Monday, January 9, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব


জগদীশ নারায়ণ সরকার
 
৪। মুঙ্গের-গিরিডি
বিশ্বস্ত জমিদারের বিশ্বাঘাতকতা এবং সম্রাটের সেনাপতিদের তাদের বাহিনীকে হতবুদ্ধি করে দেওয়া রণনীতির প্রভাবে ৬ মার্চ সুজা পালালেন আবার। আলমগিরনামায় জায়গাটির নাম বলছে, তেলিয়াগিড়ি পেরিয়ে রাঙ্গামাটি। এখানে তিনি ১৫ দিন শিবির ফেলে(১০-২৪ মার্চ) নাওয়ারা(যুদ্ধ নৌকো সম্ভবত) নিয়ে নদী পাহারায় বসালেন এবং গড়ি বা তেলিয়াগড়িতের সুরাক্ষা সাজালেন নতুন করে। তিনি বীরভূম আর ছটনগরের জমিদার খ্বোয়াজা কমল আফগানকে গঙ্গা থেকে বীরভূম পর্যন্ত অঞ্চল রক্ষার দায়িতে দিলেন, যাতে পাহাড় থেকে নেমে আসা মীর জুমলার যে কোন ঝটতি আক্রমন প্রতিরোধ করতে পারেন।
মুঙ্গের থেকে ৪০ মাইল পূর্ব পিয়ালাপুরে অবস্থান করার সময়ে শুনলেন যে সুজা আরও পূর্বের দিকে পালিয়ে যাচ্ছেন। মহম্মদ সুলতানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী এই নতুন দখল করা অঞ্চলে রেখে, প্রশাসনিক এবং বাকি সেনা না আসা পর্যন্ত দুর্গের সুরক্ষারভার অস্থায়ীভাবে মহম্মদ হুসেইন সালদুজের ওপর দিয়ে নিজে বাহিনী নিয়ে ছুটলেন সুজার পিছনে। পিয়ালপুরে শুনলেন সুজা গড়িতে তাঁবু ফেলেছেন, সেই মুহূর্তে তিনি সম্রাটের মহম্মদ সুলতানের বিপুল বাহিনী নিয়ে গেলেন রাজমহলে যাতে তিনি সুজার পালিয়ে যাওয়ার রাস্তায় বাধা তৈরি করতে পারেন। গঙ্গা থেকে দক্ষিণের পাহাড় পর্যন্ত সুজার সুরক্ষার ঢাল সাজানো ছিল বিপুল সাঁজোয়া বাহিনী দিয়ে আর গঙ্গার রাস্তা পাহারা দিচ্ছিল নাওয়ারার বিপুল বাহিনী। সেই সিময়ে বাঙলার প্রবেশপথ বলে পরিচির তেলিয়াগড়ি এবং সকরিগলিও এই সুক্ষার মধ্যে জুড়ে নেন সুজা। 

সুজার জোরদার সুরক্ষার বহরের খবরে মহম্মদ সুলতান মীর জুমলাকে প্রশ্ন করলেন, তিনি কি সরাসরি গড়িতে সরাসরি গিরিসঙ্কট দিয়ে আক্রমণ করবেন। শোনা যায় মীর জুমলা তাকে কিছুটাই ব্যঙ্গভরে বলেছিলেন, ‘তোমার ক্ষেত্রে এটি অসম্ভব নয় কেননা তুমি প্রখ্যাত তৈমুরের বংশধর, এই কাজে তোলার উপযুক্ত কেউ নেই, কিন্তু, এই ধরণের (গিরি)যুদ্ধে প্রচুর মানবসম্পদ ক্ষয় হয়, ফলে এই যুদ্ধ করা উচিত নয়। যে কাজ কূটনৈতিক এবং কৌশলী কাজে সম্পন্ন করা যায়, সে কাজে কেন লোকক্ষয় করব? ফলে আমার সামনের মূল কাজ, যুদ্ধ না করে প্রজ্ঞা এবং নীতিকৌশলে(তবদির)কাজ উদ্ধার।’

