Monday, January 2, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪১ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজে

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৯। দিল্লির সিংহাসন দখলের লড়াইএর সময় এবং তাঁর পরের কর্ণাটক
দিল্লির সিংহাসন পাদশাহ শাহজাহানের কোন পুত্র দখল নেবেন সেই লড়াইএর শুরুতে মীর জুমলাকে দৌলতাবাদে ছদ্ম-গ্রেফতার করেন আওরঙ্গজেব, সেই সঙ্গে তাঁর সম্পত্তি এবং গোলাবারুদ অস্ত্রশস্ত্রও ১৬৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে দখল নেয় আওরঙ্গজেব পাদশাহের প্রশাসন। সেই সঙ্গে তাঁর কর্ণাটক তালুকও সাম্রাজ্যের পক্ষে দখল করেন আওরঙ্গজেব সরকার। কর্ণাটকের রাজনৈতিক অবস্থার এই তাত্ত্বিক পরিবির্তন করা হয়েছিল যাতে তার সঠিক আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিধান করা যায়। ফলে ফেব্রুয়ারিতে উত্তরের দিকে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চলা আওরঙ্গজেব তাঁর পূর্বের সহৃদয়তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে কুতুব শাহকে হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখলেন যে তিনি যেন মানুষ জনকে হেনস্থা না করেন, কৃষকদের দুর্দশায় না ফেলেন, এবং মুঘল সেনা বাহিনীর অবর্তমানে কর্ণাটকে কোন গোলযোগ তৈরি করার চেষ্টা না করেন, এবং চেষ্টা করুণ যাতে কর্ণাটকের প্রশাসন তত্ত্ব থেকে সহজেই প্রায়োগিকতার স্তরে পৌঁছতে পারে। সুলতানের সঙ্গে বন্ধুতের কড়ার করে তিনি লিখলেন, রুঢভাষী এবং দুর্বিনীত দূতের স্থানে মহম্মদ সৈয়দের যায়গায় প্রয়োজনে মৃদুভাষী আবদুল মাবুদকে দূত করার নির্দেশ দিন এবং কর্ণাটকের সীমান্তকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার উদ্যোগ নিন।

কিন্তু আওরঙ্গজেবের উত্তরের অভিযানের সুযোগে, সেনা বাহিনী হ্রাসের কারণে কুতুব শাহ গোলকুণ্ডা এবং সিদ্ধঔত মীর মিরজুমলার বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেন ফলে কর্ণাটক নতুন গোলযোগের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ায়। এবারে দ্বিধাহীনভাবে কর্ণাটকের দিকে নজর দিতে পারলেন আওরঙ্গজেব, নিজেকে হিন্দুস্তানের রাজা হিসেবে ঘোষণা করায়। তিনি কুতুব শাহকে সরাসরি বললেন তাঁর চক্রান্ত এবং হুড়মুড়করে নেওয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে মীর জুমলার দখল করা এলাকা ফিরিয়ে দিয়ে কর্ণাটক্ম থেকে নিজস্ব সেনা বাহিনী তুলে নিতে। ততদিনে তিনি ছদ্ম-কারাগার থেকে মীর জুমলাকে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রচনা করে তাঁকে খণ্ডেশের সুবাদার ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। একই সঙ্গে তিনি মীর জুমলা হায়দ্রাবাদ থেকে কর্ণাটক পর্যন্ত যে সব ডাকচৌকি স্থাপন করেছিলেন, সেগুলিকে কোন রকম অব্যবস্থার মধ্যে না ফেলতেও নির্দেশ দিলেন।

তবুও কুতুব শাহ তাঁর আগ্রাসী মনোভাবে এড়ে রইলেন। আগস্ট ১৬৫৬ সালে মীর জুমলার বাহিনী হঠিয়ে পুনামাল্লি দখল নিলেও পরে মীর জুমলার সেনাপতি টুপাকি কৃষ্ণ সেটি দখল করলেও, সেটি ঘিরে থাকা শাহী বাহিনীর আত্মক্ষার্থে আরও বড় বাহিনী পাঠালেন। কৃষ্ণ একই সঙ্গে ডাচেদের পুলিকট এবং ব্রিটিশদের কুঠি অবরোধ করেন। অক্টোবরে গোলকুণ্ডার সেনানায়ক কুতুব বেগ টুপাকিকে শুধু হারলেন তাই নয়, তাঁকে আহত করে গ্রেফতার করলেন মাদ্রাজ এবং স্যান থোমের আশেপকাশের অঞ্চল দখল করলেন।

আজমেড়ে(মার্চ ১৬৫৯) দারার বাহিনীকে হারিয়ে সুজার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে দাক্ষিণাত্যে সুলতানের দিকে নজর দিলেন আওরঙ্গজেব। এতদিন সাম্রাজ্যের দূত কৃষ্ণ রাওএর সঙ্গে সুলতান, কর্ণাটক নিয়ে কোন কথাই বলেন নি, আলোচনাও করেন নি এবং মীর জুমলার কর্ণাটক দখলের আশাও ছাড়েন নি। সম্রাট আওরঙ্গজেব হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন হিন্দুস্তানের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেই, তিনি গোলকুণ্ডা এবং কর্ণাটক দখল করতে দাক্ষিণাত্যের দিকে যাওয়া যে কোন সেনাবাহিনীর নেতা করে দেবেন মীর জুমলাকে। ‘কর্ণাটক মীর জুমলাকে দেওয়া হয়েছে... কোনভাবেই তা ফেরত নেওয়া যায় না... তোমার বাহিনীকে বল দূর্গ আর মহলগুলি মীর জুমলার বাহিনীর হাতে ছেড়ে (গোলকুণ্ডায় সরে)আসতে... কিন্তু তুমি যদি তোমার উদ্দেশ্যপথ না পাল্টাও, তা হলে এই বর্ষার পরে হিন্দুস্তান থেকে শত্রুর নাম মুছে দেব। মীর জুমলা গোলকুণ্ডা আর কর্ণাটক বলপূর্বক দখল করে নেবে... সময় এসেছে তোমায় উপড়ে ফেলার। মুহূর্তের মধ্যে তোমার সম্মান পথের ধূলায় লুটোবে। তোমার দেশ থেকে তোমার সব নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে।’ সুজা রাজমহল ছেড়ে তাণ্ডার দিকে যেতে শুরু করলে, দক্ষিণে মীর জুমলার বাহিনীর সঙ্গে সুলতানের বাহিনীর লড়াই লাগলে আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডার দিকে মীর আহমদ খোয়াফি ওরফে মুস্তাফা খানকে পাঠালেন। আমরা দেখলাম মীর জুমলার কর্ণাটক বিষয়ে আওরঙ্গজেবের প্রতিক্রিয়া তার নিজস্ব চাহিদা, পেশা এবং সিংহাসন দখলের ভাগ্যের ওপরে নির্ভরশীল ছিল।

মীর জুমলা মুঘল উজির এবং তার পরে দাক্ষিণাত্যে গমনে তার কর্মচারী টাপা টাপ(তাবাতাবাই?) গোলকুণ্ডায় তার স্বার্থ এবং সম্পত্তি রক্ষায় গোলকুণ্ডা এবং মছলিপত্তনমে থেকে গেলেন। বন্দরে কুতুব শাহের কর্মচারীরা বন্দরে তার জাহাজের পণ্য বাজেয়াপ্ত করলে টাপা টাপ(তাবাতাবাই?)এর সঙ্গে তাদের সরাসরি বিরোধের অবস্থা তৈরি হয়। এ বিষয়ে পাদশাহের আপত্তি নিয়ে কুতুব লিখলেন, ‘বন্দরের এই সাম্রাজ্যের জাহাজ আটকানোর কোন ক্ষমতা নেই সেখানকার আধিকারিকদের, শুধু জাহাজটিকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে মাত্র, ১০% শুল্ক দিয়ে দিলে সেটিকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানালেন শুধু মীর জুমলাই নয়, অন্যান্য জাহাজের পণ্যের ওপর শুল্ক নেওয়া গোলকুণ্ডার বহুদিনের প্রথা।

গোলকুণ্ডাতেও টাপা টাপ, তাঁর কর্মদাতার মৃত্যুর পরও তাঁর সম্পত্তি গোলকুণ্ডার আওরঙ্গজেবের প্রসাসন দখল করে নেওয়া থেকে বাঁচাতে, তাঁর গুদামঘর থেকে বহুমূল্য সম্পদ সরয়ে নিয়েছিলেন। মীর জুমলা নামটা এতই প্রভাবশালী ছিল যে, তাঁর মৃত্যুর চার বছর পরও তাঁর পুত্র মহম্মদ আমিন খুব বিখ্যাত হয়ে যান। এবং তাঁর দালাল মীর মহম্মদ হুসেইন তাফা টাপা বন্দরের কার্যত প্রধান হিসেবে কাজ করেন।
(চলবে)

Post a Comment