চুম্বী এবং ব্যবসায় অদ্ভুত জ্ঞান-সম্পন্ন অভিজ্ঞতা তাকে সাফল্য দিয়েছিল। যেহেতু সম্পদই বাস্তবে স্বাধীনতা আর ক্ষমতার বাহক, তিনি সম্পদ আহরণে উদ্যমী হলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্য গোলকুণ্ডার এক ব্যবসায়ীর দপ্তরে হিরে ব্যবসায় শিক্ষা নবীশ রূপে কাজ পেলেন। কিন্তু বেশি দিন তিনি সেই কাজ করেন নি। ক্রমশঃ তিনি নিজের হিরে ব্যবসা গড়ে তুলতে লাগলেন। বেনামিতে কয়েকটি হিরের খনি নিজের আওতায় নিয়ে এসে দক্ষতায় এবং পরিশ্রমে সেগুলিকে ব্যবসায়িকভাবে কার্যকর করে গড়ে তুলে হিরে ব্যবসায়ে সফলতার স্বাদ পেতে শুরু করলেন।
বিশ্ব জোড়া হিরে বাণিজ্যে অংশগ্রহনে তাঁর সমৃদ্ধির সূত্রপাত। সমুদ্র বাণিজ্যে অংশ
নিয়ে ক্রমশঃ তিনি সেই রাজ্যের বড় ব্যবসায়ীদের অন্যতম রূপে গণ্য হতে শুরু করলেন। তাঁর ব্যবসা কর্মে বহু জাহাজ অংশ নিত। রাজনৈতিক জীবনে আরও বড় হতে চেয়ে তাঁর হিরে ব্যবসার সমৃদ্ধির সম্পদ কাজে লাগিয়ে তিনি কুতুব শাহের রাজসভার কাছে একটি প্রাসাদ খরিদ করেন। তাঁর ব্যবহার আর খরুচে স্বাভাবে মুগ্ধ হয়ে রাজপ্রাসাদের সভাসদেরা মীরের রাজনৈতিক উচ্চাশা পরিপূর্ণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু ইংরেজদের কুঠির তথ্য বলছে ১৬৩৪ সাল পর্যন্ত গোলকুণ্ডায় তাঁর নাম খুব বড় ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। অন্তত ১৬৩৫-৩৬ সালে শরইদপ্তরশাহীতে(রাজকীয় নথি রক্ষক) তিনি সাধারণ একজন শিল্লাদাররূপে কাজ করছেন। ক্রমশ তিনি রাজকীয় প্রসাসনে ওপরে ওঠা শুরু করলেন, সুলতান নবাব আল্লামি ফাহামি শেখ মুহম্মদিবিন খাতুন তাঁকে মীর জুমলা উপাধি দেবেন রাজ্যের পেশোয়ার দপ্তর দেখা শোনার জন্য। পেশোয়া পদটি কূটনৈতিক পদের কাজের জন্য নির্ধারিত যেমন কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগায়োগ, তদের কথাবার্তা জানা শোনা ইত্যাদি। এছাড়াও প্রশাসনিক নানান কাজ যেমন মামলা করা, চাষের জমির এলাকা বাড়ানো, জনগণের জীবনের মানোন্নয়ন করা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকতে হত পেশোয়াকে।

নবাব আলামি নিজে খুব বড় প্রশাসক, তিনি ক্ষমতায় আসার আজে রাজ্যর প্রশাসনে এবং সেনা বাহিনীতে যে বিশৃঙ্খলা চলত তা তিনি নির্মূল করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর প্রশাসনিক সময়ে একটা তত্ত্ব প্রমানিত হয়, যে রাজত্বে প্রশাসন যখন অদক্ষ, তখন রাজ্য জুড়ে স্বজন পোষণ আর দুর্ণীতি বেড়ে চলে, সেই অবস্থার সুয়োগ নিয়ে কোন যোগ্য ব্যক্তি সুলতানের কাছাকাছি পৌঁছে গুরুত্ব অর্জন করে বিপুল ক্ষমতা দখল করতে পারেন। একই সময়ে সেই ব্যক্তির এই ওপরে ওঠার উচ্চাশা এবং হঠাত পাওয়া প্রতিপত্তিতে অসন্তুষ্ট হয়ে কিছু মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে রাজসভায় সুলতানের কান ভারি করার চক্রান্ত করা শুরু করেন, যাতে সুলতান তাঁর প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে পড়েন। এই তত্ত্ব মীর জুমলার জীবনে বহুবার ঘটেছে।
