Saturday, November 26, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা১৬ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৭। সিধোউত(siddhout বা সিদ্ধবাতম)
১৬৪৮এ জিঞ্জি আর পরের বছরে তাঞ্জোরের পতনের পর দুই সুলতানি রাজ্য বাকি থাকা ক'একটা হিন্দু রাজ্য দখলের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করল। বিজাপুর দক্ষিণে আর গোলকুণ্ডা শক্তির সেনাপতি মীর জুমলা উত্তর দিকে নজর দিলেন নতুন করে। বিজাপুর, বিজয়নগরের পশ্চিমের তেলুগু আর পূর্বের তামিল পশ্চাদভাগের অংশটার পাশাপাশি পেনুকোণ্ডা এবং বাসবপত্তনম, বেলোর, জিঞ্জি এবং আর্নি দখলে রেখেছে। মীর জুমলা দখল করতে লাগলেন উত্তরের siddhout, গাণ্ডিকোটা এবং গুটি আর দক্ষিণের উপকূলভাগ। কার পরে কোনটা দখল করেছেন মীর জুমলা, সেই ক্রম বোঝা দুষ্কর বিভিন্ন ডাচ, পারসি, তেলুগু, তামিল, ব্রিটিশ পরস্পর বিরোধী সূত্রে। তবুও আমরা তেলুগু সূত্র, সাহিত্যিক এবং লেখমালা আর ভৌগোলিক অঞ্চলের সূত্র তুল্যমূল্য বিচার করে ধরে মীর জুমলার বিজয় পথ নির্ধারণ করতে চেষ্টা করতে পারি।
মীর জুমলার পরের নজর ছিল কুডাপ্পা জেলার siddhout বা সিদ্ধবাতম। ১৬৪৬ সালে তিনি উদয়গিরি নতুন করে দখল করে চিট্টিভেলির একাংশ কবলে নিয়ে আসেন। কিন্তু এই জেলারই, বালাঘাট কর্ণাটকের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ শাসন করছেন কুলাপ্পা জেলার পূর্বাংশের মাতলি সমাজের নায়ক দ্বিতীয় কুমার অনন্তের পালিত পুত্র, অনন্তরাজা দেবছোড়া মহারাজা যার রাজধানী সিদ্ধবাতম। তেলুগু সূত্রে জানতে পারছি, যুদ্ধে তিনি মীর জুমলার দুই মুসলমান আধিকারিক (সর্দার)এর মাথা কেটে নেন এবং ব্রাহ্মণ বক্সী ত্রিম্বকম রাউ(ত্রিম্বক রাও) পালিয়ে বাঁচেন(শক ১৫৭১ বিকৃতি, ১৬৪৯-৫০)। তবে পরের দিকে যুদ্ধ করে টিকে থাকা যাবে না বুঝেই তাঁর কাকা এলামারাজা এবং অন্যান্য আধিকারিকের সঙ্গে আলোচনা করে মহিলা, অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি নিয়ে ইক্কেরি বাসবপুরমে পালিয়ে যান(১৬৫০)। সিদ্ধবাতমকে মীর জুমলা সেনা ঘাঁটি বানান এবং এখানে ত্রিম্বক রাও শঙ্করজী পন্তকে শাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

৮। গাণ্ডিকোটা
আধুনিক মাদ্রাজের কুডাপ্পা আর অনন্তপুর জেলার গাণ্ডিকোটার রাজা ছিলেন তিম্মা নায়ার(তেলুগু সূত্রে প্রেমাসানি চিনা(চিন্না), তিম্মা নায়ডু)। তিনি বিজয়নগরের এবং জিল্লালার রেড্ডিদের করদ রাজা ছিলেন। পেন্নার উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গাণ্ডিকোটা। এর দুর্গ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাভার্নিয়ে বলেছেন, এটি গোলকুণ্ডার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কুডাপ্পা জেলার য়ারামালাই পাহাড়ের ওপর সমুদ্র তল থেকে ১৬৭০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। পাহাড়ের পাদদেশেই শহরটি। দুই সাম্রাজ্যবাদী সুলতানি রণনীতিতেই এই অঞ্চল্টাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। গোলকুণ্ডা কয়েকবার চেষ্টা করেও গাণ্ডিকোটার রাজাকে দমন করতে পারে নি।

