Thursday, January 5, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৯। এই পর্বে মীর জুমলার ভূমিকা
রাজদরবারে ডেকে পাঠানোর পর্বকে সামলানোর পরিকল্পনা মীর জুমলার কূটনীতিকের জীবনে সব থেকে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াল। তার ক্ষেত্রে এটা হয়ে উঠল দায়িত্ব এবং স্বার্থের চিরকালীন দ্বন্দ্ব। আরও তীক্ষ্ণভাবে বলতে গেলে তার বন্ধু দাক্ষিণাত্যের সুবাদার এবং সম্রাটের মধ্যে যে কোন কাউকে বেছে নেওয়ার পালা। সমস্যার যায়গাটা জটিল হল এইভাবে যে, তার বন্ধু এবং যার সঙ্গে তার জোট, তার প্রতিদ্বন্দ্বী(দারা) সম্রাটকে করায়ত্ত্ব করে রেখেছে। এটা পরিষ্কার যে তার আনুগত্য কিন্তু সবসময়ে ছিল তার চাকুরিদাতা সম্রাটের প্রতি, দাক্ষিণাত্যের সুবাদারের প্রতি, এবং তার পরিবারের প্রতি, সেগুলি তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে এবং সে সমস্যা সহজে সমাধানের নয়। অবশ্যই আওরঙ্গজেবের বন্ধু-জোট পক্ষ হিসেবে সে দরবারে যেতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক ছিল না। আইনত ভাবে সে সাম্রাজ্যের আধিকারিক, তাই কোন সম্ভাব্য যুক্তিপূর্ণ কারণ ছাড়া তার পক্ষে দরবারে না যাওয়াও সম্ভব নয়। দরবারে যোগ দেওয়ার নির্দেশ অমান্য করার অর্থ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা। এবং তার ফলে দারার রোষে পড়বে দিল্লিতে থাকা তার পরিবার। তার সামনে সমস্যা দেখা দিল যে তার সাম্রাজ্য আনুগত্য বজায় রেখে কি করে সে বন্ধুর সম্মান বজায় রাখতে পারবে আর তার পরিবারকেও সুরক্ষা দিতে পারবে।

তার কূটনীতির চতুরতা তাকে এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিল। ১৬৫৮ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দিলেন, সম্রাটের নির্দেশনামা অনুসরণ করে তিনি আগ্রায় যাচ্ছেন। আওরঙ্গজেবের আগ্রাসী পরিকল্পনায় ভীত হয়ে তিনি বললেন, আমার পক্ষে সুবাদারের সঙ্গে দেখা করা অসম্ভব, সম্রাট আমায় আদেশ দিয়েছেন, সেটি মান্য করা ছাড়া আমার সামনে অন্য কোন উপায় খোলা নেই। আওরঙ্গজেব মহম্মদ সুলতানকে মীর জুমলার সঙ্গে থাকতে বলে, বললেন, আকাশে ওড়া সম্পদশালী বাজকে আমার কাছে ধরে নিয়ে এস। তিনি শাহজাদা মার্ফত মীর জুমলাকে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠিয়ে বললেন, তার প্রতি কোন রকম অবিশ্বাস না পোষণ করতে, তিনি তাকে আজও তার শুভচিন্তকই ভাবেন। আগ্রা যাওয়ার আগে তিনি যেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করতে তার সঙ্গে দেখা করেন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলা মার্ফত সম্রাটকে একটা মৌখিক বার্তা পাঠাতে চান। শাহজাদা তার প্রতি তথাকথিত শান্তিবার্তাটি মীর জুমলার কাছে পৌঁছে দিয়ে তাকে প্ররোচিত করেন সুবাদারের সঙ্গে দেখা করতে। যেই মুহূর্তে মীর জুমলা আলোচনার জন্য আওরঙ্গজেবের খাস কামরায় (খিলাতগা) প্রবেশ করলেন, তাকে গ্রেফতার করা হল।

