Wednesday, January 4, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪২ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
তৃতীয় খণ্ড

বীজাপুর অভিযান ১৬৫৭-৫৮
১। মীর জুমলার বিজাপুর অভিযানের পরিকল্পনা রূপায়ন
মীর জুমলা উজিরের পদে আসীন থাকার সময়ই ১৬৫৭-৫৮ সালে বীজাপুর অভিযানের পরিকল্পনার ভাবনা আসে। আগের বছরের গোলকুণ্ডা অভিযানের মতই মীর জুমলা এবং আওরঙ্গজেব উভয়েই এই পরিকল্পনাটির রচয়িতা। কিন্তু গোলকুণ্ডার ক্ষেত্রে ভাবনাটা যেমন এসেছিল আরঙ্গজেবের মাথা থেকে, বীজাপুর অভিযানের পরিকল্পনাটা সূচিত হয়েছিল মীর জুমলার পক্ষ থেকে। আগের অধ্যায়েই আমরা দেখেছি আওরঙ্গজেব কিভাবে কর্ণাটক বিষয়ে শাহী সুলতান আগ্রাসী মনোভাব নেওয়ার জন্য তাঁকে শাস্তি দিতে এবং গোলকুণ্ডা দখলের গোপন ইচ্ছে পূরণ করতে, কর্ণাটক সমস্যা সমাধানে যেতে এবং সামগ্রিকভাবে দাক্ষিণাত্য অভিযান করতে মীর জুমলাকে সম্রাটের অনুমতি নেওয়ার জন্য চাপ দেন। ঠিক একই সঙ্গে কর্ণাটক সমস্যা সমাধানের জন্য একটা বাহিনী নিয়ে দাক্ষিণাত্য অভিযানের জন্য বারবার এত্তেলা পাঠিয়ে মীর জুমলাকে যে চাপ দেন তা কিন্তু সফল হয় নি। মীর জুমলার ধারণা ছিল কুতুব শাহ আর রয়াল উভয়েই শেষ হয়ে যাওয়া আগ্নেয়গিরি, এদের নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজনই নেই, বরং বীজাপুর শত্রু হিসেবে যথেষ্ট ভীতিপ্রদ এবং খুব তাড়াতাড়ি এই রাজত্বকে ধ্বংস করে ফেলা দরকার তারপরে সুলতানের শাস্তিস্বরূপ কর্ণাটকের নিরাপত্তা এবং দাক্ষিণাত্যের শান্তির কাজে তাঁকে বাধ্য করে কাজে লাগানো যাবে। হয়ত এই কারণেই মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে প্রস্তাব দেন যাতে তিনি দুই সুলতানের আদত উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত তথ্য পাদশাহকে পাঠান, যাতে তিনি নিজে সম্রাটকে দারার শান্তি উদ্যম দমন এবং বীজাপুর অভিযানের জন্য অনুমতি নিয়ে রাখতে পারেন। উজির, নিজের জায়গায় শাহ বেগ খানকে পাঠানোর উদ্দেশ্যটাই ছিল যে নিজেকে বীজাপুর অভিযানের জন্য তুলে রেখে দেওয়া। ১৬৫৭ সালের অক্টোবর মাসে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে লিখছেন, ‘এই বিষয়ের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তোমার নির্দেশে সব কাজ করে গিয়েছি, কোন কাজের বিরুদ্ধতা করি নি, অন্যান্য প্রস্তাবের শুরু থেকেও আমি তোমার ইচ্ছেতেই কাজ করব।’ এবং যেহেতু তাঁর পক্ষে আদিল শাহকে শান্ত রাখা জরুরি হয়ে পড়ছিল, তাই তিনি লিখলেন, মীর জুমলার শয়তানি চক্রান্তে (বাধ্য হয়ে)আমি আপনার এবং গোলকুণ্ডা আক্রমণ করেছি।

