Friday, April 6, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৩৭ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২

শিক্ষা এবং অতীত সংরক্ষণ
কোর্ট অব ডিরেক্টর্স ওয়েলেসলির উচ্চাকাঙ্খী পরিকল্পনা হাতে পেয়েই পাঠ্যক্রম ইওরোপিয় অংশটা ছেঁটে ফেললেন এবং আবাসিকতার পরিকল্পনাটা নাকচ করে দিলেন। তাদের কলেজের মূল সমস্যা বলে মনে হয়েছিল যে এটা শেষ পর্যন্ত ভাষা শিক্ষার কলেজে পরিণত হবে। তবে ইংলন্ডের হ্যালিবেরিতে আমলা তৈরির জন্যে যে বিদ্যালয় স্থাপন করেন কর্তারা সেখানে কিন্তু ইংরেজির সঙ্গে ভারতীয় ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থাও রাখলেন।
ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের গভর্নিং কাউন্সিল কোর্ট অব ডিরেক্টর্সের কাটছাঁট করা বাজেটে দেখলেন যে তাদের হাতে ১৮০১ থেকে ১৮১২ পর্যন্ত সময়কালে আছে ৪০ হাজার পাউন্ড ৮৮টা বই সম্পাদনা, লেখা ও অনুবাদের জন্যে। মূল খরচ হয়েছিল পার্সিভাষার বই প্রকাশের জন্যে ১,১০,০০০ টাকা, আরবি ৫২,০০০টাকা এবং সংস্কৃত ৪৪,০০০ টাকা। কোম্পানি তার কর্মকর্তাদের জানাল এরপর থেকে কোন ধরণের ভর্তুকি দেওয়া বইএর প্রকাশনা তার মান দেখে যাচাই করা হবে।কোর্ট লিখল, দত ভেরি হেভি এক্সপেনস টু হুইচ ইয়ু হ্যাভ সাবজেকটেড আস বাই দ্য এনকারেজমেন্ট, হুইচ সিমস টু হ্যাভ বিন ইন্ডিস্ক্রিমিমিনেটলি এফোর্ড টু পাবুলিকেশনস, সেভারেল অব হুইচ আর ভেরি ইল এক্সিকিউটেড, অর অব ন উইজ এজ ক্লসা বুকস, নর আর দে ইন আনি আদার ওয়ে অবজেক্টস হুইচ কল ফর দ্য প্যাট্রনেজ অব ইয়োর গভর্নমেন্ট।
দেশিয় শিক্ষকদের মধ্যে প্রখ্যাততমরা ছিলেন মেদিনীপুরের মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, লক্ষনৌএর মৌলভি আল্লা দাউদ। এছাড়াও রাম রাম বসু, মীর আমীন, গুজরাটের লালজিলাল বাংলা উর্দু আর হিন্দি অনুবাদ প্রকাশে দারুণ প্রভাব ফেলেন। ১৮১০ সালে ম্যাথু লুমসডেনের পার্সিয়ান ব্যকরণ প্রকাশিত হয়, তিনি মৌলভি আল্লা দাউদ সম্বন্ধে লেখেন, এই প্রভাবশালী শিক্ষকের থেকে আমি পাঠগ্রহণ করেছি। তিনি তার উৎসাহ আর খাটনিরও প্রশংসা করেছেন। তিনি ইওরোপিয় পাঠকদের আদত সত্য উল্লেখ করে বলেছেন, বইতে যদিও তার নিজের নাম আছে, কিন্তু দাউদের থেকে অসাধারন সব তথ্য পেয়ে তিনি এই বইটি প্রকাশ করছেন।
