Monday, May 16, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন৫ যদুনাথ সরকার

পঞ্চমত, মুঘল রাষ্ট্র চরম কেন্দ্রিভূত একনায়তন্ত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সম্রাট ছিলেন বিপুলাকৃতি প্রশাসনের একমাত্র চালিকাশক্তি। যে সরকার চূড়ান্ত একনায়কতন্ত্রী, যে সরকারে একজনের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত, যে সাম্রাজ্যের আয়তন বিশাল বড়, যেখানে বিভিন্ন প্রান্তের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব ধীর এবং অসুবিধেজনক, রাষ্ট্র যন্ত্রে বা রাজনীতিতে যেখানে বিন্দুমাত্র জনগনের অংশগ্রহন ছিল না, সেখানে বাস্তবিকভাবে বিপুল পরিমানে সরকারি নানান ফর্মান, নানান ধরণের লিখিত ব্যবস্থার পরিকাঠামো তৈরি করতে হয়েছে। ফলে মুঘল সরকার সামরিক প্রতিষ্ঠান তো ছিলই, তার সঙ্গে একে আমরা ‘কাগজি রাজ’ বলতে পারি (এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি দুনম্বর পরমএ অনুদিত প্রবন্ধে জেমস ডব্লিউ ফ্রে মুঘল সাম্রাজ্যকে সোভিয়েত এবং ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের বিপরীতে গিয়ে গানপাউডার সাম্রাজ্য না বলে কাগজি সাম্রাজ্য বলতে চেয়েছেন – কেননা সাফাভি অটোমান হ্যাপ্সবার্গ সাম্রাজ্যের মত বারুদ তৈরির পরিকাঠমোই ছিল না মুঘল সরকারের এছাড়াও বলছেন ইব্রাহিম লোদিকে হারাতে বাবরের কামানের গুরুত্ব অনেক বেশি দেখিয়েছেন ঐতিহাসিকেরা, কিন্তু সেই যুদ্ধস্মৃতিতে বাবর নিজে গুরুত্ব দিচ্ছেন রণকৌশলে, পদাতিক সৈন্য পরিচালনায়, কামানের ওপর নয়; এবং পাঁচ নম্বর পরম পত্রিকায় ব্রিটিশ পূর্ব শিক্ষা ব্যবস্থা সংখ্যায় হাইডেন বেলেনয় একটি প্রবন্ধে সাম্রাজ্যে কাগজের ব্যবহার আর মুঘল শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নানান গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল)। সরকারের প্রায় প্রত্যেকটি দপ্তর বিভিন্ন ধরণের খাতা বজায় রাখতে হত যেমন চিঠিপত্রের নকল, তস্য নকল, পদাধিকারীদের বর্ণনা, পদের বিশদ কাজকর্মের উদ্দেশ্য, আমলাদের কাজকর্মের খতিয়ান আর তার ইতিহাস, সংবাদপত্র(নিউজলেটার্স)তৈরি করা এবং পাঠানো এবং যে সব ডেসপাচ আসত তার বিশদ বিবরণ, হিসাবের দুই বা তিনটি নকল রাখা, সংক্ষিপ্ত এবং বিশদ বর্ণনা, বিভিন্ন পদের সেনা গোয়েন্দাদের খবর লিখে রাখা, আর দেশজোড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার বিশদ বিবরণ লিখে রাখতে হত।
অভিজ্ঞ ইঙ্গ-ভারতীয় প্রশাসক, ডবলিউ ক্রুকস নর্থ ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স বইতে আইনিআকবরির সমালোচনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, আকবর বিশদে তথ্য রাখার চরম করে গিয়েছেন(মাস্টার অব ডিটেইলস); কিন্তু এখানে (আইনিআকবরিতে)যেভাবে বিশদে তথ্য রাখা হয়েছে তা নথি করণের চরমতম পর্যায়... সমগ্র প্রশাসনের ধারণা ছিল কাজ ভাল হবে যদি বিশদে, জটিলতম পদ্ধতিতে তথ্য পঞ্জিকৃত করা যায়, এবং আমাদের সময়ের এই তথ্য ছেঁকে তোলার কাজের ভ্রমে আমাদের আমলারাও পড়েছিল।
আইন ও বিচার ব্যবস্থা
ষষ্ঠত আইন আর বিচার ব্যবস্থা সংক্রান্ত যে ধারণাগুলি ছিল তা আধুনিক ধারণার বিপরীত। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কাজ হল বিচার সুনিশ্চিত করা এবং সেই বিচারকে প্রয়োগ করা। এ বাবদে মুঘল প্রশাসন সব থেকে দুর্বল ছিল। যদিও বৈদেশিক আক্রমণ এবং দেশিয় বিদ্রোহ থেকে সে দেশকে বাঁচিয়েছে, এবং শহরে নিজের কর্মচারী দিয়ে জীবন এবং সম্পত্তির রক্ষা করত। কিন্তু বিশাল গ্রাম ভারতে সে বিষয়টা সে ছেড়েদিয়েছিল স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার ওপর; চৌকিদারেরা এই কাজ করত। চৌকিদার ছিল গ্রাম সমাজের কর্মচারী, তার ভরণ পোষণ করত গ্রাম সমাজ। এরা রাষ্ট্র দ্বারা পোষিত ছিল না। এদের জন্য গ্রাম সমাজ চাষের বরাদ্দ রাখত, বা জমি বরাদ্দ করত। মুঘল রাষ্ট্র এই ব্যবস্থায় অংশ নিত না। গ্রাম সমাজের অধিবাসীরা নিজেদের সম্পত্তি বা গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দিতেন। অবশ্যি ফৌজদার নামে সরকারি কর্মচারী ছিল, কিন্তু তার কাজের এবং এলাকার বিস্তৃতি এত বড় ছিল, যে তার অধীনে পড়া সমস্ত গ্রামের নিরাপত্তা বা অরক্ষা দেওয়ার কাজ দেখাশোনা করা অসম্ভব ছিল। তার দায় ছিল বড় বড় দাঙ্গা হাঙ্গামায় নজর রাখা – যেমন জমিদারদের বিদ্রোহ, ডাকাতি বা লুঠেরা বা বিশাল এলাকার ভূমি রাজস্ব বাকি পড়লে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
আর বিচার ব্যবস্থা বলতে, মুঘল সম্রাট নিজেকে চূড়ান্ত বিচারদাতা বলে মনে করতেন এবং পূর্ব দেশগুলির যে পরম্পরা, রাজা নিজে তার রাজসভায় বসে সমস্ত বিচার সম্পাদন করবেন – সেই রীতিনীতি অনুসরণ করতেন। সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।
(চলতে পারে)
Post a Comment