Friday, December 23, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩১ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

এই ঘটনায় দুইজন প্রধান চক্রান্তকারী, প্রথমজন দাক্ষিণাত্যের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মুঘল সুবাদার অন্যজন প্রত্যাঘাত করতে চাওয়া গোলকুণ্ডার পারসিক উজির। এই দুজনে মিলে ব্যক্তিগত দূত মহম্মদ আরফকে দিয়ে ইঙ্গিতে পাঠানো উভয় পক্ষেরে মৌখিক আলাপ এবং গোপন চিঠি চাপাটি মার্ফত গোলকুণ্ডা দখলের অবস্থা তৈরি করেছিলেন। মীর জুমলার আন্তরিকতা এবং বিশ্বাসের প্রতি দাদ দিয়ে তাকে আওরঙ্গজেব লিখলেন, দুমুখোটি(কুতুব শা) উচিত শাস্তি পাবে... তাকে আমি সঠিক সময়ে তোমার সঠিক পরামর্শ নিয়ে সমূলে উচ্ছেদ করব। মীর জুমলাকে বলা হল কুতুব শাহের সরইলস্কর এবং অন্যান্য সেনাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ভড়কাতে, কেননা তাদের সঙ্গে জোট বাঁধা খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে। এবং মীর জুমলা যখন কর্ণাটক ছাড়বেন, তখন যেন তিনি রয়ালকে তাঁর পক্ষে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। ছোট করে আররঙ্গজেব লিখলেন, ‘যে কোন মূল্যে শত্রুর থেকে তোমার সব ক’টি পদক্ষেপ গোপন রাখ। বিভিন্ন অঞ্চলে যা সব ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে তা সংগ্রহ কর। তোমার যে কোন পদক্ষেপ নেওয়ার ২/৩ মাস আগে থেকে আমায় সতর্ক কোরো এবং খুব বেশি দেরি কোর না।’ তিনি আরও লিখলেন, ‘আমি চাই লোকে দেখুক আমি তোমায় কতটা বিশ্বাস এবং পক্ষপাত করছি আর তারা ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে মরুক।’ মীর তাঁর পক্ষ থেকে আওরঙ্গজেবকে জানালেন যে তিনি যেন গোলকুণ্ডা আক্রমণ করেন, সেখানকার প্রধান অমাত্য বা দবীর তাঁর আত্মীয় এবং আক্রমণকারী সেনাকে দৈনিক ৫০০০০ টাকা ভর্তুকি দিতে প্রস্তুত।

চক্রান্তীদের যে পরিকল্পনা তৈরি হল তা এইঃ
১) কুতুব শাহকে মীর জুমলার ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে, সে যদি অমান্য করে,
২) মহম্মদ সুলতান হায়দ্রাবাদে গিয়ে বন্দীদের শক্তি প্রয়োগ করে মুক্ত করবে, প্রয়োজনে মীর জুমলার জন্য অপেক্ষা করবে সেখানে,
৩) যদি আদিল শাহ, কুতুব শাহকে আমিনকে ছাড়ানোর বিরোধিতা করতে (সামরিক )সাহায্য করতে আসে তাহলে ব্যক্তিগতভাবে আওরঙ্গজেব সেখানে যাবেন,
৪) মীর জুমলা কর্ণাটকে তাঁর সব বাকি কাজ শেষ করে ফেলবেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, তাঁর বিশ্বস্ত প্রশাসকেদের বাকি কাজের দায়িত্ব দিয়ে তিনি গোলকুণ্ডার দিকে তাঁর সাঁজোয়া সেনাসহ কাজ উদ্ধারে(আসল মকসদ), গোলকুণ্ডা দখল করতে রওনা হবেন।

গোলকুণ্ডা দখলে মীর জুমলা এবং আওরঙ্গজেব শাঁড়াশি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন – মীর জুমলা দক্ষিণ থেকে এবং আওরঙ্গজেব উত্তর থেকে। তিনি মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘আমার মনে হয় তাঁর রাজধানী ছিনিয়ে নেওয়ার এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।’ সত্যকারের আওরঙ্গজেব যেভাবে পাদশাহকে লিখেছিলেন, সুসজ্জিত হয়ে রণনিপুন পদাতিক, বিপুল হস্তি বাহিনী এবং সাঁজোয়া গোলান্দাজ সেনা নিয়ে মীর জুমলা যদি কর্ণাটক গোলকুণ্ডা থেকে আক্রমণ করেন, সেটা বোধহয় হবে সোনালি সুযোগ, যা আর দ্বিতীয়বার আয়োজিত করা যাবে না। আর এই পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করছিল দুই বাহিনীর দু দিক থেকে মুহুর্মুহু দ্বিধা হীন আক্রমন করার ওপর, এবং সেই জন্য বার বার আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বলেছেন যে, সময় এবং অবস্থার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে এবং কোন রকম দেরি ছাড়া এগিয়ে যেতে আর তাঁর সমস্ত পদক্ষেপ আওরঙ্গজেবকে জানাতে এমন কি কবে - কোন তারিখে তিনি হায়দ্রাবাদের পৌঁছতে পারবেন তাও অগ্রিমভাবে জানাতে।

পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার দায় গিয়ে পড়ল আওরঙ্গজেবের ওপর। ১৬৫৫ সালের ২০ ডিসেম্বর তিনি, সমস্ত নীতি ও আনুগত্য বর্হিভূত হয়ে মহম্মদ আমিনকে গ্রেফতারের দায়ে দায়ি করে কুতুব শাহকে একটি নিশান পাঠিয়ে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারবর্গকে মুক্ত করার, বাজেয়াপ্ত সম্পদ তাঁর দূত মীর আবদুল কাশেমের (সাজোঁয়া বাহিনীর পরিদর্শক) এবং নিশান বাহক সঈদ আলির হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সাবধান করে বললেন, এই আদেশ আমান্য করলেই শাহজাদা মহম্মদ গোলকুণ্ডা আক্রমন করতে বাধ্য হবেন। কুতুব শাহ, আদিল শাহের সঙ্গে চুক্তির বলে, মদ্যপান জনিত কারণে এবং প্রবল আত্মঅভিমানে সম্রাটের ৩ ডিসেম্বরের ফর্মান এবং আওরঙ্গজেবের ২০ ডিসেম্বরের নিশান অগ্রাহ্য করলেন। এছাড়াও তিনি নিজের দুর্বুদ্ধিতায় হায়দারাবাদ এবং ইন্দৌরের সীমান্তে গন্ডগোল লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব ২৬ ডিসেম্বর মহম্মদ সুলতানকে পাঠালেন গোলকুণ্ডার উদ্দেশ্যে এবং তেলেঙ্গানার উপপ্রশাসক হাদিদাদ খাঁকে নান্দেরে ১০০০০ পদাতিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে জমায়েত হতে নির্দেশ দিলেন। মীর ফজলুল্লার সন্তান আসাদুল্লাকে চান্দার জমিদারের উদ্দেশ্যে ৫০০ ঘোড়সওয়ার নিয়ে পাঠিয়ে তাঁর সঙ্গে সীমান্তে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মীর জুমলা যদি সেই পথে আসেন তাহলে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে রাজধানীতে যেতে বললেন। আদিল শাহ যদি কোন গন্ডগোল না করেন, তা হলে আওরঙ্গজেবের অঙ্ক হল এই ঘটনাটা খুব সহজেই মিটিয়ে নেওয়ার। কিন্তু এদিকে সরাসরি জানাগেল আদিল শাহ, কুতুব শাহকে সাহায্য করার জন্য তোড়জোড় করা শুরু করেছেন, ফলে আওরঙ্গজেব সম্রাটের কাছ থেকে নির্দেশ চাইলেন যাতে তিনি তাঁর গোলকুণ্ডা অভিযানের পরিকল্পনা অবিলম্বে মঞ্জুর করেন এই যুক্তিতে যে কুতুব শাহ সম্রাটের নির্দেশ সত্ত্বেও আমিনকে চাড়ে নি।

