Sunday, April 29, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৭৯ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৫
বস্ত্র, পরিধেয় এবং উপনিবেশিকতাবাদঃ উনবিংশ শতকের ভারত

পরিচিতির চিহ্ন হিসেবে পাগড়ি
সময়ের হস্তাবলেপনে, সেনাবাহিনীর মত করে পরা পাগড়ি শিখেদের সাধারন চিহ্ন হয়ে উঠল, যদিও শিখ সমাজে এই ধরণের পাগড়ি পরিধানকে এক্কেবারেই সাধারণীকরণ করা যাবে না। এবারে প্রভুভক্ত শিখেরা ব্রিটিশ দ্বীপে এল। কিন্তু পুরোনো সময়ে যে চিহ্নটা শিখদের পরিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অনুগত করে রাখার জন্যে তৈরি হয়েছিল, সেই পাগড়িটার সেই তাৎপর্য আর তখন নেই। এখন পাগড়ি, বৃহত্তর জনসমাজের মধ্যে ডুবে না গিয়ে, শিখেদের আলাদা চরিত্র বজায় রাখার জন্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অতীতে যে চিহ্ন শাসকেরা তৈরি করেছিল আনুগত্যের শপথ হিসেবে, সাগরের সময়ে সেটাকে দেখা হতে শুরু করল শিখেদের একগুঁয়েমি হিসেবে। ইংলন্ডের বাস কন্ডাক্টরদের পোষাকের চরিত্র বজায় রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলল। ব্রিটিশদের পক্ষে বলা হতে থাকল শিখেরা কি ইংলন্ডের আইন ভঙ্গ করতে পারে, যে আইনে বলা হয়েছে ব্রিটেনে মোটরসাইকেল আরোহীদের ইস্পাতের হেলমেট পরতে হবে, শিখেরা পাগড়ি পরে বলেই কি সেই আইন তারা অমান্য করতে পারে? আরও সম্প্রতি এই যুদ্ধটা চলে এসেছে ইস্কুলের প্রাঙ্গনে যেখানে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, দাড়ি চুল না কাটা বাবার বাচ্চাকে আদৌ প্রাথমিক স্তরে ভর্তি নেওয়া হবে কি না। এই মামলা ১৯৮৩ সালে শেষ হয় হাউস অব লর্ডসএ। তারা নিচের স্তরের আদালতের রায় বদল করে বলল হেডমাস্টার বেআইনি ভাবে শিখেদের চুল কেটে দিয়ে তাদের পাগড়ি না পরতে বাধ্য করে, শিখদের বিরুদ্ধে পক্ষপাত করেছে।

ব্রিটিশেরা যেভাবে নিজেদের দেখাতে চাইল
ভারতের নতুন শাসক হয়ে উঠতে উঠতে, ব্রিটিশেরা নতুন ধরণের আচরণবিধি তৈরি করল, যার মাধ্যমে তারা বাহ্যিকভাবে, সামাজিকভাবে এবং কৃষ্টিগতভাবে ভারতীয় প্রজাদের থেকে আলাদাভাবে প্রতীয়মান হয়ে উঠবে। সপ্তদশ শতকের প্রথমপাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সুরাটে প্রথম কুঠি স্থাপন করার পর থেকেই কোম্পানির আমলারা সমাজের থেকে প্রায়আলাদা হয়েই ঘেরাটোপে বাস করত। ব্যবসা আর লাভের জন্যে মুঘল সেনা আর ভারতীয় বণিকদের জ্ঞানের ওপর এবং ভারতীয় ভৃত্যদের পরিচর্যার ওপর দৈনিক জীবনধারণে নির্ভরশীল হলেও তারা আলাদা হয়েই থাকতে ভালবাসত। পরিধেয় এবং আচার আচরণে তারা ভারতীয় উচ্চপদাধিকারী, সমপদের এবং নিম্নপদের মানুষদের থেকে যে আলাদা সেটা বোঝাতে চাইত। ইওরোপিয়দের যে সব ছবি ভারতীয়রা এঁকেছে সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকে, তাদের পোষাক পরিচ্ছদে কোথাও বোঝা যায় নি যে তারা ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং বাহ্যিক আবহাওয়াকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাড়িতে বা দপ্তরে বা মাঠেঘাটে শিকারে বা সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় ব্রিটিশেরা নিজেদের মত করে পোষাক পরত।

কয়েকটা ব্যতিক্রম আমরা দেখতে পাই যেখানে মধ্য ভারতে ইওরোপিয় প্রতিনিধিরা নিজেদের কৃষ্টিমাফিক পরিচ্ছেদ বর্জন করে মুসলমান রাজদরবারের মত করে পোষাক পরছে। কিছু ইওরোপিয় যারা এদেশের মেয়েকে বিয়ে করেছিল বা রক্ষিতা রেখে তাদের সন্তানকে নাম দিয়েছিল, যাদের এই অর্ধ-মুঘল বলা হত সেই ইওরোপিয়দের অনেকেই নানান গণঅনুষ্ঠানে ইওরোপিয় পোষাক পরলেও বাড়িতে কিন্তু ভারতীয় বসন পরত। কোম্পানি তার কর্মচারীদের ভারতীয় যে কোন অনুষ্ঠানে ভারতীয় পোষাক পরা নিষিদ্ধ করে ১৮৩০ সালে। উত্তরভারতে আদালতে ভারতীয় পোষাক পরে বিচার করা কোম্পানি আমলা ফ্রেড্রিক জন শোরএর উদ্দেশ্যে আলাদা করে নির্দেশিকা জারি হয়। শোর ছিলেন কিন্তু বর্তমানে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়া ভারতীয়দের চরম সমালোচক, বিশেষ করে স্থানীয় অভিজাত, বুদ্ধিজীবি এবং রাজস্ব এবং বিচার দপ্তরে গুরুত্বপুর্ণ পদে কাজ করা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে তিনি কলম শানিয়েছেন। তিনি শুধু দেশিয়দের বিরুদ্ধেই কলম ধরেন নি, নিজের দেশের প্রত্যেকের চাকরিপাওয়ার জন্যেও লিখেছেন নিরন্তর। 
Post a Comment