Friday, April 6, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা৪০ - ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং তার জ্ঞানচর্চার আঙ্গিক - সাম্রাজ্যের মন ও মান ।। বারনার্ড কোহন

অধ্যায়২
সিদ্ধান্তঃ ভারতীয় জ্ঞানের পুনর্বিন্যাস

তেলুগু শব্দকোষ তৈরি করার পথে হোঁচট খেতে খেতে সি পি ব্রাউন বিভিন্ন পুথির মান্য পাঠের আভিধানিক শব্দ নিয়ে কাজটা শুরু করবেন, তার প্রথম বাছাই হল মনু চরিত্র নামক একটি পাঠ্য। কয়েকজন দেশী জ্ঞানী সাথীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মনু চরিত্রের অনেকগুলি পাঠান্তর জোগাড় করলেন। এই পুথিগুলি পড়ে তিনি লিখলেন এগুলি অজস্র ভুলে ভরা, এবং তার সহকারীরা সেই ভুলগুলি আন্দজমত ঠিক করে দেওয়ার কাজ করেছেন। ব্রাউনের কাছে প্রত্যেক পুথির নকল ছিল। এক পাতা অন্তর প্রত্যেক পাতার কবিতা আলাদা করে রাখা হচ্ছিল। তার সঙ্গে কাজ করছিলেন বেশ কয়েকজন করণিক এবং তিনজন অধ্যাপক যারা সংস্কৃত আর তেলুগু ছন্দ আর ব্যকরণে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। এই কবিতাগুলি পড়া হল এবং নিজেদের মধ্যে জ্ঞানীরা আলাপ আলোচনা করলেও ব্রাউনই ঠিক করছিলেন কোনটা মান্য পাঠ – ঠিক যেমন করে বিভিন্ন পরস্পর বিরোধী তথ্য দেখে একজন বিচারক ঠিক করেন কোন তথ্যটা গ্রহনীয়।
এই পদ্ধতিতে ব্রাউনিয় তত্ত্বে মান্য পাঠ ঠিক হল। ততদিনে ভারতে ছাপাখানার আবির্ভাব ঘটেছে। এবং একই সঙ্গে কোন পাঠটা মান্য আর কোনটা নয়, সেটা ছাপাখানায় ছাপা হয়ে প্রমিতকরণের পরিবেশ সৃষ্টি করে তেলুগু ভাষা আর সাহিত্যে বিপুল প্রভাব ফেলেছে। আদতে গোটা ব্যাপারটা বৈজ্ঞানিকতার আড়ালে সাহিত্য বিষয়ে ইওরোপিয় ধারণাটিকে প্রথিত করে দেওয়া। টেক্সট বিষয়ে ইওরোপিয় তত্ত্ব হল লেখক অতীতে যা ঘটেছে, সেই ঘটনার মৌখিক ভাষ্যকে নথিবদ্ধ করেন তার লেখনির মাধ্যমে। ছাপাখানা আসার আগে ধরে নেওয়া হত যে পুথিগুলো ভুলে ভরা, কেননা প্রাথমিকভাবে লেখক ঠিক লিখলেও নকল যারা করেন তাদের বিশ্বাস করা যায় না।
উনবিংশ শতকে ইওরোপিয়রা সাহিত্যকে ইতিহাসের সঙ্গী হসেবে দেখতে চাইছিল, যেখানে লেখক জ্ঞানত দারুণ সাহিত্য সৃষ্টি করছেন মৌলিকত্ব অনুসরণ করে। কামিল জেলবি(zvelbi - চেক ভারততত্ত্ববিদ, মূলত দাক্ষীণাত্য নিয়ে কাজ করা জ্ঞানী) বলছেন, ভারতীয়রা সাহিত্যকে রৈখিক সময়গতভাবে দেখে না বরং তার গড়নক্রম এবং রূপতাত্ত্বিকভাবে দেখে। ভারতবর্ষে সাহিত্য একটি যুগপত/সমকালবর্তী বাস্তবতা যা যুগপত ক্রম তৈরি করে(has a simultaneous existence and composes a simultaneous order)। তিনি আরও বলছেন একজন ভারতীয় আর একজন ইওরোপিয় দুজনের মনের গড়ন আলাদাভাবে গড়ে ওঠে। ভারতে তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অনেক কম, বরং তাদের জন্মের আগে থেকে তৈরি করা এবং তার মৃত্যুর পরেও থেকে যাওয়া সামাজিক কাঠামোয় সে বদ্ধ। জেলবি বলছেন, উনবিংশ শতকের আগের লেখক আর কবিরা নব্য ধারার পদ্য আবিষ্কার করতেন না, বরং তারা বাহিত প্রথা মেনে সাহিত্য রচনা করতেন।
উনবিংশ শতাব্দের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ভারতীয় ভাবনা আর কৃষ্টির ওপর ইওরোপিয় জ্ঞানীদের আপত্তি আর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার কি বিপুল প্রভাব পড়েছে, তা খুঁজে বার করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। ইওরোপিয়দের ভাবনা, সাহিত্য, কৃষ্টি পুনর্গঠনের কাজে যে সব ভারতীয়কে যুক্ত করা হচ্ছিল তারা খুব অক্রিয় থাকত না। দীর্ঘ সময় ধরে নব্য ভারতীয় সামাজিক এবং বস্তুগত প্রযুক্তিতে ইওরোপিয়রা যে কর্তৃত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল, একতা সময় পরে তা ভারতীয়দের দখলে চলে আসে এবং এর ফলে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। প্রায় প্রত্যেক স্তরে ভারতীয়দের চেতনা বৃদ্ধি ঘটেছে এবং তারা ইওরোপ নিয়ন্ত্রিত প্রাচীন স্তরের বিশ্ব ইতিহাসের জাদুঘর হয়ে থাকতে অস্বীকার করেছে।
Post a Comment