৫। গড়ির কাছে মীর জুমলার রণকৌশল পরিবর্তন
মুঙ্গেরে দেখেছি, বর্তমানে এখনও দেখছি, কৌশল আর কূটনীতিকে তাঁর শক্তি বানিয়ে ফেলে কাজ উদ্ধার করে চলছিলেন মীর জুমলা। আবারও তিনি সুজার বিরুদ্ধে রণনীতি হিসেবে পথ ধরলেন সোনা প্রভাব নীতির।বীরভূমের জমিদারকে তিনি স্বপক্ষে নিয়ে এলেন যেভাবে তিনি খড়গপুরের সাম্রাজ্যের পক্ষে রাজাকে নিয়ে এসেছিলেন এবং সেই ভাবেই আগামী দিনের পথের সুরক্ষা অর্জন করলেন। মুঙ্গেরের দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলে যেটি মানুষখেকো হিংস্র শ্বাপদে পরিপূর্ণ, ফলাবনত গাছ এবং নির্ঝঞ্ঝাট খাদ্য এবং পানীয় জল সরবরাহের জন্য চাষের জমিগুলির ক্ষতি না করে তিনি এগিয়ে চলার পরিকল্পনা করলেন। এই দুটি বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি রাজা বাহারোজের পণ্য সরবরাহের দক্ষতার সূত্রটি সঙ্গে নিয়ে ঝাড়খণ্ডের পথে পা বাড়ালেন মীর জুমলা।

তাঁর এগিয়ে চলার রণনীতি হল –
স্বয়ং মীর জুমলা এবং জুলফিকারের নেতৃত্বে বিপুল হাতির দল আর বিশাল দ্রুত চলতে পারা ঘোড়া বাহিনীর সাহায্যে কাঠুরে এবং বড় কুঠার হাতে করা পথ দেখানো বেলদারেরা গাছ কেটে পথ তৈরি করে, পথটি বোঝাতে পথের দুপাশে পতাকা পুঁতে দিচ্ছে। সেনাবাহিনীটি নতুন পথে শুধুই দিনের বেলা চলল এবং রাতে বিশ্রাম নিল। ঝাড়খণ্ড হয়ে যে পথ বাংলায় ঢুকেছে সেটির পথ খুব সরু এবং ন্যাড়া পাহাড়ি গিরিসংকটে পরিপূর্ণ এবং ঘাস থেকে গাছ, জীবনের বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। পথটি খুব বেহুদা, কিন্তু যতটা পারা যায় তাড়াতাড়ি মীর জুমলার নেতৃত্ব এবং শৃঙ্খলার জোরে বাহিনীটি দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলল – বাহিনীর ডানদিকে ছিল রথ নিয়ে ২০০০ বাহিনীর জুলফিকার, বাঁদিকে ইসলাম খান এবং ফিদায়ি খান ৫০০০ করে সেনা নিয়ে, সামনে ১৫টি ঘোড়ার সুরক্ষায় শাহজাদাকে রেখে মীর জুমলা সহ কুঁয়র রাম সিং, ইখলাস খান খোয়েসগি, রাও ভাও সিং হাদা, সৈয়দ মুজফফর খান। সঙ্গে বাঁদিকের অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে ২০০০ বাহিনীর দাউদ খান এবং ডনদিকের ২০০০ বাহিনীর রশিদ খান। গভীর জঙ্গলটি ১২ দিনে অতিক্রম করে দলটি খ্বোয়াজার জমিদারি, উখলা(উখড়া) এবং সিউড়ি পেরিয়ে বীরভূমের সমতলে পৌঁছল ২৮ মার্চ।

৬। মীর জুমলাকে রাজপুতেরা ছেড়ে গেল
প্রকৃতির প্রতিবন্ধকতা মীর জুমলা নিজস্ব উদ্যোগে পেরিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু মানুষের অবিশ্বাস, স্বার্থবোধ এবং ভিরুতার কোন দাওয়াই তাঁর কাছে ছিল না। অভিযানের শেষের দিকে রাজপুত কুঁয়র রাম সিং(মীর্জা রাজার পুত্র), রাও ভাও সিং(রাজা ছত্রশাল হাদার পুত্র), অমর সিং, চতুর্ভূজ চৌহানের মত সেনা নায়কেরা মীর জুমলাকে ছেড়ে ঝাড়খণ্ডএর পথ বেয়ে আবার আগ্রার পথে রওনা হয়ে গেল। কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনাক্রমের জন্য মীর জুমলার সেনাবাহিনীর তুলনামূলক শক্তি অনেকটা কমে গেল, সেই বর্ণনা একেক জন ঐতিহাসিক একেক রকমভাবে দিয়েছেন। সুজার ঐতিহাসিক মাসুমের বক্তব্য, রাজপুতেরা যে ধরণের আর পরিমান সম্পদের দাবি করেছিলেন মীর জুমলার কাছে, তিনি তা পূরণ করতে পারেন নি। শোনা যায় মীর উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনারা সাম্রাজ্যের জায়গিরদার এবং বিপুল পরিমান বেতন পান। (এখন অভিযানের সময়) বেশি সম্পদ খরচ করা যাবে না। কোথা থেকে আপনাদের এত চাহিদা পূরণ করব? যখন দেশটি দখল হবে দারোগা নির্বাচন হবে, একমাত্র তখনই আপনাদের চাহিদা পূরণ করা যাবে।’ মীর জুমলার সঙ্গে থাকা রোজবিহানী দল এটিকে আওরঙ্গজেবের হিন্দু নিপীড়নের ফলশ্রুতি হিসেবে জুড়ে দিয়েছিল। রাম সিং বা ভায়োঁ সিংএর মত রাজপুত শুনেছিলেন আওরঙ্গজেব মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ বানাচ্ছেন এবং হিন্দুদেরও ধরে ধরে কতল করবার পরিকল্পনা করেছেন, এবং তারা নিজেদের জীবনটাও নাকি মীর জুমলার অধীনে খুব একটা সুরক্ষিত বোধ করছিলেন না। ফলে তারা সম্রাটের সেনানীকে যৌথভাবে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই ব্যখ্যা কতটা যৌক্তিক তা ভেবে দেখার। মনে রাখা দরকার সব রাজপুত কিন্তু মীর জুমলাকে ছেড়ে যান নি, রাজা ইন্দ্রদুম্ন কিন্তু থেকে যান। দুই পলাতকের সঙ্গে যোগ দেন দুই মুসলমান সেনানী শের বেগ এবং সৈয়দ সুজাত খান। রাজপুতদের চরিত্র বিরোধী এই কাজের মধ্যে রয়েছে শুধু মাত্র আর্থিক নয়, আরও গভীর কোন কারণ। আওরঙ্গজেব এই কাণ্ডটির তদন্তে নামায় আলিকুলি খান এটির সঠিক কারণ খুঁজে বার করেন, এবং সেটি সরকারি ইতিহাস, আলমগীরনামাতেও রয়েছে। আজমেঢে(দেওরাই ১৪-১৪ মার্চ) দারার জেতার মিথ্যা সংবাদ এবং আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্যে চলে যাওয়ার খবর আসে পিয়ালপুরে। (এই দুটি খবর জুড়ে দিয়ে একে সম্রাটের পরাজয় ভেবে) সেনাবাহিনীর একটি অংশ হতোদ্যম হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাজপুতেদের মনে হল যে দারা তাদের প্রতি প্রতিহিংসার কাজ করতে পারে রাজপুতানায়। এছাড়াও সুজাকে তাড়া করতে গিয়ে যেভাবে মীর জুমলা ঘুরপথ ধরেছেন, তাতেও তাদের মীর জুমলার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্দেহ জাগে। তাদের মনে হয় দারার জয়ে মীর জুমলা পথ খুঁজছেন আওরঙ্গজেবের পথ ধরে শাহজাদা সুলতান মহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে গোপন দাক্ষিণাত্যে পালিয়েও যাওয়ার।  

পলাতকেদের বোঝানোর বা শাস্তি দেওয়ার পথে না গিয়ে মীর জুমলার বাহিনী তখনও প্রায় ২৫০০০ পদাতিক সমৃদ্ধ, দারার প্রায় দ্বিগুণ, আরও দুরন্ত গতিতে আঘাত করার পরিকল্পনাকে এগিয়ে চলল।
(চলবে)
Post a Comment