Thursday, January 5, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪৭ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। আওরঙ্গজেবের পথপ্রদর্শক রূপে মীর জুমলা
শুধু শান্তিচুক্তি অনুসারে পান্দেরা উদ্ধার করার জন্য আওরঙ্গজেব, মীর জুমলার ওপর নির্ভর করলেন না, তার থেকেও বেশি তিনি দিল্লির মসনদের লড়াইয়ের পরিকল্পনা রূপায়নে মীর জুমলাকে বেশি করে আঁকড়ে ধরলেন। তার ওপর সত্যিকারের নির্ভর করে তিনি কোন দিন কোন বিষয়েই মীর জুমলার প্রস্তাবে না বলেন নি, এবং সিংহাসনের লড়াইতেও তিনি মীর জুমলার পরামর্শ মতই লড়াইটা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলেন। বাস্তবিকভাবে আওরঙ্গজেবের মনযোগ এখন দিল্লি এবং পান্দেরা, এই দুইভাগে ভাগ হয়ে পড়েছে, কিন্তু দিল্লি থেকে তার সভাদূত ঈশা বেগের সম্রাটের স্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত পাঠানো খবরের প্রেক্ষিতে তিনি মীর জুমলাকে স্মরণ করলেন। যদি শাহজাহানের শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়, তাহলে তিনি মীর জুমলাকে পান্দেরা ছেড়ে তক্ষুণি তার সঙ্গে যোগ দিতে বলবেন, আর যদি ভাল হয়ে ওঠে, তাহলে তিনি তাঁকে আরও কিছু দিন পাণ্ডেরায় থেকে যেতে বলতে পারেন। যখন আওরঙ্গজেব কোন খবর পান না, তখন চরম মানসিক উত্তেজনায় থাকেন, মনে হয় খারাপটিই ঘটতে চলেছে। এই সব অবস্থা বিশ্লেষণ করে তিনি মীর জুমলাকে কাছে এসে তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দিতে অনুরোধ করলেন।

১৭ সেপ্ট – ২৫ অক্টো এই ২৫ দিন সময়ের মধ্যে দিল্লির কোন খবর না পেয়ে তার ধারণা হল সম্রাটের এন্তেকাল ঘটেছে এবং তিনি সিংহাসনের লড়াইতে কোন দেরি না করে অবিলম্বে ঝাঁপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মীর জুমলাকে (অক্টোবরের মাঝামাঝি) জানালেন যে কোন উপায়ে কিলাদারকে হাত করে খুব তাড়াতাড়ি পান্দেরা ছেড়ে চলে আসতে। ১৫ অক্টোবর একজন বিশ্বস্ত নিশানইখাসের থেকে পাওয়া সংবাদে আওরঙ্গজেব বুঝলেন যে শাহজাহানের আর কোন নতুন করে একটাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। তিনি মীর জুমলাকে দুতিন দিনের বেশি আর দেরি না করে চলে আসতে বললেন, কেননা তার পাশে এখন একজনও নেই যে তাঁকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারে - তুমি যেটা ঠিক করবে সেটাই আমি সর্বান্তকরণে মেনে নেব। নতুন ঘটনাবলীতে উত্তেজিত হয়ে থাকা আওরঙ্গজেবের অবস্থায় মীর জুমলাকে আওরঙ্গজেবের সচিব দিল্লির ঘটনাবলীর বিবর্তন সম্বন্ধে বীজাপুরীদের সামনে মুখ না খুলতে অনুরোধ করলেন। তার আশা আওরঙ্গজেব মীর জুমলার উদ্ধারে সেনাবাহিনী পাঠাবেন। সচিব মীর জুমলাকে বললেন, তুমি যদি মনে কর আওরঙ্গজেবের বিচ্ছেদ তোমার ক্ষেত্রে অসহনীয়, তাহলে ভেবে দেখ আওরঙ্গজেব কতটা মনঃপীড়াতে ভুগছেন, কেননা তিনি জানেন তোমার গুরুত্ব কি...। তার সামনে তোমার উপস্থিতি তাঁকে চাঙ্গা করার জন্য যথেষ্ট। এই মুহূর্তে তুমি ছাড়া তাঁর আর কোন শুভচিন্তক নেই।

৮ অক্টোবর শাহজাহানের স্বাস্থ্য আরও খারাপের সংবাদ পেয়ে হতিবুদ্ধি আওরঙ্গজেব মীর জুমলার পরামর্শে ১৮ তারিখে বিদর ত্যাগ করলেন। বীজাপুরীরা সেই খবর ইতোমধ্যে পেয়েগিয়েছে, তাই তার পরেও সেখানে থাকা আত্মহত্যার শামিল বলে মীর জুমলা মনে করলেন। তাঁকে পাথরি যেতে বললেন মীর জুমলা এবং সেখানে তিনি যেন সম্রাট সম্বন্ধে নতুন খবরের আশায় অপেক্ষা করেন। এক্ষুনি তাঁর বুরহানপুরে যাওয়া অসমীচীন হবে, সম্রাটের মৃত্যুর আগেই মুহম্মদ সুলতানকে দিল্লির উদ্দেশ্যে পাঠানো দরকার বলে মত প্রকাশ করলেন আওরঙ্গজেব। দিল্লির ঘটনায় তার আগ্রহ বেশি আন্দাজ করে দুই সুলতান শান্তিচুন্তি রূপায়ন করতে গড়িমসি করার চেষ্টা করবেন। এই তত্ত্বটি বুঝে, তিনি মীর জুমলাকে আহমদনগরে একজন শাহজাদা পাঠাতে বললেন। হতবুদ্ধি আওরঙ্গজেব আবার তাঁকে(১৯ অক্টোবর) পান্দেরা দুর্গ দখল করতে নির্দেশ দিলেন। আওরঙ্গজেব স্বীকার করলেন তার বুদ্ধিশুদ্ধি সব গুলিয়ে যাচ্ছে, ঘটনার ওপর তার নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। আমার মন এতই ছড়িয়ে যাচ্ছে যে আমি নিজে কোন কিছুই সিদ্ধান্ত নিয়ে উঠতে পারছি না, কোন পরিকল্পনা কষে উঠতে পারছি না। তুমি ছাড়া আমার কোন বিশ্বাসী বন্ধু এবং পরামর্শদাতা নেই। সর্বশক্তিমানের ইচ্ছেয় তোমার শুভচিন্তা আমায় সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করে। প্রত্যেক বিষয়ে আমার পদক্ষেপ কি হওয়া দরকার সে বিষয়ে তুমি আমাকে পরামর্শ দেবে, যাতে আমি সঠিক দিশায় এগোতে পারি। ২১ অক্টোবর সম্রাটের কিছুটা স্বাস্থ্য উন্নতির খবর পেয়ে তিনি মীর জুমলাকে জানালেন পান্দেরা উদ্ধার করেই তিনি তার সঙ্গে যোগ দিন।

অক্টোবরে আগ্রার রাজস্ব আধিকারিকের থেকে খবর পেয়ে তার মনে হল, হয় শাহজাহান মারা গিয়েছেন, না হয় ঘটনাবলীর ওপরে তার আর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। দুটি অবস্থাতেই খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই বড় করে ভাবার সময় এসেছে। তিনি মীর জুমলাকে লিখলেন পান্দেরায় আর দেরি না করে অবিলম্বে পরামর্শের জন্য তার কাছে চলে আসতে, কেননা আর দেরি করলে ঘটনাবলীর প্রবাহটি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। আর যদি শাহজাহান সেরে উঠে (পান্দেরার বিষয়ে )তার কাছে কৈফিয়ত দাবি করেন, তাহলে কেন তিনি পান্দেরা উদ্ধার করতে পারলেন না, সে বিষয়ে উপযুক্ত উত্তর দিতে পারবেন।

২২ অক্টোবর দিল্লিতে দারার ক্ষমতায় আরোহণের সংবাদে তিনি ঠিক করলেন মুহম্মদ সুলতানকে বুরহানপুরে সেনাবাহিনী নিয়ে পাঠাবেন যাতে নাসিরি খানের মত সেনানায়কেরা দিল্লির ফর্মান এলেই স্থানীয় জমিদারদের থেকে সেনা জোগাড় করে উত্তরের দিকে যেতে পা পারেন। কিন্তু এটি সেহেতু সরাসরি সম্রাটের নির্দেশ উল্লঙ্ঘন এবং বিরুদ্ধাচরণ, ফলে সেই বিষয়টা তাঁকে বোঝানো যাবে কি না সে বিষয়ে আওরঙ্গজেব যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন। ফলে বুরহানপুরের দিকে মহম্মদ সুলতানকে পাঠানো উচিত হবে কি না এই প্রশ্নে মীর জুমলার মত জানতে চিঠি দিলেন আওরঙ্গজেব। ... এই বিষয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, আমি তোমার পরামর্শই নিয়ে চলেছি, এবং তার বাইরে কিছুই করি নি, এর পরের অন্যান্য বিষয়েও তোমার পরামর্শ পেতে অধীর হয়ে উঠেছি, এই খবর(দারার ক্ষমতায় আরোহণ)টা পাওয়ার পরে তুমি যদি পরামর্শ দিতে চাও তাহলে আমি খুশিই হব। পান্দেরা হয়ত হাতছাড়া হবে বীজাপুরীদের আক্রমণে। তুমি কি মনে কর মহম্মদ সুলতানকে বুরহানপুরে পাঠানো উচিত হবে? আমি তাঁকে আহমদনগরেও পাঠাতে পারি, সেখান থেকে সে পান্দেরা পৌঁছে যাবে সহজেই। ঠাণ্ডা লোহায় হাতুড়ি মারার মত ফলহীন কাজ হল পান্দেরাকে রক্ষার চেষ্টা করা, শুধু সময়ের অপচয়, সে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ কর, একটা আহদনামা চুক্তি করে আওরঙ্গাবাদে ফিরে এস, যাতে তোমার সঙ্গে আলোচনা করে বিশালকায় পরিকল্পনাটা আমরা সাজিয়ে নিতে পারি। মহম্মদ সুলতান আমার সেনা নিয়ে পাথরিতে যাচ্ছে। ততদিনে তোমার চিঠির আশা করছি। তুমি রাজি থাকলে মহম্মদ সুলতানকে আহমদনগর পাঠিয়ে আমি আওরঙ্গাবাদে যেতে পারি অথবা তাঁকে বুরহানপুরেও পাঠিয়ে আমি সেখানে তোমার জন্য দিন গুণতে পারি। তাড়াতাড়ি উত্তর দাও, তোমার মত পাঠাও। মহম্মদ সুলতানকে বুরহানপুরে পাঠাবার প্রস্তাবে মীর জুমলা রাজি হলেন না, অবশ্য মীর জুমলার চিঠি আসার আগেই আওরঙ্গজেব স্বয়ং এই পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়েছিলেন, যেহেতু সাম্রাজ্যের অভিজাতরা ততদিনে নারবাদা পেরিয়ে গিয়েছিলেন।
(চলবে)

Post a Comment