লুমসডেনের বক্তব্য ভারতীয় আর ইওরোপিয়দের মধ্যের সম্পর্ককে হাট করে দেয়। লুমসডেন এমন এক ব্রিটিশ জ্ঞানী, যিনি ভারতীয় জ্ঞানকে ইওরোপিয় তথ্যে রূপান্তরিত করেন। ভারতীয়রা এখানে শুধুমাত্র দেশিয় তথ্য সরবরাহকারী, যারা তথ্য ইংরেজিতে বা দেশিয় ভাষায় মুখের কথায় জানায়; আর ইয়োরোপীয়রা সেগুলি সংগ্রহ করে অনুবাদ করে, পাঠ্যাংশ আর তথ্যকে বিশ্লেষণ করে, নানান ধরণের ব্যাখ্যা দেয়, যেগুলি শ্রেণীবদ্ধ এবং আব্রও বিশ্লেষিত হয়ে ভারতের বা ভারত বিষয়ে জ্ঞান তৈরি করে।
শিশির কুমার দাস যেমন বলছেন ফোর্ট উইলিয়ামের কলেজ সরাসরি খাড়াখাড়ি দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল, সাহেব আর মুন্সিদের মধ্যে। অবশ্যই দুপক্ষই দুপক্ষের থেকে জ্ঞানার্জন করেছে, সৌহার্দ্যের পরিবেশও হয়ত তৈরি হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ব্রিটিশেরা এজেন্ডা তৈরি করত নিজেদের ঔপনিবেশিক অবস্থান থেকে, দাগিয়ে দিত কোনটা কার্যকরী জ্ঞান আর কোনটা নয় - ভারতীয় জ্ঞানীরা জানত তারা তাদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং ইওরোপিয় শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ, কিন্তু বাস্তবে তারা শুধুই একজন তথ্যসরবরাহকারী চাকুরে, ভাষা শিক্ষকদের হাতের হাতিয়ার মাত্র।
ভারতীয় জ্ঞানী আর ইওরোপিয় শিক্ষকদের মধ্যে পার্থক্য সামাজিক বা রাজনৈতিক সম্পর্কের থেকেও বেশি কিছু ছিল, যার মাধ্যমে ব্রিটিশেরা প্রভুত্ব করতে পেরেছে; দুই পারের দু ধরণের জ্ঞানীর পার্থক্য গড়ে দিয়েছে জ্ঞানচার্চিক কৃষ্টি। যে সব ব্রিটিশ ভারতীয় ব্যকরণ, শব্দকোষ, সাহিত্যিক অনুবাদ, আইনের বই সৃষ্টি করছিল, তারা ভারতীয় জ্ঞানীদের কাজের পদ্ধতি বিষয়ে খুব বেশি খুশি ছিলেন না। বিশেষ করে তেলুগু ব্যকরণ বিষয়ে চল্লিশ বছর ধরে কাজ করা সি পি ব্রাউন, ব্রাহ্মণদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতায় বলছেন, তারা খুবই পণ্ডিতি দেখায়, কাজের কাজ কিছুই করে না, এবং তাকে প্রায় ডুবিয়ে ছেড়েছিলেন। তার অভিযোগ ভারতীয় ব্রাহ্মণ জ্ঞানীরা নানা দৈনন্দিনের সমস্যা আর সাধারণ বিষয়কে সংক্ষেপিত এবং দুর্বোধ্যতার পরিবেশ তৈরি করতে সতত দক্ষ। তেলুগু শব্দকোষ তৈরি করতে করতে বিশাল বিশাল শব্দ তৈরি করে সেই শব্দকে বিভিন্ন দলে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলার খেলায় বিরক্ত হয়ে তিনি বিদ্রোহ করে বসেছিলেন। রেভারেন্ড রবার্ট কল্ডওয়েলের বক্তব্য ছিল পদ্যায়িত হেঁয়ালি এবং সুরেলা তুচ্ছাতিতুচ্ছতা শেখার মধ্যে দিয়ে ভারতীয়রা শান্ত শ্রমিক এবং শুদ্ধ এবং নির্ভুল জ্ঞানের পরিবেশ তৈরি করলেও আদতে ঐতিহাসিক সত্যে উপনীত হওয়া এবং সাধারণীকরণ আর বিভেদকে রুখতে পারে নি।
Post a Comment