Saturday, January 7, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৩ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
দ্বিতীয় খণ্ড
বিহারের যুদ্ধ

১। সুজাকে ধাওয়া করলেন মীর জুমলা
৫ জানুয়ারি যুদ্ধে হেরে রণক্লান্ত, বিধ্বস্ত, হতাশ, বিষণ্ণ সুজা বিহারের পানে পালিয়ে গেলেন, যেন তার রেকাবে পা নেই, হৃদয়ে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। সুজাকে নিঃশ্বাস ফেলার সময় না দিয়েই, মীর মহম্মদকে তার পিছনে লাগিয়ে দিলেন আউরঙ্গজেব। নিজে খাজওয়ায় আরও এক সপ্তাহ থেকে গেলেন।
মীর জুমলাও সম্রাটের সঙ্গে রইলেন। ১১ জানুয়ারি সম্রাট তাকে ৭ হাজারি মনসবদার রূপে(হফত হাজারি হফত হাজার সওয়ার)সম্মানিত করলেন এবং সঙ্গে আরও কিছু তার পছন্দের উপহারও দিলেন সাম্রাজ্য সেবার জন্য। খ্বয়াজা ফেরার পথে পরের দিন মীর জুমলা সম্রাটের সঙ্গে গঙ্গার দিকে ঘুরতে গেলেন। ১৪ জানুয়ারি দিল্লির পথে রওনা হওয়ার আগে, সম্রাট তাকে তার পলাতক ভাইয়ের খোঁজে এবং স্থানীয়দের হাত থেকে বিহার-বাঙলা উদ্ধারের দায়িত্ব দিলেন। সবথেকে বড় কথা, তার পুত্রের আতালিক(দিগদর্শক) হওয়ার অনুরোধ করলেন। তাত্ত্বিকভাবে মুঘল সেনাবাহিনীর রীতি অনুযায়ী মীর জুমলা এবং শাহজাদাকে মিলিয়ে একটা যৌথ কামান তৈরি হল, কিন্তু বাস্তবিকভাবে মীর জুমলাকেই গোটা সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের এবং বহাল আর বরখাস্ত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হল। মীর জুমলা নতমস্তকে এই গুরু দায়িত্ব নিজের মাথায় তুলে নিয়ে বললেন তিনি শত্রুর হাত থেকে সিংহাসন এবং রাজমুকুট বাঁচিয়ে তাকে সমুদ্রের জলে ফেলে দেবেন।

১৪ জানুয়ারির কিছু সময় পরে শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের বাহিনীকে জোরদার করতে চললেন্ম মীর জুমলা এবং তার যোগ দেওয়ার পরে সেই বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়াল ৩০ হাজার। আলমগীরনামা সূত্রে মীর জুমলার সঙ্গে থাকা ২৭ জন সেনানায়কের নাম পাচ্ছি ১। জুলফিকার খান(তাবরেজি), ২। ইসলাম খান(বাদাকশি), ৩। কুঁয়র রাম সিং, ৪। দাউদ খান(কুরেশি), ৫। ফিদায়ি খান(বাখরাজি), ৬। রাজা ইন্দ্রদুম্ন ধামধেরা, ৭। রাও ভাও সিং হাদা(রাও ছত্রশালের পুত্র), ৮। ইশ্তিশাম খান, ৯। ফতে জং খান(রুহেলা), ১০। রাও অমর সিং চন্দ্রাওয়াত, ১১। ইখলাস খান খোয়েসগি, ১২। খাওয়াস খান, ১৩। এক্ককাতজ খান(আসল নাম আবদুল্লা), ১৪। রশিদ খান (আনসারি), ১৫। লোদি খান, ১৬। সৈয়দ ফিরোজ খান বারহা, ১৭। সৈয়দ শের খান বারহা, ১৮। সৈয়দ মুজাফফির খান বারহা(খানইজাহান), ১৯। জবরদস্ত খান(রুহেলা) ২০। আলি কুলি খান, ২১। কিজিল্বাস খান, ২২। ইস্কন্দর রুহেলা, ২৩। কাকার খান, ২৪। দিলোয়ার খান, ২৫। নেকনাম খান, ২৬। নিয়াজি খান, ২৭। কাদিরদাদ আনসারি এবং অন্যান্য। তিনি মীর জুমলাকে নির্দেশ দিলেন দুর্ধর্ষ রোজবিহানী সেনা – রাসুল, মহম্মদ এবং চিরাগকে সঙ্গে নিতে। তাদের প্রত্যেকেই চরম অভিজ্ঞ, দৌড়বীর, এবং আত্মনিবেদনের মূর্ত প্রতীক। বাদশাহ বললেন আহমদ এবং মহম্মদ মুরাদও খুব সাহসী এবং দাঙ্গাকারী, তাদেও সঙ্গে নিতে।

