Monday, May 2, 2016

উপনিবেশবাদ বিরোধী চর্চা - আলিবর্দি’র সময়ে বস্ত্র উৎপাদন


(আলিবর্দি এন্ড হিজ টাইমস – কালিকিঙ্কর দত্ত থেকে)
বাংলার উৎপাদনের উতকৃষ্টতার নজির ছিল তার বিভিন্ন ধরণের বস্ত্র শিল্পের উতকর্ষ। কোম্পানির এক আমলা, হেনরি পাটুলো(An Essay upon the Cultivation of the Lands, and Improvements of the Revenues, of Bengal, essay written by Henry Patullo) ১৭৭২ সালে যখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছে লিখছেন বাংলার উতপন্ন পণ্য বিশ্বের বাজারে বিপুল চাহিদা রয়েছে। তাঁদের গুণমান এতই উচ্চ যে বিশ্বে কোন দেশই সে দ্রব্য উতপাদন করতে সক্ষম হয় না। অবশ্যই কৃষি সাধারণ গ্রামীনদের জীবনে এক বিপুল কর্ম সংস্থান করত - ওরমে তার ইন্দোস্তান...এ বলছেন, তাঁরা তো কৃষিতে কাজ করতই, তার পর তাঁরা অন্য সময় তাঁতে বসে অতিরিক্ত সুতি বা রেশম বস্ত্র উৎপাদন করতেন, এবং এত কম দামে দিতে পারতেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সেই দামে অত সুন্দর পণ্য পাওয়া যেত না। কাজ না করা রেশম বস্ত্র বিদেশে রপ্তানি করা হত।
তাঁতিরা ছড়িয়েছিলেন প্রত্যেক জেলাতেই। প্রত্যেকের বুনন এবং ঘরাণা ছিল এক্কেবারে আলাদা। নাটোরের রাণী ভবানীর জমিদারির মালদা, হরিয়াল, শেরপুর, বালিকুশি এবং কগমারি নানান ধরণের বস্ত্র তৈরি করত – ১) ইওরোপের বাজারের জন্য খাসা(কোণাকুণি ডুরে কাপড়), এলাচি, হামহাম, চৌথা(চারভাঁজ করা কাপড়), ওটালি, সুসি(মোটা ডুরে কাপড়), শিরসুচের(পাগড়ির কাপড়)..., ২) বসরা, মোকা, জেড্ডা, পেগু, আচেন এবং মালাক্কার জন্য অন্য ধরণের খাসা, বাফতা(এক ধরণের ক্যালিকো), সানোজ(সান- এক ধরণের লিনেন), মলমল(এক রঙের মসলিন), তাঞ্জেব(আরেক ধরণের ভাল গুণমানের মসলিন) কেঞ্চি।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সন্তোষের রাজার জমিদারির রংপুর, ঘোড়াঘাটা, সন্তোষ, বুড্ডালের আড়ং থেকে কিনত স্যানো, মলমল, আর তাঞ্জেব ডোরা, তেরেন্দাম। বর্ধমানের মহারাজা তিলকচাঁদের জমিদারির মধ্যে পড়া বর্ধমান, ক্ষিরপাই, রাধানগর এবং দেওয়ানগঞ্জ আড়ং থেকে কিনত বিভিন্ন কাটা কাপড় সেমন ডুরে, তেরেন্দাম, কাটেনি, সুসি, সুত রুমাল, গুড়া, সেস্তারসো, স্যান্টন কুপি, চেরিদেরি, চিল, কুস্টা, দুসুতা এবং বর্ধমানের জমিদারির অন্য কিছু এলাকা থেকে কিছু কমদামের কাপড় যেমন শিরবন্দ, গলাবন্দ ইত্যাদি। গুণমানে তুলনায় একটু খারাপ সুতি আর রেশম কাপড় তৈরি হত বাঁকুড়া আর বিষ্ণুপুরে। মেদিনীপুরে তৈরি হত চারকোণিয়া(ডোরা মসলিন), চাকলা(সুতি, রেশম মিশিয়ে), পেনাইস্কো, সুরসুচার, সালবাস্তা(সুতির শাল)। ওডিসার পিপলিতে তৈরি হত সানি, কাসি, ডিমিটি, মলমল, রেশম রুমাল, আর রেশম আর সুতির রুমাল, গুড়া আর লুঙ্গি(বার্ডউডের মতে কোমরে আর মাথায় জড়ানোর কাপড়)। মো্টা ধরণের নীল রঙের রুমাল তৈরি হত কলকাতা আর বরানগরে। বীরভূমের ইলমবাজারের তাঁতিরা ছিলেন। নদিয়া আর মুর্শিদাবাদের সুখ্যাতি ছিল বিশেষ ধরণের