Saturday, May 14, 2016

শিক্ষিতদের নিরাসক্তি, মরিচঝাঁপি, বাংলাজোড়া গণহত্যা এবং আরও কিছু কথা

মূলতঃ বর্ণভেদ। কিন্তু এর সংগে রয়েছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বিভাজন, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যেভাবে অ-শি-ক্ষি-ত শব্দটা কেটে কেটে উচ্চারণ করে তা কিন্তু বোঝার। বাংলায় পলাশির পরে পুঁথিগত শিক্ষা আর জ্ঞানের পার্থক্য করতে পারলাম না আমরা শিক্ষিতরা। যে বিদ্যালয়ে যায় নি সে অবধারিত অশিক্ষিত, মুর্খ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত হয় আজও - এমনকি মার্ক্সীয় সাহিত্যেও - যার জন্য বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র, নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতির বাড়বাড়ন্ত হয় বাংলায় - নবজাগরণ আজও অবশ্য পাঠ্য। ঠিক সেই জন্য 'মনের মানুষ' উপন্যাসে সুনীল গাঙ্গুলি বুঝতে পারেন না কি করে অশিক্ষিত, বিদ্যালয়ে না যাওয়া লালন ফকির জ্ঞানের কথা আলোচনা করেন, সে জ্ঞানের কথা অনেক পরে তাঁর মত পশ্চিমের শিক্ষায় শিক্ষিতরা বলতে পেরেছেন। ফলে আমরা খুব উদ্বিগ্ন হই। যখন পাঠশালার সংখ্যা নিয়ে, পাঠশালায় বটু বা শিক্ষকের সংখ্যা নিয়ে নিজেরাও, নিজেদের লেখালিখিতে অ্যাডামের শিক্ষা সমীক্ষা ধরে বুক ঠুকে শিক্ষার হারের উচ্চসঙ্খ্যার দাবি করি, তখনও কি সেই শিক্ষিত-অশিক্ষিত যুক্তির ফাঁদে পা দিই না?
ঠিক সেই জন্য ছিয়াত্তরের পরের বিপুল সংখ্যায় মারা যাওয়া অশিক্ষিত মানুষের সব কটি গণহত্যা কাণ্ডের অনুসর্গ দাঁড়িয়ে যায় মন্বন্তর - এবং কয়েক শ কোটি ভারতীয়র গণহত্যা নিয়ে শিক্ষিত বাঙালির বিন্দুমাত্র খেদ হয় না - এবং রেলপথ পাতার চক্রান্তে কয়েক শ যে গণহত্যা ঘটিয়েছিল ব্রিটিশ, সে তথ্য উদ্ঘাটনের কাজ কিন্তু কোন বাঙালি করেন নি, করেছেন এক পাঞ্জাবি ভাটিয়া। বিয়াল্লিশের গণহত্যার পর ইংরেজের বিচার করার কথা ভুলে গিয়ে, শুরু হয় নুরেমবার্গ বিচার - একজন বাঙালি বিচারক হিসেবে যোগদেন সেখানে - আজও শিক্ষিত বাঙ্গালির গর্ব তিনি। কিন্তু তার কয়েক বছর আগে বাংলাজুড়ে লাখে লাখে হতভাগ্য মানুষগুলো খুন হলেন ব্রিটিশ আর তার শিক্ষিত বাঙালি দালালদের দাতে, তার দায়ভার ইংরেজের ওপর ন্যস্ত করার কাজ হয়ত একজন শ্যামাপ্রসাদ বা একজন মধুশ্রী বা কামিনি রায়ের পিতা চণ্ডীচরণ সেন নন্দকুমার ও শতবত্সর পূর্বের বঙ্গ সমাজ নামক এক চোখের জলে লেখা পথভাঙ্গা উপন্যাসে হাতেগোণা কয়েকজন করেছেন - যার জন্য তাঁকে জেলেও যেতে হয়েছিল, কিন্তু সর্বস্তরের ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি?
আর ব্রিটিশ যুগের প্রথম ছিয়াত্তরের গণহত্যা, যে গণহত্যা কয়েক কোটি গ্রামীন তথাকথিত অশিক্ষিত বাঙালির শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে দেয়, তার বিচার কে করবে? কোহিনুর বয়ে আনার জন্য শিক্ষিত বাঙালির যে অপরিসীম উতসাহ দেখা যায়, রাজ পরিবারের কোন কর্মীর ফোঁড়া হলে যারা কলকাতায় বসে নিজেদের দেহে ত্বক পরীক্ষা করেন তাঁদের একজনেরও মনে পড়ে না ছিয়াত্তর থেকে শুরু করে বিয়াল্লিশ পর্যন্ত বা তার পরের মরিচঝাঁপির গণহত্যাগুলির বিচার চাওয়ার দাবি - যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক বালমুকুন্দ ভাটিয়ার গবেষণায় রেললাইন জুড়ে ফেমিন লাইনের অন্তত আড়াইশ মর্মন্তুদ গণহত্যার কথা।
আদতে এই অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন গরুপুজক, বাঁদর পুজক, প্রকৃতি পুজক গ্রামীনদের শিক্ষিতরা উদ্বৃত্তের বেশি কিছু ভাবে নি। সেই ধারাবাহিকতার প্রত্যক্ষ ফল মরিচঝাঁপি।
Post a Comment