Saturday, April 7, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৪২ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৩
আইন এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র

কোন বেসরকারি ব্যবসায়িক কোম্পানি যেটি এখন রাষ্ট্রের চরিত্র ধারণ করে ভূখণ্ড শাসন করছে সে রাজার দেওয়া আর্থিক দান আর সনদ নির্ভর করে এই কাজ সম্পাদন করতে পারে কি না সে প্রশ্ন উঠছিল। ভারত শাসন বিষয়ে এই প্রশ্নই বার বার উঠতে লাগল লন্ডনের রাজনীতিতে। সেই শাসনটা যদি আইনি হয়ও(কারণ একে আইনি বৈধতা না দিতে পারলে ব্রিটিশের বাংলা লুঠের বৈধতা আসে না - অনুবাদক), তাহলে প্রজাদের ভাল রাখা আর সমৃদ্ধির জন্যে তার কি কি করা প্রয়োজন, সেটাও আলোচিত হতে থাকল। এই প্রধান বিষয় এবং এর সঙ্গে জুড়ে থাকা হাজারো প্রশ্ন ১৭৬০ থেকে ১৭৯০ পর্যন্ত লন্ডন রাজনীতির আলোচনার মুল রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে উঠে আসছিল। ১৭৮৫ নাগাদ, ভারতে দ্বৈত সার্বভৌমত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলিকৃত ভূখণ্ডে নিজের আর নিজের অংশিদারদের লাভের জন্যে সরকার চালাতে পারে ঠিকই – কিন্তু সেটা করতে হবে পার্লামেন্টের আইন অনুসারে, এবং পার্লামেন্টের নির্দিষ্ট সময়ান্তরে ভারতে কোম্পানির সরকার চালানোর যোগ্যতা এবং ঔচিত্য বিবেচনায়। কোম্পানির কর্মচারীরা রাজার একচ্ছত্রতার অধীনে থাকলেও, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে জুড়ে থাকা রাজন্য প্রতিনিধি থেকে চাষী পর্যন্ত ভারতীয় প্রজারা কিন্তু সরাসরি রাজার প্রজা নয়। রাজাদের থেকে প্রাপ্ত বা অধিকৃত ধন পাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে কোম্পানি ভারতে তার শাসনের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত করছিল – যেমন ১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি পাওয়া, যার মাধ্যমে ভারতের রাজস্বের পরিমান নির্ধারণ এবং সেটি আদায়ের কাজ পায়। ভারতে এবং লন্ডনে, সাংবধানিক প্রশ্নগুলি সমাধানের উদ্বেগ এবং ভারতে কোম্পানি শাসনের বৈধতা প্রমানের সঙ্গে সঙ্গেই যে সব সার্বভৌম চরিত্র আরোপিত হচ্ছিল কোম্পানির দেহে, সেই বিষয়গুলি খুব জটিল এবং দুরুহ আলোচনাযোগ্য ছিল ঠিকই; এর পাশাপাশি ভারত শাসনের প্রশাসনিক হাতিয়ার তৈরির উদ্দেশ্যে ভারতে কোম্পানির শাসন ব্যবস্থাপনায় জড়িত থাকা বাস্তববাদীরা একযোগে কাজ করা শুরু করে দিলেন।
১৭৬৫ সালে ক্লাইভ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মদাতাদের দাবি করে লিখলেন, কোম্পানি মুঘল দেওয়ানি অধিকার পেয়ে যাওয়ার এই ধনী সম্পদশালী ভূখণ্ডের সার্বভৌম শাসক হয়ে বসেছে। তারা শুধু নবাবের পক্ষে রাজস্ব আদায়কারীই নয়, নবাবের রাজস্বের হকদারও(প্রোপ্রাইটর) বটে। ক্লাইভের দাবিতে কর্তারা খুব খুশি হন নি, কারণ তাদের মনে হয়েছিল ব্রিটিশরা রাজস্ব আদায়ের পরিকাঠামো তৈরিতে অদক্ষ এবং এই কাজে চতুর দেশিয়দের কাজে লাগানো তাদের কম্ম নয়, দেশিয় আমলারা তাদের হতভম্ভ করে দেবে, এই আদায়কারীরা আদায়ের সঠিক মূল্য