গুণমানের কাপড় তৈরির জন্য। শান্তিপুর, বুড়ন ইত্যাদিতে মলমল আর খাসা তৈরি হত। এক কুঠিয়ালের বক্তব্য কাশিমবাজারের তাঁতিরা অসম্ভব উদ্যমী, তাফতা তৈরিতে অসম্ভব দক্ষ। দেশের মধ্যে সব থেকে ভাল তাঁতের কাপড় তৈরি করেন তাঁরা। স্তাবোরিনাস(Stavorinus) বলছেন ছাপা সুতির শাড়ি যার নাম চিন্টজ(দরজা আর জানালার পর্দা তৈরি হত তা দিয়ে) বাংলার তাঁতিরা তৈরিই করত না, সেটি তৈরি হত বিহারের পাটনায়। যে এলাকায় তৈরি হত সেই এলাকার নামে এটির নাম হয়েছে। বাংলা সুবার পাটনা, কিন্তু সে সময়ে বস্ত্র বুননে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বিহারের বিভিন্ন স্থানে সুতির কাপড়, কার্পেট যেমন শতরঞ্চি, দুলিকা এবং গালিকা তৈরি হচ্ছে।
বাংলা এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরণের মসলিন এবং সুতির কাপড় তৈরি হত। মসলিনে বাংলা বিখ্যাত ছিল এবং শুধু ইওরোপের জন্য কিছু মসলিন তৈরি হত। ১৭৭০ সালে স্তাবোরিনাস লিখছেন, মসলিন এমন ভাবে বোনা হত যে ২০ গজের কাপড় একটা ছোট্ট তামাকের বাক্সে ভরে ফেলা যেত। জটিল অথচ স্বর্গীয় এই কাজটা যে অবর্ণনীয় সাধারণতম হাতিয়ার দিয়ে করা হয় তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। ১৯ ডিসেম্বরের, ১৭৫৫র কোর্ট অব ডিরেক্টরের, কাউন্সিল অব কলকাতাকে লেখা এক চিঠিতে জানাযাচ্ছে, ঢাকাতে তৈরি হত সরবতি(সরবতের মত স্বচ্ছ), মলমল, আলাবালি, তাঞ্জেব, তেরিন্দাম, ডুরিয়া(ডুরে মসলিন), জামদানি(কাজকরা মসলিন) ইত্যাদি। ঢাকার তাঁতগুলি - সূক্ষ্মতম মসলিন থেকে জেনানাদের অন্তর্বাস থেকে গরীব রায়তদের মোটা কাপড়- নানান ধরণের গুণমানের বস্ত্র তৈরি করতে মাহির ছিল।
ঢাকায় চার ধরণের মসলিন তৈরি হত – কোম্পানির নথিপত্রে  চারটি গুণমানের নাম পাওয়া যাচ্ছে – অর্ডিনারি, ফাইন, সুপার ফাইন, এবং ফাইন সুপারফাইন। মসলিনগুলি সাধারণ, এক রঙা, ডুরে, কৌণিক ডুরে হত। ঢাকায় সব থেকে ভাল গলায় ঝোলানো কাপড়ের জন্য আর ফ্রান্সের জন্য তৈরি মসলিনে সূক্ষ্মতম সোনা, রূপার এম্ব্রয়ডায়রি করা হত।
সব থেকে বেশি তুলো উৎপাদন হত ঢাকা সহ বাংলার নানান প্রান্তে। যদিও যত তাঁত চলত তার জন্য যথেষ্ট সুতো উৎপাদন হত না বাংলায়। বহু সময় বম্বে আর সুরাট থেকে সুতো আমদানি করতে হত। ১৭৫২র ৪ঠা ডিসেম্বর ফোর্ট উইলিয়মের এক আলোচনায় বলা হচ্ছে, বম্বেতে তাঁদের এক এজেন্টকে হেক্টর জাহাজে জাহাজের পরিবহন ক্ষমতা(টনেজ) অনুযায়ী, দুরিঙহ্যাম কাপড় তৈরির সব থেকে ভালতম ভারুচ সুতো ভর্তি করে দিতে। হলওয়েল নাটোর সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখছেন, এখানে প্রচুর কার্পাস উৎপাদন হয়, তাদিয়ে কিছু পরিমান বস্ত্র তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তা বিদেশের চাহিদার জন্য যথেষ্ট নয়, ফলে আমাদের সুরাট থেকে সুতো আমদানি করতে হবে। স্তাবোরিনাস লিখছেন বাংলার তাঁত চালাবার জন্য সাধারণত বাংলার বাইরে বিশেষ করে সুরাট থেকে সুতো আমদানি করতে হয়।
Post a Comment