Tuesday, January 10, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। দাউদ খানের পাটনা থেকে মালদার দিকে আগমন
সুজার ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয়টা বোঝা যাবে না যদি আমরা মে মাসে সম্রাটের নির্দেশবলে মীর জুমলার চিঠি পাওয়ার পর থেকে দাউদ খানের কর্মপদ্ধতিটি বুঝতে না পারি। মীর জুমলার চিঠি পাওয়ার পরে দাউদ তুরন্ত কাজ করতে শুরু করে দেন। তার সেনানায়ককে তিন মাসের অতিরিক্ত বেতন দিয়ে তিনি সম্রাটের কাজের জন্য নির্দিষ্ট বাহিনীর প্রধান করে দেন। এবং বিশাল সেনা বাহিনী তৈরি করেন। মেশি আর দ্বারভাঙ্গা থেকে দু জন পালোয়ান আর তাদের বাহিনী, অর্থ এবং সম্পদ চাইলেন, মানকালী পরিবার এবং ককর নেতাদের ডাকলেন। তিনি স্থানীয় মাঝিদের থেকে প্রচুর কিস্তি এবং ঘুরাব নৌকো কিনে নেন এবং প্রত্যেকটি নৌকোকে ১০টি গোলান্দাজ বাহিনী এবং গোলাবারুদ দিয়ে সাজিয়ে তোলেন।
এই প্রস্তুতি নিয়ে দাউদ তার ভাই শেখ মহম্মদ হায়াতকে তার অধীনে নিয়ে ১৩ মে পাটনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন ১৫০০ রিসালা(অশ্বারোহী), ২০০০ পদাতিক নিয়ে। গঙ্গা পেরোলেন নৌকোর সেতুতে এবং তার পরে ভরা বর্ষার সরযূ আর গণ্ডকে শত্রুর নানান বাধা পেরিয়ে ভাগলপুরের উল্টো দিকের গ্রাম কাজি-কেরিয়ায় উপস্থিত হন তিন মাস পরে। রোজবিহানীরা তখন ভাগলপুরে অপেক্ষা করছে, তাদের আনতে ৯০টি নৌকো পাঠালেন। সেখানে আগেই খাসা এবং ঘুরাব যুদ্ধ জাহাজের বিপুল নৌবহর নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সুজার সেনানায়ক খ্বোয়াজা মিশকি(ইতিবর খান)। তার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম দিনে যুদ্ধে শুধুই গোলাগুলি চলে, রাতে দাউদ ১০টি কামানে সাজানো নৌকো আর ১০টা সাঁজোয়া নৌকো নদীর সুরক্ষায় সাজিয়ে রাখতে নির্দেশ দিলেন। পরের দিন লড়াইয়ে খ্বোয়াজার হারের পর ১০ জুন মীর জুমলার রশিদ এবং রোজবিহানী সেনাবাহিনী এবং তার নেতৃত্ব চিরাগ দাউদের সঙ্গে দেখা করে সুলতান মহম্মদের পলায়নের খবর দেন এবং বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি যেন কাজি-কেরিয়া না ছাড়েন মীর জুমলার এই নির্দেশ পৌঁছে দেন। কোশি, কালিন্দি আর মহানন্দায় বিপুল বন্যার জন্য দাউদকে সেখানেই বসে থাকতে হল। দাউদের নির্দেশে তীর জুড়ে রশিদ নিজের বাহিনী নিয়ে বিপক্ষের গোলান্দাজির নিরাপত্তা বিধান করলেন। পরের দিন দাউদকে আক্রমণে সফল না হয়ে মিশকি ভাগলপুর ফিরে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে তিনি মীর জুমলার ফৌজদারকে গ্রেফতার করেন। পরে সুজার দল মীর জুমলার সেনানী আলি কুলির(শামসের) ভাইপোর ১০০ বাহিনীর হাতে হেরে যায়। আলি কুলি ফৌজদারকে ছাড়িয়ে আনেন, যুদ্ধের সঞ্জাম উদ্ধার এবং খরাজ আদায় করে।

ঠিক এই সময়ে ২২ আগস্ট সুজা রাজমহল দখল করেন। সেই উত্তেজনায় তিনি ফিদায়ি খানকে নির্দেশ দেন মুঙ্গেরে গিয়ে ভাগলপুর থেকে সুরাজগঞ্জের মধ্যের এলাকার সম্রাটের বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে নদীপথ, গ্রাম দখল করে নদী পারাপার নিজের সেনা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে। তাকে খ্বোয়াজা মিশিকির সঙ্গে যোগ দিয়ে দাউদকে আক্রমন করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়। দাউদ তখন ভাগলপুর আর কলগঙ্গের মাঝে একটা এলাকায় ছিলেন। আলি কুলির ভাস্তা শামসের বিপক্ষের ফিদায়ি খানের বিপুল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে সরাসরি যায় না, ভাগলপুর থেকে জাহাঙ্গিরা(সুলতানগঞ্জের কাছে)য় উপস্থিত হন। ভাগলপুর থেকে তাড়াতাড়ি দিয়ে শত্রুর ছেড়ে যাওয়া জাহাঙ্গিরা দখল করেন ফিদায়ি ইসমাইলের কবল থেকে, প্রচুর অর্থ এবং রসদ উদ্ধার করেন, প্রত্যেক গ্রামে তরফদার এবং রহদার নিয়োগ করে ফেরি নিয়ন্ত্রণ করে সুজার পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। যুদ্ধে ইসমাইল আহত হন এবং মুঙ্গেরে মারা যান।

দাউদ যতক্ষণ বেঁচে রয়েছেন এবং তার এলাকাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে আসতে পারছেন, ততক্ষণ সুজা নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন না। মুঙ্গেরের দুর্গ মহম্মদ হোসেন এবং তার পাঁচ সাথী নিরাপদে রেখেছিলেন। একজন মারা গিয়েছেন ইসমাইল; অন্য চার জন রাসুল, মির্জা, হাসান এবং শামসের তখনও রয়েছেন। তাকে মুঙ্গেরে দিকে না পাঠিয়ে সুজা নির্দেশ দিলেন সব ফেরি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলতে এবং দাউদের বিরুদ্ধে জলযুদ্ধ যুদ্ধ শুরু করতে। সেই যুদ্ধে জিতলে দাউদ ছাড়া চার ভাইকে হত্যার নির্দেশও দিয়ে তার বাহিনীকে মীর জুমলার সঙ্গে লড়ায়ের কাজে বাংলায় পাঠিয়ে দিতে। ফিদায়ের হাতে জাহাঙ্গিরা ছেড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় তিনি তাকে নির্দেশ দিয়ে গেলেন দাউদকে তার বহর দিয়ে ঘিরে ফেলতে।

দাউদের সঙ্গে দ্বিতীয়বারের যুদ্ধ শুরু হল। প্রথম দিনের যুদ্ধে গোলান্দাজির পর দ্বিতীয় দিনে খুব খারাপ টিপ করে সুজার বাহিনী গোলান্দাজি করতে থাকায় দাউদের খুব বেশি ক্ষতি হল না। দাউদের নিষেধ এবং বিপুল গোলান্দাজি সত্ত্বেও বিপক্ষের নৌকোগুলি ক্ষতি করতে নদীতেই প্রচুর ঘোড়া নামিয়ে দেয় রশিদ এবং চিরাগ। সুজার বাহিনী ক্রমে বন্যার প্রকোপে ৭০০ নৌকো নিয়ে জাহাঙ্গিরায় চলে যেতে বাধ্য হয়। এই সংবাদে সুজা হতাশ হয়ে মন্তব্য করলেন ভাগ্যলক্ষ্মী তার প্রতি অপ্রসন্ন হয়েছেন। জাহাঙ্গিরায় মিশকিকে রেখে, মাসুমবাজারে থাকা ফিদায়ি খানকে সুজা নির্দেশ দিলেন সেপ্টেম্বরে(?) মীর জুমলার দখলে থাকা রাজমহল আক্রমন করতে আসা দাউদের অভিযানে নৌকো নিয়ে বাধা সৃষ্টি করতে। এই সময়ে দাউদ আওরঙ্গজেবের থেকে খবর পেলেন মুঙ্গেরে গঙ্গা পার হয়ে দিল্লি থেকে অর্থ, অস্ত্রশস্ত্র এবং রসদ, ১০০০ উইঘুর এবং উজবেগ সেনা, আবু নাবির নেতৃত্বে ৫০ জন রোজবিহানী সেনা নিয়ে আসা ফারহাদ খান আসছেন, তার জন্য অপেক্ষা করতে – এবং সেই অর্থ থেকে সৈনিকদের তিন মাসের অগ্রিম এবং নৌকোয় দিল্লি থেকে আনা ৪০টি কামান বসিয়ে ফিদায়ি এবং মিশিকির প্রতিরোধ গুড়িয়ে দিতে। তারপর দাউদ খানকে মীর জুমলার সাহায্যে পাঠিয়ে তার নির্দেশ অনুসরণ করতে। দাউদ সম্রাটের এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানালেন, পাঁচ মাস ধরে যে নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধ চলছে, তার জন্য খান সেনাপতিদের কিছু পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রয়োজন। সম্রাট দাউদের এই অনুরোধ মান্য করে সঙ্গে সঙ্গে চিরাগের নেতৃত্বে রোজবিহানী বাহিনীকে পুরষ্কার দিতে নির্দেশ দিলেন এবং স্বয়ং দাউদের পদ মনসবদারি আরও ১০০০ বাড়ল।

