Sunday, April 29, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৭৭ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৫
বস্ত্র, পরিধেয় এবং উপনিবেশিকতাবাদঃ উনবিংশ শতকের ভারত

পরিচিতির চিহ্ন হিসেবে পাগড়ি
শিখেদের ব্যবহৃত প্রতীকগুলির আলোচনায় কোথাও কিন্তু পাগড়ির চিহ্ন দেখা গেল না। যে সব জ্ঞানী, বিদ্বান শিখ সম্প্রদায়ের উদ্ভব এবং বিকাশ নিয়ে লিখেছেন, তাঁরা কিন্তু পাগড়ির বিকাশ এবং পন্থে অন্যান্যগুলি এড়িয়ে কিভাবে শুধু পাগড়িই শিখ চরিত্রের অন্যতম চিহ্ন হয়ে উঠল, সে বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে চুপ থেকেছেন। গুরুগ্রন্থসাহিবের অনুবাদক এবং আলোচক এম এ ম্যাকাউলিফার টিকাতে লিখছেন, যদিও গুরু বলছেন, তার শিষ্যরা যে সব দেশে যাবেন, সেই সব দেশের পোষাক পরলেও তারা কিন্তু টুপি না পরে পাগড়ি পরিধান করবেন যাতে তাদের দীর্ঘ চুল ঠিকঠাকভাবে পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করা যায়। ডবলিউ এইচ ম্যাকলয়েড বলছেন, অষ্টাদশ শতক পরবর্তী সময়ের খালসার চিহ্ন হিসেবে যুক্ত হয়েছে পাগড়ি – এবং উনবিনশ এবং বিংশ শতকে শিখেদের আত্মপরিচিতি পাওয়ার অতিরিক্ত উৎসাহ এবং সেই পরিচিতির চিহ্ন হিসেবে পাগড়ি ধারণের ধারণাটি প্রবল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে।
উনবিংশ শতকজুড়ে ভারতীয় এবং ইওরোপিয় শিল্পীদের আঁকায় দুধরণের পাগড়ির ছবি দেখতে পাই। একটা সাধারণ কাপড় দিয়ে মাথার ওপর খোঁপাটাকে জড়িয়ে নিয়ে শক্ত করে গোটা মাথা বাঁধা। উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে আরেক ধরণের পাগড়ি যেটা অনেকটা শাসনের সঙ্গে জুড়ে থাকা শিখেরা পরতেন। গোটামাথায় শক্ত করে কাপড় বাঁধা থাকত, আর সামনে কপালের ওপরে কাপড়ের সঙ্গে জুড়ে থাকত একটি জিঘা, পক্ষীর পালকের সঙ্গে আঁটা একটি রত্ন। আর থাকত সোনা আর রূপোর সঙ্গে আটকানো একের বেশি রত্ন, যার নাম সারপঁচ। এই রত্নখচিত মুকুট বা পাগড়ি পরা ভারতে জনপ্রিয় করে শাসক মুঘলেরা।
অষ্টাদশ শতকে মুঘলদের রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তি ধ্বংস হতে থাকে। পাঞ্জাবে বঃহিশক্তি আক্রমণ করে  এবং আস্তে আস্তে রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে শিখ রাজনীতি নতুন করে সংহত হতে থাকে এবং একটি শিখ রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। ১৮৩৯ সালে রঞ্জিত সিংহের মৃত্যুর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে শিখদের ওপর, শেষ পর্যন্ত প্রাক্তন শিখ রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ১৮৪৯ সালে বিলীন হয়ে যায়।

শিখ রাষ্ট্র শতচ্ছিন্ন হয়ে ব্রিটিশদের কাছে তারা হেরে গেলেও, শিখ সেনা বাহিনী আটুট থেকে যায়। ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শিখদের অন্যভাবে দেখতে শুরু করে। বিশেষ করে যে সব ব্রিটিশ শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, তারা শিখদের যুদ্ধ করার ক্ষমতার প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হয়ে পড়ে। অন্যান্য সমাজকে জয় করে ব্রিটিশরা অকর্মণ্য, কুসংস্কারী এবং অকেজো, মেয়েলি দেগে দিলেও শিখদের কিন্তু তারা শৌর্যের শিরোপা দিল। ঔপনিবেশিক সেনাদের জন্যে লেখা তথ্যগ্রন্থে ক্যাপটেন আর ডব্লিউ ফ্যালকন লিখলেন এই ধর্মে মূর্তিপুজা, ভণ্ডামি, জাতিবাদিতা, মহিলাদের পুড়িয়ে মারা বা শিশুহত্যার মত জঘন্য কাজ হয় না... শিখেরা যুদ্ধ জাতি, তারা খেলোয়াড়, বুদ্ধিতে একটু খাটো কিন্তু সাহসী, ঋজু এবং সত্যবাদী। এককথায় দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালি, গুর্খা বা উত্তরপশ্চিমের সীমান্তের পাঠানদের মত শিখেরা ব্রিটিশদের হারিয়ে দেওয়ার মুখে চলে এসেছিল এবং পরবর্তীকালে এরাই ব্রিটিশ সেনার মূল স্তম্ভ হল।
Post a Comment