Tuesday, January 10, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৮ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
চতুর্থ পর্ব
গঙ্গার পশ্চিমের যুদ্ধ

১। মীর জুমলার বাড়তে থাকা অস্বস্তি
শাহজাদার মীর জুমলার শিবির ছেড়ে যাওয়া যুদ্ধের মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল। এত দিন ধরে গঙ্গার যুদ্ধে প্রায় একতরফা আক্রমন করে আসছিলেন মীর জুমলা, আঘাত সামলাচ্ছিল বিপক্ষ দল, বিশেষ করে মীর জুমলার রাজমহল দখল করার পরের সময়ে। এত দিন ধরে সুজা আত্মরক্ষামূলক রণনীতি অনুসরণ করছিলেন। গঙ্গা যুদ্ধের গতি পালটে এই প্রথম অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রতিআক্রমনে যেতে শুরু করলেন তিনি এবং শেষ বারের মত। এবার যুদ্ধ নতুন পর্বে প্রবেশ করল তাই নয়, দৃশ্যপটও পরিবর্তন হয়ে গেল। শাহজাদা পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে চলে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রকোপটা ছিল গঙ্গার ওপরে, সেটি ঢলে পড়ল পশ্চিম দিকে। সুজা এবারে রাজমহল আক্রমণের সুচিন্তিত প্রস্তুতি শুরু করলেন।

শাহজাদার শিবির পরিবর্তন কিন্তু মীর জুমলার পক্ষে হাজারো বাধা তৈরি করল। অবশই শাহজাদা চলে যাওয়ায় সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা সঙ্কুচিত হয় নি, কিন্তু মনে মনে যে বোঝা যাচ্ছিল যে কোথাও একটা তার কেটে গিয়েছে। আর যেহেতু মীর জুমলার যুদ্ধ সমিতিতে তিনি ছিলেন, তাই তার যুদ্ধ করার পদ্ধতি এবং সেনা বাহিনীর গোপন খবরাখবর দিয়ে সুজাকে যুদ্ধের মাঠে কয়েক কদম এগিয়ে দেবে বলাই বাহুল্য। আর শাহজাদার শুধু উপস্থিতিই সুজার বাহিনীকে এতই চাঙ্গা করে তুলেছিল যে তারা নতুন করে যুদ্ধর শেষ দেখে ছাড়ার পরিকল্পনা করে আক্রমনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। বালেশ্বরের কুঠিয়ালেরা ১৫ ডিসেম্বর চমতকৃত হয়ে দেখল যে, সুজা এখন গঙ্গা যুদ্ধের শেষ পর্ব নিয়ন্ত্রণের অবস্থায় চলে এসেছেন। এবং বর্ষার উতপাতও মীর জুমলাকে কিছুটা পিছিয়ে দিল। বর্ষা, বন্যা শুধু যে দু পক্ষের ৬০ মাইলের অলঙ্ঘ বাধা তৈরি করল তাই নয়, মীড় জুমলার বড় বাহিনীর জন্য কাদা রাস্তাগুলি যাতায়াতের অনুপযুক্ত হয়ে উঠল, এবং মীর জুমলার শিবির আশংকায় থাকল সাম্রাজ্যের বাহিনীর জন্য তেরি রসদ সরবরাহের পথগুলি সুজা কেটে দিতে পারেন।

এই সবক’টি কারণ মিলে আশংকার গহ্বরে ডুবে গেল সাম্রাজ্যের বাহিনী। অন্যদিকে সুজা নতুন উদ্যমে মীর জুমলার বাহিনিকে আক্রমন করার পরিকল্পনা রচনা করা শুরু করে দিলেন। সুজার বাহিনীর কাছে প্রধান প্রশ্ন হল, মুকসুদাবাদ না রাজমহল, কোন শিবিরে সুজা আগে আক্রমন শানাবে। সিদ্ধান্ত হল গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের রাজমহল। মুর্শিদাবাদের আক্রমনে