বিজাপুরের ইক্কেরি দখলের সমসময়ে(১০৪৭/১৬৩৮) খান মহম্মদ, মালিক রাইহান, আলি খুদাবন্দ খান এবং অন্যান্য বিজাপুরী উজির এটি অবরোধ করে। কিন্তু সাহজী ভোঁসলা আর আসদ খানের বাহিনীকে (১০৫৭/১৬৪৮ সালে) ভিল্ভুয়ার আর কৃষ্ণা তুপাক্কির নেতৃত্বে রয়ালের বাহিনী হারিয়ে দিলে, আদিল শাহের নির্দেশ সেই অবরোধ তুলে নিয়ে মুস্তাফা খাঁয়ের বাহিনীর শক্তিকে জোরদার করতে যোগ দিতে হয়। আন্দাজ করা হচ্ছে এই সময় বিজাপুর শক্তি জিল্লালা দখল এবং রেড্ডিদের বন্দী করে। রেড্ডিরা পালিয়ে গিয়ে তিম্মা নায়ারের সাহায্যে তাদের রাজ্য আর নান্দিয়ালের দু/তিনটি গ্রাম দখল করে। খান মহম্মদ তিম্মা নায়ারের সঙ্গে চুক্তি করে দখলি গ্রামের জন্য ক্ষতিপূরণ জোগাড় করেন। কিন্তু সীমান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত, বিজাপুরের মনে হয়েছে এই এলাকাগুলি তাঁর দখলে আসা দরকার এবং চুক্তির পরে এর আশেপাশের এলাকাগুলি কুতুব শাহের জন্য ছেড়ে রাখে তারা, তাঁর জন্য কুতুব শাহ বেশ ভাল রকমের ক্ষতিপূরণ দেন (১৬৪৯)।

১৫১৭র ভিক্রি শকে মীর জুমলা গোলকুণ্ডা থেকে গান্ডিকোটার দিকে বিপুল বাহিনী নিয়ে এগোতে এগোতে জাম্বুলামাদক তালুকের মাইলাবর্ণ গ্রামে উপস্থিত হন। সেখান থেকে মাত্র একটাই রাস্তা দিয়ে দুর্গ পর্যন্ত পৌঁছনো যায়। রাস্তাটির সব থেকে চওড়া অংশ ২০ থেকে ২৫ ফুট আর সব থেকে ন্যারো অংশ ৭-৮ ফুট। থেভেনটের মতে গুঁড়ি দিয়ে সে দুর্গে পৌঁছতে হয়। পাশেই খাড়া পাহাড় তাঁর পাশে দুটি খরস্রোতা নদী। পাহাড়ের মাথায় একটা ছোট সমতল ভূমি - সেখানে ছোট ছোট ঝর্ণার জলে ধান আর বজরা চাষ হয়। তাভার্নিয়ে লিখছেন, ‘দক্ষিণের সমতলে এই শহরটা এমন একভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এক দিকে খাড়া পাহাড় আর দুটি নদী, তিনদিকের বিশাল পাথরের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। শহরে ঢোকার জন্য সমতলের দিকে রয়েছে একটিই দরজা আর তাঁর পাশে পরিখা কাটা। দুর্গে মাত্র দুটি কামান রয়েছে, একটি ১২ পাউণ্ডের(নাম রামাবনম), দরজার সামনে বসানো, অন্যটি ৭-৮ পাউণ্ডের কামান দুর্গ প্রাচীরের মত জায়গায় বসানো।’ এর রাজা তিম্মা নায়ার এই এলাকার মধ্যে সুকৌশলী সেনা নায়কদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর পাশে ছিল রেড্ডি রাজারা। ঘেরাও হলে ১২ বছরের খাদ্য পানীয়ের সমস্যা হবে না এমন অবস্থা তৈরি করে রাজা মীর জুমলার বশ্যতা অস্বীকার এবং যুদ্ধে আহ্বান করেন। ছোট ছোট আক্রমনে স্থানীয়েরা আক্রমণকারীদের বিপুল ক্ষতি করতে থাকেন এবং এক সময় দেখা যায় মীর জুমলার ৩০০০ সেনা নিহত হয়। ফলে মীর জুমলাকে তাঁর শিবির পিছিয়ে গুদেমচেরুভু আর গোরিগানুরুতে নিয়ে যেতে হয়। থেভেনট আবদুল্লার সময় গোলকুণ্ডা এসেছিলেন তাঁর লেখনী আর তেলুগু সূত্র থেকে পরিষ্কার মীর জুমলার জয় বাহুবলে হয় নি, বরং ছলে-কৌশলে হয়। তাভার্নিয়ে বলছেন, শেষ পর্যন্ত মীর জুমলা পাহাড়ের চূড়ার উচ্চতা পর্যন্ত কামান বয়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রাজার ফরাসী গোলান্দাজদের চার মাসের সাধারণ বেতনের তুলনায় অনেক বেশি বেতনের অর্থ দক্ষিণার টোপ দিয়ে কাজটি করাতে পেরেছিলেন। চারটি কামান উচ্চতায় তুলে দুর্গটিতে গোলা দাগা হতে থাকলে সদর দরজার কাছে থাকা কামানটিকেও অকেজো করে দেওয়া হয়। সুরক্ষিত দরজাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে পড়ছে দেখে দুর্গের অধিবাসীরা নিজেদের সুরক্ষার শর্তে দুর্গ ছেড়ে চলে যায়। তাভার্নিয়ে বলছেন, গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলা সফল হয়েছেন ফরাসী গোলান্দাজদের দক্ষতার জন্য, খারাপ ব্যবহার পেয়ে এরা ডাচেদের ছেড়ে এসেছিল। তাদের সঙ্গে ব্রিটিশ আর ডাচ এবং ২/৩ জন ইতালির গোলান্দাজও ছিল। আবার তেলুগু সূত্র বলছে – বহিদিন ধরে অবরোধ করেও যখন দুর্গটি দখল করা সম্ভব হল না, তখন মীর জুমলা প্রস্তাব দিলেন তাদের গুটি দুর্গের সঙ্গে এই দুর্গটি বদল করার। কিফায়তিতে যে কারণ দেওয়া হয়েছে তা যদিও হয়ত সত্য নাও হয়, কিন্তু মীর জুমলার কূটনৈতিক চাল যে কাজ করেছে তার উদাহরণ পাই থেভার্নের কথায়, ‘মীর জেমলা বল প্রয়োগে দুর্গটি দখল করতে না পেরে কৌশল আর অর্থ বলে(শান্তি আলোচনায় তাঁর সকাশে আসা নায়েককে) রাজাকে দুর্গের বাইরে বের করে নিয়ে এসে, তাকে দেওয়া শর্ত ভঙ্গ করে তাকে নজরবন্দী করে রেখে গাণ্ডিকোটা দুর্গ দখল করেন।’ তাভার্নিয়ের এই বর্ণনার সঙ্গে মীর জুমলার ঘুষের বর্ণনা খাপ খেয়ে যাচ্ছে।