এ দিকে মহম্মদ আমিনের গ্রেফতারির খবর পেয়ে শাহজাহান কুতুব শাহকে একটি জরুরি চিঠি লিখে আমিনকে ২/৩ দিনের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২৯ ডিসেম্বর সম্রাট আওরঙ্গজেবকে জানান যে তাঁর বিশ্বাস কুতুব শাহ আমিনকে ছেড়ে দেবে, কিন্তু তিনি তার পুত্রকে বলেন সব ধরণের সিদ্ধান্তের পথ খোলা রাখতে এবং আওরঙ্গজেবকে শান্ত করতে তিনি বলেন যদি দেখা যায় গোলকুণ্ডা তাঁর নির্দেশ অমান্য করছে তাহলেই কেবল মাত্র তিনি যেন আক্রমণের পথ ধরেন। কুতুব শাহ মীর জুমলাকে যে কোন মূল্যে ধরতে চাইলেন। এদিকে মালওয়ার প্রশাসক শায়েস্তা খাঁকে তাঁর মনসবদারদের নিয়ে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। দুটো চিঠিই আওরঙ্গজেবের হাতে পৌঁছল ৭ জানুয়ারি, ১৬৫৬। তিনি তুলির আঁচড়ে গোলকুণ্ডা ধ্বংস করতে উদ্যোগী হলেন। শাহজাহানের ২৪ তারিখের বন্দী মুক্তির চিঠি কুতুব শাহের হাতে পড়ার জন্য অপেক্ষা না করেই ৩ ডিসেম্বরের সম্রাটের চিঠি অমান্য করায় শাহেনশাহের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে ফলে তাঁর আর গোলকুণ্ডা আক্রমণ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই বলে কুতুব শাকে জানালেন। মীর জুমলাকে বললেন, সুলতান যদি নিজের হাতে বন্দীদের মুক্ত না করে, আওরঙ্গজেব নিজে গিয়ে বন্দীদের মুক্ত করাবেন। তিনি নিজের অভিযান বন্ধ করে তাঁর পুত্রকে হায়দারাবাদের দিকে কুচ, এবং যদি তারা বন্দী থাকেন তাহলে তাদের অবিলম্বে মুক্ত করার নির্দেশ দিলেন।
(চলবে)

Thursday, December 22, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

বাস্তবে মীর জুমলা কিন্তু কূটনৈতিকভাবে জোরালো অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আওরঙ্গজেব বিষয়টা সম্যকভাবে বুঝেছিলেন এবং তিনি এই অবস্থাটি পাদশাহকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন। মহম্মদ মুনিমের ফেরার পরেও মীর জুমলার সঙ্গে তাঁর চিঠি চাপাটিতে বোঝা যাচ্ছে ক্ষুরবুদ্ধি উজিরকে তিনি খুব সহজে বশ করতে পারেন নি এবং মুঘলদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে মীর জুমলা কিছুটা ইতস্ততও করছিলেন, বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখছিলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে লিখলেন, ‘(সাম্রাজ্যকে)সেবা করার ইচ্ছের ওপর জোর রেখে নিজের ওপর আস্থা বজায় রাখ, এবং মনে রাখ তোমার জন্য অনন্ত ভাগ্যবান ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে (দৌলত সরমাদল(না সারমাদি?))।’

৪। ইখলাস খান, শাহজী ভোঁসলে এবং রয়াল ত্রয়ীর সঙ্গে মীর জুমলার কূটনৈতিক সম্পর্ক
মীর জুমলার জোরদার কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল করতে দুই সুলতান মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করলেন। শাওয়াল ১০৬৪(১৬ আগস্ট-১২ সেপ্ট ১৬৫৪)এ আওরঙ্গজেব, মুনিমকে নির্দেশ দিলেন যেহেতু কুতুব শাহ পুরোনো চুক্তি নবীকরণ করতে চাইছে, তাঁর সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যাক। বীজাপুরও এই ভাবে মুঘলদের সঙ্গে দরকষাকষি, গা ঘষাঘষি সুরু করল। পাদশাহ যাতে রয়ালকে নিরাপত্তা না দেন তাঁর জন্য তাকে প্রচুর পরিমানে উপঢৌকন দেওয়া হল। সুলতানদের বিরুদ্ধে যত চক্রান্ত হবে, সেটি তত মীর জুমলার পক্ষে যাবে এটা তিনি বুঝলেন। এই উদ্দেশ্যে বাধ্য হয়ে মীর জুমলা তাঁর কূটনৈতিক চক্রের জাল আরও বেশি এলাকায় বিছোনোর কাজ শুরু করলেন। আদিল শাহের বিরোধিতার ধার নষ্ট করতে বিজাপুরী কর্ণাটকের হাবসি প্রশাসক ইখলাস শাহের সঙ্গে দহরম মহরম শুরু করতে দুজনের মধ্যে আশ্চর্য জনক কিছু চিঠ চাপাটি আদান প্রদান শুরু হল। এছাড়াও তিনি আদিল শাহের বিরোধী মারাঠি নেতা শাহজী ভোঁসলার বন্ধুত্বও চেয়ে বসলেন আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে। আওরঙ্গজেবের ইচ্ছে তাকে বীজাপুরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, তাই তিনি মীর জুমলার এই পদক্ষেপকে জোরদার সমর্থন জানালেন এবং মীর জুমলার থেকে জানতে চাইলেন শাহজীর মনোভাব, যাতে তাকেও তিনি এই শিবিরে নিয়ে আসতে পারেন। মীর জুমলা মুঘলদের সঙ্গে রয়ালের হয়ে দৌত্য আর বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলেন, তার দীর্ঘদিনের বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার বিরোধিতাকে ধুনো দিতে এবং নিজের অবস্থাকে আরও দৃঢ করতে। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি সম্রাট রয়ালকে নিরাপত্তা দিতে আস্বীকার করলেন। তাই মীর জুমলা তাঁর সুরক্ষার স্বিতীয় স্তর গড়ে তুলতে দ্বিতীয়বারের জন্য রয়ালের হৃদয় জিততে চেষ্টা চালালেন। তিনি আওরঙ্গজেবকে বললেন রয়াল কিন্তু তাঁর মতিতে স্থির রয়েছে এবং তাকে রয়ালের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন যেহেতু মীর জুমলা এর আগে রয়ালের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন, তাই তাকে নতুন করে পাদশাহের সামনে বিষয়টা পেশ করতে হবে।

৫। আওরঙ্গজেবের গোলকুণ্ডা অভিযানের পরিকল্পনা
মুঘলদের সঙ্গে গোপনে চলতে থাকা তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক আলাপ আলোচনা সত্ত্বেও কিন্তু শেষ পর্যন্ত মীর জুমলা বাধ্যবাধকতাটাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেন না। মুঘল সম্রাটের সঙ্গে যে তিনি আলাপালোচনা চালাচ্ছেন, সেই খবর প্রকাশ হয়ে পড়ল। সুলতানেরা তাঁর বিরুদ্ধে যৌথ সেনাবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করতে লাগলেন। তাঁরা দুজনেই চাইছিলেন না যে মীর জুমলা তাঁর ব্যাপক সম্পদ এবং এই এলাকা সম্বন্ধে খুঁটিনাটি জ্ঞান নিয়ে যেন কোনভাবেই সম্রাটের সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন। এই গোপন আলোচনা প্রকাশ্যে আসায় চূড়ান্তভাবে বেশি অস্থির হয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়ে ফেললেন সুলতান আবদাল্লা কুতুব শাহ। ২১ নভেম্বর ১৬৫৫ সালে তিনি তাঁর অনুপস্থিত আমীরের পুত্র মহম্মদ আমিন, তাঁর মা আর বোনকে গ্রাফতার করে, তাদের সব সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে গোলকুণ্ডার অনতিদূরে কোভিলকোণ্ডা দুর্গে বন্দী করে রাখলেন। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি আওরঙ্গজেব সম্রাটের কর্ণগোচর করলেন এবং বললেন এই খবরে মীর জুমলা উত্তেজিত হয়ে পড়বেন এবং দূরদৃষ্টিবিহীন কুতবুলমুলক মীর জুমলার পুত্রকে হত্যাও করতে পারে, তাই তাকে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ করার অনুমতি দেওয়া হোক’।

