Wednesday, January 4, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪৩ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

ফলে আওরঙ্গজেব মনে করলেন, দাক্ষিণাত্য অভিযানের সাফল্যের একমাত্র পূর্ব শর্ত হল মীর জুমলার শীঘ্র উপস্থিতি। চিঠির পর চিঠি লিখে তিনি উজিরকে বোঝাতে চেষ্টা করে গিয়েছেন তার (দাক্ষিণাত্যে)আসা খুব জরুরি এবং দেরি করার অর্থ সুযোগ হাত ছাড়া করা। কাজের তদবিরের সফলতা নির্ভর করছে তোমার যাত্রাকালের সময়ের ওপর। এই দেশের সমস্যাগুলি সম্বন্ধে তোমার পরিচিতি যথেষ্ট; (তোমার আসার পর)আমাদের বৈঠকে তুমি অনেক কথা বলবে, এবং প্রত্যেক পদক্ষেপে কি করা দরকার আমায় জানাবে। আওরঙ্গজেব মনে করলেন মীর জুমলা না এলে আহমদনগরের বাইরে সেনা নিয়ে বেরোনো তার পক্ষে ঠিক হবে না। তিনি লিখলেন, তুমি যদি সত্যিকারে এখানে আসার মন করে থাক তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে এস, সব কিছুই খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে হবে...। ১৬৫৬র মাঝ বরাবর সময়ে আওরঙ্গজেব আবার মীর জুমলাকে লিখলেন, তোমার সঙ্গে মিলনের ইচ্ছে আর আগ্রহ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে, তাঁকে তাড়াতে পারছি না। তাড়াতাড়ি চলে এস, সময় বয়ে যায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাপারটার সুরাহা করতে হবে। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করাই মঙ্গল।
বীজাপুর অভিযানের সাফল্যের দ্বিতীয় শর্ত ছিল, প্রয়োজনমত গোলাবারুদের ব্যবস্থা করা। সম্রাটের নির্দেশে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে জানালেন, দাক্ষিণাত্যের দুর্গগুলি থেকে কিছু পরিমান গোলাবারুদ বীজাপুর সীমান্তে পাঠানো যেতে পারে। মূলত দৌলতাবাদ দুর্গে প্রচুর পরিমান গোলাবারুদ রয়েছে, সাম্রাজ্যের গোলাবারুদ ভাণ্ডারের দারোগা মীর শামসুদ্দিনকে সম্রাট নির্দেশ দিলেন সেই ভাণ্ডারটি নিরীক্ষণ কড়ে সমীক্ষা পেশ করতে। নিরীক্ষণ শেষে আওরঙ্গজেবকে জানালেন, সেখানে শুধু ব্যবহার করার মত একটাই বড় কামান রয়েছে, সেটিকে বয়ে নিয়ে আসা খুব কঠিন, এবং নিয়ে এলেও সেটি যে চাহিদা মত কাজ করতে পারবে কি না সে সম্বন্ধে নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। মুঘল দাক্ষিনাত্যের অন্যান্য দুর্গের গোলাগুলি বা কামান গোলকুণ্ডা এবং অন্যান্য বীজাপুরী দুর্গের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা বেড়া ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট নয়। আওরঙ্গজেব আবারও লিখলেন, যদি এই বিষয়ে দাক্ষিণাত্যে এসে আরও কিছু দূর এগোতে চাও তাহলে সম্রাটের অনুমতি নিয়েই নিজের গোলাবারুদ নিজের সঙ্গেই এনো। মীর জুমলাকেও বলা হল সম্রাটের এই দৃষ্টিভঙ্গী আওরঙ্গজেবকে জানিয়ে দিতে। উজির মীর জুমলার অতীত যুদ্ধ-সাফল্যে গোলাবারুদ খুব বড় ভূমিকা পালন করেছিল এবং সেই ভাণ্ডার দিল্লিতে নিয়ে আসার পথে সমস্তটাই কিন্তু তখনও নান্দেরেই ছিল। সেখান থেকে সেগুলিকে (আওরঙ্গজেবের সিবিরে)বয়ে নিয়ে যাওয়া খুব বড় কাজ ছিল না। পরে মীর জুমলার এসে পৌঁছনোর খবরে আওরঙ্গজেব তাঁকে সেইগুলি ধারারে পাঠানোর প্রস্তাব দিলেন।

একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর মাথাদের মন জেতাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। আওরঙ্গজেব বুঝলেন কোন জোটই এখন বাস্তবতার অনুকূল নয়, তাই তিনি মীর জুমলাকে বললেন শাহ নওয়াজ খান, মির্জা মহম্মদ মাশাদির মত তাঁর চেনা জানা কয়েকজন আওরঙ্গজেবপন্থী সেনানায়ককে রাজসভায় ডেকে (সম্রাটের)অনুমতি নিয়ে সঙ্গে নিয়ে আসতে। এছাড়াও কারখানা প্রধান, প্রয়াত তারবিয়ত খানের পুত্র দারোগা সইফুদ্দিনকে সঙ্গে নিতে বললেন।

৩। মীর জুমলা এবং আওরঙ্গজেবের বীজাপুরী আমলা ও সেনা নায়কদের প্রলুব্ধ করণ
ইতোমধ্যে আওরঙ্গজেব বীজাপুরি আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাত্রাটা বাড়িয়ে দিলেন। যদিও মীর জুমলা তখনও দাক্ষিণাত্যে পৌছন নি, কিন্তু দক্ষিণী রাজসভা বিষয়ে আওরঙ্গজেবের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই কাজে কয়েক কদম এগিয়ে রেখেছিল। প্রথমেই বীজাপুরী উজির মুজফফরুদ্দিন ইখলাস খান মানসিকভাবে শিবির বদল করলেন।

কিন্তু বীজাপুরের মুল্লা আহমদ নাটিয়ার সঙ্গে দরকষাকষি জোরদার হয়, প্রমান হল তিনি খুব কঠিন ঠাঁই। তার দৃঢতা ভাঙা আওরঙ্গজেবের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। ১৬৫৬র জুলাইতেই আওরঙ্গজেব, মীর জুমলাকে অনুরোধ করেন দুর্ভেদ্য দুর্গ নাটিয়ার রক্ষণ ভাঙতে। আওরঙ্গজেব জানতে পারলেন অন্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা এবং তিনি নিজের কর্মদাতাকে ভুল বোঝানোর পরেও সুলতানের সঙ্গে মুঘলদের মধ্যে আলাপ আলোচনার ঘোরতর বিরোধিতা করেন। আওরঙ্গজেবের পক্ষে কাবিল খান মীর জুমলাকে জানালেন যে মীরের সঙ্গে যেহেতু নাটিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক, এবং সেই সম্পর্ক যদি থেকে থাকে, তাহলে তাঁকে স্বপক্ষে আনা দরকার। না হলে, দেরি না করে মীর জুমলা মুঘলদের তার সম্বন্ধে কিছু ইঙ্গিত দিন, কিভাবে নাটিয়ারের রক্ষণ ভেদ করে তাঁকে ব্যস্ত করে রাখা যায়। মুঘলদের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়ে মীর জুমলা কিছু চিঠি মুল্লার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে, তার নকল আওরঙ্গজেবকে পাঠালেন(৫ নভেম্বর ১৬৫৬)। এই কাজের জবাবে আওরঙ্গজেব বীজাপুরের মুঘল হাজিবকে এই চিঠিগুলি পাঠিয়ে সেগুলি হয় চরের মাধ্যেমে গোপনে অথবা প্রকাশ্যে হরকরা মার্ফত একটা জবাবি চিঠি লিখে মুল্লার কাছে পাঠাতে বললেন – যে পদ্ধতিটা মুল্লা পছন্দের। মীর জুমলার চিঠির উত্তরে আওরঙ্গজেব লিখলেন, তিনি(মুল্লা) যদি আমার প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহলে ভাল এবং মঙ্গলজনক; না হলে আমাদের নেওয়া পদক্ষেপ সামলাতে তাঁকে চরম ভোগান্তি ভুগতে হবে। মীর জুমলা যেন বাস্তব সম্বন্ধে সচেতন করতে মুল্লাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার কাজটি করেন এবং তাঁদের প্রস্তাবে সম্মত করান। ডিসেম্বরে সমাধান বেরিয়ে এল, আওরঙ্গজেব মুল্লা আহমদকে আশ্বাস দিলেন এবং ইখলাস খানের পরামর্শে মুল্লা বীজাপুরে মুঘল দূতের সঙ্গে দেখা করে আওরঙ্গজেবের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু আওরঙ্গজেব তাঁকে সে মুহূর্তে বিশ্বাস করেন নি, মীর জুমলার আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তোমার আসার পরেই তোমার মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।

এছাড়াও যে কুর্ণুলের সিদ্দি জৌহার মীর জুমলার কর্ণাটকের কিছু গ্রাম(কোক্কানুর আর গোরুমকুণ্ডা?) তছনছ করেছিলেন, তিনিও আওরঙ্গজেবের পক্ষে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন।
Post a Comment