Sunday, November 27, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

এখানে বিশদে আর গভীরে গিয়ে কর্ণাটকে মীর জুমলার প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়া এখানে সম্ভব নয়, এছাড়াও সেখানে থাকার তার সময় এত বেশি ছিল না যে তিনি তার অনপণেয় দক্ষতার ছাপ সেখানকার প্রশাসনে ছেড়ে আসতে পারেন। তিনি কোন দিনই থিতু হওয়ার সময় পাননি- সারাক্ষণ খুবই ব্যস্ত ছিলেন, একদিকে যুদ্ধের পর যুদ্ধ করে দেশ জয়ের পরিকল্পনা, তার পরে গোলকুণ্ডা সুলতানির সংগে তার ক্রমাগত বিরোধ এবগ সম্পর্কের অবনতি এবং সব শেষে কর্ণাটক ছেড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের কাজে যোগ দেওয়া।

আমাদের ধারণা মীর জুমলা বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গ্রামীন সংগঠনের ধারাটি গ্রহন করেছেন, কেননা বহু ইওরোপিয় নথিতে বিজয়নগর রাজ্যের প্রশাসনের যে সব পদের নাম পাওয়া যায় – যেমন নটবর বা নাড়ু বা কয়েকটি গ্রামের প্রধান, বা কারনাম বা কাণক্কপিল্লাই বা হিসেব রক্ষক, তালয়ারি(স্থলওয়ার) বা টুকরি বা গ্রাম রক্ষক, পোলিগার বা পুলিশ প্রধান, ইত্যাদি, সেগুলি তার প্রশাসনেও ব্যবহার করেছেন তিনি।

গোলকুণ্ডা ছিল মীরজুমলার প্রশাসনের মূল কেন্দ্র। এক দিকে হায়দারাবাদ (কাম্বম, মাছরেলা, দাবারকোণ্ডা এবং হায়াতনগর হয়ে) পর্যন্ত অন্যদিকে মাদ্রাজ পর্যন্ত। ছড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ কুঠি নথি সূত্রে আন্দাজ করে নেওয়া যায় যে, যে সব এলাকা মীর জুমলা দখল করেছেন, বিশেষ করে মাদ্রাজের আশেপাশের এলাকা, সেগুলিকে কতগুলি ছোট ছোট প্রশাসনিক এলাকায় ভাগ করেছিলেন এবং প্রত্যেক এলাকায় প্রশাসক(গভরণর) নিযুক্ত করেন।

ব্রিটিশ নথি সূত্রে পাচ্ছি, মাল্লাপ্পা, সৈয়দ ইব্রাহিম তিম্মাজি বালা রাউ এবং মীর সৈয়দ আলি মীর জুমলার পক্ষ থেকে ১৬৫৫-৫৮ সালে ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। উইলিয়ম ফস্টার এবং মিস্টার লাভ, মাল্লাপ্পা আর তিম্মাজির সম্পর্কে লিখেছেন, মাদ্রাজ কুঠিতে(চোল্ট্রি) তারা ছিলেন নবাবের আদিগর বা প্রতিনিধি। কিন্তু এটাও মনে হয় মাল্লাপ্পা শুধু যে মাদ্রাজে নবাবের আদিগরের কাজ করতেন তাই নয়, তিনি পুনামাল্লিতে প্রশাসকরূপেও দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৬৪৭ সালের জুন মাসে ব্রিটিশদের শ্রী রঙ্গ বাণিজ্য সুবিধে দেওয়ার পরে মীর জুমলা মাল্লাপ্পা এবং ব্রিটিশ কুঠিয়ালকে মাদ্রাজে পাঠিয়েছিলেন তার প্রশাসনের দেখাশোনা করতে। মাল্লাপ্পা সেখানে পূর্বের প্রশাসকের চরিত্রের মতই সাত বছর ধরে প্রশাসন কার্য পরিচালনা করেন। সৈয়দ ইব্রাহিম, মাল্লাপ্পার স্থলে পুনামাল্লিতে প্রশাসক নিযুক্ত হলেন, এবং তিনি তিম্মাজীকে নবাবের আদিগর হিসেবে মাদ্রাজে পাঠালেন। ১৬৫৩ সালে জুলফিকার আস্তারাবাদীর পুত্র রুস্তম বেগ, পুনামাল্লির হাবিলদার নিযুক্ত করেন।

