Sunday, August 11, 2013

চাপড়া ষষ্ঠী নিয়ে একটি রাজশাহীর ফেবু লিঙ্ক, প্রচুর ছবি আর সেদিনের বর্ণনা আর আমাদের কিছু মন্তব্য আর কথা

https://www.facebook.com/media/set/?set=a.10152126810440716.911039.243162680715&type=1

দয়া করে দেখুন। এর আগের লোকফোকএর এ নিয়ে পোষ্টটিও দেখুন, যা আসলে ইন্দিরার ব্লগ থেকে তোলা।

আমাদের কাছে চাপড়া ষষ্ঠী খুব গুরুত্বপূর্ণ লেগেছে দুটি কারনে

১) এটি কোন সময় বোঝা না গেলেও, একটি বিষয় পরিষ্কার যে, সে সময় গ্রামে বণিকদের দবদবা ছিল। যদি ধরেও নি এটি সাধু বেনের কাল তাহলে এটি অন্ততঃ ৮০০-১০০০ বছরের পুরনো। নীহাররঞ্জন বলছেন ১৫০০ সালের আশেপাশে কবিরা এই কাব্যগুলো লিখছেন কৌম স্মৃতি থেকে।

বাংলা শস্য শ্যামলা। তার আগেও সে সুজলা। সুজলাং সুফলাং। সুজলাং বলেই সে সুফলাং। মানুষ প্রকৃতিকে শ্রদ্ধা করত, তার নিয়মগুলো জানত, মানত। বসবাস করার জন্য যতটুকু প্রকৃতিকে বদলাতে হয়, ততটুকু বদলে, চেষ্টা করত যত সম্ভব প্রকৃতির কম ক্ষতি করা যায়। বাসস্থান স্থাপনার জন্য, চাষের জন্য, প্রচুর গাছ কাটতে হয়েছে। ফলে ভুমির সেই জল ধারণ পূরণ করার জন্য সে অগুন্তি পুকুর কেটেছে, এবং পুকুরগুলো বিশাল বিশাল। প্রায় সাগরের মত।

মনে রাখা দরকার এই বনিকেরা সে সময় সারা বিশ্বে না হলেও বৃহত্তর ভারতে ব্যবসা করতে যেত। এবং নানান শিল্প, কৃষি পন্যের প্রায় একচেটিয়া বাজার তৈরি করেছিল। সেই বনিকেরা কিন্তু যতটা পারাযায় জমি চাষ করে অত্যধিক লাভ করতে চায় নি। প্রাপ্য জমি চাষ না করে তারা পৃথিবীকে অন্ততঃ সুজলা দেখতে চেয়েছিল।

এবং সে সময় পুকুর কাটা বড় ব্যপার ছিল। বনিকেরা পুকুর কাটত। এই ব্রতে যে তিনটে পুকুর শেষ পর্যন্ত কাটা হল, তা শুধু তিন বউএর জন্য নয়, স্থানীয় মানুষেরাও তা নিশ্চয়ই ব্যবহার করত। আর সেই পুকুরগুলো অবশ্যই ব্যক্তিগত ব্যবহারের  জন্য কাটা হয় নি, না হলে আজও এই টালমাটাল সময়ে মেয়েরা সেই পুকুর কাটার ব্রত স্মরণ করছেন। এটা খুব ছোট ব্যপার নয়। অন্ততঃ আমরা মনে করি না।

এই লিঙ্কে দেখছি রাজশাহীর ব্রতের দিনের বর্ণনা আর ছবি। সারা বাংলায় এক সময় প্রচুর পুকুর কাটা হয়েছে। লিখলাম পুকুর বটে, আদতে তা দিঘি। রাঢ বাংলার কথা বলছিনা, যেখানে পুকুরকে এখনও দিঘী নয় সাগর নামে ডাকে। এখানে নদিয়া, মালদা দিনাজপুরের কথা বলছি যেখানে বড় পুকুরকে দিঘি বলে আজও। দিঘি অনুসর্গে এত স্থাননাম বাঙলায় রয়েছে তা গুনে শেষ করা যাবে না।

গত নভেম্বরে জয়া মিত্রদিদিকে নিয়ে গিয়েছিলাম দিনাজপুরের এক গ্রাম মুস্কিপুরে, মধুদাদের বাড়ি, কার্তিক পুজোয়। সেখানে তাকে এত বড়বড় দিঘি দেখিয়েছি বলার নয়। স্থনীয়েরা ২০-৩০ বিঘা পুকুরকে ছোট পুকুর আখ্যা দিচ্ছেন- জয়াদির ভাষায় নম্বর দিচ্ছেন না। মাঝে মাঝে শিহরন জাগছিল, আমরা জলে আছি না স্থলে। রাস্তার দুপাশে ৪০০ বিঘা করে দুটি দিঘি। যাচ্ছি তো যাচ্ছি। শেষ আর হয় না। এই একটা শেষ হলতো আরেকটা বা কয়েকটা দিঘির এলাকার শুরু। মাঝে মাঝে ঘোর লাগছিল।

আজ বুঝছি এটি এই এলাকার ব্রত।

২) শুধু শাড়ি, গয়নার প্রতি বাংলার মহিলাদের অদ্ভুত আসক্তির জন্য, ব্যঙ্গ করা হয় আজও। কেন!

পূর্ববঙ্গ গীতিকায় হাজারো স্থানে বেচারা পুরুষদের উদ্ধার করছেন মহিলারা। পুরুষরা যেন অনেকটা পুতুলের মত। যা বলা হচ্ছে তাই রাজা বিশ্বাস করছেন। রাজা মশাই আপনার বানর, ব্যাং পুত্র হয়েছে। রাজামশাই সত্যিটা কি তা দেখতে না গিয়েই, অন্যদের কথায় সেই রানীকে বনবাস বা সাজা শুনিয়ে দিচ্ছেন।

আর আজও বাংলার গ্রামের মেয়েরা যদি না খাটেন, বাড়ির অন্দরের সংসারের খাটনির কথা বলছি না, তথাকথিত অর্থনীতিবিদেরা, সমাজতাত্বিকেরা যাকে রোজগার বলেন, সেই কাজ বন্ধ করে দেন, তাহলে বাঙলায় ধর্মঘট হয়ে যাবে, বিশেষ করে চাষের মাঠে।

আবার যদি আমরা গীতিকায় ফিরে যাই দেখব, মহিলারা তার ধনবান স্বামীর থেকে সোনা দানা কাপড় কিচ্ছু চাইছেন না, শুধু পুকুর বা দিঘি চাইছেন। আজও দুই বাংলা বেঁচে আছে এই মহিলাদের দাবিমত কাটা অবেক পুকুরের দয়ায়। এবং অনাবশ্যকভাবে সেই পুকুর গুলোয় পলি পড়ে আজ মর মর দশা।

এই দুটি বিষয়ের জন্য আমাদের কাছে চাপড়া ষষ্ঠী আজও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার মহিলাকুল সেটি এবং এরকম আরও অনেকটি আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন।

তাদের পায়ে কোটি কোটি প্রনাম।
Post a Comment