Friday, August 24, 2018

নকলনবিশ

উপমহাদেশে ছাপাখানা আসার আগে পুঁথি নকল করা বহু মানুষের জীবিকা ছিল। সব থেকে পুরোনো যে সাহিত্যে নকলনবিশদের নাম পাওইয়া যায় সেটা হল জাতক, লেখক নাম সেখানে উল্লিখিত হয়েছেঅর্থশাস্ত্রেও একই নাম পাচ্ছি। তারপরে অশোকের ১৪তম শিলালেখতে লিপিকার বা লিবিকার নাম পাচ্ছি। সিদ্দপুর লেখতে লেখ লেখক নিজেকে লিপিকার বলছেন। সাঁচী শিলালিপিতে দেখছি রাজলিপিকার পদ। এই পদটা পাণিনিতেও পাচ্ছি(৪খ্রীপূ)।
ফারসি দেবির অর্থাৎ লেখক পশ্চিমভারত আত্তীকৃত করে। বহু ৭-৮ শতকের পহলবি লেখতে দিবীরা বা দিবীরাপতি শব্দটা পাচ্ছি।
হিউএনসাং কাশ্মীরে গেলে সেখানকার রাজা ২০জন লিপিকার নিযুক্ত করেছিলেন, তার থেকে জ্ঞানার্জন করে পুঁথি তৈরি করতে। কাশ্মীরে লেখকদের দিবীরা নাম ১১ শতকের রাজতরঙ্গিনীতে পাচ্ছি আর ১২ শতকে ক্ষেমেন্দ্র লোকপ্রকাশে দিবীরাকে কয়েকটিভাগে ভাগ করেন গঞ্জ দিবীরা, গ্রাম দিবীরা, নগর দীবিরা, খাসা দিবীরা ইত্যাদি।
৮শতে উত্তর এবং পূর্ব ভারতে লেখকেরা কায়স্থ নামে পরিচিত হলেন। যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে এই শব্দটা প্রথম পাচ্ছি। লেখকদের অন্যান্য নামগুলিও করণ, করণিকা, করনিন, সাসনিকা এবং ধর্মলেখিন মাঝে মধ্যে ব্যবহৃত হত
সমাজে কায়স্থরা বেশ ভাল সম্মান অর্জন করতেন। চান্দেলা লেখতে বুঝতে পারি ১১ শতে তারা বেশ গুরুত্বপুর্ণ পদ হয়ে উঠছেনএই সময়ে চান্দেলা দেশে তারা কিরকম শক্তি হয়ে উঠছে তা নিচের লেখাতেই বোঝা যাবে – মোট ৩৫টা শহর; সত্যি বলতে কি লেখক জাতিরা সেই শহরগুলিতে বাস করেন(করণ-কর্ম-নিবসপুত) (এবং) তারা(অন্যান্য শহরেও) বেশ স্বচ্ছলভাবে বাস করেতাদের মধ্যে প্রখ্যাততম হলেন তক্ষরিক, যিনি অন্যদের কাছে ঈর্ষার পাত্র... (এবং) শহরগুলির (ছাত্রদের) ভিড়েতে বেদের শ্লোকের উচ্চারণ শোনা যায়, ...যে সব কায়স্থ বাস্তব্য পরিবারে জন্মেছেন তাদের সৌরভ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অন্ধকার দূর করছে।
গুজরাটের জৈন শ্রীসিদ্ধরাজা ছাত্রদের মধ্যে ১ লক্ষ ২৫ হাজার সিদ্ধহেম ব্যাকরণ বিতরণ করার জন্যে ৩০০ লিপিকার নিয়োগ করেছিলেন। প্রভাকর চরিত্র এবং কুমারপাল-প্রবন্ধে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে গরীব ছাত্রদের বিনামূল্যে পুস্তক সরবরাহের।
তুর্কি-আফগান সুলতান এবং অভিজাতরাও জ্ঞান, বিদ্যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময় বিপুল পরিমান পুথি লিখত, নকল এবং অনুদিত হয়েছে। তারা বিপুল পরিমান লেখক নিযুক্ত করতেন এবং বহু সময় দাসেদের শিক্ষিত করিয়ে রোমা্নদের মত নকলনবিশের কাজে নিযুক্ত করতেন।
বিপুল পরিমান কাগজের ব্যবহারের জন্যে মুঘল রাষ্ট্র কাগজনির্ভর রাষ্ট্র নামে পরিচিত ছিল। এই যুগে বিপুল পরিমান নকলনবিশ, করণিক এবং খবর লেখক বা ওয়াকিয়া নবিশ নিযুক্ত হন। কারকুনদের মাসে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হত।
প্রত্যেক গ্রামের গ্রাম প্রধান পাতিলের সঙ্গে একজন করে করণিক দেওয়া হত। এদের নাম কুলকার্ণি বা গ্রাম-লেখক। তাদের সম্মান পাতিলদের পরেই। গ্রামের রাজস্ব দিয়েই তাদের বেতন হত। এছাড়াও তেল থেকে কালি পর্যন্ত নানান দৈনন্দিনের দ্রব্য গ্রামীনেরা তাদের দিয়ে সাহায্য করতেন।
আসামের রাজারা তাদের প্রাসাদে গ্রন্থাগার রাখতেন। রাজার প্রধান গ্রন্থাগারের প্রধানের নাম হল গান্ধিন বড়ূয়া। সরকারির হিসেবে তার ব্যাপক সামাজিক সম্মান। তার পরের আধিকারিকের নাম হল লিক্ষকর বড়ুয়া – তিনি বিশাল সংখ্যক লেখক, করণিকের ব্যবস্থাপনা করতেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ছাপাখানা আসার আগে রাইটার বা করণিক নিযুক্ত করত। বাংলা, মাদ্রাজ এবং বম্বের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুধু আর্থিক লেনদেনের কাজগের পরিমান ছিল ১৩০০ বিশাল খণ্ড – এই কাজে বিপুল সংখ্যক দেশিয় করণিক নিযুক্ত হত। 

No comments: