Saturday, May 21, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন, যদুনাথ সরকার



সদর পদটি ছিল বিভিন্ন গুণী, বিদ্যাজীবি, ফকির এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিকে সম্রাট বা যুবরাজের দেওয়া জমি দান বিষয়ে বিচার ও নজরদারির কাজ। তাঁর দায়িত্ব ছিল জমিগুলি  ঠিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা নজরদারি অথবা নতুন আবেদন বিচার বিবেচনা করা। বহু সময় অর্থেও দান দেওয়া হত। শুল্ক ছাড়া যে সব জমি দান করা হত তাদের নাম ছিল সায়ূরঘাল(তুর্কি), মদদইমাশ(আর্বি), আইমা ইত্যাদি। সদরের অন্যতম কাজ ছিল সম্রাটের হয়ে দান(ভিক্ষা) বিতরণ করা, বিশেষ করে রামজান মাসে বা অন্যান্য পুণ্য সময়ে – ঔরঙ্গজেবের সময়ে এর পরিমান ছিল দেড়লক্ষ টাকা। তহবিল তছরূপ করে, ঘুষ নিয়ে নিজেকে ধনী করার অন্যতম পদ ছিল সদর। আকবরের সময়ে সদর পদটি ঘুষ দেওয়া আর দুর্ণীতির সমার্থক হয়ে উঠেছিল।
সাম্রাজ্যের প্রধান সদরের পদের নাম ছিল সদরউসসাদুর বা সিদরইজাহাঁ বা জনগণের ভাষায় সদরইকুল। এছাড়া প্রত্যেক সুবায় সদর পদ ছিল। সদর ছিলেন মোটামুটি দেওয়ানি বিচারক, কিন্তু সব দেওয়ানি বিচারের নয়। কাজি এবং সদর পদের জন্য নির্মল চরিত্র আরবি বিষয়ে পণ্ডিতদের বাছা হত।
সুবায় যখন প্রধান সদর তাঁর সদর প্রতিনিধি পাঠাতেন, তখন তিনি তাঁদের জন্য সেখানকার শুল্ক ছাড়া নানান জমি, সেই সুবার বিভিন্নদের জন্য বরাদ্দ দৈনিক ভাতা(চলতে থাকা বা নতুন), আয়মাদার, রোজিনাদার, মসজিদের প্রধানদের জন্ম মৃত্যু এবং ততবিষয়ক সম্রাটের আদেশনামা দিয়ে তাকে সেই আদেশনামার অনুসারী হয়ে চলতে নির্দেশ দিতেন।
মুহতাসিব বা সেন্সর অব পাবলিক মরাল
শরিয়ত আইন অনুযায়ী সম্রাট জনগণের নৈতিকতা বিচার এবং বজায় রাখার জন্য পদাধিকারী নিযুক্ত করতেন – এই পদের নাম মুহতাসিব। উদেশ্য ছিল মুসলমান সমাজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কোন কোন নীতিগুলি পালনীয় আর কোন কোনগুলি বর্জনীয়, পয়গম্বরের তৈরি করে দেওয়া সেই নীতিগুলি যাতে প্রজারা পালন করেন, তা নজরদারি করা যেমন মদ্যপান না করা, ভেজা মাদক সেবন না করা, জুয়া না খেলা বা যৌন নৈতিকতা পালন করা ইত্যাদি দেখাশোনা করা। শুকনো মাদক গাঁজা বা আফিম জাতীয় দ্রব্য সেবন কিন্তু বর্জনীয় ছিল না, যদিও ঔরঙ্গজেব তাঁর সময়ে  ভাং চাষ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পয়গম্বরের বিরুদ্ধাচারণ করা, প্রচলিত ধর্মমত বিরোধিতা(heretical opinions), পাঁচওক্ত নামাজ না পড়া বা রামজানের সময় উপবাস না করা ইত্যাদির বিচার করতেন মুহতাসিব। সৈন্যপরিবেষ্টিত হয়ে তিনি পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে রাস্তার ধারের মদের দোকান, মদ তৈরির ভাটি, ভাং তৈরির নানান পাত্র, জুয়াখানার নানান সামগ্রী নষ্ট করতেন এবং সেগুলি জোর প্রয়োগ করে উঠিয়ে দিতেন। এছাড়াও তিনি দেখতেন মুসলমান সমাজ ধর্মীয় নানান আচার পালন করছেন কি না। এই কাণ্ডগুলি করতে গিয়ে লড়াইতে জড়িয়ে পড়ত তাঁর সেনা বাহিনী। নতুন তৈরি মন্দির ধ্বংস করা তাঁর সেনাদের অন্যতম কর্ম ছিল(হিস্টোরি অব আওরঙ্গজেব)।
নতুন মুহতসিব পদে বৃত হলে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে এই ধরণের একটি নির্দেশনামা দেওয়া হতঃ
‘যে সব মুসলমান উপাসনার পদ্ধতি জানে না, মুসলমান ধর্ম নির্দেশিত বিভিন্ন আচার আচরণ মান্য করে না, আপনি তাকে তা পালন করতে নির্দেশ দেবেন। তাঁরা যদি তা পালন করতে অস্বীকার করে তাহলে তাকে সংযত করতে হবে নয়ত শাস্তি(chastise)দিয়ে সেই কাজ করতে বাধ্য করবেন।
বাজারে বা গলির মধ্যে নিয়ম না মেনে কোন রাস্তা কিছুটা বা পুরোটা দখল(পর্দা) করে রাখে বা রাস্তায় ময়লা ফেলে – বা জনগনের চলাচলের জন্য বাজার বা রাস্তার কোন অংশ যদি কেউ দখল করে রেখে দোকান খোলে, আপনি তাকে রাষ্ট্রের আইন মনে করিয়ে দেবেন এবং সরে যেতে বাধ্য করবেন।
শরিয়তি আইন অনুযায়ী, শহরে পেয় মাদকদ্রব্য, এমন কি পেশাদার মহিলাদের(তবায়েফ) কোঠিতেও বিক্রি নিষিদ্ধ।
যারা কোরাণের বিধি লঙ্ঘন করে তাঁদের সঠিক পরামর্শ দিন, সতর্ক করুণ, প্রথমেই চরমতম মনোভাব দেখাবেন না, কেননা তাতে গণ্ডগোল শুরু হয়ে যেতে পারে। প্রথমে এই মানুষদের নেতাদের কাছে আপনার বার্তা পাঠান, তাঁরাও যদি না শোনেন তাহলে শাসনকর্তার কাছে আবেদন করুণ।’
কোথাও কোথাও মুহতসিবরা স্থানীয় বাজারের ওজন, বাটখারা দেখাশোনা করতেন(সূত্র মাউজি পারাসনিস, সনদস এন্ড লেটার্স)।কিন্তু অন্যান্য জায়গায় এই কাজের দায় ছিল কোতোয়ালের ওপর।
Post a Comment