এই ঘটনায় মুঘলদের প্রতি যে দ্বিধান্বিত অবস্থা ছিল মীর জুমলার সেটি চকিতে উধাও হয়ে গেল। মীর জুমলার ইচ্ছে গোলকুণ্ডার সুলতান তো পূরণ করেনই নি বরং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বন্দী করে রেখে তাঁর হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়ে তাকে সত্যিকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে ঠেকে দিলেন। তিনি সুলতানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। তাঁর নিজের সেনা বাহিনী দুই সুলতানের বাহিনীর সঙ্গে জুঝতে পারবে না, তাই তিনি সরাসরি আওরঙ্গজেবের শরণাপন্ন হলেন, বললেন তিনি সাম্রাজ্যের অন্যতম একনিষ্ঠ সেবক এবং তিনি মহান সম্রাটের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করছেন। স্বীকার করলেন তাঁর একার বাহিনী দিয়ে এই অবস্থার সমাধান হবে না, সুলতানদের বিরুদ্ধে সম্রাটের সরাসরি সাহায্য দরকার। তাঁর চিঠি অনুবাদ সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে আওরঙ্গজেব সরাসরি তাঁর পিতাকে চাপ দিলেন কোন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ করার। আয়ুত সম্পদে ধনী গোলকুণ্ডাকে দখল করার এই যে অবস্থা আওরঙ্গজেবের সামনে উপস্থিত হয়েছে সেই অবস্থাটি এইভাবে তিলে তিলে পেকে উঠুক, সেই মনোভাব বহুকাল ধরে আওরঙ্গজেব পোষণ করছিলেন। এখন তাঁর সাম্রাজ্যবাদী সত্ত্বা শুধু গোলকুণ্ডা দখল করে শান্ত থাকল না, এর সঙ্গে কর্ণাটকের দিকেও নজর পড়ল। পিতাকে তিনি লিখলেন এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না, কেননা গোলকুণ্ডা এবং তাদের হয়ে মীর জুমলা কর্ণাটক দখল করেছে। এই দুটি অঞ্চল সম্পদে অমিত ধনী, নানান ধরণের দুষ্প্রাপ্য পণ্য রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আরও যে কত কি লুকিয়ে আছে তা জানার বাইরে, আর রয়েছে বিশ্বশ্রুত খনি – এত কিছুর সঙ্গে সম্রাটের হাতে এসে পড়বে কর্মক্ষম কিছু অভিজাত যা সম্রাটের সাম্রাজ্যকে শুধু ঐহিক নয় পারমার্থিক বুদ্ধিবৃত্তিতেও ধনী করবে।

১৬৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর সম্রাট শাহজাহান মীর জুমলার আবেদন শুনলেন এবং আওরঙ্গজেবের অনুরোধক্রমে কাজি মহম্মদ আরিফ কাশ্মীরী(আহদির দ্বিতীয় বক্সী)র মার্ফত মীর জুমলাকে মুঘল সেনাবাহিনীর ৫ হাজারি জাট এবং ৫ হাজার সওয়ার এবং তাঁর পুত্রকে ২ হাজার জাট এবং ২ হাজার সওয়ার পদে নিয়োগ করে অসাধারণ সুন্দর কারুকার্যময় একটি চিঠি এবং খিলাত পাঠিয়ে রাজসভায় হাজির হতে নির্দেশ দিলেন। একই সঙ্গে কুতুব শাহকে একটি চিঠি লিখে মীর জুমলা আর তাঁর পুত্রকে রাজসভায় আসতে বাধা না দেওয়ার এবং তাদের কোন সম্পত্তি অধিকার না করার এবং পরিবারের কাউকে হেনস্থা না করারও নির্দেশ দিলেন। ১৬৫৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর এই চিঠি দুটি আওরঙ্গজেবকে দেন মহম্মদ শরিফ ইসাওয়াল। আওরঙ্গজেব কুতুব শাহকে চিঠি লিখে জানালেন উক্ত দিন থেকে মীর জুমলা এবং তাঁর পুত্র রাজকীয় সেবায় নিযুক্ত হয়েছেন ফলে কুতুব শাহ হয় তাঁর পুত্রকে ছেড়ে দিক না হয় যথোপযুক্ত অবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকুক। এরই সঙ্গে আওরঙ্গজেব রাজস্ব বাকি পড়ার অজুহাতে হায়দারাবাদ অভিযানেরও নির্দেশ দিলেন।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৯ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

এদিকে গোলকুণ্ডায় ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, যার বলে আওরঙ্গজেবের পক্ষে সেই ঘটনায় আরও তাড়াতাড়ি অংশগ্রহণ করার সুযোগ এসে যায়। কুতুব শাহের সঙ্গে মীর জুমলার মতবিরোধ যখন তুঙ্গে, সুলতান তাকে চক্রান্ত করে গোলকুণ্ডায় ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। পুত্রের সহায়তায় নিজেকে অস্ত্রের সাহায্যর মুক্ত করে মীর জুমলা সশরীরে কর্ণাটকে ফিরে যান এবং আর কোন দিন গোলকুণ্ডায় ফিরে যাবেন না সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর গোপন সিদ্ধান্ত বুঝে তাকে বার বার গোলকুণ্ডায় আনানোর চেষ্টা করতে থাকেন সুলতান। এই সবেতেই সুলতানের উজিরের সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে এবং তিনি গোলকুণ্ডায় না যাওয়ার সিদ্ধন্তে অনড় থাকেন। শেষ পর্যন্ত সুলতানের ভালমানুষির মুখোশ খুলে যায় এবং তিনি মীর জুমলাকে গ্রেপ্তার করে তাকে ধ্বংস করার সিদ্ধন্ত নিয়ে ফেলেন।

পাদশাহ বুঝলেন মীর জুমলার সঙ্গে ঠিক মত ব্যবহার করা হয় নি। এবং অবস্থা অনুধাবন করে আওরঙ্গজেব মার্ফত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলেন কেন মীর জুমলা কর্ণাটকে ফিরে গেলেন। আওরঙ্গজেব সমস্ত অবস্থা পর্যালোচনা করলেন, এবং সম্রাটকে বোঝালেন মীর জুমলা বাধ্য হয়েছেন কর্ণাটকে ফিরে যেতে, কেননা মুঘল সাহায্য তাঁর কাছে আসে নি। আর তাঁর মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার কেউ নেই বর্তমানে; যত তাড়াতাড়ি তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে তত শীঘ্র যোগ দেওয়ার জন্য ইচ্ছুক হয়ে রয়েছে। শুধু মাত্র মৌখিক সমঝোতার প্রতিশ্রুতিতে কোন কাজ হয় না। আওরঙ্গজেব অনুভব করলেন খুব শীঘ্রই তাকে কাজে নামতে হবে এবং তাঁর আধিকারিক সঈদ আহমেদ মার্ফত তিনি মীর জুমলাকে একটি চিঠি লিখলেন এই মর্মে যে তিনি যেন খোলাখুলিভাবে মুঘল সাম্রাজ্যে যোগ দেন এবং তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন যে তিনি নিজে পাদশাহের সঙ্গে দেখা করে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ব্যবস্থা করবেন। এছাড়াও পাদশাহ মহম্মদ মুনিমকে সাম্রাজ্যের পক্ষে, সাম্রাজ্যের ফার্মান নিয়ে তাঁর নিজের হয়ে শ্রীরঙ্গর সঙ্গে এবং সরাসরি মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিলেন। মীর জুমলা একজন সাম্রাজ্যিক মধ্যস্থতার জন্য দূত প্রার্থনা করে সম্রাটের কাছে আবেদন পাঠালেন এবং সেটি প্রত্যায়িত করে দিলেন আওরঙ্গজেব নিজে।

৩। মহম্মদ মুমিন দৌত্য
এত দিনে, ১৬৫৩-৫৪ সালে শ্রীরঙ্গর ইসলামে পরিবর্তিত হওয়ার আবেদনের খবর এবং মুঘল রাজসভায় তাঁর হয়ে একজন প্রাজ্ঞ মুঘল কূটনীতিবিদ মহম্মদ মুনিম সফদরখানির দৌত্যের খবর পৌছল সুলতানদের কানে। তাঁদের আশংকা হল যে তারা কর্ণাটক হারাবেন। ‘আদিল শাহ মনে করলেন এত দিন তারা কর্ণাটকে যা ভোগ করে এসেছেন, তা মুঘলেরা দখল করে নিতে পারে, তিনি মীর জুমলার বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অন্য দিকে কুতুব শাহ মীর জুমলাকে বাবা বাছা করে শান্ত করে তাঁর পুরোনো পদ এবং মহাল দেওয়ার সিদ্ধন্ত নিলেন। কিন্তু ততদিনে খুব দেরি হয়ে গিয়েছে। যদিও মুঘলেরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করেছে, কিন্তু শিরদাঁড়া সোজা রাখা উজির, মীর জুমলা ঠিক করেই নিয়েছেন, যে দু বছর পেরিয়ে গেলেই তিনি হয় কুতুব শাহের দরবারে উপস্থিত হবেন, না হয় তীর্থে চলে যাবেন।’ মহম্মদ আমিন হায়দ্রাবাদের মীর জুমলার পুত্র, এবং তাঁর অধীনস্থ আধিকারিক, মহম্মদ আমিন নিজেদের কুতুব শাহের অধীনে থাকাকে খুব একটা সুরক্ষিত বোধ করছিলেন না, এবং সুলতানকে দিয়ে ওপরে বর্ণিত শান্তি চুক্তি করে সাময়িকভাবে সুরক্ষিত বোধ করলেন। এই ঘটনাপ্রবাহে উদ্বিগ্ন আওরঙ্গজেব সম্রাটকে আবেদন করে বললেন যে সাম্রাজ্য যেন মীর জুমলাকে সরাসরি সাহায্য করবে এমন একটা প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিক এবং তিনি যেন যে কোন মুহূর্তে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে পারেন সে ব্যবস্থাও করা হোক।

আওরঙ্গজেব যা চেয়েছিলেন তা রূপায়ন করা বাস্তবে খুব সহজ কাজ হল না। কুতুব শাহকে ঠেকিয়ে রাখার যে কূটনীতি নিয়েছিলেন মীর জুমলা, ঠিক সেই নীতি তিনি নিলেন আওরঙ্গজেবের সঙ্গেও। আওরঙ্গজেব মহম্মদ মুনীমকে তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালাবার জন্য দায়িত্ব দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে যেতে যতক্ষণনা তিনি মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পাকা সিদ্ধন্ত নিচ্ছেন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে ইতোমধ্যে চিঠি লিখেছেন এবং সঈদ আহমেদকে কাজে লাগিয়েছেন এবং তাঁর বিশ্বাসের প্রশংসা করেছেন এবং সুলতান যে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, তাও সেই চিঠিতে তিনি নিন্দা করেছেন। তিনি লিখলেন তাঁর বিশ্বাস বাইরের সব ঝঞ্ঝাট মিটে যাবে এবং মীর জুমলা যেন সাম্রাজ্যে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করেন, কেননা তাকে সেই সিদ্ধান্ত লাভবান করাবে। তিনি বললেন মীর জুমলা যেন তাঁর দূতের কাছে নিজের মনের কথা খুলে বলেন এবং সাম্রাজ্যে উঁচু পদ লাভের সুযোগ না হারান। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দুজন সুলতান জোর বদ্ধ হয়েছে; তাই সম্রাটের থেকে সঠিক প্রতিশ্রুতি না পেয়ে, মীর জুমলা দূতের কাছে মুখ খুললেন না। মুনিম তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি আওরঙ্গজেবের মার্ফত সুলতানকে একটা আবেদন পেশ করলেন। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন, যতক্ষণতা সাম্রাজ্য মীর জুমলার সুরক্ষা বিষয়ে কোন স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ততদিন মীর জুমলা কোন স্থায়ী সিদ্ধন্ত নেবে না, এবং সেই জন্য তিনি চাকরির শর্ত – যেমন তাঁর পদ বৃত্তান্ত, তাকে রক্ষার জন্য নিরাপত্তার বিষয় এবং সেই জন্য অতিরিক্ত সেনাবাহিনী বরাদ্দ করার ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু তবুও শাহজাহান সিদ্ধন্ত নিতে না পারায় মীর জুমলা সতর্ক হয়ে গেলেন এবং তিনি পাদশাহের মনোভাব বিষয়ে শংকিত হয়ে পড়লেন। ফলে আওরঙ্গজেব চেষ্টা চালালেন তাঁর আশংকা দূর করার। দূত মার্ফত গোপন কথাবার্তা বিনিময় হতে থাকল। মীর জুমলাকে শান্ত করতে আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে নিশান পাঠানো হল। কুড়ি দিন পরে মীর জুমলা দুজন সেনাদূত মার্ফত একটি চিঠি পালটা আওরঙ্গজেবকে পাঠালেন। আওরঙ্গজেব সেটি সম্রাটের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেন এবং মীর জুমলাকে লেখেন, মীর জুমলা যেন তাঁর জীবনের সব থেকে বড় চমক পুরষ্কার স্বরূপ পাওয়ার জন্য ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রাখেন।

১৬৫৪ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে, আওরঙ্গজেবের নাছোড়বান্দা মনোভাবে প্রভাবিত হয়ে অবশেষে পাদশাহ মীর জুমলাকে আওরঙ্গজেবের সুরক্ষায়, এবং একমাত্র আওরঙ্গজেবের উপস্থিতিতে রাজধানীতে আনার সম্মতি দিলেন। তিনি দুটি ফর্মান জারির প্রস্তাব দিলেন একটি গোপনে মীর জুমলাকে তাঁর সামনে আসার অন্যটি কুতুব শাহকে লেখেন যাতে তিনি তাঁর উজির এবং পুত্রকে মুঘল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে দাঁড়ান।

মীর জুমলা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে হঠাতই এক বছর সময় চাইলেন। উদ্দেশ্য বিভিন্ন বন্দরে ছড়িয়ে থাকা তাঁর সম্পদ উদ্ধার করা। এবং তিনি তাঁর প্রাক্তন চাকুরিদাতার সঙ্গেও কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন যাতে তারা তাঁর বিরুদ্ধে না যান এবং মুঘলদের সঙ্গে তাঁর চুক্তি যাতে গোপন থাকে এই প্রস্তাবও দিলেন।
মীর জুমলার মনোভাবে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন এক্ষুনি তাঁর উদ্দদেশ্যে কোন দূত না পাঠাতে এবং মহম্মদ মুনিমের ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। মুনিম ফিরে গিয়ে মীর জুমলার এই অবস্থা সম্রাটকে বর্ণনা করবেন। তিনি সম্রাটকে এই আলোচনা বা পদক্ষেপ গোপন রখতে অনুরোধ করলেন, কারণ দুজন সুলতান যদি মীর জুমলার উদ্দেশ্য জানতে পারেন, তাহলে তারা যে কোন ছলে বলে কৌশলে এই উচ্চপদ পাওয়া থেকে বাধা দেবে(অর্থাৎ মেরে ফেলা) এবং তখন সুলতানদের বাধা দেওয়া অতীব অসুবিধে হবে কেননা এই বিষয়ে দু জন একমত হয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি মীর জুমলাকে বললেন(১৩ জানুয়ারি ১৬৫৫) তাঁর বকেয়া কাজগুলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পাদন করতে এবং মন থেকে সাম্রাজ্যের সেবায় যোগ দেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করতে।

রাজধানীর পথে যাওয়া মুহম্মদ মুনিমের হাত দিয়ে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে লিখলেন, ‘বাস্তব হল মীর জুমলার আর সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে না এসে গতি নেই। সেটা সে আমায় জানিয়েছে। সম্পত্তি উদ্ধার করা তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য। এখন সে যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক চাল চেলেছে সেটা তাঁর মনের কথা নয়। দূর্গ, বন্দর এবং খনি সমৃদ্ধ এই জনাকীর্ণ রাজ্যে(জোরদার সেনাবাহিনী, আতুল ঐশ্বর্য এবং কার্যকরী আধিকারিক সমৃদ্ধ) সে তাঁর সম্পদ উদ্ধার পুরোনো আশ্রয়দাতা বিজাপুরের সুলতানের কাছে ফিরে না গিয়ে মুঘল বাহিনীতে যোগ দেবে। সাম্রাজ্যের রাজসভায় যোগ দেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। বর্তমানেরটি কূটনৈতিক চাল এবং ততক্ষণ সে দুই সুলতানকে চটাতে চাইছে না তাঁর নিরাপত্তার জন্য... এবং সেজন্য সে এখুনি এই দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইছে না... সুন্দর ব্যবহার এবং ছলে বলে কর্ণাটকের জমিদারদের বশ্যতা অর্জন করে এবং ইখলাস হাবসির বন্ধুত্ব অর্জন করে... মীর জুমলা সুচতুরভাবে শুধু সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৮ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

২। মীর জুমলার কূটনৈতিক উদ্যম
সুলতানের ক্রোধান্বিত অবস্থা আন্দাজ করে, মূল ঘটনা ঘটার বহু আগে থেকেই মীর জুমলা নিজের সুরক্ষা বলয় তৈরি করার উদ্যম নিলেন। কর্ণাটকে তোলা কোন রাজস্বই তিনি কুতুব শাহকে দিতে অস্বীকার করলেন, কেননা তিনি ‘তাকে আর সুলতান মানেন না, বরং তাঁর চরমতম শত্রু হিসেবে গণ্য করেন’। কুতুব শাহের মনোভাব পরিবর্তন হবে আন্দাজ করেই তিনি তাঁর দূরদৃষ্টি অবলম্বন করে ঠিক করলেন যে তাঁর মাতৃভূমিতে তিনি ফিরে যাবেন এবং ইরাণের সম্রাটের দরবারে তিনি সব কথা বলে তাঁর মন জয় করার চেষ্টা করবেন। ১৬৫৩ সালে তিনি, পারস্যের উজির, খালিফাইসুলতানকে দুটি বন্ধুত্বপূর্ণ চিঠি পেশ করে বললেন যে তাদের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে তা যেন বজায় থাকে এবং তিনি অতীতের মতই আগামী দিনে শাহের সেবার জন্য প্রস্তুত। তাঁর পূর্ব সেবার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি স্বয়ং পারস্যের দ্বিতীয় আব্বাস শাহকে চিঠি লিখে আবেদন করলেন, কর্ণাটকের রাজনৈতিক অবস্থা তাঁর টিকে থাকার যদি জন্য খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে পারস্যে চলে যেতে ইচ্ছুক। উত্তরে শাহ জানালেন যে তাঁর সব স্মরণ রয়েছে এবং উপযুক্ত সময় এলে তিনি তাঁকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু বাস্তবে ইরাণের শাহ, কুতুব শাহের বিরুদ্ধে মীর জুমলার যাওয়া সমর্থন করলেন না এবং তিনি মনে করলেন যে কুতুব শাহের সঙ্গে মীর জুমলা যেন সমস্ত বিরোধ মিটিয়ে নেন।

মীর জুমলার কাছে শাহের উত্তর অনেক পরে এল এবং এই ভাসা ভাসা উত্তর দেওয়ায় চিঠিটির বক্তব্য তাঁর মনোমত হল না। তাঁর ধারণা হচ্ছিল যে পারস্য থেকে ঠিক সময়ে তাঁর জন্য সাহায্য আসবে না। তিনি কোন ধন্ধে না থেকে তাঁর আশেপাশের পরিবেশ থেকে সুরক্ষা খুঁজতে শুরু করলেন। প্রথমে তাঁর প্রভুর একদা শত্রু রয়ালের বন্ধুত্ব চাইলেন। তিনি মনে করলেন তাঁর ঠিক পাশের শাসকই তাঁর সুরক্ষার সত্যিকারের উৎস হতে পারেন – সেজন্য তিনি যে কোন আক্রমনের হাত থেকে তাকে বাঁচাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমর্থন আদায় করলেন। ইতিমধ্যে কুতুবের বিরোধিতার অবস্থা আন্দাজ করে, বেশ কিছু যোগ্য সুলতানি সেনাপতিকে তিনি নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বিজাপুরের আদিল শাহকে জানালেন যে তিনি তাকে কর্ণাটক উপহার হিসেবে তুলে দিতে চান। আদিল শাহ স্বপ্নেও ভাবেন নি, মালিক অম্বরের মত যোগ্য সেনানায়কের পরে দাক্ষিণাত্য এ ধরণের উপযুক্ত দক্ষ কর্মচারী পাবে।

এই ধরণের কুশলী কূটনৈতিক চালে তিনি সুলতানের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে নিজেকে বাঁচাবার ব্যবস্থা করলেন যাতে নতুন ধরণের একটা স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে তুলতে পারেন। তিনি গোপনে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করলেন। তিনি যদি আগেই উতসাহী হতেন তাহলে হয়ত তাকে সাহায্যের জন্য মুঘলেরা উতসাহী হয়ে উঠতে পারত। আওরঙ্গজেব ভাবলেন মীর জুমলার মত উপযুক্ত মন্ত্রী যদি তাঁর অধীনে চলে আসে, তাহলে এই সম্পদশালী রাজ্যটি দখলের তাঁর সুপ্ত বাসনা বাস্তবে রূপ পেতে পারে। ওয়ান্ডিওয়াস দখলের সময়েই তিনি মীর জুমলাকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, পাশে পেতে। মীর জুমলা এই বার্তা অবলম্বন করে আওরঙ্গজেবের দূতকে জানালেন ‘যোগাযোগ, বন্ধুত্ব এবং ভালবাসার সমস্ত দরজা খোলা থাকবে’।

সুলতান এবং উজিরের লড়াইএর অবস্থা অনুধাবন করে আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডায় মুঘল হাজিব মুইজ্জুলমুলকের ভাই আব্দুল লতিফকে বাস্তব অবস্থা অবস্থা বুঝতে গোপনে চিঠি লিখলেন। মীর জুমলা তাঁর এতদিনের রক্ষণাত্মক অবস্থার মোড়ক ভেঙ্গে, সাম্প্রতিক শত্রুদের বিরুদ্ধে কূটনৈতিভাবে আক্রমণাত্ম হওয়ার পরিকল্পনার ছক তৈরি করলেন। আদিল শাহের হাতে নিদারুণ হার, এবং গাণ্ডিকোটা উপহারের ফলে লুটোনো সম্মান উদ্ধারের হাতিয়ার হল চরম কূটনৈতিক চাল। বিজাপুরী সেনানায়ক খান মহম্মদকে জিঞ্জির হয়ে যাওয়ার অনুমতি না দেওয়া, মহীশূরের সঙ্গে চক্রান্ত করা এবং রয়ালের সঙ্গে যেচে বন্ধুত্ব এই সবই তাঁর কূটনৈতিক চাল হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে তাঁর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপটি হল রয়ালের হয়ে আওরঙ্গজেবের মার্ফত গোপনে মুঘল শক্তির সঙ্গে সমঝোতার রাস্তা খোলার কাজ। যাহুর লিখছেন, ‘ভেল্লোর দূর্গে শ্রীরঙ্গ ঝামেলা তৈরি করলেন, এবং তিনি মীর জুমলার সঙ্গে চিঠি আদানপ্রদান করে ঠিক করলেন যে তিনি এবং তাঁর উকিল মার্ফত মুঘলদের --- পেশকাশ দেবেন। এই বিষয়ের সমস্ত দায় সামলানোর ভার মীর জুমলা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তিনি রাজার হয়ে মুঘলদের সমস্ত রকম প্ররোচনা দিতে শুরু করলেন।’ ১৬৫৩ সালে মীর জুমলার মন্ত্রণায় রয়াল, গোপনে তাঁর ব্রাহ্মণ দূত শ্রীনিবাসকে আওরঙ্গজেবের হয়ে পাদশাহের উদ্দেশ্যে চিঠি লিখে পাঠালেন এই সমঝোতায় যে তিনি শুধু যে ইসলাম গ্রহণ করবেন তাই নয়, বছরে ৫০ লক্ষ হুণ, ২০০টি হাতি এবং কিছু দামি অলঙ্কার উপঢৌকন হিসেবে দেবেন, তাঁর বদলে তিনি সুলতানের থেকে সুরক্ষা দাবি করেন।

এই পদক্ষেপে মীর জুমলা যে তাঁর দুর্দিনে শুধু রয়ালের আনুগত্য অর্জন করলেন তাই নয়, তিনি আদিল শাহ এবং তাঁর নিজের সুলতান কুতুব শাহের বিরুদ্ধেও কূটনৈতিকভাবে কয়েক কদম এগিয়ে গেলেন। মীর জুমলার মধ্যস্থতার দৌত্য আওরঙ্গজেবের কাছে দাক্ষিণাত্যে নতুন সম্ভাবনা দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। রয়ালের ইসলামে রূপান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব যেমন আওরঙ্গজেবকে সাহায্য করল দক্ষিণে আরও বড় করে ইসলামের ছত্র বিস্তারের কাজে তেমনি কর্ণাটকের যুদ্ধের লুঠতরাজের পরে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুই সুলতানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কাজ করল যাতে তারা তাকে এত দিন না দেওয়া পেশকাশ ঠিকঠাক পরিমানে দেন। মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে রয়ালের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার মানে, শুধু যে ইসলামের বিস্তার তাই নয়, বিপুল সম্পদ অর্জনের পথ খোলা। এ ছাড়াও নিজের দিকে মীর জুমলাকে টেনে আনার সুযোগও তৈরি হল।

আওরঙ্গজেব তাঁর হাজিবকে মীর জুমলার – যিনি বরাবরই মুঘল সাম্রাজ্যের সভায় আনুগত্য দেখিয়েছেন, সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য দায়িত্ব দিলেন, এবং নির্দেশ দিলেন প্রয়োজনে বদান্যতা প্রদর্শন করতে, যাতে মীর জুমলা সাম্রাজ্যের সেনা বাহিনীর অংশ হয়ে ওঠেন। এর সঙ্গে তিনি মীর জুমলার সম্পদ এবং তাঁর বাহিনীর বিষয়ে সমীক্ষাপত্র পেশ করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি চেষ্টা চালালেন যাতে পাদশাহ নিজে মীর জুমলাকে নিজের দিকে আনার জন্য উতসাহী হন। কেননা পাদশাহের হাত বাঁধা ১৬৩৬ সালের আহদ(চুক্তি) অনুযায়ী, যে চুক্তিবলে তাঁর পক্ষে সুলতানের কোন আধিকারিককে সাম্রাজ্যের কাজে(ফুসলে) নেওয়ার সুযোগ ছিল না। দারাও মীর জুমলাকে মুঘল বাহিনীতে নেওয়ার বিরোধী মত প্রকাশ করে। আওরঙ্গজেবের যুক্তি ছিল মীর জুমলা গোপনে বহুবার তাঁর আবেদন পেশ করেছেন যাতে তাকে সাম্রাজ্যের অংশ করে নেওয়া হয় এবং তিনি তাঁর প্রাণ দিয়ে সাম্রাজ্যের সেবা করবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর আগেও যতদূর সম্ভব মীর জুমলার দূত ঈমান ওয়ার্দি বেগ সম্রাটের কাছে একই আবেদন পেশ করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত মীর জুমলার সাম্রাজ্যের প্রতি আত্মনিবেদনে সন্তুষ্ট হয়ে সম্রাট তাকে সান্ত্বনা দিয়ে আওরঙ্গজেবকে নির্দেশ দিলেন যে তাঁর জন্য যা কিছু করার দরকার, করতে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত সরাসরি পাদশাহ মীর জুমলাকে সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে নেওয়ার কোন প্রতিশ্রুতি দেননি। সম্রাটের বার্তা পেয়ে তৎক্ষণাৎ আওরঙ্গজেব মীর জুমলার সাহায্য এবং সুরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী মুঘল বাহিনী পাঠিয়ে দেন এবং নিশ্চিত করেন কোনভাবেই যেন সুলতান তাকে মুঘল পক্ষে যোগ দিতে বাধা সৃষ্টি না করতে পারেন।
(চলবে)

Wednesday, December 21, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৭ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

১৬৫৩-৫৫ সালে সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার সময় তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হন নি। বরং তাদের সঙ্গে ব্যবসা করে তাঁর নিজস্ব ব্যবসাজাত সম্পদ বাড়ানোর কাজ করে গিয়েছেন। একই সঙ্গে জাতপাত নিয়ে কোম্পানির আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব তৈরি হল(এপ্রিল ১৬৫৫) সেখানে প্রথমে তিনি প্রবেশ করতে চাননি, এমন কি তারা তাঁর সাহায্য চাইলেও তিনি সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অস্বীকার করেন; আবার মাদ্রাজ কাউন্সিলে কোম্পানির মধ্যে এই বিষয় নিয়ে মতদ্বৈধ তৈরি হলে, তাকে তিনি কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশেরা যাতে চন্দ্রাগিরির রাজাকে সাহায্য না করতে পারে, সে বিষয়ে তিনি উদ্যোগী হয়ে ওঠেন। আদতে তিনি নিজের এবং গোলকুণ্ডার সুলতানের অবস্থাকে আরও দৃঢ করতে চাইছিলেন। ব্রিটিশ আর মীর জুমলার মধ্যে এই যে ছোট ফাটল তৈরি হল তা আগামী দিনে চওড়া ফাটলের রূপ পরিগ্রহ করবে।

৭। পর্তুগিজদের সঙ্গে সম্পর্ক
কর্ণাটকে থাকাকালীন মীর জুমলার সঙ্গে গোয়ার পর্তুগিজ শাসক দোম ফিলিপি ম্যাস্কারহান্সের(১৬৪৫-৫১) সম্পর্ক ‘অসাধারণ বন্ধুত্বপূর্ণ’ ছিল। তাদের মধ্যে চিঠি চালাচালি এবং নিয়মিত উপহার আদান প্রদান হত। তাকে দেওয়া পর্তুগিজ হস্তাবরণ, বক্ষাবরণী বা শিরস্ত্রাণের উচ্ছসিত প্রশংসা করতেন মীর জুমলা এবং যুদ্ধে তিনি প্রায়শই সেগুলি ব্যবহারও করতেন। তাঁর বিনিময়ে তিনি কর্ণাটকের হিরের খনি থেকে তোলা ভাল হিরেগুলি পর্তুগিজ প্রশাসককে পাঠাতেন, এমন কি তিনি তাঁর কাছে তাঁর শ্রেষ্ঠ রত্নগুলির কিছু বিক্রিও করেছেন। তাঁর শাসন কালে মীর জুমলা পর্তুগিজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছেন, যাতে প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তাদের শক্তি তিনি ব্যবহার করতে পারেন।

কিন্তু কর্ণাটক বিজয় যাত্রায় পর্তুগিজ উপনিবেশ স্যান থোমকে কিন্তু মীর জুমলা ছেড়ে কথা বলেন নি। তিনি সেই শহরটি অবরোধ করে রাখেন বহু দিন এবং তাঁর কর্মচারীরা শহরের বাইরের বহু বাগান এবং জমি দখল করে তাদের প্রভুকে না দেওয়া খাজনা উসুল করে নেয়। ১৬৫১ সালের জানুয়ারি মাসে ভেঙ্গে দেওয়া পর্তুগিজ চার্চ বানিয়ে দেন কিন্তু তাঁর রাজস্ব বছরে ২০০০ রিয়াল আদায়ের সিদ্ধান্ত বজায় রাখে। ব্রিটিশদের বিশ্বাস ছিল, বহুকাল ধরে চলা, চার্চের বাইরে হিন্দু কোন মূর্তির শোভাযাত্রা বন্ধ করে দেওয়ায় তিনি এই জরিমানা করেন।


তৃতীয় অধ্যায়
মীর জুমলার বিদ্রোহ

১। মীর জুমলা এবং কুতুব শাহের মধ্যে বিরোধের কারণ
কর্ণাটক বিজয়ে মীর জুমলার চরিত্র বদল ঘটল। এর আগে তিনি ছিলেন এক ক্ষমতাহীন সুলতানের সভাসদ এবং কর্মচারী মাত্র – কিন্তু বিজয়ের পরে তাঁর প্রভুর থেকে যথেষ্ট দূরত্বে থেকে এই কর্মচারীই হয়ে উঠলেন স্বাধীন এবং ক্ষমতাবান শাসক। বার্নিয়ে সূত্র ধরে বলা যায় তাঁর কর্মচারীর প্রতি সুলতানের স্বাভাবিক ঈর্ষা বরাবরই জগ্রত ছিল। ইওরোপিয় ঐতিহাসিকদের বক্তব্য কুতুব শাহ ক্রমশঃ তাঁর উজিরের ক্ষমতা এবং অবস্থায় চিন্তিত হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু এটা বলা বোধহয় ঠিক হবে না যে সুলতান, কর্ণাটক জয়ের পর তাঁর উজিরের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রথমে নিজের ক্ষমতা হ্রাস বিষয়ে চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

আমরা আগেই দেখেছি, মীর জুমলার সাফল্যে উত্তেজিত হয়ে তাঁর প্রতি সমস্ত রকমের সুযোগ সুবিধে বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বহু পরের দিকে পারস্যের সুলতানকে লেখা এক চিঠিতে গোলকুণ্ডার সুলতান আক্ষেপ করে লিখছেন, তিনি যে চারাগাছটি, দুঃসাহসিক অভিযাত্রী মীর মহম্মদ সঈদ রূপে রোপণ করেছেন, সেটি এখন বিপুল বিশাল মহীরুহ হিসেবে গোলকুণ্ডার উজির মীর জুমলায় পরিণত হয়েছে – এবং তিনি অবাক হয়ে যাচ্ছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে মীর জুমলা বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করছেন। উজিরের প্রতি সুলতানের যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা যে খুব স্বাভাবিক ছিল এবং মীর জুমলার উচ্চাকাংখাই যে তাকে এই ঈর্ষার দিকে ঠেলে দিয়েছিল তা বলা যাবে না। বরং মীর জুমলার অমেয় সম্পদ, ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে, তাঁর স্তরের সভাসদেদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারে ক্ষিপ্ত হয়ে দাক্ষিণাত্যের বেশ কিছু সভাসদ সুলতানের কান ভারি করতে থাকেন যে মীর জুমলা তাঁর ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে চাইছেন। যদিও মীর জুমলা স্বাভাবত দুর্বিনীত চরিত্রের মানুষ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর ক্ষমতায় আরোহনের দরুণ তিনি কিছুটা নিজের খোলসে ঢুকে পড়তে থাকেন এবং তাঁর জন্য তাকে তাঁর স্তরের মানুষেরা মনে করতে থাকেন তিনি তাদের এড়িয়ে চলছেন।

মীর জুমলার ক্ষমতায় হিংসয় জ্বলেপুড়ে তাঁর বিরোধীরা, তাঁর অনুপস্থিতিতে সুলতানের কানে তাঁর উজিরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের কল্পনামূলক কাহিনী রচনা করে তাঁর মন বিষিয়ে দিতে থাকেন। সেই সময়ে ভারত ভ্রমণে আসা কিছু ইওরোপিয় লেখক সূত্রে জানা যায় যে মীর জুমলা এবং সুলতানের মা হায়াত বক্সী বেগমের অস্বাভাবিক সম্পর্ক নৈকট্য সুলতান খুব স্বাভাবিকভাবে নেন নি, এবং একে তিনি তাঁর পরিবারের সম্মান হানিরূপে গণ্য করেছিলেন এবং এই জন্য ক্রমশঃ তিনি তাঁর উজিরের থেকে দূরে সরে গিয়ে থাকতে পারেন। হাদিকতউসসুলতানের লেখক নিজামুদ্দিন আহমদ সিরাজি লক্ষ্য করছেন যে সুলতানের মায়ের বেশ কিছু ব্যক্তিগত এবং প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সরইখাহিল সম্পাদন করে দেওয়ায় প্রায়ই তাঁকে তিনি বহুমূল্য উপহারে সজ্জিত করতেন এবং তাঁর উত্তরে তিনিও কিছু উপহার পাঠাতেন সুলতানের মায়ের উদ্দেশ্যে। এই উপহার দেওয়া নেওয়া গোপনে না হওয়ায় এই দেওয়া নেওয়ার ওপরে জনগণের দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে থাকে এবং এই সম্পর্কটি যে খুব স্বাভাবিক নয় এমনভাবে দেখা হতে থাকে। দুজনেই তখন মধ্য বয়স পেরিয়ে গিয়েছেন। আর মীর জুমলা সভা থেকে দূরেই থাকতেন। এবং মীর জুমলার ব্যক্তিগত চরিত্র এই ঘটনার সঙ্গে খাপ খায় না। এবং এটির সপক্ষে কোন উপযুক্ত প্রমানও পাওয়া যায় নি, অতএব, একে আমরা কুৎসাকারীদের স্বকপোলকল্পিত গুজব রটনা হিসেবেই দেখতে পারি, এর বেশি কিছু নয়। বাস্তবে মীর জুমলা এবং সুলতানের দুজনের সম্পর্ক জড়িয়ে যে কুতসার বাতাবরণ গড়ে উঠেছিল, তা সে সময়কার ঈর্ষান্বিত সভাসদেদের উতসাহী রটনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাভার্নিয়ে সূত্রে জানছি, ঈর্ষান্বিত সভাসদের সুলতানকে বললেন, ‘মীর জুমলা যে ধরণের ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত করছেন, তাতে যে কোন সময়ে তিনি সুলতানের সিংহাসন কেড়ে নিতে পারেন এবং গোলকুণ্ডা রাজত্বে সুলতানকে হঠিয়ে মীর জুমলা তাঁর পুত্রকে বসিয়ে দিতে চাইছেন, এবং তাই সুলতানের পক্ষে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকা দুর্ভাগ্যকে সসম্মানে ডেকে আনার মত হবে এবং সেই দিনের দিকে তাকয়ে তিনি যেন অপেক্ষা করে বসে না থাকেন – কেননা সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ওঠার সব থেকে ছোট্ট রাস্তা হল শুধু সুলতানকেই সরিয়ে দেওয়া।’

মুঘল সম্রাটের উজির পদে বৃত হওয়ার পর পাদশাহ শাহজাহান কুতুব শাহকে যে চিঠিটি লেখেন তাতে মীর জুমলার বিদ্রোহের কারণের সমস্ত ইঙ্গিত ধরা রয়েছে এবং এই চিঠিতে সম্রাট, এ ধরণের যোগ্য শাসককে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কুতুব শাহের মুর্খতা এবং তাঁর প্রজ্ঞাকে পরোক্ষাভাবে দোষী ঠাউরেছেন। সম্রাট লিখছেন, ‘আজকের দিনে অভিজ্ঞ এবং কর্মক্ষম কর্মচারী পাওয়া খুব কঠিন বিষয়, বিশেষ করে মুয়াজ্জম খাঁয়ের মত, যিনি যে কোন দক্ষতম উজিরের মত আমার সভা উজ্জ্বল করতে পারেন। তাঁর দক্ষতা স্বীকার করা এবং মেনে নেওয়া অতীব প্রয়োজন।’ শাহজাহান আরও লিখছেন, ‘স্বউদ্যমী মানুষের পক্ষে শত্রুদের পরামর্শে কান দেওয়া অনুচিত বলে আমি মনে করি, কেননা ভুল পরামর্শ দাতারা তার ফলে প্রভুর কোন উপকার করতে পারে না এবং তাকে ভালও রাখতে পারে না, শুধু তারা স্বস্বার্থ সম্পাদনে লেগে থেকে বন্ধুদের শত্রুতে পরিণত করে, ফলে (এই মানুষদের থেকে দূরে থেকে) নিজের জীবন, পরিবার, সমাজের সম্মান রক্ষা সক্কলের সামূহিক কর্তব্য।’

মীর জুমলার গাণ্ডিকোটা দখলের(১৬৫০) পরই প্রথম সুলতান এবং উজিরের মতপার্থক্য সর্বসমক্ষে চলে এল। কর্ণাটক দখল এবং ভাগ করা নিয়ে দুই সুলতানের মধ্যেকার যুদ্ধে(১৬৫১-৫২) মীর জুমলার হার এবং গাণ্ডিকোটার নিয়ন্ত্রণকে কুতুব শাহের হাতে না দিয়ে আদিল শাহের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তেই গোলকুণ্ডার সুলতানের সঙ্গে তাঁর উজিরের প্রথম সম্পর্কের মধ্যে ফাটল হিসেবে ধরা যায়। স্যার যদুনাথ সঠিকভাবেই এই সূত্রটি সম্বন্ধে বলছেন, ‘উজিরের জয়ের ফসল তুলতে চেয়েছিলেন স্বাভাবিকভাবেই কুতুব শাহ। কর্ণাটক দখলে এই দুজন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কাজ করেছেন। কিন্তু তারা জয়ের পরে লাভের অঙ্ক নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পরলেন। কুতুব শাহ, মীর জুমলাকে সাধারণ কর্মচারীর মত বিচার করতে চাইলেন। এবং মীর জুমলার বিজয় করা অঞ্চলকে দখল করতে চাইছেন সুলতান এমন একটা ধারণা তৈরি হল। অন্য দিকে মীর জুমলা জানেন, যে সুলতানের অধীনে কাজ করছেন, তিনি কত দুর্বল এবং ক্ষমতাহীন, এবং যে যুদ্ধটি তিনি জিতেছেন সেটি সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজের কৃতিত্ব এবং সেই ফল তিনি নিজেই ভোগ করবেন। কর্ণাটকে প্রায় স্বাধীন জীবনযাপন করার পরে সুলতানের সভাসদ হিসেবে ফিরে যাওয়া খুব সম্মানের কাজ ছিল না।’ তাঁর কর্মের প্রতিফল হিসেবে যে পদ তাকে দেওয়া হল, তাতে তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হলেন এবং জয় করা এলাকা ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। ইংরেজ কুঠিয়াল লিখছেন, তিনি চাইলেই প্রকৃতপক্ষে মহান রাজা হতে পারতেন। ক্ষিপ্ত সুলতান মীর জুমলার পাঠানো জয়ের চিঠিকে তার উজিরেরই কৃতিত্ব বুঝে, তাঁর কর্ণাটকীয় স্বাধীনতার ভিত্তি কেড়ে নিতে উদ্যোগী হলেন। লিখিত সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে, ১৬৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত চিঠি চালাচালি সূত্রে কিন্তু সুলতান এবং মীর জুমলার মধ্যে কোন বিরোধের সূত্র পাওয়া যাচ্ছে না বরং মীর জুমলাকে বলা হচ্ছে সুলতানের কর্মচারী(এজেন্ট)। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই সেন্ট জর্জের কুঠিয়ালেদের লেখায় দেখা যাচ্ছে যে সুলতানের বিরুদ্ধে মীর জুমলা অস্ত্র তুলে নিয়েছেন।

তাঁর ক্ষমতার প্রতিস্পর্ধী হিসেবে মীর জুমলাকে চিহ্নিত করে কুতুব শাহ তাঁর উজিরকে তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারীরূপে নয়, তাঁর প্রতিস্পর্ধী রূপে চিহ্নিত করলেন এবং উন্মুখ হয়ে নিরবে তাকে ধ্বংস করার এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্যোগ নিলেন। তাঁর সঙ্গে ঘৃতাহূতি পড়ল তাঁর সভাসদেদের বারে বারে তাঁর শয়তান প্রতিস্পর্ধীকে, দেরি না করে সমূলে ক্ষমতাচ্যুত করার উত্যক্ত মন্ত্রণা। তাঁর পাশে উজিরের শুভচিন্তকরা যেহেতু সর্বক্ষণ ঘিরে থাকে, তাই সুলতান মীর জুমলা বিরোধী মনোভাব লুকিয়ে চলতে লাগলেন, কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাত হঠাত করে তাঁর বিরুদ্ধে তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটত। কর্ণাটকে বসে থাকা মীর জুমলাকে স্বয়ং তাঁর নিজের এবং তাঁর স্ত্রীয়ের পরিবারের আত্মীয় এবং সভায় তাঁর শুভার্থীদের অবস্থা জানানো হল।

