Thursday, August 23, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কানহাইয়াকুমারের হিন্দি - এক আধ-ওডিয়া-ভাষীর ব্যক্তিগত অনুভব - ভাষার প্রমিত-হিংসা রাজনীতির গল্প

এটা শুধু কঠোরতম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, চলতি প্রমিত ভাষা রাজনীতির চোখে না দেখতে পাওয়া হিংসার গল্প। কলকাতা, লক্ষনৌ, দিল্লির প্রমিত হিন্দি, ইংরেজি এবং বাংলাভাষী ভদ্রলোকেরা নিজেদের রাজনীতি আর মনস্তত্বের ভেতরে ঝুঁকে দেখুন। তারপরে কানহাইয়ার হিন্দি ভাষা নিয়ে সমালোচনা করবেন।
আমি আর আজ বাম রাজনীতি করিনা, কানহাইহা কি বলেন, না বলেন তার সত্য-মিথ্যে জানি না, বুঝি না। কানহাইয়ার হিন্দি বলাটা অনেকটা বুঝতে পারি। আজ কেন কানহাইয়া অঞ্জিকায় বলছে না, সেটা যাঁরা এই লেখার পাঠক, যারা প্রাথমিকভাবে প্রমিতভাষী, তাদের পক্ষে বোঝা মুশকিল।
এটাই আমাদের প্রমিতভাষার ঔপনিবেশিক হিংসার রাজনীতি, হিন্দি আর ইংরেজির চালনোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। যে সব মোটামুটি স্বচ্ছল ভদ্রবিত্ত বা তাদের সঙ্গের জুড়ে থাকা উন্নয়নশীল গ্রামীণ তার অঞ্চল ছেড়ে শহরে আসেন, প্রায় বাধ্য করা হয় সামাজিক ভাবে তার নিজের বোলি, উচ্চারণ ভুলে প্রমিত ভাষা গ্রহণের। আমি তার চলন্ত উদাহরণ।
---
আমি প্রাথমিকভাবে উপকূল মেদিনীপুরের মানুষ। জন্ম সেখানেই। বাবা-মা উভয়েই মেদিনীপুরী। প্রথম যৌবনে বাম রাজনীতির টানে বাবা কলকাতাবাসী। মা বিয়ের পরে। বাবা বড়িশা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মা নুরপুরের সুন্দরিকা গ্রামের মেয়েদের বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা। আমি থাকতাম মাদারমনি যেতে চাউলখোলার পাশের গ্রাম দক্ষিণ শীতলায় মামাবাড়িতে স্বাধীনতা সংগ্রামী দিদার দ্যাখাশোনায়।
তো আমি ছোটবেলা থেকেই কিছুটা মায়ের কাছে, কিছুটা দক্ষিণ শীতলায় দিদিমার কাছে পড়াশোনা করেছি। স্বচ্ছন্দে বাংলা মেশানো ওডিয়া টানেই কথা বলতাম। আমার সঙ্গে সক্কলেই বাংলাই বলত। আমি আমার লব্জটাকেই বাংলা বলে জানতাম। তখনও বোধ হয় নি ওটা প্রমিত বাংলা নয়।
পঞ্চম শ্রেণীতে আমায় কলকাতায় চলে আসতে হল - মা বদলি হয়ে বড়িশা উচ্চ বিদ্যালয়ে এলেন। ৭৭এর পরে মামা-বাবা কলকাতায় যেহেতু দুজনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন - এবং তখন আমাদের বিস্তৃত পরিবার - কাকা, জ্যাঠা ইত্যাদি ইত্যাদি - প্রায় ২০ জনের কাছাকাছি রোজ পাত পড়ে, আমিও থাকতে শুরু করলাম। তখনও আমার বাংলায় মেদিনীপুরী টান যথেষ্ট। মা আজও গড়গড়িয়ে মেদিনীপুরী বলেন।
মা-বাবা দুজনেই সিপিয়াই - সবে বামফ্রন্ট এসেছে - সিপিয়আই তখনও বামফ্রন্টে নেই - বিতর্ক শুরু হয়েছে বামফ্রন্টে যোগ দেওয়া হবে কি না। বাবা ছিলেন সক্রিয় কর্মী - ট্রাম কোম্পানির নেতা মহম্মদ ইসমাইলের নির্বাচনী এজেন্ট - ৭৭এর নির্বাচনে বহুদিন একটা সাদা এম্বাস্যাডার বাবার জন্য বরাদ্দ ছিল - আমরা চোখ ফেড়ে ফেড়ে দেখতাম বাবা অতি-সক্কালবেলা বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন আর মাঝরাতে ফিরতেন। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সাধারণ রুটিন ছিল বাবার এটা - শুধু গাড়িটা থাকত না। ৭৭এ নির্বাচনে সময় আমার পক্স, হাম টাইফয়েড পরপর তিন মাসে হল, একাহাতে ক্লাস করতে করতে মা আর জেঠু সামলালেন। তারপর আসতে আসতে জ্যাঠা, কাকারা চাকরি আর কাজে পুনর্বাসিত হয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। আমরা কয়েক বছরের মধ্যেই নিউক্লিয়ার পরিবার। আমি আর মা-বাব।
