Thursday, January 5, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৪৮ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
৪। পারেনদা জয়ে মীর জুমলার বিফলতা

মীর জুমলার পরামর্শে আওরঙ্গজেবের অগাধ বিশ্বাস এবং প্রতি কাজে তার ওপর নির্ভরতা থাকলেও দুজন বন্ধুর লক্ষ্যের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আশা, উদ্বেগ, পরিকল্পনা এবং নড়বড়ে চিন্তায়পূর্ণ এই মাসগুলিতে আওরঙ্গজেব কিন্তু পারেনদা দখলকর্ম, তার দিল্লির সিংহাসনের দিকে লক্ষ্যচ্যুতি এবং বড় পরিকল্পনাটা রূপায়নে তার আশা ধ্বংস করুক সেটা চান নি। অন্যদিকে মীর জুমলা অন্যান্য ঝামেলা, অসুবিধে ঝেড়ে ফেলে পারেনদা দখলকেই তার পাখির চোখ করে এগিয়েছেন। তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল পারেনদার কিলাদারকে তার পক্ষে নিয়ে আসা। ১৪ নভেম্বরের মীর জুমলার এই প্রস্তাবে আওরঙ্গজেব কিলাদারকে ১৭ নভেম্বর একটি নিশান লিখে পাঠান, যাতে বলা ছিল যে মীর জুমলার হাতে কোন দেরি না করেই যেন তিনি কেল্লার চাবি তুলে দেন। বিদর ছাড়ার আগেই প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষ মীরজুমলাকে আওরঙ্গজেব লিখে পাঠালেন, যে কোন উপায়ে কিলাদারকে জিতে নিন। মীর জুমলার প্রস্তাবে তিনি বীজাপুরের মুঘল হাজিব মহম্মদ আমনকে একটি নিশান পাঠান এবং একই সঙ্গে মীর জুমলাকে বলেন তিনি কি চান, সেটা বীজাপুরী প্রধানমন্ত্রী ইখলাস খানকে লিখুন।

কিন্তু সোনার চাবির নীতি সফল হল না। মীর জুমলা বাধ্য হয়ে বল প্রয়োগ করলেন। মহম্মদ সুলতানকে বুরহানপুরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কন্ডেম করে তিনি আওরঙ্গজেবকে বললেন পাথরি থেকে সেনা পারেনদায় পাঠাতে এই আশায় যে বড় শক্তি দেখলে বীজাপুরীরা পিছু হঠতে পারে। কিন্তু আওরঙ্গজেব পালটা প্রশ্ন করলেন সেনা কোথায়? কিছু শাহজাদার সঙ্গে যাবে, আর কিছু আমার সঙ্গে?অবশ্যি যারা এখানে রয়েছে তারা আমার সঙ্গে থাকবে কিনা ঠিক হয় নি, সেটা ঠিক হবে নির্দেশ আসার পরে।মহম্মদ সুলতানের নেতৃত্বে খুব কম পরিমান সেনা তোমার দিকে যাওয়ার প্রস্তাব আমার পছন্দ নয়। আর যারা হিন্দুস্তান যেতে চায়, তাদের ইচ্ছেতেও যদি আমি বাধ সাধি, তাহলেও কি এই ক’টিমাত্র সেনা নিয়ে তোমার ইচ্ছে পূর্ণ করা সম্ভব? তেমন বড় বাহিনী না নিয়ে মহম্মদ সুলতানের পক্ষে তোমার কাছে যাওয়া কতটা সঠিক হবে? যা আছে তা নিয়ে তোমার কাছে গিয়ে কি কোন কাজ হবে? দ্বিতীয়ত, আওরঙ্গজেব মনে করতেন দারা ক্ষমতায় আসায় যে রাজনৈতিক পরিবেশ তার বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তাতে বীজাপুরে সেনা মোতায়েন করা কাজের কাজ হবে না। আওরঙ্গজেবের বা মীর জুমলার কোন প্রস্তাবেই সম্রাট কান দেবেন না। গুজরাটের সুবাদারের পদচ্যুতি ঘটেছে। মালওয়ায় শায়েস্তা খানের বদলি অবশ্যম্ভাবী। ফলে আওরঙ্গজেবের একটাই দাওয়াই বিন্দুমাত্র দেরি না করে সিংহাসনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা তৈরি করা। তার দাবি যে তার ধারণাটিই ঠিক।

মীর জুমলার প্রস্তাবটাকে দারুণ পরিকল্পনারূপে বর্ণনা করলেও তার ভাবনাটা আওরঙ্গজেবের এক্কেবারেই পছন্দ হয় নি। কিন্তু তাঁকে সান্ত্বনা দিতে ৪ নভেম্বর এধার ওধার থেকে কয়েকজন সৈন্য খাড়া করে মহম্মদ সুলতানকে পারেনদার দিকে পাঠান, এবং ছেলেকে মীর জুমলার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করতে বলে দেন, কেননা, সেটি তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য একান্তই প্রয়োজনীয়। তিনি মীর জুমলাকেও তার পুত্রকে পথ দেখাতে অনুরোধ করলেন।

সম্ভবতঃ ঠিক সময়ে তিনি যে পারেনদা দখল করতে পারেন নি, সে বিষয়ে দিল্লি তার প্রতি অসন্তুষ্ট, এমন একটি ধারণা মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে লিখে পাঠিয়েছিলেন, যার উত্তরে আওরঙ্গজেব তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন বীজাপুরীদের এ বিষয়ে কি মনোভাব এবং কিলাদারের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রেক্ষিতের বিষয়টা হয়ত সম্রাট জানেন। দিল্লিতে আধিকারিককে ডেকে পাঠানোর কল্পনায় জল ঢেলে আওরঙ্গজেন লিখলেন, নবাব! তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। দিল্লির ফরমানে যখন অভিজাতরা রাজধানীর দিকে রওনা হয়ে গিয়েছে, তার ফল কি ঘটবে তুমি জান। তারা (বীজাপুরীরা) সর্বশক্তিমানের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করছে যাতে এই ধরণের ঘটনা আরও ঘটে; কিন্তু বার বার আমি তোমায় বলছি, এ সব বিষয়ে মন দিও না আমি সেনা পাঠাচ্ছি যাতে তোমার এত দিনের কাজ নষ্ট না হয়ে যায়, আমি সময় নেব না। এবারে আওরঙ্গজেবের আশা জাগল, মীর জুমলা সব কিছু ছেড়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।

বলপ্রয়োগ করার মীর জুমলার নীতি বিফল হল। মুহম্মদ সুলতানের পৌঁছবার এক সপ্তাহের মধ্যে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে লেখা এক চিঠিতে(৯ নভেম্বর) তার নীতির ব্যর্থতা স্বীকার করলেন। কাজি নিজামা তখনও বীজাপুরীদের থেকে ক্ষতিপূরণ সংগ্রহ করতে পারেন নি, কেননা তারা তাদের সঙ্গে দারাকে পেয়ে গিয়েছে। সান্ত্বনা দিয়ে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে লিখলেন, বিজাপুরী এবং দিল্লির সিংহাসন দুটোরই কি নীতি হতে পারে তা জানাও, কেননা সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর গুপ্ত তথ্য, স্থানীয় বাহিনীগুলির যাতায়াত, রাজস্বের অবস্থা, শত্রুপক্ষকে আক্রমণের তথ্য, সময়, অবস্থা সব কিছুই তোমার নখদর্পণে রয়েছে।
৫। বীজাপুরীদের সঙ্গে সমঝোতা করে মীর জুমলার পারেনদা ত্যাগ
কয়েক মাসের উদ্বেগ, সুশ্চিন্তা, বিফল শ্রম সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব দিল্লি, গুজরাট এবং বাঙলার সমস্ত ঘটনা এবং তার নিজস্ব প্রস্তুতির খবর মীর জুমলাকে জানিয়ে গিয়েছেন নিয়মিতভাবে যতে তিনি দ্বিধাহীনভাবে তাঁকে এসব বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে যেতে পারেন। সম্ভবত তিনি আওরঙ্গজেবকে মুরাদ, সুজা বিষয়ে তাঁকে তার ভাবনা বলেছেন, যদিও কি বলেছেন তা এখন আর জানা যায় না।

দাক্ষিণাত্য থেকে অভিজাতদের দিল্লিতে ডেকে নেওয়া, সম্রাট যে দিল্লিতে ঘটে চলা সমস্ত ঘটনা বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারছেন না এবং সে দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে দারা ক্ষমতায় আরোহণ করেছে এই সংবাদ প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আওরঙ্গজেব নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে পারেনদায় বলপ্রয়োগ করেও মীর জুমলা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন না। স্বাভাবিকভাবেই আওরঙ্গজেব কিভাবে দিল্লির রাজসিংহাসন দখল করবেন সে পরিকল্পনা ছকতে এবং সেটি বাস্তবায়নের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এই কাজ যে মীর জুমলাকে সঙ্গে না পেলে কঠিন হয়ে যাবে সেটা তিনি জানতেন। কিন্তু মীর জুমলা মাথা উঁচু করেই পারেনদা ছাড়বেন সেটাও আওরঙ্গজেবের কাছে স্পষ্ট ছিল। তিনি এবারে পারেনদা সমস্যা সমাধান করতে মীর জুমলার পাশে দাঁড়াবার সিদ্ধান্ত নিলেন। যদি পারেনদা সহজে জয় না করা যায়, তাহলে তাহলে অন্তত অবস্থা যা রয়েছে তার থেকে খারাপ হতে দেওয়া যাবে না, অথচ বাস্তবটা অনুধাবন করাও খুব জরুরি, পিছিয়ে আসার সময় মীর জুমলার মাথা উঁচু করে পিছোনোও দরকার। তাই মীর জুমলার প্রাথমিক কাজ হল আওরঙ্গজেবের উত্তরের দিকে রওনা হওয়ার সময় যেন দুই সুলতান দাক্ষিণাত্য জুড়ে কোন বিপদ সৃষ্টি না করেন তা নিশ্চয় করা। ১৬৫৭র অক্টোবরের শেষের দিকে আওরঙ্গজেব এই প্রসঙ্গে লিখলেন দাক্ষিণাত্যে বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করতে দুই সুলতানকে পাশে পাওয়া আর শান্ত রাখা জরুরি। আওরঙ্গজেব আদিল শাহকে চিঠি লিখে বীজাপুর অভিযানের সমস্ত দায় চাপিয়ে দিলেন মীর জুমলার ওপরে, তার শয়তানি প্ররোচনায় আমি বীজাপুর আর গোলকুণ্ডা অভিযান করেছি। তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করে বললেন, পারেনদা দুর্গ এবং তার আশেপাশের জায়গাগুলি, কোঙ্কণ এবং ওয়াঙ্গির মহাল যেগুলি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করে নেওয়া হয়েছিল, এবং তার সঙ্গে কিছু দুর্গ এবং মহাল যেগুলি মীর জুমলার অংশ হিসেবে খালসাইসরকারের অন্তর্ভূক্ত করে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলি বাদে গোটা কর্ণাটক তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হল।

আওরঙ্গজেব বীজাপুর সমস্যা সমাধানের একমাত্র অনুঘটক হতে পারেন মীর জুমলা বুঝেই তাঁকে এই সমস্যা সমাধানের জন্য এগোতে বললেন। তিনি মীর জুমলাকে লিখলেন, সার্বিকভাবে, পেশকাশ সংগ্রহের আর দেশ জয়ের ভাবনা ছেড়ে দাও। শুধু দেখ তারা যেন তোমার দেখানো ভালবাসাকে আঘাত করতে না পারে, তাহলেই আমরা এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে পারব। তোমার প্রস্তাব এবং প্রতিশ্রুতিতে প্রভাবিত হয়ে হয়ত বীজাপুরীরা খুব একটা ঝামেলা পাকাবে না। তাহলেই নতুন সেনাবাহিনী তৈরি করা যাবে। জোর করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে, তার সময়ও এখন নেই। এই রকম চরম অবস্থায় তোমায় বন্ধুত্বের মুখোশ পরা খুব জরুরি। দেখ বেশি সময় না নিয়ে কত দূর এগোন যায়।

আওরঙ্গজেব যে কর্মপদ্ধতি মীর জুমলাকে বাতালেন সেটি আদতে প্রচ্ছন্ন হুমকি আর কূটনৈতিক সান্ত্বনার কুশলী মিশেল। মীর জুমলা শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের আর আওরঙ্গজেবের আবির্ভাবের খবর ছাপিয়ে দিলেন, যাতে বীজাপুরীদের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করা যায়। মুঘল-পন্থী শান্তিবাদী বীজাপুরী প্রধানমন্ত্রী ইখলাস খানের মন জেতার জন্য সমস্ত কূটনৈতিক দাঁওপ্যাঁচ প্রয়োগ করেদিলেন। তাঁকে বীজাপুরীদের বোঝাতে বলা হল যে যুদ্ধটা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটি ঘটেছিল সম্রাটের ফরমানে। এখন যেহেতু তিনি রাষ্ট্রের ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন, ফলে সেই যুদ্ধের আর কোন প্রয়োজন নেই। ইখলাস খান এবং মীর জুমলা, আওরঙ্গজেবের সঙ্গে অনাগ্রাসন চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি করছেন। মীর জুমলা ক্ষতিপূরণ আর এলাকা দখলের দাবি থেকে সরে আসবেন ঠিকই কিন্তু একই সঙ্গে বীজাপুরকেও চুক্তির মান রাখতে হবে এবং বিদর, কল্যাণী এবং তার সঙ্গে জোড়া অন্যান্য এলাকার দাবি ছাড়তে হবে আর মুঘলদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করা যাবে না। মীরকে এমনভাবে বিষয়টা বোঝাতে হবে যাতে বীজাপুরীদের মনে হয় তারাই এই ঘটনায় সব থেকে বেশি লাভবান হচ্ছে।

কিন্তু এই পরিকল্পনাও সফল হল না, মুঘল বিরোধী, মুল্লা আহমদ নাটিয়ার প্ররোচনায় খুন হয়ে গেলেন ইখলাস খান ১১ নভেম্বর। ফলে নীতির ঘোমটা সরিয়ে এখন মীর জুমলাকে উদ্ভুত পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা ছকতে হল। তার হাতে এখন নাটিয়াকে পাশে টানা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। আওরঙ্গজেবকে এই প্রস্তাব দিয়ে চিঠি লিখলেন এবং সঙ্গে তাঁকে লেখা নাটিয়ার একটি চিঠিও জুড়ে দিলেন। সতর্ক ভাষায় আওরঙ্গজেব মীর জুমলার এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানাতে বাধ্য হলেন।
(চলবে)
Post a Comment