২। খাজওয়া-পাটনা
পলাতক শাহজাদা খাজওয়া থেকে ৩০ মাইল গেলেন চার দিনে। এলাহাবাদে গঙ্গা পেরিয়ে ঝুসিতে শিবির ফেললেন। সাম্রাজ্যের সৈন্য বাহিনী এগিয়ে আসছে খবর পেয়ে একদা এলাহাবাদের দারার সেনানায়ক, পরে সুজার দিল্লি অভিযানের সঙ্গী তাহাওয়ার খান উপাধি ওয়ালা বারহার সৈয়দ, সৈয়দ কাশিম, আওরঙ্গজেবের সেনানায়ক বাহাদুর খানের হাতে নিজের খানইদৌরাণ দুর্গ সঁপে দিলেন ১২ জানুয়ারি। বেনারসের পাঁচ মাইল পূর্বের গঙ্গার তীর বাহাদুরপুরে পৌঁছে বেনারসের তার পূর্ব-শিবিরের জন্য কাটা পরিখা এবং সুরক্ষা দেওয়াল সারালেন, ঢালু যায়গায়(র্যা ম্পার্ট) চুনার থেকে আনা ৭টি কামান বসালেন এবং অন্যান্য দুর্গ থেকে আরও কামান আনার পরিকল্পনা করলেন। তাঁর অনুসরণকারীদের এখানেই জবাব দেওয়ার জন্য মনস্থির করলেন, আর যদি বিপদ ঘণ হয়ে আসে তাহলে গঙ্গায় নোঙ্গর করা ছিপ নৌকোর বহর নিয়ে পালানোর ব্যবস্থা করে রাখলেন।

অন্যদিকে রাস্তায় কোন দেরি না করেই মীর জুমলা এলাহাবাদের মহম্মদ সুলতানের সঙ্গে যোগ দিলেন। শাহজাদার কানে বেনারসে উঁচু স্থানে রাখা ৭টি কামানের সুজার প্রস্তুতির খবর পৌঁছল, কিন্তু এটাও জানাগেল বাহাদুরপুরে তার কাকা ভরা গঙ্গা নদী পার হতে পারেন নি নৌকোর অভাবের জন্য। মীর জুমলা শাহজাদাকে পরামর্শ দিলেন চুনারের দিকে এগোনোর। গঙ্গার ওপরের প্রবাহের দিকে এগিয়ে মীর জুমলার পরামর্শে শাহজাদা এলাহাবাদের হেঁটে হেঁটেই নদী পার হয়ে ৪ দিনের মাথায় খেরি এবং কুন্তিত হয়ে চুনার পৌঁছলেন। সাম্রাজ্যের নির্দেশে অযোধ্যার সুবাদার ফিদায়ি খান গোরখপুর থেকে গঙ্গার উত্তর পাড় ধরে পাটনার দিকে এগোতে শুরু করলেন। শাঁড়াশি আক্রমণের সম্ভাব্যতার আশংকায় সুজা হতাশ হয়ে বাহাদুরপুর থেকে পাটনার পানে রওনা হলেন; শহরে না ঢুকে শহরের বাইর তিনি জাফর খানএর বাগানে উপস্থিত হলেন ১০ ফেব্রুয়ারি ১৬৫৯। শাহজাদা বেনারসের খনন করা পরিখা ঘুরে দেখলেন, দুদিন বিশ্রাম নিয়ে মীর জুমলার পরামর্শে এবং পথ দর্শনে পাটনার দিকে চললেন।

৩। পাটিনা-মুঙ্গের
পুত্রের বিয়ে উপলক্ষ্যে সুজা পাটনার পূর্ব দিকের অঞ্চলে বহুদিন নষ্ট করলেও শীঘ্র পাটনার ২০ মাইল পশ্চিমে পৌঁছলেন মীর জুমলার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যের বাহিনী। সামনে বিশাল চওড়া উপত্যাকার নিরাপত্তাহীনতা, সুরক্ষার অভাবে চিন্তিত এবং আশংকিত হয়ে সুজা আরও পূর্বের দিকে সরে গিয়ে মুঙ্গেরে পৌঁছলেন ১৯ ফেব্রুয়ারি এবং তাকে ধাওয়া করা অগ্রগামী সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর জন্য প্রবল প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি হলেন(১৮ ফেব্রুয়ারি-৬ মার্চ)। শহরের নিরাপত্তা খুঁটিয়ে দেখে সেটির সুরক্ষা আরও জোরদার করলেন গঙ্গার তীর আর দক্ষিণের পাহাড়ের নিচের দুর্গের মাঝখানের পুরোনো নড়বড়ে দেওয়াল সারালেন, এবং শহর জুড়ে যে সব উঁচু এলাকা রয়েছে সেখানে আক্রমণাত্মক হাতিয়ার যেমন, কামানের সারি, হাতি-উটের সুভেল(?), হাউইওয়ালা, বন্দুকচি সাজিয়ে বসালেন। বিভিন্ন রণনৈতিক কোণে বিদেশি সেনানায়ক গোলান্দাজদের বসিয়ে পাহাড়ের তলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা(দামিনিকোহ)টি খড়গপুরের রাজা, রাজা বাহারোজের হাতে তুলে দিলেন।

সুজা পাটনা ছেড়ে যাওয়ার ৮ দিনের মাথায় ২২ ফেব্রুয়ারি পাটনায় পৌঁছে অপেক্ষারত ফিদায়ি খানের সেনার সঙ্গে যোগ দিলেন। আটদিন অবস্থান করে চলে যাওয়ার আগে, মীর জুমলা বিহারের সুবাদাররূপে নির্বাচন করলেন দাউদ খানকে। মুঙ্গেরের দিকে রওনা হয়ে যাওয়ার সময় খবর পেলেন জেকপুরায় বিরোধীপক্ষ জোরদার নিরাপত্তার চাদরে শহরটাকে মুড়ে ফেলেছে। মার্চের শুরুর দিকে মুঙ্গেরের পথে প্রচুর বাধা পেয়ে কি ধরণের রণনীতি অবলম্বন করা যায়, সে বিষয়ে শাহজাদা পরামর্শের জন্য মীর জুমলার দ্বারস্থ হলেন। সুজার ছিদ্রহীন নিরাপত্তায় আঘাত না করে মীর জুমলা ঠিক করলেন তার পিছনের সরবরাহের যে শিকলি সুজা তৈরি করেছেন সেটিকে যথা সম্ভব কেটে দেওয়ার। সোনাদানার উপঢৌকন আর হুমকি এবং ‘সঠিক’ পরামর্শে মোড়া চিঠি দিয়ে তিনি রাজা বাহারোজকে হাত করে খড়গপুর পাহাড়জুড়ে রাজমহলের কঠিন পথ চড়াইউতরাই ভরা ঘুরপথে পাহাড়ি হিংস্র জন্তু, পথ রোধ করা দ্রুম, পাহাড়ি সমাজভরা এলাকা, সে সময় যেটির নাম ছিল ‘বাড় জঙ্গল’, নিশানা লাগিয়ে সহজ করে নিলেন। মীর জুমলা শুধু শুধু মুখোমুখি লড়াই এবং অযথা শক্তি ক্ষয় না করে শুধুই পরিকল্পিত রণনীতির মাধ্যমে তার শত্রুর থেকে বহ পথ এগিয়ে গেলেন। জুলফিকার খানকে দিয়ে কাঠুরে লাগিয়ে তিনি পথের বাধা গাছগুলি কাটলেন। দ্রুমভরা পাহাড় পেরিয়ে শাহজাদাকে সঙ্গে নিয়ে এবারে মীর জুমলা মুঙ্গেরের সমতলে পৌছলেন।
(চলবে)
Post a Comment