তো আমাদেরর বাড়িতে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা, গানের আসর, কবিতার আসর বসত - মারিচ সংবাদের সিয়া-সিয়া বাবার এক বন্ধু গাইতেন, জগন্নাথ তো তাঁর মুখস্থই ছিল প্রায়। বড়িশা বিদ্যালয়েরই শিক্ষক প্রাক্তন নকশাল নেতা আদিত্য মিত্র আর ব্রজসুন্দর দাসের নেতৃত্বে কলনায়ক নাটকের দল চলত - বাঘ নাটক চলছে - মেদিনীপুরী লব্জ ব্রজস্যর মার থেকে জেনে নিচ্ছেন। গানের স্কোয়াড ছিল - স্বাভাবিক ভাবে আমিও সদস্য ছিলাম। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম সব কিছুর প্রতিবাদেই অংশ নিচ্ছি, মিছিলে যাচ্ছি লাল পতাকা হাতে, নিয়মিত গান বা নাটকে অংশগ্রহণ করতাম কিন্তু কিন্তু ভাষার জন্য আমায় স্টেজে একা কিছুই করতে দিতেন না। পাঁচ শ্রেণীতে ঠিক নয় আট-নয় শ্রেণীতে, আমি তখন বেশ সচেতন, আমার মা-বাবা দুজনের বিদ্যালয়েররর শিক্ষক, শ্রেণীর বন্ধুরা আমায় মেদিনীপুর, কন্টাই ডাকত। এর অনেক আগে, মা যে গ্রামে শিক্ষিকা ছিলেন, কলাতলা হাটের এক কম্পাউন্ডার মায়ের শিক্ষিকা বন্ধুর বাবা, পালান জেঠু বলতেন উড়ে যায় মাটিতে পা। মন খারা হত - অন্য কাউকে এরকম কেন বলেন না তাঁরা? ইডেন গার্ডেনে বিশাল যুব উৎসব হল আমি দর্শক। একমাত্র পাটনায় এন্টিফ্যাসিস্ট কনফারেন্সে আমার অতীত না জানা অজিত পাণ্ডে আমায় স্টেজে উঠিয়েছিলেন।
সিপিয়াইএর কমরেডরা প্রমিত বাংলা বলতেন। আমাদের বাড়ি ছিল কমরেডদের ঘাঁটি। গ্রাম থেকে প্রচুর কমরেড আসতেন - থাকতেন - তারা কলকাতার প্রমিত কমরেডদের হাতে পরোক্ষে বেশ হ্যাটা হতেন, ভাষা, হাঁটা চলা, কাপড়চোপড়ের জন্যে - আজ বুঝি।এক এক জনের কথা হয়ত চেষ্টা করে মনেও করতে পারি। আমার ওডিয়া টান মা-বাবাকে বলতেন শুধরে দিতে। ওঁরা যেহেতু সক্রিয় রাজনীতি করতেন, আমায় খুব একটা সময় দিতে পারতেন না - আমি তো একা থাকতাম। অস্বস্তিতে পড়তেন। আমার বাংলার শুদ্ধতা আসতই না।
বাবার পরের প্রজন্মের এক দাদা, আমার ওডিয়া লব্জ শোধনএর দায় নিলেন। আমি অত ছোট বলে হয়ত তাদের সামগ্রিক আক্রমণের পাত্র হই নি।
সেই কয়েক বছরের মধ্যে দাদার 'যত্নে' আমার ওডিয়া লব্জ গেল, আর ফিরে আসে নি।
শুধু লব্জ গেল না, গ্রামে থাকার সময় মামার সঙ্গে শীতলামঙ্গলের দলে ঘুরেছি, বাসন্তী পুজোয় অংশ নিয়েছি, গ্রামে দেওয়া আমাদের জমিতে বার্ষিক পুজোয় দিদিমার সঙ্গে সঙ্গে ফল কেটেছি, মামার দলের শ্মশান মসান চোখ ফেড়ে দেখেছি, হরির লুঠে বাতাসা কুড়িয়েছি, বিড়ি খেয়ে ধরাপড়ে মার খেয়েছি, দিদার সঙ্গে সুর করে রামায়ন পড়েছি - সে সব গাঁইয়ামি পিছিয়েপড়ামি জলাঞ্জলি গেল রবীন্দ্রসঙ্গীত, গ্রুপ থিয়েটার, শহুরে সাহিত্য আর ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ারের প্রমিততার প্রাবল্যে।
সেগুলোর অনেক কিছুই হয়ত অনেক পরে ফিরে এসেছে আমার জীবনে বহু সংগ্রামী চেষ্টায়। বাম দল করা ছাড়তে হয়েছে, শহুরে জীবনযাত্রা বন্ধুবান্ধব ছাড়তে হয়েছে, যা যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছিলাম সব ভুলতে হয়েছে, গাঁইয়াদের পায়ের কাছে বসতে হয়েছে, হকার, কারিগর দল করতে হয়েছে। কিন্তু ভাষাকে আর ফেরত পাইনি আজও।
এই প্রমিত হিংসার রাজনীতি আধউড়ে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি; কানহাইয়াদের দিল্লিতে বসে রাজনীতি করা আর তাদের মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার রাজনীতি বুঝি।
আমার মত গাঁইয়াদের প্রমিত রাজনীতি শেখাতে আসবেন না।
বলে রেখে দিলাম।

No comments: