Tuesday, January 10, 2017

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৫৯ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। বেলঘাটা, গিরিয়ার যুদ্ধ
রাজমহল দখল করে উজ্জীবিত সুজা তার পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ভাবতে শুরু করলেন। তিনি কি রাজমহলের দিকে অভিযান করা দাউদ খানের বিরিদ্ধে অভিযান করবেন না দক্ষিণে মীর জুমলার বাহিনীর ওপর আক্রমন করবেন এই দ্বন্দ্বে পড়লেন। শাহজাদা মহম্মদ আজমের পরামর্শতে বর্ষার ঠিক পরে পরেই তিনি নিজে মীর জুমলা আর তার বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ায়ের ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নিলেন, কেননা মীর জুমলাকে হারাতে পারলেই দাউদ খানের অভিযান ব্যর্থ হবে। যদিও তিনি দাউদ খাননের অভিযানকে বিন্দুমাত্র তুচ্ছ করছেন না, তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী সামলানোর দায়িত্ব দিলেন ফিদায়ি খান এবং খ্বোয়াজা মিশকি(ইতাবর খান)কে। বর্ষা শেষ হতে না হতেই সুজা ৮০০০ বর্ম পরা সেনা নিয়ে খাসা এবং ঘুরাব নিয়ে রাজমহল থেকে দুনাপুর, দোগাছি এবং সুতি হয়ে বেলঘাটা পৌছঁলেন দুমাসের মধ্যে।

ইতোমধ্যে ছাউনিতে থাকা বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য উপযোগী করে ফেলেছেন মীর জুমলা। রথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জুলফিকার খান, ডানদিকে মুজফফর, বাঁয়ে ফিদায়ি(খান কোকা), গোলান্দাজ বাহিনী মহম্মদ মুরাদ বেগের নেতৃত্বে আর মহম্মদ আঘর(উইঘুর) হারনাওয়াল(?) হিসেবে ছিলেন। মাসুমবাজার থেকে ২০ মাইল দূরে বেলঘাটায় তিনি ভাগীরথীর তীরে ঢুকে যাওয়া একটি গভীর নালাকে পরিখা হিসেবে বেছে নিলেন। একটি বাহিনী মূল বাহিনীর কাছে, অন্য বাহিনীটি এক মাইল দূরে রেখে তিনি তাদের মাথা সুরক্ষা আচ্ছাদনে ঢাকলেন। একতাজ খান বাঁদিকের বাহিনীর হয়ে লড়ায়ের দায়িত্ব পেলেন। সেনাপতিদের পালিয়ে যাওয়া রুখতে হাতির বদলে তিনি ঘোড়া চড়তে নির্দেশ দিলেন। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে হাতি দিয়ে মাড়িয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে রাখলেন তিনি। মীর জুমলার বাহিনীর অগ্রগমনের সংবাদে সুজার বাহিনীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

নালা দিয়ে বিভক্ত দুই বাহিনীর মধ্যে প্রথমে গোলার লড়াই শুরু হল ৬ ডিসেম্বর দিনের দেড় পহর(প্রহর? তিন ঘন্টায় এক প্রহর আর যাম হিসেবে ছটায় সকাল ধরলে দুপুর এগারোটা নাগাদ শুরু হল লড়াই - অনুবাদক) থেকে। কয়েকদিন ধরে গোলা বিনিময় এবং খণ্ডযুদ্ধের পর মীর জুমলার বাহিনীকে টেনে আনতে রাজমহলের দিকে পিছু হঠার ভান করল। সেই সুযোগে মীর জুমলার বাহিনী সুজার ছেড়ে যাওয়া যায়গা দখল করে সুজার বাহিনীকে ঘিরে নেওয়ার চেষ্টা করলে সুজার সেনানী মহম্মদ সুলতান মাত্র ৪০০ বাহিনী নিয়ে সামনের দিক পাহারা দেওয়া একতাজ খানের বাহিনী ঘিরে নেয়(১৫ ডিসেম্বর)। মুখ্য পাহারাদার একতাজ, তার বাহিনীর সাহায্যের জন্য মীর জুমলাকে নতুন বাহিনী পাঠাবার অনুরোধ করলেন। মীর জুমলা জুলফিকারকে বললেন আঘার(উইঘুর) এবং রোজবিহানীদের ৭০০০ মেলানো মেশানো বাহিনী পাঠাতে। এবং যদি তারা জয় নিশ্চিত করতে পারে তাহলে যেন তারা শাহজাদার পিছন ধাওয়া করে। কিন্তু বিপক্ষের গোলাগুলিতে আহত একতাজকে সঙ্গে নিয়ে নালার সেতু পেরিয়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয় জুলফিকার।

মীর জুমলা নতুন করে দাবার ঘুঁটি সাজাতে বসলেন। সুজার তিনজন সেনানায়কের মধ্যে, এই বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করার অভিজ্ঞতা হয়েছে সামনে লড়াই দেওয়া শাহজাদার যিনি বাঁদিকের সেতু দখলের দিকে এগোচ্ছিলেন। মীর জুমলা পাশ এবং পিছন দিয়ে সুজার বাহিনীকে ঘেরার পরিকল্পনা করলেন স্বভাবসিদ্ধ রণনীতিতে। সামগ্রিক সেনা চালনার দায় জুলফিকার খানকে দিয়ে মীর জুমলা বাঁদিকের সেতু ধরে নালা পেরিয়ে ধীর গতিতে জঙ্গল, কাদা পেরিয়ে গিরিয়ার কাছে ভাগীরথীর তীরে সুজার সেনার পিছনে মীর ইসফানদিয়ার মামুরির বাহিনীর ওপর গোলান্দাজ বাহিনী, হাতি এবং উট হাউই(সুইভেল?) বাহিনী নিয়ে তীব্র আক্রমন শানালেন। মীর জুমলার আক্রমন এতই তীব্র হয়েছিল যে, শাহজাদাকে তার সেনার উদ্ধারে চলে আসতে হল এবং জিতলে হিন্দুস্তানের অর্ধেকটা তাকে উপহারও দেওয়া হবে এমন লোভ দেখালেন। জুলফিকারের বিপক্ষে লড়াইতে গোলাবারুদের দারোগা ইবন হুসেইনকে সামনে রেখে সুজা ছোট কিন্তু দক্ষ সেনা বাহিনী নিয়ে সর্বশক্তিমানের ওপর ভরসা রেখে তাকে বার বার বিপদে ফেলা বৃদ্ধ যোদ্ধা, মীর জুমলাকে শিক্ষা দিতে এলেন।

দিনের তিন পহর পার হয়ে গেলেও সুজা জোরদার যুদ্ধ করলেন। তার পিছনটি সুরক্ষিত একটি গ্রাম এবং সামনে কামানের সারি দিয়ে। মির্জা জান বেগ মীর জুমলার আক্রমণের সামনে পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থেকে কামান থেকে ১০ থেকে ১৫ সেরের গোলা ছুঁড়ছিলেন। তার পরিকল্পনা প্রায় বিফলে যেতে বসেছিল। কিছু সময় তিনি এগোতেও পারছিলেন না, পিছোতেও পারছিলেন না। আলমগিরনামায় বলা হয়েছে মীর জুমলার বাহিনীর সেনাপতিরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন না। তারা নিজেদের মত আক্রমন সাজাচ্ছিলেন বিচ্ছিন্নভাবে। ফলে কেন্দ্রিভূতভাবে একজন কারোর পক্ষেই নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল ছিল না।
দুই পক্ষই রণক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।মীর জুমলার গোলা শেষ হয়ে গেল এবং তিনি বিপুল বাহিনী নিয়ে একটি খাঁড়ির মধ্যে আটকে পড়লেও সুজা তার ওপরে খুব বেশি গোলা ছুঁড়ল না। সুজার ঐতিহাসিক বলছেন, তিনি যদি এই আক্রমনটা জোরদার করতে পারতেন, তাহলে হয়ত মীর জুমলার বাহিনীকে হারিয়েও দিতে পারতেন। কিন্তু এই যুক্তিটা খুব সাজানো মনে হল। শেষ দুটি লড়ায়ে একটি বাঁদিকের বাহিনীর ওপরে এবং গিরিয়ায় নিজের বাহিনীর পিছনের অংশে তিনি প্রাথমিক সাফল্য পেয়েছিলেন তার গোলান্দাজির জন্য। মীর্জা জানের বিপুল কামান বাহিনীর গোলার ভাণ্ডার শুন্য হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। ফলে গোলার সুরক্ষা না নিয়ে তিনি মীর জুমলার বিপুল বাহিনীর সঙ্গে হাতে হাতে যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে চান নি। অন্য দিকে গিরিয়ার যুদ্ধে মীর জুমলা পরিকল্পিত ভাবে আটকে পড়া বাহিনীকে উদ্ধারের কাজ করছিলেন ব্যক্তিগত তদারকিতে। এবং হয়ত তিনি বুঝতে পারেন নি যে সুজার বাহিনীর গোলা ফুরিয়ে গিয়েছে এবং রাতে সুজার গোলার প্রাবল্যের ধাক্কায় তার হতোদ্যম সেনাপতিদের নিয়ে তিনি হয়ত আর যুদ্ধ খুব একটা এগোতে পারতেন না।

তার পূর্ব রণনীতিতে পরিকল্পিত সময়ের পিছনে চলছিলেন মীর জুমলা। বর্ষার শেষে তিনি দাউদ খানকে বলেছেন(তখন মুঙ্গেরে) কোশি পেরিয়ে তাণ্ডার দিকে এগোতে। তিনি প্রত্যেকদিন আশা করছেন, দাউদ খানের বাহিনীর আসার খবর পেয়ে সুজা এই যুদ্ধ ছেড়ে তার শিবির বাঁচাতে কখন দৌড় লাগাবেন। এদিকে সম্রাটের পাঠানো দিলির খানের নেতৃত্বে গোলান্দাজ বাহিনীর অপেক্ষা করছিলেন তিনি, ফলে খালি হাতে লড়ে তার বাহিনীকে আর নষ্ট করতে চাইছিলেন না। ফালে তিনি তাড়াতাড়ি নালা পেরিয়ে মুর্শিদাবাদের দিকে চললেন।

মীর জুমলার পশ্চাদাপসরণ দেখে এবং নিজের পিছনে দাউদ খানের আক্রমণের কথা ভুলে গিয়ে সুজা মীর জুমলাকে মুর্শিদাবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যম নিলেন। ভাগীরথী পেরিয়ে মীর জুমলার সমান্তরালভাবে মুর্শিদাবাদের উত্তরে নসিপুর (নাসিরপুর) পেরিয়ে আবার নদীর ওপর পারে গিয়ে মীর জুমলার রসদের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চালালেন। বহুদিন ধরে দুইতীরে পরস্পরের মধ্যে গোলান্দাজির প্রতিযোগিতা চলল। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখের রাতে যখন সুজা ফেরি পের হচ্ছেন, সেই সময় খবর পেলেন কোশি পেরিয়ে তার সেনানায়ককে হারিয়ে দাউদ খান দ্রুত তাণ্ডার দিকে এগোচ্ছেন।
(চলবে)
Post a Comment