Wednesday, January 11, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৬৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। তাণ্ডার দিকে মীর জুমলার অভিযান
সুজার আশেপাশের ঘিরে থাকা পরাজয়ের জালটিকে আরও ঘণ করে সুজার ওপরে ফেলার চেষ্টা করে চললেন মীর জুমলা। প্রথমে মহানন্দা এবং পরে দক্ষিণের দিকের পালানোর পথটিতেও পাহারা বসিয়ে দিলেন। স্থানীর জমিদারদেরে থেকে খবর পেলেন যে বালাঘাটের কাছে নিচের অববাহিকায় হাঁটু জল থাকতে পারে এবং শত্রুর রসদ এই পথেই যায়। সেখানে গিয়ে মালদার পথ কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিলেও এই ঘটনা আঁচ করে সময় মত সুজার পুত্র বুলন্দ আখতার এবং সেনাপতি সৈয়দ আলম ডান পাড় পাহারা দেওয়ায়, সম্রাটের বাহিনীর সেই উদ্দেশ্য পূরণ হল না। মীর জুমলা সময় নিলেন। মালদায় সুজার বাহিনী তার সেখানকার বাহিনীর থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী বুঝে তিনি দিলির খানকে নির্দেশ দিলেন মালদার বাহিনীকে জোরদার করতে এবং তাকে তিনি মালদা-বালাঘাট এলাকার সমস্ত কাজের সেনানায়ক বানিয়ে দিলেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি শিবির ছেড়ে দিলির দক্ষিণের দিকে এগোলেন, রাস্তায় শীতলঘাটে সুজার সেনাপতি মির্জা বেগের বাহিনী হারিয়ে, মহানন্দায় সৈয়দ আলম এবং বুলন্দ আখতারের তীরের উল্টো দিকে ঘাঁটি গাড়লেন।

বাঁদিকের পাড়ের একটি অংশের সেনার হারের খবর সুজার কানে পৌঁছল। তখন তিনি কালিন্দির দক্ষিণ তীরে দাউদ খানের সেনার উল্টো দিকে জান বেগ আর ইবন হুসেনের ছোট বাহিনী নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন। পুত্র বুলন্দ আখতার আর খানইআলমকে মহানন্দার পূর্ব পাড়ের অংশটা জোর দিতে বলে সুজা সমধার উল্টো দিকে তার নিরাপত্তা জোরদার করলেন। তিনি জানেন এটি হাতছাড়া হওয়া মানেই তার বাহিনীর কচুকাটা হওয়া এবং তার সাম্রাজ্যের পতন।

ঈশপের গল্পের এক চক্ষু হরিণের মত তার সব কিছু সমধার পতনে নির্ধারিত হবে এই চিন্তায় সুজা বড় ভুলটি করে ফেললেন। সুজাকে ব্যস্ত রাখতে মীর জুমলা তার উল্টো দিকে কিছু সৈন্য দাঁড় করিয়ে রেখে মহানন্দার পূর্ব পাড়ের অংশটির প্রতি নজর দিলেন। হেঁটে নদী পার হওয়ার একটাই অসুবিধে ছিল তাকে ব্যক্তিগতভাবে সেই কাজটায় জড়িয়ে থাকতে হবে, না হলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। উত্তরের যুদ্ধ ক্ষেত্রে দাউদ খানকে সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে সমধায় সুজন সিংকে ১০০০ সেনা আর ৫০০০ বন্দুকবাজ দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে, মীর জুমলা চরটি ছাড়লেন ২৯ ফেব্রুয়ারি। পরের দিন মহানন্দা পার করে মালদার দিকে এগোতে থাকলেন(২ মার্চ)। ৬ তারিখ তিনি মালদার দক্ষিণে মহানন্দার কাছে পৌঁছলেন। পরের দিন তিনি উল্টো দিকে বুলন্দ আখতার এবং সৈয়দ কুলি উজবেগের বাহিনীর দিকে তাক করে পরিখায় কামান খাড়া করা দিলির খানের সাজসজ্জা পরিদর্শন করতে গেলেন।

মীর জুমলা ঢাকা থেকে শত্রুর কাছে পাঠানো রসদের রাস্তায় বাধা তৈরি করার উদ্যম নিলেন। সে অঞ্চল থেকে ঢাকার পথে যাওয়া তিনটি স্থলপথ। দুটি - একটি বালাঘাট হয়ে একটি মালদা হয়ে – নিয়ন্ত্রণ করছে সাম্রাজ্যবাদীরা। তৃতীয় পথটি শেরপুর হাজারাহাটির রাস্তাটি পাহারা দিতে লোদি খানকে নির্দেশ দিলেন।

