Wednesday, January 11, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬২ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
পঞ্চম পর্ব

১। গঙ্গা পারের উদ্যম
পশ্চিম পাড় থেকে সুজার পালানো এবং মীর জুমলার রাজমহলের দখল করায় দিল্লির সিংহাসন দখলের লড়ায়ের বাঙলার পর্ব শেষ পর্যায়ে পৌঁছল। পশ্চিম পাড় শত্রু কবল মুক্ত করলেই গঙ্গা পার হওয়ার সম্রাটের নির্দেশ পালন করতে মীর জুমলা বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না। গঙ্গার ডান দিকের তীরটি শত্রুর হঠাত আক্রমণের থেকে বাঁচাতে তিনি উদ্যোগ নিলেন। ১০ জানুয়ারি দোগাছির আভিজাতদের সঙ্গে তিনি পরামর্শ সভা ডাকলেন। এছাড়াও বহুদিন ধরে শত্রুর আক্রমনে বন্ধ থাকা নদীর ধারের রাঙ্গামাটি থেকে তেলিয়াগড়ি হয়ে মুঙ্গের পর্যন্ত রাস্তা খুলে রাখার জন্য তিনি মহম্মদ মুরাদ বেগের অধীনে ৩০০০ পদাতিক এবং গোলান্দাজ বাহিনী নিযুক্ত করলেন। ১১ তারিখে রাজমহলে দাউদ খানের নৌকোয় গঙ্গা পেরোবার জন্য এগোলেন। রাস্তায় তিনি জানতে পারলেন সম্রাটের নির্দেশে দিলির খান(সঙ্গে ২৫০০ আফগান নিয়ে) আকবরপুরে থাকা দাউদ খানের মার্ফত মীর জুমলার নির্দেশ অনুযায়ী ৯ জানুয়ারি কদমতলা ফেরিতে গঙ্গা পেরিয়েছেন। রাজমহলের প্রশাসনের ভার দেওয়া হল ইসলাম খানকে। তাকে সাহায্যের জন্য কয়েকজন দক্ষ আধিকারিক নিয়োগ করা হল। আর দেওয়া হল ১০০০০ ঘোড়া। একজন করে ফৌজদার এবং কোতোয়ালও নিযুক্ত হল। নদীর পাড় জুড়ে পরিখা খোঁড়া হল এবং শত্রু যাতে অচকিতে আক্রমন না করতে পারে তার জন্য নিয়মিত খবর রাখার চেষ্টা হল। কর্মী এবং আধিকারিকদের চাকলা এবং পরগণায় পাঠানো হল। রাজমহলের থানেদার নিযুক্ত হল রসুল বেগ রোজবিহানী। দোগাছি এবং সুতির মধ্যে অনেকিগুলি থানা তৈরি হল। ৫০০০ সেনা নিয়ে ইসলাম খান দোগাছি পাহারায় রইলেন। দুনাপুরের দায়িত্ব দেওয়া হল আলি কুলি খানকে। রাঙ্গামাটি হয়ে রাজমহল এবং তেলয়াগড়ির মধ্যের বড় জাঙ্গালের নিরাপত্তা দায়িত্ব পেলেন রাজা কোকালত উজ্জয়নিয়া তেলয়াগড়ি এবং মুঙ্গের এলাকা রক্ষার দায়িত্ব পেলেন রাজা বাহারোজ।

খুব তাড়াতাড়ি এই ব্যবস্থাপনা করে মীর জুমলা, জুলফিকার খান, রাজা বাহারোজ, রাজা কোকলত এবং অন্যান্য অভিজাত নিয়ে ১১ জানুয়ারি রাজমহলের উত্তরাঞ্চল, পীরপাহাড়ে শিবির ফেললেন। পরে তিনি কদমতলা(বা দোধা)য় শিবির স্থাপন করেন। মীর জুমলা তার অভিযানের খরচ হিসেবে সৈয়দ নাসিরুদ্দিন খানকে পাঠিয়ে মুঙ্গের থেকে ১৭ লক্ষ টাকা আনানোর দায়িত্ব দিলেন। ১৬৬০ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি তিনি সমধায় ফিরে আসেন সাড়ে চৌদ্দ লক্ষ টাকা নিয়ে।

সুজার সমধা, চৌকি-মীরদাদপুর, তাণ্ডা এবং মালদায় শিবির ভাঙ্গার কাজের দিকে এবারে নজর দিলেন মীর জুমলা – এই পরিকল্পনাটি রূপায়ণ করতে তার লেগেছিল মোট আট মাস।

২। সমধায় মীর জুমলা
১৩ জানুয়ারি দাউদের পুত্র শেখ হামিদ ১৬০টি নৌকোর বহর দোধায়(কদমতলা) নিয়ে এল। এখানে গঙ্গা তিন ভাগে বিভক্ত হয়েছে। একটি ছোট ধারায় নৌকো সেতু বেয়ে মীর জুমলা পার হলেন ১৫ জানুয়ারি। এবারে সেই নৌকোগুলি রাজমহলের উল্টো দিকের বড় দুটি নদীতে নিয়ে এসে স্থাপন করা হল এমনভাবে যাতে বিপুল পরিমান সেনা ও রসদ নদী পার হয়ে চরে পৌঁছতে পারে। ১৭ জানুয়ারি মীর জুমলা নিজে চরে পৌঁছলেন দ্বিতীয় বড় নদীটি পেরিয়ে।

মীর জুমলার দ্রুত পদচারণ সুজার পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল। তিনি প্রস্তাব দিলেন মহম্মদ সুলতানকে কামান এবং নৌকো দিয়ে মহানন্দায় দিলির এবং দাউদ খানের অভিযানে বাধা দান করতে। তিনি নিজের সব নৌকো ডাক দিলেন, শাহজাদার কাছে যেগুলি ছিল সেগুলিও চেয়ে পাঠালেন এবং চরেদের নিয়োগ করলেন সমধার নাবিকদের অপহরণ করতে।

সুজার এই পদক্ষেপ রুখতে মীর জুমলাও পরিকল্পনা ছকতে শুরু করেছেন। যথা শীঘ্র সম্ভব তৃতীয় নদীতে নৌকোর সেতু তৈরি করার উদ্যম নিলেন। সুজার চরেদের আটকানোর ব্যবস্থা করলেন। স্থানীয় মাঝিরা যাতে সুজার পক্ষে যোগ দিতে না পারে তার জন্য তিনি ১০০০ বাহিনীর একটি থানা তৈরি করলেন সমধায়। সমধায় যে দিন মীর জুমলা উপস্থিত, সেই দিন দুপুরেই আকবরপুর(নদীর উলতো দিক থেকে) থেকে দিলির দাউদ এবং রশিদকে ডাকিয়ে এনে বৈঠক হল।

মীর জুমলার সমস্যা যে শুধু সুজার থেকে কম নৌকো তাই নয়, তার বিশাল বাহিনীও এই হাওর, প্রচুর নালা, বিশাল জঙ্গুলে এলাকায় বোঝা হয়ে দাঁড়াল কেননা তারা যে খুব তাড়াতাড়ি চলতে পারছেনা সেটা তার কাছে পরিষ্কার। তিনি মন্তব্য করলেন, এই এলাকা খুবই খারাপ, এরা প্রত্যেক বাঁকে যেন একটা করে নালা গুঁজে রেখেছে।

খোলা মাঠে সাম্রাজ্যের বাহিনীকে তাদের বহরের জোরে পারবেন না বুঝে সুজা তাদের প্রতিরোধের রাস্তা নিলেন মহানন্দা এবং কালিন্দী ধরেই। মীর জুমলার সরাসরি তাণ্ডায় যাওয়া আটকাতে মহানন্দার শাখা কালিন্দিতে তিনি দুই সারি পরিখা খনন করলেন এবং সেটির দায়িত্ব দিলেন সৈয়দ তাজ এবং মিশকিকে। সমধার উল্টো দিকে চৌকি-মীরদাদপুরের ঘাটে মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে সুজা স্বয়ং রইলেন।

মীর জুমলাকে হুঁশিয়ার আর সাবধান হয়েই পদক্ষেপ করতে হবে। শত্রুপক্ষ সমধার মাত্র চার মাইল দূরে কালিন্দিতে ভারি কামান সাজিয়ে রেখেছে, ফলে তিনি তক্ষুণি সেখান ছেড়ে আরও পূর্বের দিকে এগোনো সমীচীন বোধ করলেন না। এটি ছেড়ে যাওয়ার অর্থই হল সমধার পতন এবং রাজমহলকে সরাসরি শত্রুর আক্রমনের নিশানায় নিয়ে আসা। তিনি যদিও তৃতীয় ধারাটি তাড়াতাড়ি পেরোতে চাইছিলেন, আগামী কয়েকদিন, অন্তত ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি তার সদরটি সমধায় রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এ ছাড়াও মীর জুমলার পক্ষে সুজাদের কাটা পরিখা এবং সৈয়দ তাজ এবং মিশকির তৈরি করা নিরাপত্তা ভেদ করা আত্মহত্যার সামিল হবে। প্রথমে তিনি কালিন্দি আর মহানন্দার মোহলায় কালিন্দি পার হওয়ার চেষ্টা করবেন এবং তার পরে অভিজ্ঞ দাউদ এবং দিলিরের পরামর্শ অনুযায়ী মহানন্দা পার হওয়ার চেষ্টা চালাবেন। কিন্তু তার কাজ থেকে শত্রুপক্ষের দৃষ্টি ঘোরাতে তিনি দুজন খানকে নির্দেশ দিলেন শত্রুর মুখোমুখি কোথাও একটা দেখিয়ে দেখিয়ে পরিখা কাটার অভিনয় করবেন।
(চলবে)
Post a Comment