মীর জুমলা যে শুধু ভাল দেশ নায়ক ছিলেন তাই নয়, তিনি ভাল আর্থিক প্রশাসকও ছিলেন। তিনি কর্ণাটকের আর্থিক শৃঙ্খলার ভার গোলকুণ্ডা নিয়োগী নামক ব্রাহ্মণ প্রশাসাকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। কর্ণাটক থেকে সারা বছরে তিনি ৪৩ লক্ষ টাকা রাজস্ব তুলতেন। তার রাজত্বের আয়ের জায়গাগুলি ছিল ১) ভূমি রাজস্ব। ২) কর্ণাটক জোড়া লুঠ, ৩) হীরের খনি, ৪) একচেটিয়া ব্যবসা সহ রাজত্বের উতপাদনের ওপর আর ব্যবসা থেকে আয়, ৫) আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, ৬) পথ কর, ৭)দাস ব্যবসা চালানোর পঞ্জিকরণ, 8) উপহার সামগ্রী, ৯) আদায়(ইম্পোজিসন্স)।

তার ভূমি রাজস্বএর প্রশাসন, চাষ থেকে আদায়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন। ইসলামি আইনে জমি আর জমির সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষের চরিত্র আর শ্রেণী বদলে গেল, ফলে জমির পরিমাণ অনুযায়ী গ্রামের সম্পত্তি আর জমির রাজস্ব নির্ধারণ করা হল।

তিনি দুর্গ দখল, অঞ্চল লুঠ, বিভিন্ন মন্দিরের সিন্দুক লুঠ করে বিপুল পরিমান সঞ্চয়ে থাকা সম্পত্তি, লুকোনো ধনসম্পদ উদ্ধার করেন। কারটু বলছেন, কর্ণাটকী সম্পদশালীদের প্রত্যেকের বাড়িতে যা সোনা দানা রত্নরাজি যা আছে সেগুলি তাকে দিতে তিনি বাধ্য করেছিলেন। এবং যারা রত্নরাজি জমির ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন, সেগুলি উদ্ধার করে দেশের তাদের আইন অনুযায়ী তাদের চাবুক মারা হত। থেভেনট বলছেন মীরজুমলা, একজন রাজার মত সম্পত্তি দখল করেছিলেন, তার ছিল কর্ণাটক লুঠ করে উদ্ধার হওয়া ২০ মনের হিরে।

গোলকুণ্ডার বিশ্ব খ্যাতি ছিল তার হীরের জন্য। সেখানে শুধু হীরের খনিই ছিল না, সেগুলি পালিস করা আর কাটার কাজও সেখানে হত। এই কাজ থেকে রাষ্ট্র বিপুল প্রমান রাজস্ব উদ্ধার করত। কর্ণাটকে হিরের খনি রয়েছে, এই খবর পেয়ে মীর জুমলা সে দেশ আক্রমন করার এক বছর আগেই বারো হাজার শক্তপোক্ত চুক্তিভূক্ত কৃষি শ্রমিককে সেই অঞ্চলের খনিগুলিতে পাঠান হিরে তোলার কাজ করতে এবং যখন এক বছর পরে সেখান থেকে পাঁচটা ছোট থলে ভরা হিরে পেলেন, তাতে তার মন ভরল না, তার আফসোস হল, তিনি প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ দিয়ে কৃষিকাজে পাঠিয়ে দিলেন। গোলকুণ্ডার কৃষ্ণা নদীর তীরে সব থেকে বড় হিরে তোলার কুল্লার খনি তার প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই ছিল, সেগুলি তাকে ধনীতম ব্যবসায়ী বানিয়েছিল। সেগুলি তিনি তার আত্মীয় আর বন্ধুদের মধ্যে বেঁটে দিয়েছিলেন, কিন্তু সব থেকে বড় আর সব থেকে কাজের খনিটি নিজের জন্য রেখেছিলেন। তার খনিতে ৬০ হাজার বাচ্চা, পুরুষ আর নারী কাজ করত, যে পাথরগুলি উঠত তার ওজন ছিল ৪০ থেকে ৯০০ ক্যারট। তার হীরে ব্যবসার প্রশাসনটা বীজাপুরী কর্ণাটকের রাওলকোডা খনির মত করে চলত – মধ্যস্থরা হিরের খনির জন্য ২ শতাংশ এড ভ্যালোরেম ট্যাক্স দিতে হত সরকারকে। আমরা জানি না মীর জুমলার খনি হিরে ছাড়া গন্ধর্বমণি(এগেট), পদ্মরাগমণি/নীলকান্তমণি(আমেথিস্ট), পোখরাজ(টোপাজ)এর মত দামি রত্ন উঠত কি না। তবে তিনি পারস্য উপসাগর থেকে মুক্তো আমদানি করে তা রপ্তানি করতেন। তাভার্নিয়ে যখন প্রথম গোলকুণ্ডা আসেন(১৬৫২) তিনি মীর জুমলাকে এই ধরণের মুক্তো বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। হীরে ছাড়া মীর জুমলার কর্ণাটকে বিজোয়ার(bezoar??), লোহা-ইস্পাত, সোরা উতপাদন হপ্ত। মীর জুমলা বিপুল পরিমান সোরা উতপাদন এবং সংগ্রহ করতেন প্রতি বছর।
(চলবে)
Post a Comment