সুজা আর মীর জুমলার মধ্যেকার দ্বৈত লড়াই এখন সময়ের অপেক্ষা। মীর জুমলা বিপক্ষকে ভুলপথে চালিত করার কাজ আগেও সফলভাবে করেছেন, এবারেও সেই নীতি অনুসরণ করলেন। উত্তরে সুজার বাহিনীর নজর টিকিয়ে রাখার জন্য মীর জুমলা কালিন্দির মধ্যে দিয়ে বলপ্রয়োগ করে সুজার পরিখা ভেদ করে দাউদ খানকে একটা পথ তৈরি করতে নির্দেশ দিলেন। এক মাসের জন্য সমস্ত সুযোগ সুবিধে এবং বিলাসিতা ছেড়ে তিনি মহম্মদাবাদের পড়ে রইলেন যাতে সুজার সঙ্গে যুদ্ধটা তিনি বর্ষার আগেই সেরে ফেলতে পারেন। কিন্তু যতটা সহজে কাজটা হবে ভেবেছিলেন, সুজার বাহিনী, পরিখায় দৃঢভাবে দাঁড়ানো সেনা, গোলান্দাজি, নদী আর নদীতে নৌবহরের জন্য মীর জুমলার কাজটা ততটাই কঠিন হয়ে উঠল।

দিলির খানের বহু চেষ্টা, বহু খোঁজাখুঁজি, বহু পাহারা না দেওয়া, বহুদিন না হাঁটা নদী পথ দেখে দেখে যখন ক্লান্ত, তখন স্থানীয় এক রাজার চেষ্টায় নদীতে একটা পায়ে হাঁটা পেরোবার পথ পাওয়া গেল বালাঘাটের ৪ মাইল নিচে। মীর জুমলা সঙ্গে সঙ্গে এই একমাত্র পথটি যাতে হাত ছাড়া না হয়, অবিলম্বে তার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন। প্রাথমিক সব প্রস্তুতি নেওয়ার পর শিবির ছেড়ে মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে ৫ এপ্রিল ভোর তিনটের সময় ১০-১২ হাজার পদাতিক নিয়ে বালাঘাট থেকে দিলির খানকে তুলে ভোরে নদী হাঁটতে নামলেন। সূর্য উঠতে অবাক হয়ে দেখলেন উল্টো দিকে একটা ছোট শত্রু শিবির কয়েকটি কামান তাদের দিকে তাক করে বসে রয়েছে।

এক মুহূর্ত দেরি না করে মীর জুমলা তার বাহিনীকে জলে নামতে নির্দেশ দিলেন। দিলির খান, ইখলাস, মুখলিস এবং মুজফফর সবার আগে নেমে তাদের হাতি জলে ভাসিয়ে দিলেন। তার পরে রিসালা জলে নামল। দুই তীরের দুই পাশে গভীর জল, কিছু সেনা তাড়াতাড়িতে আবার শত্রুর গোলান্দাজির ভয়ে নদীতে নেমে হাঁটা পথ হারিয়ে ফেলে ডুবে গেল, কিছু শত্রুর গোলান্দাজিতে মারা পড়ল - এই সবে বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে তার দূরের লক্ষ্যে মীর জুমলা অটল রইলেন। ১০০০ সেনা মারা গেল। ততক্ষণে সাম্রাজ্যের সেনা নদী পেরিয়ে বিপক্ষকে কচুকাটা করে ফেলেছে, কিছু তাদের সমস্ত রসদ ফেলে পালিয়ে গিয়েছে। মীর জুমলা দীর্ঘ লক্ষ্য পূরণে এই ক্ষতি খুব একটা গায়ে মাখলেন না। বহু পরে শাহজাদা বুলন্দ আখতার আর সৈয়দ আলমের বাহিনী এল, ততক্ষণে তাদের বিশাল বাহিনী স্থানীয়ভাবে নৌকো জোগাড় করে সেতু বানিয়ে নদী পার হয়েগিয়েছে।

সিংহাসন দখলের লড়াইতে এই পর্বের যুদ্ধটায় মীর জুমলা জেতার খেলা খেললেন। বুলন্দ আখতার তাণ্ডা ছেড়ে পালালেন, আর সৈয়দ আলম পালিয়ে দুপুরে চৌকি-মীরদদপুরে পৌঁছে সুজাকে এই দুঃসংবাদ দিলেন। দাউদের তীরের উল্টোদিকে দাঁড়ানো সুজার তিনপাশ তখন ঘিরে ফেলেছে মীর জুমলার বাহিনী। তার সামনে একটাই পথ নদী পথে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া। মির্জা জান বেগের পরামর্শে তিনি রাতে চৌকি-মীরদাদপুর ছেড়ে ভোর চারটেয় তাণ্ডা পৌঁছলেন ৬ এপ্রিল। সন্ধ্যে ৪টেয় কয়েকটি যুদ্ধ নৌকোয় চড়ে তিনি ঢাকার দিকে রওনা হয়ে গেলেন।

৫। তাণ্ডা-তারতিপুর-ঢাকা
সুজা পালিয়ে যাওয়ার, মীর জুমলা যথেষ্ট সময় পেলেন কেন না হাঁটু জলে নেমে তার বিশাল বাহিনী সামলাতে, নদীতে পড়ে যাওয়া নানান রদস এবং অস্ত্রশস্ত্র তোলার জন্য মাছ ধরার জাল ফেলতেই বহু সময় কাটিয়ে দিয়েছেন, ফলে তাণ্ডার দিকে তাড়াতাড়ি রওনা হতে পারেন নি।

৬ এপ্রিল যখন সুজা টাণ্ডার দিকে তখনও মীর জুমলা ব্যস্ত। সকালে তিনি তাণ্ডার দিকে রওনা হলেন। রাস্তায় তিনি কিছুটা বাঁয়ে তারতিপুরে গিয়ে সুজার গঙ্গার ওপর দিয়ে পালানোর পথ বন্ধ করতে গিয়ে রসদে বোঝাই ৪০০টি নৌবহর পেলেন। সেখানে তিনি ৬০০ বন্দুকবাজ সহ নুরুল হাসান আর মীর আজিরকে ওয়াকিয়ানবিশ হিসেবে রেখে এলেন। মধ্য রাত্রে ৪০০ সেনা বাহিনী নিয়ে তিনি তাণ্ডায় পৌঁছলেন।

মীর জুমলার পৌছন যেন ঘোলা জলে তেল পড়ার মত হল। কিছু ক্ষণের লুঠ খুন আর তাণ্ডবের পর, ৭ এপ্রিল তিনি সব কিছু নতুন করে সাজিয়ে তোলার নির্দেশ দিলেন। সরকারি সমস্ত সম্পদ, সম্পত্তি আর সেনা যে সব জিনিস লুটেছিল সেগুলি উদ্ধারে মন দিলেন। সুজা যে সব মহিলা হারেমের মহিলা ছেড়ে গিয়েছিল সেটির নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে আধিকারিক আর খোজাদের দায় দায়িত্ব পালন করতে বলা হল। এই সন্ধ্যায় দাউদ খান মীরদদপুর হয়ে তাণ্ডায় পৌঁছলেন।

মীর জুমলা তাণ্ডায় ১২ দিন ধরে থেকে সব কিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে শৃঙ্খলিত করলেন। জেতার এলাকায় প্রশাসন বসালেন। পলাতক শাহজাদার থেকে সম্পত্তি এবং ভাণ্ডার উদ্ধার করতে দক্ষিণ দিকে মীর জুমলা নদীর পাড়ে পাহারা বসালেন। তারা তারতিপুরে ধনরত্নভর্তি দুটি ঘুরাব দখল নিল। হাজারাহাটি আর শেরপুরে সুজার আধিকারিক সহ নৌবহরের ৩০টি নৌকো দখল নিল লোদি খান। তারা মীর জুমলার সামনে ৯ এপ্রিল আত্মসমর্পণ করল এবং সম্রাটের সেবায় কাজে লেগে গেল।

যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা আর দিলির খানের গুণবত্তা বর্ণনা দিয়ে দিয়ে মীর জুমলা সম্রাটকে চিঠি লিখলেন এবং আশা করলেন, সুজা হয়ত ঢাকায় না গিয়ে আরাকানের দিকে পালিয়ে যাবে। এছাড়াও যুদ্ধের সরঞ্জামগুলি তিনি দরবারে পাঠাবেন কি না সেই প্রশ্নও করলেন। ২০ এপ্রিল চিঠি পেয়ে সম্রাট খুব খুশি হলেন। তিনি সেনানায়ককে পুরষ্কৃত করে বললেন যাতে প্রত্যেক সেনাকে যথাযোগ্য বেতন দেওয়া হয়। রসদগুলি দরবারে পাঠিয়ে ঢাকায় গিয়ে সুজাকে তাড়িয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।

১৯ এপ্রিল মীর জুমলা তাণ্ডা থেকে তারতিপুরের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। ইসলাম খানের যায়গায় রাজমহলের ফৌজদার করে তিনি মুখলিস খানকে পাঠালেন। ইসলাম খানের সঙ্গে মীর জুমলার ঝগড়ার পর সম্রাটের অনুমতি না নিয়ে সে দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়।

২০ এপ্রিল ঢাকার উদ্দেশ্যে স্থলপথে বেরিয়ে তারতিপুর ছেড়ে মীর জুমলা হিজরাপুরে পৌঁছলেন। তার সঙ্গে ছিলেন দিলির খান, দাউদ খান, রশিদ খান, সৈয়দ নাসিরুদ্দিন খান, ফরহাদ খান, উইঘুর খান, কারাওয়াল খান, এবং আবদুল বারি আনসারি। ঢকা থেকে সুজাকে তাড়াতে তিনি দ্রুত ঢাকা চললেন। যেসব জমিদার সুজাকেকে ছেড়ে গিয়েছে তাদের শাস্তি দিতে সুজা এখন অপারগ, অথবা তার দিকে এগিয়ে আসা সেনাপতির সঙ্গেও লড়ায়ের সাধ্য না থাকায় তার পূর্ব দিকের রাজধানী ছেড়ে ৬ মে আরাকানের রাজার থেকে সাহায্যের আশায় ঢাকা ছেড়ে পালালেন। ঢাকার বাইরে মীর জুমলা পৌঁছলেন ৯ মে। সুজা যে সব যুদ্ধ রসদ ছেড়ে গিয়েছেন সেগুলি সম্রাটের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। এখন সমগ্র হিন্দুস্তান সম্রাটের আধীনে হল।
(চলবে)
Post a Comment