আলমগীরনামা সূত্রে জানতে পারছি, আওরঙ্গজেব রাজনৈতিক কারণে মীর জুমলাকে গ্রেফতার করেন, কারণ তার বিশ্বাস ছিল, মীর জুমলা যদি দরবারে যোগ দেন তা হলে তার সিংহাসন দখল এবং তৎসংক্রান্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে। অন্যদিকে আরংনামা, বলছে তিনি প্রথমে মীর জুমলাকে দারার বিরুদ্ধ-দলে, তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তার ঠিক পরেই মীর জুমলা বলেন আওরঙ্গজেবের পক্ষে প্রকাশ্যে যোগ দিলে দিল্লিতে তার পরিবারের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যাবে। তিনি বলেন প্রয়োজনে প্রকাশ্যে তাকে গ্রেফতার করে তার সমস্ত সম্পত্তি, গোলাবারুদ সেনা বাহিনী যা কিছু রয়েছে সব দখল নিয়ে মুরাদের সহায়তায় দারার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হ’ন। এই চাতুরতায় একমাত্র আওরঙ্গজেবের আগ্রাসন এবং তার পরিবার রক্ষার মত দুকুলই বজায় থাকবে। আওরঙ্গজেব একজন সঈদকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্তে কিছুটা ইতস্তত করছিলেন, কিন্তু মীর জুমলা বলেন তিনি স্বইচ্ছেতেই গ্রেফতার হচ্ছেন, এখানে আওরঙ্গজেবের কোন পাপ হবে না। তখন তাকে সরকারিভাবে প্রকাশ্যে গ্রেফতার করা হয়। যতদূর সম্ভব এই সমঝোতা সেই দিন হয় নি, বরং অনেক আগে থেকেই এই নাটকের খসড়া তৈরি করা হচ্ছিল। মীর জুমলা আন্দাজ করছিলেন যে তাকে দরবারে ডেকে পাঠানো সময়ের অপেক্ষামাত্র। তার প্রতি দারার প্রতিকূল মনোভাব তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন দিল্লিস্থ-পুত্র। মীর জুমলার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের বিভিন্ন পত্র বিনিময় এবং ডিসেম্বরে বীরএ আওরঙ্গজেবের সচিবের সঙ্গে তার তিনটে বৈঠক এটা প্রমান করে যে দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বহু আগে থেকেই দারার পরিকল্পনা বানচাল করতে ভেতরে ভেতরে পরিকল্পনা সাঁটছিলেন। মীর জুমলার উদ্দেশ্যে কাবিল খানের দৌত্য থেকে জানতে পারি যে তাদের গোপন আলোচনাগুলি সচিব মহোদয় এতই গোপনীয়তায় মুড়ে রেখেছিলেন যে পাঠকের বুঝতে কষ্ট হয় না যে দুজনের মধ্যে কিছু না কিছু চরম গোপনীয় আলোচ্য বিষয়ে রয়েছে এবং এই আলোচনা লিপিবদ্ধও করেন নি কেউই, এবং সেই আলোচনার সারৎসার তিনি আওরঙ্গজেবকে মৌখিকভাবে জানান। এটা পরিষ্কার যে মীর জুমলার গ্রেফতারি হয়েছিল তার নিজেরই সুপারিশে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির প্ররোচনায়। হয়ত দুজনের মধ্যে গ্রেফতারির সময় বা স্থান নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু ঘটনাটা নিয়ে নয়। দারার আশংকা ছিল পারস্পরিক স্বার্থবদ্ধ দুজনেই যৌথভাবে(বর সাজিশ ও ইত্তিফাক) কিছু একটা ঘটাবে। তিনি এই ঘটনাটা সম্রাটকে জানিয়ে মহম্মদ আমিন খান বক্সীকে কোন একটা তুচ্ছ কিছু দায়িত্ব সঠিকভাবে না পালন করার ঝুটা মামলায় ফাঁসিয়ে গ্রেফতার করার অনুমতি নিয়ে নিজের বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখেন। শাহজাহান তাকে নির্দোষ জেনে তিন চার দিন বাদে তাকে মুক্ত করার আদেশ দেন।

