Monday, April 9, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৫৩ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়
আইন এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র

কোলব্রুক এবং হিন্দু আইন চরিত্র বিতর্ক
কোলব্রুক হিন্দু আইনের বিভিন্নতাকে নানান ঘরানায় বিভক্ত করেন। লুডো রোশার বলছেন বিভিন্ন আঙ্গিকের হিন্দু আইনকে বিভিন্ন ঘরানায় বিভক্ত করা বৈদেশিক ধারণা। রোশারের মন্তব্য, কোলব্রুকের ধারণাটি নানান ভুল ধারণার ওপর ভিত্তিকরে গড়ে উঠেছে। হিন্দু আইনি টেক্সটের ব্যখ্যাগুলিকে কোলব্রুক দেখছেন ভারতের মূল আইনগুলির ভিত্তি হিসেবে, যেগুলি লিখেছেন দেশের আইনজ্ঞ, আইনসভা ইত্যাদিরা। এই যুক্তিটি অনেকটা প্রথম যুগের ব্রিটিশ আইনবিশেষজ্ঞদের ধারণা থেকে ধার করা যারা বিশ্বাস করতেন ব্রিটেনের নানান এলাকায় নানান ধরণের আইনি প্রথা আছে। দ্বিতীয় ভুল ধারনাটি তৈরি হয়েছিল হিন্দু আর মুসলমান আইন বিষয়ে। ব্রিটিশেরা মুসলমান আইনের মূল দুটি ভাগ শিয়া আর সুন্নি সম্বন্ধে আগে থেকেই জানত। সুন্নির চারটি উপবিভাগ হানাফি, সাফাই, মালিকি, হানবালি। কোলব্রুক হিন্দু আইনকে মুসলমান আইনের আঙ্গিকে দুইভাবে ভাগ করে দায়ভাগ এবং মিতাক্ষরা। মিতাক্ষরার আবার চারটে ভাগ করা হল, বেনারস, মিথিলা, মহারষ্ট্রীয় আর দাক্ষিণাত্যি।
কোলব্রুক মনে করতেন জোনসের নির্দেশনায় জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন যে সঙ্কলনটি করেন সেটি ত্রুটিপূর্ণ কেননা সেখানে হিন্দু আইনের বিভিন্ন আঙ্গিকের স্মৃতি বিষয়ক পণ্ডিতদের পালটা ভাষ্যগুলোকে ধরার চেষ্টা হয় নি।  কোলব্রুকের তত্ত্বে, আইনের প্রত্যেক ঘরানার নিজস্ব মতবাদ আছে। প্রত্যক ব্রিটশ বিচারকের উচিত প্রত্যেক আঙ্গিকের মূল সূত্রগুলি জানা, কেন এই সিদ্ধান্তে টিকাকার উপনীত হুলেন।
যে সব ভারতীয় আঙ্গিকের পণ্ডিতেরা ব্রিটিশদের নানান কাজে সহায়তা করছেন, তারা যদি ব্রিটিশ আদালত স্থায়ী এবং সম্পূর্ণভাবে আর সঠিকভাবে চালানোর জন্যে প্রয়োজনীয় হিন্দু আর মুসলমান আইনি টেক্সটগুলির সংহিতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইওরপিয় পদ্ধতি প্রয়োগ করে এই উদ্দেশ্য পূরণ করা হবে। কোলব্রুকের সমাধান হল, টেক্সটের প্রামাণিকতা প্রমান করা যেহেতু খুব কঠিন তাই সেগুলির সরলরৈখিক কালনিরূপণ করা দরকার। টেক্সটগুলির যদি কাল নিরূপণ হয়ে যায়, তাহলে সেগুলোর মধ্যে কোনটা সব থেকে প্রাচীন, সেইটিও বোঝা যেতে পারে এবং পরবর্তী কালে যে সব টিকাকরণ/সংযোজন করা হয়েছে সেগুলোও চিহ্নিত করা যাবে। ভারতীয় টেক্সটগুলির লেখক আছে। বহুসময় দেখা যায় একজন লেখক অন্য জনের নাম নিয়েছেন, এবং কোন কোন টেক্সটে লেখক এবং টিকাকারদের তুলনামূলক সময়ও বিবৃত হয়েছে, কিন্তু লেখকদের জীবনী এবং ইতিহাস সম্বন্ধে সব কিছুই ধোঁয়াশা। ফলে কোনটা অথরিটেটিভ এবং সেগুলোর নির্দিষ্ট সময়সারনী তৈরি করা সম্ভব হল না। এবং জোনস যখন বিচারকদের মার্ফত এবং মুন্সি, পণ্ডিত আর মৌলভিদের সাহায্যে হিন্দুদের আইন ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার পরের চল্লিশ বছরে নানান ধরণের ধরণের কেস ল পাওয়া গেল/তৈরি হল।

১৮৬৪ সালের বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জুড়ে থাকা হিন্দু আর মুসলমান আধিকারিকদের বাদ দিয়ে আঞ্চলিক হাইকোর্ট তৈরি এবং ইংরেজিতে নির্দেশমূলক সিদ্ধান্তগুলি প্রকাশিত হওয়ার যে সংস্কার হল তাতে হিন্দু আইন বদলে গিয়ে ব্রিটিশ কেস ল’তে পরিণত হল। আজ যখন কেউ হিন্দু আইন খুলে দেখেন, তখন দেখা যায় সেটি অতীতের বিচারকদের মামলার উদাহরণে কণ্টকিত হয়ে আছে – যেভাবে এংলো-স্যাক্সন আইনি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে – এবং এখন দায় এসে পড়েছে বিচারক আর উকিলদের অতীতের উদাহরণ দেখিয়ে আইন ব্যখ্যা আর তৈরি করার। ওয়ারেন হেস্টিংস আর উইলিয়াম জোনস প্রাচীন ভারতীয় সংবিধান খোঁজার যে কাজ শুরু করেছিলেন, সেটি শেষে এসে পর্যবসিত হল যেটা তারা এড়াতে চেয়েছিলেন সর্বাংশে তা হল ভারতীয় আইনের ওপরে ব্রিটিশ আইনের জোব্বা পরানো – ভারতীয় আইন হয়ে উঠল আদতে ব্রিটিশ আইন। 
Post a Comment