কর্ণাটকের অভেদ্য এই দুর্গটি পতন মীর জুমলার জীবনে বড় প্রাপ্তি।

কিন্তু বিজাপুরী ঐতিহাসিক ঝাউর, এই জয়ে মীর জুমলার কোন কৌশলকেই বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ, ‘দুর্গের রাজা বিপুল রত্নরাজি আর সম্পত্তি গর্বে অন্ধ হয়ে মীর জুমলার আক্রমনকে মরুভূমিতে মরীচিকার ছোট করে দেখেছিল। যখন মীর জুমলা আক্রমন করা শুরু করে, তাকে প্রতিহত করার কোন প্রচেষ্টাই তিনি করেন নি। দুর্গেই তিনি বসে ছিলেন। মীর জুমলা দুর্গের কাছাকাছি এসে দুর্গটি ঘিরে ফেলে। প্রতিরোধের চেষ্টা করলে হয়ত রাজা সফল হতেন, কিন্তু ভিষগের হাতের তলায় যেমন রোগীর নাড়ি ফড়ফড়ায়, আদিল শাহের নাম শুনে কোন প্রতিরোধ ছাড়াই রাজা মীর জুমলার হাতে পরাজয় মেনে নেন। আর যেহেতু তাঁর আশেপাশের সব রাজাই আদিল শাহের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, সেহেতু তিনিও তা ছাড়া কোন পথ দেখলেন না।’

মীর জুমলার এই জয়ে কুতুব শাহ তাকে নওরোজইখিলাত উপাধি দেন। তখন মীর জুমলা মধ্য বয়সে পৌছেছেন, যুদ্ধের ধকলে তিনি প্রচুর শক্তিও ক্ষয় করেছেন, এছাড়াও তাঁর দৈহিক অসুস্থতা(শিকস্তগি)ও সারানোর দরকার ছিল। তিনি সুলতানের কাছে মক্কা যাবার ছাড়পত্র চাইলেন। কুতুব শাহ যুদ্ধের আগে তাকে উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এছাড়াও দীর্ঘ ২০ দিন ধরে অজীর্ণতা, নিদ্রাহীনতায় ক্রমাগত বমি করেছেন। বিগত পাঁচ বছরের নিত্যদিনের যুদ্ধে যাওয়ার কারণে তাঁর দীর্ঘ একতা রেস্ট এবং রোগ সারানোর দরকার ছিল।
(চলবে)
Post a Comment