কাজি কেরিয়ায় থেকে ডিসেম্বরের শুরুতে অর্ধেক বাহিনী এবং নিজেকে নৌবহরে চাপিয়ে, রশিদকে বাকি অর্ধেক সেনা নিয়ে শীঘ্র ঘোড়ায় চেপে মুঙ্গেরের দিকের গঙ্গার বাঁদিকের তীরে টহল দিতে বললেন, যদি শত্রুপক্ষ তাকে আক্রমন করে বসে। জাহাঙ্গিরায় মিশকি দাউদের অগ্রগমণ রোধ করলেন যতদূর সম্ভব পর্তুগিজ আর মেস্টিকোজদের নেতৃত্বে নিজের নৌবহর নিয়ে। মিশকির আক্রমণ চিরাগ বেগের বাহিনী রুখে দিলে, ৩ রাত ৩ দিনের চেষ্টায় দাউদ মুঙ্গেরের বাঁদিকের তীরে খুব কষ্টে উঠতে সক্ষম হন। দুর্গের হাবিলদার শত্রুর অগ্রগতি গোলান্দাজি এবং চিরাগের নেতৃত্বে ৪০টি নৌকো দিয়ে আটকে দেয়। সুজার বাহিনী ৪০টি কামান ও ১০০০০ রকেট হারিয়ে জাহাঙ্গিরায় পালিয়ে যায়। কিন্তু সেখানেও মুঙ্গের থেকে ঘোড়ায় দাউদ নিজে এবং ৭০০ নৌকোয় দুভাগে বিভক্ত আক্রমন শানিয়ে জাহাঙ্গিরা ছাড়া করেন। দাউদ সেখান থেকে মীর জুমলার বাহিনীকে সাহায্যের জন্য আবুন নবি, হাসান, মির্জা, শামসের এবং মহম্মদ রসুলকে পাঠান। তবে মিশকি মাঝেমধ্যেই দাউদকে আক্রমন করতে থাকে। এর মাঝে মীর জুমলা তাকে নির্দেশ দিলেন গঙ্গা পার হয়ে তাণ্ডায় অভিযান করে শত্রুর ধনসম্পদ দখল করে তার জন্য অপেক্ষা করতে। আর যদি তিনি বাঁদিকের তীর পার হন, তাহলে সুজাকে ধরার কাজ শুরু করতে। এর উত্তরে দাউদ বললেন এই কাজগুলি সম্পাদন করতে তার দেরি হয়ে যাবে। চিরাগের গোয়য়েন্দাদের হাতে খবর পেয়ে ভাগলপুরে সুজার সেনাপতির য়ুসুফ খানের শিবির লুঠের আক্রমন প্রতিহত করেন। মীর জুমলা দাউদের নেতৃত্ব, তার সফলতার প্রশংসা করলেন।

কলগঙ্গে যাবার দিনই দাউদের বাহিনীকে আক্রমন করে মিশকি ৭০০ নৌকো নিয়ে। কিন্তু প্রতিহত হয়ে পালানপুরে পালিয়ে যেতে হয়। তাণ্ডার দিকে যেতে গিয়ে গড়ি(তেলয়াগড়ি)তে দেখলেন রাজমহলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে সুজার সেনাপতি বারহার সৈয়দ তাজুদ্দিন, মিশকি এবং জামাল ঘোরি। সেই মুহূর্ত্তে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে তিনি বেলদারদের বললেন নদী থেকে একটা খাল কাটতে যাতে তার নৌকো নিয়ে তিনি তাদের কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। দুদিক থেকে শত্রুপক্ষ তাড়াতাড়ি এসে পড়লে দাউদের পুত্র হামিদ, কাদির এবং চিরাগের নেতৃত্বে কোশিতে যুদ্ধ শুরু হল। জামাল সেই যুদ্ধে মারা যায়। মিশকি পালিয়ে গিয়ে সমধে(রাজমহলের বিপরীতে) কামান নিয়ে নতুন করে বাধা সৃষ্টি করে। মুঘল, শেখ এবং পাঠানদের নিয়ে দাউদ কোশি পার হলে পুর্ণিয়ার এক ঘোড়সওয়ার তাকে খবর দেয় যে তার বক্সী ফাতাউল্লা ৫০০ জনের বাহিনী নিয়ে পুর্ণিয়ার সুজাপন্থী ফৌজদার থেকে ৩০০০০ দিরহাম, কামান সহ ২০টি কোষা নৌকো, হাতি সুইভেল এবং প্রচুর হাউই উদ্ধার করে সম্রাটের বাহিনীর সেবার জন্য উদ্দিষ্ট করেছেন। এই বিশাল পরিমান রসদ নিয়ে নদী পেরিয়ে দাউদ অপ্রতিহত গতিতে এগোতে থাকলেন। সিক্রিগলির পূর্ব দিকে আকবরপুরে দারাইসিয়া(কালিন্দি) পার হয়ে আরও এগোবার আগে নতুন রসদ আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন।
(চলবে)
Post a Comment