বাস্তবে, দুই পরিকল্পক অনতিদূর অতীত থেকেই কুতুব শাহের কর্ণাটক বিষয়ে আগ্রাসী মনোভাবের সুযোগে বীজাপুর দখলের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। মহম্মদ আদিল শাহের মৃত্যুর আগে থেকেই মীর জুমলা আর আওরঙ্গজেব বীজাপুরী আমলা আর সেনা নায়কদের মন কিভাবে জেতা যায় এবং সম্রাটের অনুমতি নেওয়া যায় তার পরিকল্পনা করছিলেন। মীর জুমলা কিভাবে সম্রাটকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন সে গল্পসম ইতিহাস আজ আর পাওয়া যায় না; তবে পারস্যদের কবল থেকে কান্দাহার উদ্ধারের স্বপ্ন বাতিল করে, তার যায়গায় আদিল শাহের মৃত্যুর পরে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দাক্ষিণাত্যে সেনা বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্তে সম্রাটকে রাজি করাতে মীর জুমলার অন্তত চার মাস সময় লেগেছিল। এই সংবাদে আওরঙ্গজেব অতীব প্রীত হয়ে মীর জুমলাকে লিখলেন, আমি জানতে পেরেছি, আদিল খানের মৃত্যুর পর তুমি এই দিকে আসার অনুমতি পেয়েছি... আমার বিশ্বাস তুমি এই ঘটনাপ্রবাহের তবদিরে তোমার মানসিক অবস্থা ঠাণ্ডা এবং স্থিতিশীল রাখবে, যাতে এই কাজটি করতে কোন কর্তব্যচ্যুতি দেখা না দেয়। অন্তিম লক্ষ্যর দিনে নজর রেখে একাগ্র হও যাতে পরিপূর্ণ শান্তি আসে এবং তোমার শ্রম নিরর্থক না হয় আর যা চাইছি সেই পথে যেন অভিষ্ট সিদ্ধি হয়।

২। মীর জুমলার সামনে কর্তব্য
৪ নভেম্বর ১৬৫৬ সালে আদিলশাহের মৃত্যুর খবর শুনে বিজাপুরের মুঘল হাজিব ১০ নভেম্বর আদিল-পুত্র মহম্মদ আমনকে দ্বিতীয় আলি আদিল শাহ উপাধি দিয়ে সিংহাসনে অভিষেক করান। এই সংবাদটি আওরঙ্গজেব সম্রাটের কানে পৌঁছে দিয়ে বীজাপুর আক্রমণের অনুমতি চান। এ প্রসঙ্গে মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘বিজাপুরের খবরটি যদি ঠিক হয়, এবং সেই রাজ্য সংক্রান্ত বিপুলাকৃতির পরিকল্পনাটিকে যদি আমাদের সফল করাতে হয়, তাহলে তুমি এই বিষয়টি সম্রাটের সামনে পেশ করে যা করার দরকার কোরো।’

মীর জুমলার সামনে দুটি পরিষ্কার কাজ ছিল, দারার উদ্দেশ্য বিফল করতে সম্রাটের থেকে বীজাপুরের অভিযানের পরিকল্পনার সম্মতি সাধন এবং একই সঙ্গে এই পুরো কাজে দাক্ষিণাত্যের সুবাদারের চাহিদা অনুযায়ী সমগ্র পরিকল্পনা রূপায়নে সেনা আর মালামাল নিয়ন্ত্রণে আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণের সম্মতি নেওয়া। দারার শঙ্কা ছিল, আওরঙ্গজেবের অবস্থান আরও জোরদার হবে যদি মীর জুমলার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যের সেনা বীজাপুরের অভিযানে নামে। তাই দারার প্রস্তাব ছিল দাক্ষিণাত্যে পাদশাহ নিজে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিন। শায়েস্তা খানের নিয়ন্ত্রণে থাকা মালওয়ার সেনা বাহিনী নিজের অধিকারে নেওয়ার পরিকল্পনা নেন আওরঙ্গজেব। দারা বোঝে যে এই পরিকল্পনায় আওরঙ্গজেবের হাত শক্ত হবে, এবং সেই পরিকল্পনায় বাদ সাধেন সফলভাবে। আওরঙ্গজেব তখন মীর জুমলাকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন স্বতঃপ্রণোদিতভাবে উদ্যোগী হয়ে সম্রাটকে বোঝান যততাড়াতাড়ি সম্ভব মালওয়া সেনা বা তার একটা অংশ মীর জুমলা নিজের অধীনে নিয়ে তার সঙ্গে অবিলম্বে যোগ দেওয়া যায়। তিনি লিখলেন মালওয়ার সেনা নিয়ে আসাটা জরুরি। আমার ডাকে সক্কলে এগিয়ে আসবে না। আর যদি সম্রাট আসেন তাহলে সক্কলে আসবে। তিনি খুব যে উদ্গ্রীব তার প্রকাশ ঘটে উজিরকে লেখা চিঠিতে, এই ঝামেলাটা সামলাতে হবে। কিন্তু তবির ব্যবহার না করে বড় ঝামেলাটা হঠানো খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তুমি কি সেনা বাহিনীতে ঢুকতে পারবে? তোমায় ছাড়া এই কাজে এগোনো এবং সাফল্য পাওয়া খুব মুশকিল।
(চলবে)
Post a Comment