কর্তাদের পরিষ্কার করে দেখাবে না। তারা বরং আদায় করা রাজস্ব খরচ করার কাজ করুক। কোম্পানির দেওয়া প্রস্তাবে বিরোধাভাস স্পষ্ট, কেননা রাজস্ব নির্ধারণ এবং আদায় খুব জটিল এবং কঠিন এক প্রক্রিয়া, যা ভারতীয় অভিজ্ঞ আমলা এতদিন সামাল দিতেন। যদি ব্রিটিশেরা জটিল এই রাজস্ব ব্যবস্থার খুঁটিনাটি আয়ত্ত না করতে পারে, তাহলে তাদের চিরকালই চতুর দেশিয়দের হাতে ক্রীড়ানক হয়েই কাটাতে হবে, যারা তাদের প্রত্যেক মুহূর্তে হতভম্ভ করে দেবে। ১৭৭২ সালে মাঠে নেমে যখন ব্রিটিশেরা রাজস্ব আদায় নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল, সে সময়টা নিয়ে একজন আধুনিক ঐতিহাসিক লিখলেন, এটা একটা অনির্দেশের পানে যাত্রার সামিল... প্রত্যেক স্তরে তারা আধাসামন্ত্রতান্ত্রিক অধিকার এবং দায়িত্বের মুখোমুখি হচ্ছিলেন যা পশ্চিমি সংজ্ঞার বিপ্রতীপ। জমিদারির সেরেস্তায় পারসিকে লিখিত দুর্বোধ্য লিপি আর হিসেব রাখার পদ্ধতির জটিলতা তাদের হতচকিত করে দিয়েছিল... প্রাচীন ভারতের সম্পত্তির লিখিত পাঠ্যগুলি তারা ভাষা না জানায় উদ্ধার করতে পারছিল না; এছাড়াও অলিখিত প্রথা ব্যবস্থাপনার স্মৃতি নির্ভরতা এবং প্রত্যেক স্তরে আঞ্চলিক লব্জের ব্যবহারে অধিকারের সীমাটুকু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল।

ব্রিটিশ কৃষ্টিগত ব্যবস্থাপনায় রাজস্ব নিরূপনের অধিকার আইনের সাথে জোড়া ছিল। আদালত সম্পত্তির অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ, এবং আদায়িকৃত রাজস্বের রাজার অংশভাগও সুনিশ্চিত করত। ভারতে আসা ব্রিটিশেরা প্রথমে বোঝার চেষ্টা করেছিল জমির অধিকার কাদের হাতে ন্যস্ত আছে, যারে মাধ্যমে তাদের দায়ি করে রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ বোঝাটা তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়। এই তত্ত্বটি তাত্ত্বিকভাবে খুব সহজ, কিন্তু  রঞ্জিত গুহ বলছেন এটা বাস্তবে প্রয়োগ করতে গিয়ে দেখল এটা অসম্ভব জটিল বিষয়। কোন বিদেশি শাসকের পক্ষে আইন তৈরি করে, সাধারণভাবে কৃষির উদ্বৃত্ত আদায় করার উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে জ্ঞানের যে আঙ্গিকে দখল থাকা প্রয়োজন ছিল, তা তাদের ছিল না; বোঝা গেল সেটা তাদের অর্জন বা তৈরি করতে হবে। ১৭৬৫র পরে অদক্ষ হাতে তারা যেভাবে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টা ঘেঁটে ফেলছিল, তার ফলে এই অধিকার পাওয়ার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলাজুড়ে একটা মন্বন্তর ঘটিয়ে ফেলল, যে মন্বন্তরে ফলে, কোম্পানির হিসেবেই একতৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। মন্বন্তরের জেরে বিপুল সংখ্যক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে এবং পতিত হয়ে যায়। হতচকিত ব্রিটিশেরা মরা কৃষি কিভাবে বাঁচানো যায় সেই পদ্ধতিটা তাত্ত্বিকভাবে বুঝতে এবং তথ্য জোগাড় করতে থাকে। মন্বন্তর আর রাজস্ব আদায় নীতি বাংলার আইন শৃঙ্খলাকে ভেঙ্গে ফেলল; ব্যবসায়ী এবং চাষীরা পরিযায়ী ডাকাতদের খাদ্য হল। 
Post a Comment