এটা পরিষ্কার যে মীর জুমলার কূটনীতিক চাল এক্ষেত্রে অসাধারণ সফল হয়েছিল। তিনি গোটা ব্যাপারটা এতই চতুরতায় ঘটিয়েছিলেন যে শাহজাহানের মনে হয়েছিল যে মীর জুমলার প্রতি আওরঙ্গজেব অবিচারই করলেন। অপাপবিদ্ধ সঈয়দীর হয়ে শাহজাহান আওরঙ্গজেবকে একটি চিঠি লেখেন – সে সম্রাটের নির্দেশেই দিল্লি যাচ্ছিল। কর্তব্যবোধে তাদের অনৈতিকভাবে গ্রেফতারির এবং তাদের সম্পত্তি দখল নেওয়ার বিরুদ্ধে সম্রাট সোচ্চার হলেন। তিনি আওরঙ্গজেবকে নির্দেশ দিলেন অবিলম্বে তাদের মুক্তি দেওয়ার।

১০। মীর জুমলার মুক্তি
সাম্রাজ্যের প্রতিবাদপত্র হাতে পাওয়ার আগেই আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানিয়ে দেন যে তার ধারণ হচ্ছিল মীর জুমলা ভেতরে ভেতরে দক্ষিণী সেনানায়কদের সঙ্গে মিলে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকাচ্ছেন, সেই জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, না হলে তিনি বাগী দক্ষিণী সেনানায়কদের দলে যোগ দিতেন। আওরঙ্গজেব যে যুক্তি দেখিয়েছেন, সেই ধারণাটি আদতে সে সময়ের দাক্ষিণাত্যের জনগণের মুখে মুখে ঘুরত। ২৬ জানুয়ারি ১৬৫৮ একজন ব্রিটিশ কুঠিয়াল মন্তব্য করেছিলেন যে নবাব, গোলকুণ্ডার রাজার সঙ্গে ষড় করে দিল্লির সিংহাসন দখল করার চেষ্টা করছিলেন। সেই জন্য তাকে গ্রেফতার করা হল।

দারার হারের পর যখন সাম্রাজ্য আর ধর্ম সংস্থাপন ঘটল, সরকারি ঐতিহাসিক লিখছেন, তখন আর মীর জুমলাকে গ্রেফতার করে রাখা জরুরি ছিল না। বরং সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাকে কাজে লাগানো খুব জরুরি কাজ। আওরঙ্গজেব তাকে ছদ্ম-কারাগার থেকে মুক্তি দিলেন। এই সুযোগে মুন্সী কাবিল খানকে একটি লিখিত কৈফিয়ত প্রকাশ করার দায়িত্ব দেওয়া হল। আওরঙ্গজেব লিখছেন, কোন এক কারণে আমি তোমায় গ্রেফতার করেছিলাম, ...ত্রুটি স্বীকারের সময় এসেছে, তবে তোমার মত বন্ধু, শুভচিন্তকের আমার দরবারে থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্য একটি চিঠিতে আওরঙ্গজেব লিখলেন বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তোমায় গ্রেফতার করা হয় নি... তোমার চেহারায় শ্রান্তি ফুটে উঠছিল...অথচ তুমি দরবারে যেতে বদ্ধ পরিকর ছিলে। সেই ভুল সময় দিল্লি যাওয়া তোমার পক্ষে ক্ষতিকর হত। আমি তা হতে দিই নি। আমি তোমায় বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তুমি বুঝতে চাওনি। ফলে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে, তোমায় বাধ্য হয়েই গ্রেফতার করতে হয়েছিল। সর্বশক্তিমানের ইচ্ছেয় আমার চাওয়া পূর্ণ হয়েছে, নতুন রাজধানী এবং ধর্মের বাগানে নতুন জীবন যাপন কর। আমার শত্রুরা পরাস্ত হয়েছে। তোমাকে এর বেশি সময় বন্দীরাখা অমানবিক হবে। আমি চাইনা তোমার মত বুদ্ধিমান মানুষ বেকার জীবনযাপন করুক। এই ক্ষমা প্রার্থনা আদতে দুটি মানুষের চক্রান্তের ওপর রঙ্গিন পর্দা ফেলার তাগিদ ছাড়া আর কিছু নয়। মহম্মদ মুয়াজ্জমকে একটি নির্দেশ দিয়ে দৌলতাবাদের কারাগার থেকে মীর জুমলাকে মুক্ত করার নির্দেশ দিলেন আওরঙ্গজেব এবং বুরহানপুরে যা পড়ে রয়েছে সেগুলি তাকে ফিরিয়ে দেওয়ারও নির্দেশ দিলেন তিনি, সঙ্গে প্রশাসনিক কাজ চালানোর জন্য একলাখ টাকা নগদ। বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মহম্মদ মুয়াজ্জমকে নির্দেশ দেওয়া হল দৌলতাবাদের মহাকোট দুর্গের প্রাকারের নিচে যে প্রাসাদ রয়েছে সেখানে তার থাকার ব্যবস্থা করতে।