অনেক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। গঙ্গার ওপর থেকে সরাসরি নৌবহর থেকে মুর্শিদাবাদের উঁচু টিলায় বসে থাকা মীর জুমলার বাহিনীর ওপর আক্রমণের অনেক অসুবিধে রয়েছে। সুজার আশংকা ইওরোপয়দের – তার ডাকে তারা সাড়া দেয় নি – এ সময় হুগলী এবং কাশিমবাজারের কুঠিয়ালেরা একসঙ্গে যদি মীর জুমলার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারে। অন্যদিকে রাজমহলে গঙ্গা থেকে সরাসরি কামান দাগা যেতে পারে। রাজমহল দখল হয়ত যুদ্ধের গতি পাল্টাতে পারবে না, কিন্তু তাদের সম্মান পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করবে। উত্তর-পশ্চিম থেকে দাউদ খান বা দক্ষিণ থেকে মীর জুমলার শিবির থেকে ত্রাণ নিয়ে পৌঁছনো সেখানে মুশকিল হবে।
সুজার রণনীতিতে রাজমহল দখল করে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে মারার সঙ্গে সঙ্গে হুগলী মুর্শিদাবাদের ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির থেকে রসদের যোগান কেটে দিয়ে তাদের ভাতে মারারাও পরিকল্পনা ছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে গঙ্গা বক্ষ দিয়ে যে রসদের ভাণ্ডার পাঠানো হচ্ছিল মুর্শিদাবাদে, সেগুলি সুজার বাহিনী দখল নিল। বিহার এবং বাঙলার পশ্চিম অঞ্চলের বহু জমিদারকে নিজের দিকে টেনে এনে সুজা তার নিজস্ব রসদের ভাণ্ডারটি জোরদার করলেন। শুধু গঙ্গাই নয়, রাস্তা ধরে পাঠানো রসদের বহরও দখল করতে শুরু করে সুজার বাহিনী। মাজোয়ার রাজা হরচাঁদকে সুজা প্রলুব্ধ করে সেই অঞ্চলের প্রত্যেক বণিককে গরুর গাড়ি বোঝাই করে খাদ্যশস্য নিজের শিবিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। ৫ জুলাইয়ের কাশিমবাজারের জমিদারকে লেখা এক চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, যে কোন বেনিয়া বা সেনার টাকাকড়ি বা সম্বল লুঠ করার পূর্ণ অধিকার দিয়েছিলেন সুজা এই শর্তে যে তার চাহিদা মত তাকে রসদ পৌঁছতে এবং যুদ্ধ হাতি সরবরাহ করতে হবে। হুগলি আর কাশিমবাজারের মধ্যে এখন একটা ত্রাসের তাজত্ব তৈরি হল, যে কোন বানিয়াই লুঠের আশংকায় তাদের রসদ নিয়ে এমন কি কোন হরকরাও চিঠিপত্র নিয়েও সেই বাধা পার হতে পারল না।
২। সুজার রাজমহল দখল
মীর জুমলা রাজমহল উদ্ধারে কিচ্ছু করে উঠতে পারলেন না। নৌবাহিনীর অভাবে দূর থেকে বসে দেখলেন আস্তে আস্তে শত্রুর শক্তিশালী নৌবহরে জলরুদ্ধ হয়ে শহরটা তার হাতছাড়া হয়ে গেল। শহরের বাসিন্দাদের জন্য তিনি যে রসদ ত্রানের জন্য পাঠালেন তা রাস্তাতেই লুঠ হয়ে গেল। ঐতিহাসিক মাসুম রাজমহলের মানুষের তৈরি করা এই মন্বন্তরের চোখে দেখা বিবরণ দিয়েছেন, দানা শস্যের দাম দাঁড়াল সোনার মূল্য। এক টাকায় নষ্ট, দুর্গন্ধ মোটা চাল আর ডালের দাম দাঁড়াল টাকায় ন’সের। ...খাদ্যের অভাবে মানুষ বিষও খেতে শুরু করল। মাংসের দাম প্রতি সের একটাকা হল। গরীবেরা নিজেদের মাংসও চিবিয়ে খেতে শুরু করল। নিজেদের ঠোঁট চেবাতে শুরু করল তারা। মাসুমকে দানা শস্য কেনার জন্য ২০-৩০তাকা খরচ করতে হল। ফাঁকা দোকানের সামনে কুকুর বেড়াল অভুক্ত অবস্থায় বসে। মন্দির মসজিদ জনশূন্য হয়ে পড়ল। মন্বন্তরের লেলিহান শিখা গ্রাস করল রাজমহলকে। মীর জুমলার রোজবিহানী সেনারাও মানল যে রুটির একটা টুকরো যেন জলের মত প্রাণদায়ী মনে হতে লাগল। আকিল খান বলছেন, নিজেদের যকৃতের রক্ত পান করে জলের তেষ্টা মেটাতে লাগল মানুষ। মন্বন্তরের সঙ্গে এল বন্যার হাহাকার। ঘোড়া আর গরুর মরতে থাকল শয়ে শয়ে। রাজমহলে মীর জুমলার বাহিনীর এখন তখন অবস্থা। হতাশ, বিশৃঙ্খলতার ঘড়া কাণায় কাণায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেনাপতিদের রাজমহল ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখা গেল না।

সেই মুহূর্তে সুজা আক্রমণ করলেন। বিপক্ষের বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না পেয়ে রাজমহলের দক্ষিণে পাটুরা দখল করে সুজার সেনাপতি শেখ আব্বাস রাজমহল দখল করার সাজসজ্জা শুরু করলেন। কিছু সময় পরে সুজা পশ্চিম তীর পার হওয়ার জন্য ছটফট করতে শুরু করলেন। তাণ্ডায় সেরাজুদ্দিন জাবরি, মীর আলাউদ্দিন, দেওয়ান মুহম্মদ জামান এবং মীরইজামানকে রেখে তিনি পাটুরার দিকে রওনা হলেন ১৮ আগস্ট। ২২ আগস্ট তিনি নৌবহর নিয়ে রাজমহল দখল করে বসলেন। সাম্রাজ্যের সেনানীদের মধ্যে উঁচু স্থানে থেকেও অসুস্থ জুলফিকার খান লড়াই দিতে পারলেন না, যতটুকু লড়াই করার রাজা ইন্দ্রদুম্ন করলেন। শহরের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা ইসলাম খান এবং ফিদায়ি খান শত্রুর আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে হতোদ্যম হয়ে যৌথভাবে আক্রমণ রোখার পরিকল্পনাটাই তৈরি করে উঠতে না পেরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেলেন। সক্কলে মিলে ঠিক করলেন শহর ছেড়ে মুর্শিবাদাদে মীর জুমলার কাছে ফিরে যাওয়ার। পাহাড়ের তলায় নতুন শহরের মধ্যে দিয়ে শত্রুর গোলাগুলির সয়ে সাম্রাজ্যের বাহিনী শহর ছেড়ে রওনা হলেন, যদিও সরকারি ইতিহাসে বলা হয়েছে সেই আক্রমণ যথেষ্ট জোরদার ছিল না। তাদের ছেড়ে আসা সমস্ত কিছু দখল করল সুজার বাহিনী। রাজমহল দখল করে সুজা গঙ্গার পশ্চিম পাড় নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল। 
ছত্রভঙ্গ হয়ে সেসে পৌঁছন সেনাবাহিনীকে একহাত নিলেন মীর জুমলা। হতচ্ছাড়া, তোমরা যুদ্ধের উপযোগীই নও। তোমাদের ছেঁড়া খোঁড়া পোষাক, বাগানে বাইজদের সঙ্গে ফুর্তি করার মাতালদের মত চরিত্র নিয়ে তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিল? পুরুষের মূল্য তার সাহসিকতায়, আর সাহসিকতার নীতি দাঁড়ায় মনুষত্বের মহিমার ওপর নির্ভর করে। তোমাদের মত বুড়ো শেয়ালদের সেই যোগ্যতা নেই। তোমরা সেনাহীন, দক্ষতাহীন উদ্যমহীন বাহিনীর কাছে হেরে পালিয়েছ। সেনানায়কের এই দুর্বাক্যের রকমাত্র প্রতিবাদ করেন জুলফিকার। তিনি বললেন সম্মানিত সেনাপতিদের মুনুষত্বহীন ভীরু বলার অধিকার সেনানায়কের নেই। জুলফিকার নিজে দারা এবং সুজার যশোবন্ত সিংএর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, কিন্তু তাকে গোটা সেনাবাহিনী নিয়ে এই যুদ্ধ স্থল ছাড়তে হয়েছে সুজার বাহিনীর পরাক্রমে নয়, তার চতুরতার জন্য এবং রসদের অভাবের জন্য, খালি পেট থাকার জন্য। জুলফিকারের কথার সারবত্তা অনুভব করে মীর জুমলা তাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং তার পূর্বের বীরত্বের জন্য এবং মীর জুমলা বললেন, তিনি যে শহর নতুন করে দখল করেছিলেন, সেই শহরটাকে সুজার আক্রমণের সামনে নয়, রসদের অভাবে ছেড়ে আসতে হয়েছে সেই দুঃখ তার চিরকাল থাকবে। তিনি বাকি সেনাদের হতাশ হতে বারণ করলেন এবং রাজমহল উদ্ধারের আশা ছাড়তে বারণ করলেন। এবং তার বিশ্বাস তিনি এই শহর সুজার বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করেই ছাড়বেন।
হঠাত আক্রমন করে বিপক্ষকে হতচকিত করে দিয়ে সুজা রাজমহল দখল করলেন, কিন্তু মীর জুমলার দক্ষিণের রসদের যোগানের রাস্তাটি বন্ধ এবং মীর জুমলাকে একাকী করার কাজ পারলেন না। তাঁর মুর্শিদাবাদের সেনা ছাউনিতে গোটা বর্ষায় মীর জুমলা বিশ্রাম তো নিচ্ছিলেনই না, বরং তার বিপুল সেনাবাহিনীর সংখ্যাধিক্যের জোরে তিনি হুগলী দিকে এবং থেকে দক্ষিণের রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ করতে লাগল, বিশেষ করে আবাধে ঘোরাফেরা করা সুজাপন্থী জমিদারদের ওপরে নজরদারির কাজ করতে শুরু করলেন তিনি। জুলাই মাসে তিনি ঘোর একজন ৫০০ ঘোড়ার ফৌজদার (মহম্মদ শরিফ?) নিয়োগ করে কাশিমবাজার থেকে হুগলির মধ্যেকার রাস্তা পরিষার করার কাজে হাত দেওয়ালেন যাতে তিনি হুগলি এবং এমন কি মেদিনীপুরও দখল করতে পারেন। এর উত্তরে সুজা, হিজলির প্রশাসক মির্জা ইসফানদার(ব্রিটিশদের নথিতে মেজর স্পিলন্ডার)কে ৬০০০ পদাতিক এবং ৫০০ ঘোড়সওয়ার আর কিছু গেরিলা (জলবা) বাহিনী নিয়ে হুগলির প্রশাসকের হাত শক্ত করার দায়িত্ব দিলেন। কিন্তু তিনি সঠিক সময়ে সেখানে পৌঁছতে পারেন নি। যদিও কাশিমবাজারের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরদের আশংকা ছিল যে মীর জুমলার বাহিনীকে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়তে হবে হয়ত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বিঘ্নে তারা হুগলী দখল নিলেন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে যখন মীর জুমলার বাহিনী মেদিনীপুর দখল নিচ্ছে তখনও মেদিনীপুর শহরের ১৭ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগড়ে রয়েছে সুজার বাহিনী।
(চলবে)
Post a Comment