Tuesday, November 22, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ


লেখকের দ্বিতীয় সংস্করণের মুখবন্ধটা বাদ দিয়ে যাওয়া গেল। সেখানে তিনি লিখেছেন, দ্বিতীয় সংস্করণ কেন, কতটা প্রথম সংস্করণ থেকে আলাদা। ঢুকে পড়ি মূল লেখায়।

প্রথম অধ্যায়
মীর জুমলার প্রথম জীবনঃ পারস্য থেকে গোলাকুণ্ডা

১। মীর মহম্মদের পারস্য থেকে প্রস্থান
প্রাচীন কাল থেকেই বিদেশের ভাগ্য সন্ধানী এবং অভিযাত্রীদের প্রিয় দেশ ভারতবর্ষ। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শত থেকে সপ্তম শত পর্যন্ত ইসলাম পূর্ব সময়ে পারসিকেরা ভারতে এসেছেন কেউ বাস করতে, কেউ সুফি হিসেবে, কেউ জয় করতে, কেউ জ্ঞান অর্জন করতে বা বিতরণ করতে, কেউবা প্রশাসনিক কাজে, কেউ সেনা হিসেবে, কেউ বা রাজত্ব কায়েম করতে। পারস্য যখন বৃহত্তর সাধারণ ইসলামি আন্দোলনের অংশ হয়, তখন এই প্রবণতাটা আরও বাড়তে থাকে। মধ্য যুগে পারস্য ছিল এশিয় সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; স্বাভাবিকভাবেই পারস্য থেকে প্রখ্যাত ব্যক্তিরা ভারতে এসে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। এই বিখ্যাতদের মধ্যে মহম্মদ গাওয়ান, মীর্জা গিয়াস বেগ, ইতিমদ্দৌলা, মীর্জা রুস্তম সাফাভি, মীর জুমলা অন্যতম। বহুকাল ধরে দাক্ষিণাত্যে সুলতানি রাজত্বের সঙ্গে ইরাণ, পারস্যের গভীর, নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এমন কি এই সব দেশের মানুষ সেই রাজত্বের সর্বোচ্চ পদে আসীনও হয়েছেন। অথচ হিন্দুস্তানে ঠিক উল্টো। পারসিকেরা সেখানে সাধারণত সেনাবাহিনীতে এবং অসামরিক প্রশাসনে অংশ নিতেনমাত্র, তাঁদের পক্ষে সহজে ক্ষমতার উচ্চতমপদে ওঠা সম্ভব ছিল না। মীর মহম্মদ সৈয়দ মীর জুমলার ক্ষেত্রে এই ঘটনার ব্যতিক্রম হয়েছিল; তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক সিঁড়িতে আরোহন করে উজির বা দেওয়ানিকুল পদে আসীন হয়েছেন, এবং পারসিকদের ক্ষেত্রে সাধারণ এই নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে তাঁকে উচ্চতম পদের উপাধিও দিয়েছিল মুঘল সাম্রাজ্য।

মীর মহম্মদ সৈয়দ আর্দিস্তানিকে আমরা সক্কলে চিনি মীর জুমলা নামে, যেটি আদতে একটি উপাধি; এছাড়াও তাঁকে ইতিহাস চেনে মুয়াজ্জম খাঁ, খাঁইখানান, সিপাহসালার এবং য়ারইওফাদার মত উপাধিদার হিসেবে। পারস্যের ইস্পাহানের আর্দিস্তান নামক শহরে এক অভাবী সৈয়দ পরিবারে তাঁর জন্ম, ১৫৯১ সালে। ইসপাহান একদা ইরাণের রাজধানী ছিল। তাঁর পিতার নাম মির্জা হাজারু, আর্দিস্তানের তেল ব্যবসায়ী। পরিবারের নিদারুণ গরীবি সত্ত্বেও ছোটবেলায় মীর জুমলা পড়াশোনা আর যথেষ্ট জ্ঞানার্জন করতে পেরেছিলেন। এই জ্ঞানার্জনের দাক্ষিণ্যে তিনি এক হিরে ব্যবসায়ীর দপ্তরে কাজ পান। সেই ব্যবসায়ির সঙ্গে সরাসরি গোলকুণ্ডার যোগাযোগ ছিল। তাঁর প্রথম জীবনে হিরে ব্যবসায়ে গভীর জ্ঞান, তাঁর জীবনে উঁচুতে উঠতে সাহায্য করেছে।