সে সময় প্রশাসনিক এবং সামরিক প্রশাসন খুব ভালভাবে চলছিল না। ১৬২৬ সালে ক্ষমতায় এসে আবদুল্লা কুতুব সাহ, এই বিশৃঙ্খলা রোধ করার উদ্যোগ নিলেন। তিনি রাজ্যের প্রশাসনে এবং সেনাবাহিনীতে আইনের শাসন প্রয়োগ করতে একজন পেশোয়া এবং এবং একজন মীর জুমলাকে দায়িত্ব দেন। তারা রাজধানীতেই দপ্তর পেলেন এবং তাঁর দুটি স্তম্ভ হয়ে কাজ করতে শুরু করলেন। নবাব আল্লামি মীর মুহম্মদ মুমিন পেশোয়ার ১৬২৪ সালে এন্তেকালের পর এবং সুলতানের শাসনকালের শেষ সময়ের দিকে পেশোয়া পদটির অস্তিত্ব ছিল কিন্তু সেই পদে কোন আমলা অভিষিক্ত ছিল না। পেশোয়ার কাজ সুলতান নিজে দেখাশোনা করতেন। বারো বছরের সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহ সিংহাসনে আরোহন করার পর তাঁর মা হায়াত বকশি বেগম জামাই শাহ মুহম্মদকে পেশোয়া পদে বসালেন। কিন্তু শাহ মুহম্মদ অযোগ্য প্রমানিত হলেন। শাহজাহানের দুই দূত আদিল সাহ আর নিজাম শাহ তাঁর অযোগ্যতা প্রমান করে দেন। একই সাথে তিনি বেশ কিছু আর্থিক দুর্ণীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। সুলতান তাকে পদচ্যুত করে এক যোগ্য পেশোয়া নায়েব পেশোয়া শেখ মুহম্মদ যার বংশত উপাধি ইবনইখাতুন, পেশোয়াইকুল পদবি দিয়ে কাজে নিয়োগ করেন(১৬২৯, ২২ এপ্রিল, রমজান ৯ ১০৩৮ হিজরা)। সুলতান মনসুর খাঁ হাবসিকে আইনিমূলককে পদন্নোতি দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের (লস্করিরিকাব) হাবিলদার রূপে নিয়োগ করেন মীর জুমলা দপ্তরে। তিনি অসামরিক প্রশাসনের কাজকর্ম দেখা শোনা করার থেকে সামরিক বাহিনীর ভালমন্দ নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুলতান লিখতে পারতেন না, সরকারি প্রশাসনেও খুব একটা দক্ষ ছিলেন না, ফলে অধস্তন ব্রাহ্মণদের এই করণিকের কাজে নিযুক্ত করেন। তারা তখন ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে। গরীব চাষীদের অভাব অভিযোগ তিনি শুনতেন না, যারা তাঁর রাজ্যেকে বাঁচিয়ে রেখেছে তাঁদের স্বার্থ দেখা জরুরি মনে করতেন না। সেনা প্রশাসন অযোগ্য স্বজন পোষিত কর্মচারীতে ভরে গিয়েছিল। স্বার্থান্বেষী মানুষদের কান ভাঙ্গানিতে উত্তেজিত হয়ে তিনি পুরোনো কিছু যোগ্য এবং তাঁর গুণগ্রাহী আধিকারিককে বরখাস্ত করেন এবং নতুন কিছু আধিকারিককে নিযুক্ত করেন। মনসুরের মত অযোগ্য মানুষের কথায় প্রভাবিত হয়ে অন্যান্য যোগ্য আধিকারিককে হেনস্থা করতে শুরু করেন।

১৬২৮সালের অক্টোবরে মনসুর খাঁয়ের মৃত্যুর পরে মীর জুমলা পদটি ফাঁকাই পড়েছিল।১৬৩৪ সাল পর্যন্ত সরইকাহিল দপ্তরের আধিকারিক এই পদএর কাজকর্ম দেখাশোনা করতে থাকেন। ১৬৩১ সালে কিছু মাসের জন্য শেখ মুহম্মদ পেশোয়া দেওয়ান হিসেবে কাজ সামলান। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ, তাঁর পিছনে ষড়যন্ত্র রচনা করলেও তিনি সেই সব অদক্ষ ষড়িদের জাল কেটে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। সুলতান তাকে নতুন করে পেশোয়া পদে নিযুক্ত করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, কিন্তু তিনি অস্বীকার করলে তাঁকে মীর জুমলা(জুমলাতুল মুলকি) পদে নিযুক্ত করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, যেটি আসলে সুলতানের পরামর্শদাতার পদ। বহু অনুনয় বিনয়ের পর ৯ শাওয়াল ১০৪৩, ২৯ মার্চ ১৬৩৪ সালে তিনি পদে আরোহন করেন এবং তাঁর ভাইপো শেখ মুহম্মদ তাহিরকে তাঁর অধস্তনরূপে(পদটির নাম সরইকাহিল, তাঁর আগে পদে ছিলেন মীর ফাসিউদ্দিন) নিয়োগ করা হয়। প্রশাসনের রশি এবার থেকে তাঁর হাতে সমর্পিত হয়। অসামরিক প্রশাসন এবং সামরিক প্রশাসনে আইনের শাসন বলবত করার চেষ্টা শুরু করা হয়। প্রত্যেক দপ্তরের জন্য বিশদে নীতি প্রণীত হয়। মোটামুটি দেখা যাচ্ছে তিনি কিছুটা হলেও দক্ষ আধিকারিক ছিলেন।।
(চলবে)
Post a Comment