Wednesday, November 23, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

সরইখাহিল শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘোড়ার প্রধান, বা দলের প্রধান। বাস্তবে এই পদের দায়িত্ব অনেকটা মীর জুমলা পদের অনুরূপ – সেনাবাহিনীর দায় ছাড়াও এই পদাধিকারীকে রাজ্য জোড়া অসামরিক রাজস্ব আদায়ের কাজ করতে হত। গোলকুণ্ডা রাজ্যে এই পদটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রাজত্বের ভাল খারাপ হওয়া এই পদে থাকা মানুষটির ওপর অনেকটা নির্ভর করত। আধিকারিক যদি অদক্ষ ব্যক্তিত্বহীন হত তাহলে করণিক ব্রাহ্মণেরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত, তহবিল তছরূপ এবং আত্মসাত করার প্রবণতা বেড়ে যেত এবং রাজস্বের ক্ষতি হত। তাই প্রধান রাজস্ব আধিকারিক হিসেবে তিনি পূর্ব উপকূলের ব্যবসায় নিজের দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করলেন। দেওয়ান মীর জুমলা মনসুর খাঁ হাবসি, মুল্লা মুহম্মদ তাকি তাকরিশিকে বহু মানুষের মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে সরইখাহিল(আসলে মীর জুমলা) পদে নিযুক্ত করেন ২৩ সফর ১০৩৮, ১২ অক্টোবর ১৬২৮ সালে। তিনি তাঁর দায়িত্ব এতই দক্ষ ভাবে পালন করেন যে মহালের দুর্নীতিপূর্ণ আধিকারিক এবং মাথায় চড়ে বসা ব্রাহ্মণেরা কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে; তহবিল তছরূপ এবং আত্মসাতের প্রবণতা বন্ধ হয়ে যায়, রাজস্ব আদায় বাড়তে তাকে। জমিদার নারায়ণ রাওয়ের(মজমুদার) থেকে ১৩০০০০ হুন আদায় হয় এবং ট্রেজারিতে জমা হয়। বিভিন্ন বাগী চৌধুরীকে হত্যা এবং তাঁদের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। সুলতান মুহম্মদ টাকিকে সারিফুলমুল্ক উপাধিতে ভূষিত করে তাকে সোনার জলে কারুকার্য করা কলমদানি উপহার দেন। তিনি এই উপহার মির্জা মুহম্মদ আমিন মীর জুমলা ছাড়া অন্য কোন অধিকারিককে উপহার দেন নি।

এই পদের বিশদ বর্ণনা এই জন্য দিলাম এটাই বার্তা দিতে যে সরইখাহিল আর মীর জুমলা এই দুটি পদ এর পর থেকে একজনই(মুহম্মদ টাকি) সামলাবেন এবং দেওয়ানির অর্থ মূলত রাজস্ব আদায়, এই দুই পদাধিকারিকের ওপর ন্যস্ত ছিল।

নিরবিচ্ছিন্ন দুবছর সাত মাস দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে, শাওয়াল ১৯, ১০৪০, ১১ মে ১৬৩১ সালে সরফইমুল্ক, সরইখহিল এবং সদর মুহম্মদ টাকি তাক্রিশির এন্তেকাল হয়। তাঁর পরের ছয় বছর এদিকওদিক করে, একের পর এক ক্ষণস্থায়ী পদাধিকারী বসিয়ে দপ্তরটি চালানো হয়, কিন্তু টাকি যে উচ্চতায় দপ্তরটিকে পো্ঁছে দিয়ে যান, সেই দক্ষতা দপ্তরের হারিয়ে যায়। পেশোয়া পদের অধিকন্তু পদ হিসেবে, প্রথমে নবাব আল্লামি ফাহিমি শেখ মহম্মদ ইবনে খাতুন দেওয়ান পদ দেখাশোনা করতেন। এই পদের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তাঁর সাবেক দেওয়ান দপ্তরের কাজকর্ম দেখাশোনা করতে দেন মীর কাশিম নাজিরউলমুল্ক, মীর মুইজ্জুদ্দিন মুহম্মদ মুশারফ এবং নারায়ণ রাও মজমুদার এবং অন্যান্য আধিকারিককে - যাদের কাজ ছিল যথাক্রমে রাজকীয় রসুইখানা, হাতিসাল, ঘোড়াশালের ব্যবস্থাপনা করা।

খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং বাড়তে থাকা খরচে নাজেহাল দেওয়ানির দৈনন্দিন কাজকর্ম বেহাল হতে থাকে। বহু কাজ বন্ধ হয়ে যায়, বিভিন্ন মহাল থেকে অভিযোগের পর অভিযোগ আসতে থাকে। বাস্তবিকভাবে এই ক্ষণস্থায়ী পদক্ষেপগুলি ঠিক মত কাজ করে নি। ২৪ জিলহিজ্বা ১০৪৯, ১৪ জুলাই ১৬৩১ মীর্জা আস্তরাবাদী, সরইখাহিল পদে নিযুক্ত হলেন। মীর্জা বিশ্বস্ত এবং সৎ হলেও, হিসেব রাখা এবং প্রশাসনিক কাজে অনভিজ্ঞতার দরুণ তাঁর পদের প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি। এই সুযোগে ব্রাহ্মণেরা মাথায় চড়ে বসতে থাকে। বাউতাত বাড়ি আর মহালগুলি থেকে এতই অভিযোগ আসতে থাকে যে সুলতান নিজে কারখানার কাজকর্ম দেখতে শুরু করেন। নবাব আল্লামির পরামর্শে সুলতান মীর্জা রোজবিহানী ইসপাহানিকে ৩ রাবিউসসানি ১০৪১, ১৯ অক্টোবর ১৬৩১ সালে এই পদে নিযুক্ত করেন। সৎ এবং সত্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরও কাজ সুলতানের অপছন্দ হল। তাকে বরখাস্ত করে সুলতানের প্রধান নৃত্য সহায়ক মীর ফাসিউদ্দিন তাকরিশি সোনার কারুকার্য করা কলমদানি উপহার দিয়ে এই পদে বহাল হন। কিন্তু তারও চাকরি বেশি দিন রইল না, শেষমেশ সুলতান নবাব আল্লামিকে মীর জুমলা পদে নিয়োগ করেন ৯ শাওয়াল ১০৪৩, ২৯ মার্চ ১৬৩৪ সালে। আগেই বলেছি তাঁর সঙ্গে তাঁর ভাইপো মুহম্মদ তাহির সরইখাহিল হিসেবে তাঁর সহকারীর পদে নিযুক্ত হন। মীর জুমলা পদ সামলানো ছাড়াও নবাব আল্লামি পেশোয়া পদের খেলাত পেলে(১৭ রজব ১০৪৫, ১৭ লিসেম্বর ১৬৩৫), সরইখাহিল তিন মাসের জন্য খালি পড়ে থাকে। নবাব আল্লামির পরামর্শে, কাশিমকোট এবং কলংএর সরইলস্কর আবদুল্লা খাঁ মাজানদারানি সরইখাহিল পদে নিযুক্ত হলেন ১৯ শাওয়াল ১০৪৫, ১৭ মার্চ ১৬৩৬। আমরা দেখলাম ১৬৩১এর পর থেকে কিছু দিন অন্তর এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আধিকারিক বদলাতে হয়েছে এবং সেই পরীক্ষা নিরীক্ষা সফল হয় নি, একের পর এক সরইখাহিল পদে আধিকারিক পরিবর্তিত হতে থাকে যতক্ষণনা আমাদের বীর মীর মুহম্মদ এই পদের আধিকারিক হিসেবে মনোনীত হচ্ছেন।

১০৪৭ হিজরাব্দে এক রাজকীয় আদেশে(ফর্মান) মীর মহম্মদকে রাজসভায় লেকে পাঠানো হয়। তাঁকে ৭ সফর ২১ জুন ১৬৩৭ সালে এক রাজকীয় অনুষ্ঠানে ভাল জাতের হাতি, ইওরোপিয় ও চিনা কাপড় উপহার দিয়ে সম্মান জানানো হয়। সুলতান তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করলেন এবং ‘জ্ঞানী আর দক্ষতার সংমিশ্রণ’ রূপে অভিহিত করলেন। সফর ৯এর রাতে ২৩ জুন ১৬৩৭ সালে সৈয়দ আবদুল্লা খাঁ মাজানদারানির উত্তরসূরীরূপে পুরোনো মহালকে উকিলদের হাতে ছেড়ে মীর মহম্মদ নতুন পদে অভিষিক্ত হলেন।
(চলবে)

Post a Comment