মীর জুমলাকে ২৯ মে, ১৬৫৮ তারিখে তার পুত্রের আসার খবর দেওয়া হল। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বললেন, তার প্রতি যে অনুগ্রহ দেখানো হয়েছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে। আগামী দিনে আরও বড় উপহারের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে তিনি তার সরঞ্জাম সামলানোর জন্য আরও নগদ পঞ্চাশহাজার টাকা দিয়ে মহাকোট থেকে দরবারে আসার নির্দেশ দিলেন। এই কাজ সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হল শাহজাদাকে এবং মীর জুমলাকে দ্রুত আওরঙ্গজেবের সঙ্গে দেখা করতে বলা হল।

ডাক পড়লেও ব্যক্তিগতভাবে মীর জুমলা কর্ণাটকে গিয়ে কুতুব শাহের হাত থেকে তার মহালগুলি উদ্ধারের কথা ভাবছিলেন। তার পুত্রের থেকে মীর জুমলার ইচ্ছের কথা জানতে পেরে আওরঙ্গজেব বললেন, যদি মীর জুমলা বেশ কিছুদিন সেখানে না থাকেন তাহলে সে কাজ তার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তিনি স্বয়ং কুতুবশাহকে সেখান থেকে তার সেনা তুলে নিতে নির্দেশ দিলেন। ১৬৫৮এ অক্টোবরের শেষের দিকে মীর জুমলাকে বুরহানপুরের ৬০০০ জাট ৬০০০ সওয়ারওয়ালা সুবাদার নিযুক্ত করা হল। আওরঙ্গাবাদে বদলি হয়ে যাওয়া ওয়াজির খানের যায়গায় তাকে খণ্ডেশের মহাল জায়গির হিসেবে অর্পণ করা হল। মীর জুমলাকে বলা হল কর্ণাটক, বুরহানপুর এবং অন্যান্য যায়গার সঙ্গে তার হিসাব কিতাব বুঝে নিতে, বিভিন্ন যায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার জাহাজ এবং অন্যান্য কিছু সামলাতে, বুরহানপুর এবং কর্ণাটকের মধ্যে ডাকচৌকি নতুন করে স্থাপন করতে, স্থানীয় জমিদার এবং আধিকারিকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করতে, সেনাবাহিনী গড়া এবং সেটি জোরদার করতে আর সব কিছু বিষয়ে তার নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে।
(চলবে)
Post a Comment