বড় হয়ে পরিবারের দারিদ্র তাকে নতুন পথ বেছে নিতে উৎসাহ দেয়। সে সময়ে পারস্যে শেইখইইসলামের দরুণ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছিল। তাঁর সময়ের বহু শিয়ার মত তিনিও তাঁর জন্মভূমি ছাড়তে বাধ্য হন। পারস্যের উজির খালিফইসুলতানকে লেখা এক চিঠিতে আগামী দিনের মীর জুমলা, ছোট বেলার মীর মহম্মদ লিখলেন, তিনি দেশ ছাড়তে চান কেননা, ১) নিজের জীবনধারণ সহজে সম্পন্ন করতে, ২) তাঁর পরিবারের বয়স্ক আর বৃদ্ধ আত্মীয়স্বজনের মুখে খাদ্য তুলে দিতে, ৩) এবং পারসিক শেখউলইসলামের অত্যাচার থেকে মুক্ত করতে। তিনি আরও লিখলেন ‘গরীব, অনাথ, অসহায়দের সম্পত্তি দখলের জন্য পারসিক শেখউলইসলামের অত্যাচার এবং জুলমএর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া কাহিনী দুর্ভাগ্যক্রমে সত্য হয়ে দেখা দিচ্ছে। সুন্নিরা এখানে(ভারত) শাহজাহানের রাজসভায় এসে সেই দুর্দশা সম্বন্ধে অভিযোগ করেছে, তারা উত্তর পেয়েছে, এই গোষ্ঠীদের এই একই সাজাই হওয়া উচিত। প্রশাসনিক টালমাটাল অবস্থা দেখে বহু বিদেশি বণিক পারস্যে পণ্য পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছে। অন্যান্যরা মনে করছে হিন্দোস্তান, ইরাণের তুলনায় শান্তি আর সমৃদ্ধির দেশ, তারা যতদূর সম্ভব তাদের পণ্য ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। যখন উচ্চপদের বসে থাকা বিচারপতি দেশে এ ধরণের দুর্যোগ বয়ে নিয়ে আসে, তখন সে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর যে ধরণের অরাজক অবস্থা নেমে আসে, তা বিশদে না বর্ণনা না করলেও চলে। ভারত সে সময় শরিয়তি আইন অনুসরণ করছিল। অথচ ইরান যেখানে এই ধর্মের, বিচারের এবং সমৃদ্ধির জন্ম স্থান, সে কিন্তু সত্যের পথ ভুলে গিয়েছে’।

মীর মহম্মদ তাঁর জ্ঞান সম্বল করে পারস্যের ব্যবসায়ীর দপ্তরে কাজ গ্রহণ করেন। তাঁর মালিক পারস্য থেকে কিছু ঘোড়া বহন করে গোলকুণ্ডার রাজাকে বিক্রি করার জন্য মনস্থ করেছিলেন। সে সময় পশ্চিম এশিয়, বিশেষ করে পার্সিদের চোখে গোলকুণ্ডা ছিল ভারতের এল ডোরাডো। কোন তারিখে তিনি গোলকুণ্ডায় পৌছে ছিলেন তা বলা না গেলেও, তিনি অবশ্যই ১৬৩০ সালের পূর্বেই সেখানে আসেন। আর মীর মহম্মদ সেখানে পৌছে কি করেছিলেন সে সম্বন্ধেও আমরা কিছুই জানতে পারি নি। বিদেশি পর্যটকেদের পরস্পর বিরোধী মন্তব্যে কোন সিদ্ধান্তে পোঁছন যায় না। যেমন মানুচি আর বার্নিয়ে বলছেন তিনি ঘোড়া ব্যবসায়ীর সঙ্গী হয়ে রাজকীয় পরিবারের জন্য আনা ঘোড়ার তদারক করছিলেন। আবার মানুচিরই সূত্রে পাচ্ছি তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘরে ঘোড়া বিক্রি করছিলেন। কোনটা সত্য তা নির্ধারন করা মুশকিল। তবে তিনি যে সরাসরি তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গোলকুণ্ডায় পৌছচ্ছেন। তাঁর উত্থান ঘটছে এটা নিশ্চিত হয় গোলকুণ্ডাতেই।
(ক্রমশঃ)
Post a Comment