Friday, January 6, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫১ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার
পঞ্চম খণ্ড

ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক(১৬৫৬-৫৮)

১। উজির পদে বৃত হওয়ার প্রভাব
মুঘল সাম্রাজ্যের কর্ম নিযুক্তির সঙ্গে কর্ণাটককে মীর জুমলার ব্যক্তিগত জায়গির হিসেবে দেওয়া হল। এই ঘটনা সরাসরি প্রভাব পড়ল তার সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্কে। পদটি পাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশদের সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং কিছুটা রাজনৈতিক সুসম্পর্ক এবং বন্ধুত্বের পরিবেশ বজায় রেখে চলছিলেন, এবং সেটা প্রকাশ্যেই। এখন আর তার পক্ষে থেকে ব্রিটিশদের সঙ্গে সেই সুসম্পর্ক রাখার বাধ্যবাধকতা রইল না। তবে দাক্ষিণাত্য থেকে তার বিদায়, রাজনৈতিক ভারসাম্যের অস্থিরতার ধরাণাটির ব্যপ্তি ঘটা, তার কর্মচারীদের ওপর আঞ্চলিক এবং ব্যবসায়িক কাজকর্মের রেশ ছেড়ে যাওয়া, তার সেনাবাহিনীর পরিমান কমা, তার আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা এবং কর্ণাটকের ওপর তার নিয়ন্ত্রণে জোরদার প্রশ্নচিহ্ন জুড়ে যাওয়ার ঘটনায় তার সঙ্গে(এবং তার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও)মাদ্রাজের ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের মধ্যে সম্পর্কের জোর অবনতি হয় এবং তার ফলে মাদ্রাজের কুঠিয়ালদের ব্যক্তিগত ব্যবসার পরিমান আগের তুলনায় যথেষ্ট বেড়ে যায়।

২। সেন্ট জর্জের কুঠিয়ালেরা মীর জুমলার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ আনলেন
তাদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় সেন্ট জর্জের কুঠিয়ালেরা অভিযোগ করেন যে সৈয়দ ইব্রাহিম আলির নিয়ন্ত্রণেই মীর জুমলার আধিকারিকেরা তাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে এবং তাদের ব্যবসা করতে বাধা দিচ্ছে। পুনামাল্লির প্রশাসক বালা রাউর সময়ে এই বিরোধ চরমে ওঠে।

ব্রিটশ কুঠির তথ্য সূত্রে আমরা জানতে পারছি যে, মীর জুমলার আধিকারিক বালা রাউ, দুর্গের ব্রিটিশদের হুমকি দিচ্ছিলেন এবং কুঠিয়ালদের সঙ্গে মাদ্রাজ প্রশাসনের সম্পর্ক যাতে বিগড়ে যায় সেই কাজে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। তিনি ব্রিটিশদের, মাদ্রাজ এবং তার পুনামাল্লির প্রশাসনে চাষ হওয়া গম ব্রিটিশদের কিনতে বাধ্য করেন। যখন কুঠিয়াল গ্রিনহিল মাদ্রাজের সঙ্গে পুনামাল্লিকে জুড়ে দেওয়ার প্রতিবাদ জানান, তিনি যখন মাদ্রাজ প্রশাসনের ভার তার এক কর্মচারীকে দিয়ে বলে যান যে, দুর্গে থাকা ব্রিটিশদের সঙ্গে যাতে মাদ্রাজ প্রশাসনের দূরত্ব বাড়ে সেইভাবে নীতি নির্ধারণ করতে। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মীর জুমলার কাছে প্রায়শই নানান অভিযোগ করতেন যাতে মীর জুমলার মন ব্রিটিশদের প্রতি বিগড়ে যায়। এছাড়াও কোম্পানির দৈনন্দিনের ব্যবসায়ও নানানভাবে মাথা গলাতেন। পুনামাল্লির দপ্তরকে ব্যবহার করে বালা রাউ মাদ্রাজের উতপাদন-বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করতেন যাতে ব্রিটিশরা খাদ্যের অভাব বোধ করে মীর জুমলার প্রতি অবনমিত হয়।

