Monday, April 30, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৮৪ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায় ৫
বস্ত্র, পরিধেয় এবং উপনিবেশিকতাবাদঃ উনবিংশ শতকের ভারত

বস্ত্র এবং কর্তৃত্বের সংবিধান
শুরুতে এই উপাধিটি মাত্র ২৫ জন ব্রিটিশ এবং ভারতীয়কে দেওয়া হত। উচ্চতমপদগুলির ব্রিটিশ আমলা এবং ভারতীয় রাজারাই একটি আংরাখা আর একটি ইনসিগলিয়া পেতেন। চল্লিশ বছর পরে এই উপাধিকে তিনভাগে ভাগ করা হয় নাইট গ্রান্ড কমাণ্ডার, নাইট কমাণ্ডার এবং কম্পানিয়ন এবং প্রাপকদের সংখ্যা বহু বাড়ানো হয়।
আংরাখাটি ছিল হাল্কা নীল রেশমে বোনা, যা দিয়ে গোটা দেহই ঢেকে যেত। এরসঙ্গে যুক্ত ছিল সাদা একটা দড়ি এবং একটি রূপোর ট্যাসল। জামাটির বাম দিকে বুকের কাছে জ্বলন্ত সূর্যের চহ্ন আঁকা থাকত সোনার সুতো দিয়ে তার ওপরে আরেকটা হীরের ছবি বসানো থাকত। লেখা থাকত হেভেনস লাইট আওয়ার গাইড, এছাড়াও থাকত একটা তারা। কলার ছিল সোনার চেনে বোনা বড় নেকলেস পাম পাতা এবং পদ্ম; মাঝখানে থাকত রাণীর ছবি দেওয়া ব্রিটিশ রাজশক্তির চিহ্নটা।
আংরাখা, ইন্সিগনিয়া, কলার, পেন্ডেন্ট ইত্যাদি মূলত ইওরোপিয় আঙ্গিকে, ইওরোপিয় ভাবনায় তৈরি করা। উপহার পাওয়ার সময় ব্যক্তিকে স্বাক্ষর করে বলতে হত তার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীকে এই উপহারগুলি রাষ্ট্রকে ফেরত দিতে হবে, যেহেতু এই উপাধিটা বংশগতভাবে প্রবাহিত হয় না। এই ধারা বহু ভারতীয়কে ক্ষুণ্ণ করেছিল, কারণ সাধারণত এই ধরণের পাওয়া সম্মান উপহারগুলি ভারতীয়রা বংশপরম্পরায় বাড়িতে সাজিয়ে রাখে তাদের পরবর্তী বংশধরদের/ভবিষ্যতের মানুষদের দেখার জন্যে, তাদের ইতিহাস জানার জন্যে। রাজাদের তোষাখানার উদ্দেশ্যটাই হল নানান ধরণের পাওয়া উপহার উপঢৌকন সম্মান সাজিয়ে রেখে দেওয়া। সেগুলি কোন এক সময় হয়ত বার করে পরা হল, দেখানো হল, আবার তোষাখানায় চলে যেত যাতে ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারীরা তাদের বংশের ইতিহাস জানতে পারে। শাল, আংরাখা, পরিধেয় এবং নানা আচার-অনুষ্ঠানে পাওয়া এক খণ্ড কাপড়ের মূল্য অনেক ছিল পরিবারগুলির কাছে। এমনকি একটি চাষী পরিবারের ট্রাঙ্ক, বিয়েতে বা অন্যান্য আচার অনুষ্ঠানে এই ধরণের উপহার পাওয়া কাপড়, ধুতি এবং নানান ধরণের তুচ্ছ উপহার সামগ্রীতে ভর্তি থাকে। এগুলো পরাই হয় না হয়ত, কিন্তু এসব নিয়ে নানান সময় আলোচনা ও দেখানো হয়। সরাসরিভাবে এই ধরণের উপহার ব্যক্তি, পরিবার এবং গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ককে মজবুত করে।
ব্রিটিশদের গভীর বন্ধু, হায়দ্রাবাদের নিজামকে নাইটহুড দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান, তিনি জানান তিনি নাইটহুড নেবেন কিন্তু আংরাখা আর ইনসিগনিয়া নেবেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সালার জঙ্গকে দিয়ে ভাইসরয়কে চিঠি লিখেয়ে বললেন, এই দেশের মানুষেরা নিজেদের পোষাক ছাড়া অন্য কারোর দেওয়া পোষাক পরার বিতৃষ্ণা আছে। সালার জং ভাইসরয়কে লিখছেন এইটা আরও সত্য রাজাদের ক্ষেত্রে, যারা তাঁদের পূর্বজদের প্রাচীন ঐতিহ্যটা ধরে রাখেন বিশেষ ধরণের পরিধেয় পরার মাধ্যমে। আরও বললেন উপহার পাওয়া নতুন ধরণের আংরাখা পরা মানুষ ভাল চোখে দেখবে না, তারা তাঁকে উপহাস করবে। যদি আংরাখাটা ভেলভেট বা রেশমের হত তাহলে হয়ত মুসলমান আইন মোতাবেক হত। এছাড়াও তিনি পেন্ডেন্টে রাণীর ছবি নিয়েও প্রশ্ন তুললেন সহি মুসলমানের পক্ষে প্রোহিবিটেড ফ্রম ওয়ারিং দ্য লাইকনেস অব আনি ক্রিয়েটেড বিয়ইং অন দেয়ার পার্সন। চিঠি পেয়ে ক্ষুব্ধ ভাইসরয় প্রধানমন্ত্রীকে লিখলেন স্টার অব ইন্ডিয়ার মর্যাদা বা আকার কোন কিছুই বদল করা যাবে না বা সে বিষয়ে কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না। নিজামকে হয় সেগুলি গ্রহণ করতে হবে নয়ত তাকে গোটা সম্মান বর্জন করতে হবে।
১৮৬১ সালে ব্রিটিশ ভারত নাইটহুড সম্মান অন্তর্ভুক্ত করে। এবং যখন পেটেন্ট এবং ইন্সিগনিয়া নিজামের দরবারে পৌঁছল, তিনি উভয়কেই সম্মান জানালেন, আংরাখাটা কিন্তু পরলেন না। গোটা বিষয় নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্যও করলেন না। ব্যাপারটা সেখানেই ধামাচাপা পড়ে গেল। উনবিংশ শতাব্দের শেষে কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারীরা এই চিহ্নগুলো গর্বকরে পরেছেন এবং সেটা জনসমক্ষেই, তাদের পূর্বজের প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই।
১৮৬৯ সালে ভারতে কোন রাজপরিবারের প্রথম সদস্য ডিউক অব এডিনবরার ভ্রমনের সময় উপস্থিত অভিজাতদের সপ্তদশ শতকের ক্যাভেলিয়ারদের পোষাক পরতে হল। ১৮৭৭ সালের ইম্পিরিয়াল এসেম্বলেজে যখন ভিক্টোরিয়াকে ভারতের রাণী হিসেবে কাজ করার জন্য সম্বর্ধনা দেওয়া হয়, সেই উতসবে প্রত্যেককে ভিক্টোরিয় ফিউডাল আঙ্গিকের সম্পূর্ণ পরিধেয় পরতে হয়। ১৮৭০ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত শ্রেণী, পদ, আঞ্চলিকতা, কাজ ইত্যাদি নির্বিশেষে প্রত্যেক ভারতীয়কে সাম্রাজ্যের দেওয়া বিশেষ পোষাক পরতে হয়, এবং এ নিয়ে কোথাও কোন প্রতিবাদ ওঠে নি। 
Post a Comment