Monday, April 23, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৬৪ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৪
উনবিংশ শতকে, বস্তুকে হস্তশিল্প, পুরাকীর্তি আর শিল্পে রূপান্তর

কর্নেল ম্যাকেঞ্জি এবং অমরাবতীর মার্বেল পাথরের স্থাপত্য
ম্যাকেঞ্জির আন্দাজ ছিল, এলাকাটি বৃত্তাকার চরিত্রের হওয়ায় এটা হয়ত দ্রুইদাসদের ধর্মস্থল এবং তাদের অনুসৃত সূর্য উপাসনা আর আচারের স্থান। স্থাপত্যের সঙ্গে জুড়ে থাকা লিপিগুলি দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে বলেন সেটি নিশ্চই ভারতীয় নয়, এবং এগুলি আগে তার নজরে আসে নি। যতদূর সম্ভব তিনি অমরাবতী স্থাপত্যের নকশা, রেখাচিত্রের নকলগুলি লন্ডন, মাদ্রাজ আর কলকাতা পাঠান। বেশ কিছু স্থাপত্যের নিদর্শন কলকাতা, মুসলিপট্টনম, মাদ্রাজ এবং লন্ডনে পাঠান – কিন্তু কতগুলি কোথায় কোথায় পাঠান তার হিসেব আজও পাওয়া যায় নি।
১৮৩০ সালে মুসলিপট্টনমের কালেক্টর রবার্টসন সেই স্থাপত্যগুলির একাংশ উদ্ধার করে, মূল বাজারের কেন্দ্রে বসান। পাঁচ বছর পরে মাদ্রাজের গভর্নর এই মূর্তিগুলি তুলে নিয়ে মাদ্রাজে বসান। স্বাভাবিকভাবে এগুলি রক্ষণাবেক্ষণের দায় দেওয়া হল মাদ্রাজ লিটারারি সোসাইটিকে। সব শেষে দেখা গেল এগুলির কিছু অংশ মাস্টার এটেন্ডেন্টের বাজানে বিরাজ করতে।
ম্যাকেঞ্জি যে লিপিটি পড়তে পারেন নি, সেই লিপিটি প্রথম পাঠের চেষ্টা হয় জেমস প্রিন্সেপের মাধ্যমে বেনারসের সংস্কৃত কলেজের গ্রন্থাগারিক পণ্ডিত মাধোরায়ের সাহায্যে। ইনি একদা ম্যাকেঞ্জির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। এই লিপিটির সঙ্গে মহাবলীপুরমের গুহা আর ছত্তিসগড়ে প্রাপ্ত লিপির মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পেলেন প্রিন্সেপ। তিনি এই অক্ষরগুলির নাম দিলেন নাধরা, যা উত্তরভারতের দেবনাগরী থেকে আবির্ভূত হয়েছে। প্রিন্সেপ বললেন এই লেখগুলি যতদূর সম্ভব কোন বৌদ্ধ রাজার সময়ে লিখিত হয়েছিল। কিন্তু রাজার নাম না পাওয়া যাওয়াতে তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন, ফলে এর তারিখটি নির্ধারণ করতে পারেন নি।  তিনি বললেন এই লিপিটি থেকে ইতিহাস কিছুই বার করতে পারবে না।
তবে এই সংগ্রহের সব থেকে বড় অংশ, নব্বইটা গুন্টুরের কমিশনার স্যর ওয়াল্টার এলিয়টের অধীনে ছিল ১৮৪০ সাল পর্যন্ত। তিনি এগুলি মাদ্রাজে নিয়ে যান। তখন থেকে ১৪ বছর এগুলি নিয়ে কারোর কোন উৎসাহ ছিল না, যতক্ষণ না সেন্ট্রাল মিউজিয়ামের অধিকর্তা ড বেলফোরের নজরে না এসেছে। তিনি এগুলির তালিকা তৈরি করেন। আশ্চর্যের নয় শেষ পর্যন্ত এই মূর্তিগুলির বিশ্লেষণের দায় গিয়ে পড়ল উইলিয়াম টেলরের হাতে, যিনি আবারও একবার কলম হাতে নিয়ে তার অত্যাশ্চর্যময় ভুলভাল তত্ত্ব প্রকাশ করার সুযোগ পেয়ে গেলেন।
এলিয়ট মার্বেল নামক মাদ্রাজি সংগ্রহ ১৮৫৭ সালে লন্ডনে গেল কোম্পানির জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্যে। পৌঁছল ১৮৫৮র শীতে, ঠিক যখন কোম্পানির শাসন অবসান হয়ে ভারতের রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছে। গোটা শীত সেই মূর্তিগুলি খোলা আকাশের নিচে সাউথওয়ার্কের ডকে পড়ে রইল। সাহেবদের মনোমত করে এগুলোর মধ্যে একটা মাত্র ভালটা বেছে নিয়ে হোয়াইট হলের ফিফ হাউসের ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে গেল। অন্যগুলোর খবর পাওয়া গেল না।

১৮৬৬ সালে, পরের বছর প্যারিস ইন্টারন্যাশলান এক্সিজিবিশনের ব্রিটিশ অংশ প্রদর্শনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত হেনরি কোল ফারগুসনকে নির্দেশ দিলেন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক এবং স্থাপত্যের ছবি নিয়ে প্রদর্শনী আয়োজন করতে। ফারগুসন ছবিগুলোর সঙ্গে বাস্তবিক কিছু মূর্তিও প্রদর্শনের ভাবনা ভাবলেন। তখন তার মাথায় এল অমরাবতী স্থাপত্যগুলি ব্যবহারের ভাবনাটা যা লিডেনহল স্ট্রিটের মিউজিয়ামের কেন্দ্রিয় আকর্ষণ। সেই বাতিল মূর্তিগুলি খুঁজে পাওয়া গেল ফিফ হাউসের কোচ হাউসের জঞ্জালের মধ্যে। ইন্ডিয়া অফিসের ক্যামেরা চালক উইলিয়াম গিগসএর তোলা ছবিগুলি নিয়ে তিনি গোটা অমরাবতী স্থাপত্যের সামগ্রিকতার ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করা শুরু করলেন। 
Post a Comment