৩। মাদ্রাজের কুঠিয়ালদের সঙ্গে সম্পর্ক
ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা মীর জুমলা এবং মীর সৈয়দ আলির দপ্তরে অভিযোগ করে বলেন যে, কর্ণাটকের প্রশাসনের ভা্রপ্রাপ্ত আধিকারিকের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা বৃথা হয় এবং বালা রাউ ব্রিটিশদের অপমান করতে উঠে পড়ে লাগেন। বালা, মীর জুমলার এলাকার এবং এলাকার বাইরে থেকে ব্রিটিশ আধিকারিকদের কেনা ধান সম্পূর্ণভাবে দখল এবং তিরুভানাভাসিতে ব্রিটিশদের কেনা কাঁসার পণ্য(পেগুর ভাষায় গানজা) ওয়ারঙ্গলে নিয়ে যেতে বাধা দেন, যদিও তাদের কাছে মীর জুমলার দেওয়া ছাড়পত্র ছিল। ফলে ব্রিটিশদের প্রভূত ক্ষতি হয়। ক্ষতিপূরণে আর সম্মান উদ্ধারে সেন্ট জর্জের প্রধান কুঠিয়ালদের প্রধান গ্রিনহিল প্রত্যাঘাতের চিন্তাভাবনা করতে থাকেন। তারা আগস্ট ১৬৫৬ সালে নবাবের লোহিত সমুদ্রের(মোকা) দিকে যাওয়া জাহাজ এবং সেটির ৪টি কামান দখল নেয়। ব্রিটিশদের এই সুযোগটা এনে দেয় কর্ণাটকের হিন্দু বিদ্রোহ।

ব্রিটিশেরা জাহাজ দখল করে প্রশাসনের ওপর হুঁশিয়ারি ছুঁড়ে দেওয়ায় মীরের প্রশাসনের সঙ্গে ব্রিটিশদের স্থায়ী সংঘাত লেগেই গেল, তার প্রভাব এসে পড়ল প্রাথমিকভাবে পূর্ব উপকূলে এবং বাংলাতেও। তাদের ধারণা হয়েছিল, অলিখিত, প্রায় বেআইনি গায়েরজোয়ারি এই কাজের প্রেক্ষিতে মীর জুমলা ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্রিটিশদের স্বার্থবাহী একটা সমঝোতা সূত্র উপনীত করবেন। কিন্তু তাদের আশা দুরাশায় পরিণত হল। কড়া প্রশাসক মীর জুমলাকে এই ধরণের কড়া হুমকিতে এবং অপমানকর কাজে যে নোয়ানো যায় না, তা পরিষ্কার হয়ে যায় তার পরবর্তী পদক্ষেপে। যদিও তখন তিনি নিজের রাজনীতির ঝামেলা সামলানো নিয়ে খুব ব্যস্ত এবং তার প্রশাসকেরা হিন্দু বিদ্রোহ দমনে দিনরাত লেগে রয়েছেন, কিন্তু তিনি যে এই অপমান মেনে নেবেন না তা স্পষ্ট হয়ে যায়। তার সেনাবাহিনী মাদ্রাজ ঘেরাও এবং অত্যাচার করে মাদ্রাজের কুঠিয়ালদের ব্রিটিশদের এই ধরণের সুযোসন্ধানী নীতিকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে ফেলে দেন।

৪। মীর জুমলার প্রশাসকের পালটা জবাব
প্রাথমিকভাবে মীর জুমলার প্রশাসন মৌখিক আলাপ আলোচনা করে জাহাজ দখল সমস্যার সমাধান করতে চাইলেও ব্রিটিশফদের এক গুঁয়েমির জন্য সেই আলোচনা খুব বেশি এগোয় না। মীর সৈয়দ আলি মাদ্রাজ ঘেরাওয়ের নির্দেশ দিলেন। প্রাথমিকভাবে বালা রাউ মাদ্রাজে অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করতে মাদ্রাজের বাইরের পরিখা কামান দিয়ে ঘিরে তাদের পণ্য খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে দিলেন। এর পরে লিঙ্গম নায়েকের নেতৃত্বে মীর জুমলার বাহিনী হিন্দু বিদ্রোহের ফলে মাদ্রাজের দুর্গে আশ্রেয় নেওয়া কিছু নেতাকে(কোনেরি ছেত্রী এবং ভেঙ্গম রাজা) গ্রেফতার করতে সরাসরি মাদ্রাজ অবরোধ করে। মাদ্রাজের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, কুঠিগুলি, গুদামগুলির কাপড় পণ্য লুঠ করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত আহত হিন্দু বিদ্রোহীরা মাদ্রাজ থেকে পালাতে সক্ষম হয়। মীর জুমলার সেনা প্রত্যাহার করে নিলেও, এই আক্রমণের প্রভাবে পরপর দুবছর ব্রিটিশদের ব্যবসায় বড় ক্ষতি হয়।

৫। ডাচ এবং ব্রিটিশদের প্রতি মনোভাব
ব্রিটিশেরা যেমন মাদ্রাজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ঠিক তেমনি পুলিকটে ডাচেরাও সুরক্ষিত দুর্গে থেকেও তাদের ক্ষতি সামলাতে পারে নি। চন্দ্রগিরির রাজা তাদের সুরক্ষা কবচ ভেঙ্গে কুঠিগুলি লুঠ করে। ১৬৫০-৫৫ সাল পর্যন্ত মীর জুমলার সঙ্গে ডাচেদের বিরোধ সত্ত্বেও পুলিকটের হিন্দু বিদ্রোহের সময় কিন্তু তারা মীর জুমলাকেই সাহায্য করেছে। অন্যদিকে ১৬৫৫ সালের মাঝামাঝি ব্রিটিশদের সঙ্গে মীর জুমলার বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়ে যায়। কর্ণাটকের হিন্দু বিদ্রোহে তারা উদ্বিগ্ন হওয়ার থেকে সুখীই হয় এবং হয়ত কিছু হিন্দু রাজা, যারা তাদের হারানো জমি খুঁজে পেতে লড়াই করছিল, তাদেরকে ব্রিটিশেরা্ সমর্থনও জানায়। যদিও তারা প্রাক্তন শাসক চন্দ্রাগিরির রাজাকে কিছুটা হলেও সমর্থন করেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন নবাবের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চটাতে সাহস করেনি, বরং তারা সেই সম্ভাবনাকে সুচতুরভাবে এড়িয়েই চলছিল।

মীর জুমলার আধিকারিকদের সঙ্গে একপক্ষকাল দরকষাকষি চলার পর ঠিক হল যে তার দখল করা পণ্য ফেরত দেবে ব্রিটিশেরা, এমন কি জাহাজটাও ফেরত দেবে এবং অতীতের সমস্ত ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধে বজায় থাকবে। আলোচনা চলার সময় মাদ্রাজের সেন্ট ফোর্ট জর্জের কাউন্সিল আপতকালীন অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য মাদ্রাজের সুরক্ষা জোরদার করতে হাতে থাকা ব্রিটিশ সেনা, ভাড়া করা সেনা দিয়ে শহরের বাইরেটা টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করল।

৬। উজিরের পদ থেকে কর্মচ্যুতির পর গন্ডগোল
১৭৫৭য় উজি্রের পদ থেকে বহিষ্কারের পরেই ব্রিটিশদের সঙ্গে মীর জুমলার বাহিনী নতুন গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশেরা মোগল বিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া চন্দ্রাগিরির রাজাকে আস্তানা গড়ার সুযোগ দিয়েছে, এই অভিযোগে তিনি মাদ্রাজ আক্রমন করেন। পরের মাদ্রাজ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটে সেপ্টেম্বর ১৬৫৭-এপ্রিল ১৬৫৮ সালে মীর জুমলার সেনাপতি টুপাকি কৃষ্ণাপ্পা নায়েক এবং বালা রাউ, মীর সৈয়দের নির্দেশে। অভিযোগ ছিল ব্রিটিশেরা মীর জুমলার জাহাজগুলি সমুদ্রে যাওয়ার ছাড়পত্র দিচ্ছে না। কিন্তু মীর জুমলার মূল সাজোঁয়া বাহিনী যেহেতু আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে চলে যায়, সেগুলি ছাড়া এই আক্রমনে তারা ব্রিটিশদের খুব একটা ক্ষতি সাধন করতে পারে নি। এবং মাদ্রাজে যেহেতু সমুদ্র পথে খাবারদাবার আনা যায়, সেজন্যও এই অবরোধ খুব একটা ফলপ্রসূ হয় নি। নানান দিক চিন্তা করে, টুপাকি কৃষ্ণাপ্পা এবং আয়াপ্পা নায়েক(জাপা) বালা রাউকে অবরোধ তুলে নিতে নির্দেশ দেয়(১৯ এপ্রিল)। এবং যতক্ষণ না মীর জুমলা এসে পৌছচ্ছেন, ততক্ষণ সমস্ত বিরোধ মুলতুবি রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৬৫৮ সালে টুপাকি কৃষ্ণাপ্পা এবং কুঠিয়াল গ্রিনহিলের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, তাতে বলা হয় বার্ষিক ৩৮০ প্যাগেডার বিনিময়ে মাদ্রাজের রাজস্ব এবং শুল্কের ওপর সমস্ত দাবি প্রত্যাহার এবং মাদ্রাজ দুর্গ আর শহরের ওপর ব্রিটিশদের অধিকার মীর জুমলা স্বীকার করে নিচ্ছেন। এর পরে টুপাকি পুলিকট অভিযানে সেনানায়ক চিনাতাম্বি মুদালিয়ারকে পাঠান। ব্রিটিশ এবং ডাচেরা মীর জুমলার বাহিনীকে বিপুল পরিমান অর্থ প্রদান করে। ডাচেরা ১০ হাজার প্যাগোডা এবং ব্রিটিশেরা ২ হাজার প্যাগোডা এবং ১ হাজার প্যাগোডা দামের কাপড় উপহার দেয়। স্যান থোমের পর্তুগিজ কুঠিকে উজাড় করে দেয় মীর জুমলার বাহিনী।
(চলবে)

Post a Comment