কুতুব শাহের কবল থেকে মীর জুমলার মুক্তির অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায় শিবাজীর বিজাপুর উদ্ধারের ভাবনাকে। তবে এটা কতটা তুলনীয় তা বলা কঠিন। শিবাজীরকে চেষ্টা ছিল জাতীয় স্তরের স্বাধীনতা আনয়ন করা এবং ঐতিহাসিকতায় পরিপূর্ণ, উল্টো দিকে মীর জুমলার স্বাধীনতার উদ্যম কিন্তু নিজের, ব্যক্তিগত; এটা মন্তব্যই করা যায়।
(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৬ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। অবস্থা সামাল দিতে কোম্পানির চেষ্টা
মছলিপত্তনমের হতবুদ্ধিকর অবস্থা সামাল দিতে বিজয়নগর রাজ্যের তটের আরও দক্ষিণের নিরাপদ এলাকায় দিকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশেরা এবং তাঁর জন্য প্রয়োজন সুলতানের থেকে নতুন করে ফর্মান সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত হল, যাতে তারা নতুন এলাকায় অবাধে ব্যবসার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর প্রথম পদক্ষেপ হল ফোর্ট জর্জের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনা এবং দ্বিতীয়টি, সুরাট থেকে গোলকুণ্ডায় এন্ড্রু কোগানের আগমন।

এন্ড্রু কোগানকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে নানানভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন মীর জুমলা, সরইখাহিল। মীর জুমলার এই চরিত্র কোগানের কাছে নতুনভাবে প্রতিভাত হল; বিশেষ করে মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালেরা তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে এত দিন তাঁকে যা জানিয়েছিল, তিনি দেখলেন মীর জুমলা তার বিপরীত চরিত্রের। কোগান, মীর জুমলাকে একটা দামি রত্ন দিলেন(আম্বারগিজ) এবং বিরক্ত হয়ে লিখলেন(বান্টামকে ৩ সেপ্টে ১৬৩৯) কোন দিন যদি কোম্পানির সরইখাহিলকে দরকার পড়ে তাহলে তিনি(মীর) তাদের হয়ে কথা কইবেন। মীর জুমলা মছলিপত্তনমের প্রশাসককে একটি বিশেষ পত্র লিখলেন এবং কোগানকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার আদেশ দিলেন।

৫। কর্ণাটক দখলের পরে ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক
কর্ণাটক দখলের পরে পূর্ব উপকূলের ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্কের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশেরা হঠাই দেখল এতদিন যে ব্যক্তি তাদের প্রশাসক এবং বাণিজ্য প্রতিযোগী ছিল, তিনি হঠাতই তাদের রাজা হয়ে বসেছেন। মীর জুমলার ভয়ে এবং তাঁর মন্ত্রীদের ঘন ঘন নজরদারির ফলে তারা ঠিক করল সেন্ট জর্জের প্রতিরক্ষা বাড়ানোর দরকার। কিন্তু মীর জুমলা তক্ষুনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোন আক্রমনের ইঙ্গিত না দেখিয়ে তাদের প্রতি বন্ধু ভাবাপন্ন মনোভাব দেখালেন। ব্রিটিশদের পক্ষেও মীরের পক্ষ্মপুটে আশ্রয় নেওয়া জরুরি ছিল। অতীতের হিন্দু শক্তি তাদের যে সব ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধে দিত, সেগুল্কি নতুন সরকার তাদের দেবে কিনা এই প্রশ্নে তারা খুবই চিন্তিত ছিল। যুদ্ধের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল যে কর্ণাটকে ক্ষমতার ভার কেন্দ্র বিজয়নগর থেকে গোলকুণ্ডায় স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে এবং সেই তত্ত্ব বুঝেই মাদ্রাজে ব্রিটিশ দূত আইভি(আগস্ট ১৬৪৪-সেপ্ট ১৬৪৮), তড়িঘড়ি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চাইলেন। ১৬৪৬ সালে মীর জুমলা যখন মাদ্রাজের কাছে স্যান থোম অবরোধ করেছেন তখন ব্রিটিশেরা তাকে গোলান্দাজ এবং পদাতিক সেনা দিয়ে সাহায্য করে। প্রতিসৌজন্যে মীর জুমলা গোলকুণ্ডার সুলতানের পক্ষ থেকে বর্তমান কাউল(মাদ্রাজ দখল রাখার ফর্মান) এবং অন্যান্য সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেন(জুন ১৬৪৭)।

পুলিকটের ডাচেরা তাদের বাণিজ্য সুবিধে বজায় রাখল মীরেরে নতুন আমলে সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে পেল আররও বেশি কিছু অর্থের সুযোগ সুবিধে। আর হিন্দু রাজত্বের তুলনায় তাঁর সময়ে পর্তুগিজেরাও অতিরিক্ত কিছু সুযোগ পায়। ১৬৪৮ সালে মছলিপত্তনমে মীর জুমলার একটি জাহাজ ঝড়ে ভেঙ্গে পরায় তিনি ব্রিটিশ বা ডাচ জাহাজগুলিকে তাঁর ব্যবসায় কাজে লাগাতে উদ্গ্রীব ছিলেন।

৬। মীর জুমলার কাছে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির দৌত্য
১৬৫০-৫১ সালের কাছাকাছির সময়ে তিনি নিজের বস্ত্রের একচেটিয়া বাণিজ্য সফল করতে গিয়ে ডাচেদের নাছোড় বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় বিরক্ত হয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত হলেন। ঠিক হল এবার থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি তাঁর দালাল মার্ফত বস্ত্র কিনে পারস্য এবং অন্যান্য এলাকায় বাণিজ্য করে তাঁর সঙ্গে লভ্যাংশ ভাগ করে নেবে।

গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলা ১৬৫০ সালে ডাচ দূতের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেন; কিন্তু ভেঙ্কট ব্রাহ্মণের ব্রিটিশ দৌত্য স্বীকার করলেন। তিনি ব্রিটিশদের বললেন তাঁর সঙ্গে বাণিজ্যের হাত বাড়ালে ব্যাপক লাভ করতে পারবে এবং সমগ্র বাণিজ্যকেও খবরদারি করতে পারবে – অর্থাৎ সেভাবে তিনি এলাকার সমগ্র বস্ত্র উতপাদন নিজের আওতায় নিয়ে এসেছেন, দাম এবং উতপাদন নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক সেইভাবেই ব্রিটিশেরা তাঁর গুদাম থেকে কাপড় নিয়ে একচেটিয়াভাবে সেই কাপড় উপকূল জুড়ে ব্যবসা করতে পারে। এ ছাড়াও তিনি সূক্ষ্মভাবে ব্রিটিশদের সঙ্গে ডাচেদের লড়িয়ে দিতে বললেন, ডাচেরা করমণ্ডলের বস্ত্র উতপাদনের পুরোটা কিনে নিয়ে এবং সেগুলি কম বিক্রি করে ব্রিটিশদের ভাতে মারতে চাইছে। কুঠিয়াল গ্রেনহিল মীর জুমলার উত্তরে একই দূত ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে এবং আরও একটা দৌত্যে ওয়াল্টার লিটলটনকে পাঠালেন ১৬৫০এর ডিসেম্বরে। তাদের যৌথ সমীক্ষায়(১৭ জানু, ১৬৫১) অঙ্গীকার করে জানালেন যে মীর জুমলার ব্রিটিশদের প্রতি আগ্রহ, ভালবাসা আন্তরিক, এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকালীন চুক্তিতে যেতে চান। এবং কোম্পানির ব্যবসাকে সুদ-মুক্ত অর্থ ধার(৫০ থেকে ৬০ হাজার প্যাগোডা) দিয়ে সাহায্য করতে চান। তাদের ধারণা হল মীর জুমলার সঙ্গে এই চুক্তিতে যাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানির পক্ষে শুভকর হবে এবং ডাচেদের বাণিজ্য উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি এবং উপহারস্বরূপ ৩০০টি লং ক্লথ এবং সালামপুর কাপড় দূতেদের দেন।

এতদিন ডাচেদের ব্যবসা সঙ্গ করে হঠাতই তিনি সিদ্ধন্ত নিলেন ব্যবসায় ব্রিটিশদের হাত ধরার। কর্ণাটক লুঠের সম্পদে তিনি এখন ব্রিটিশদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারেন, যা তাকে আরও বেশি লাভের মুখ দেখতে সাহায্য করবে। এবং এইভাবে তিনি কোম্পানিকে বোঝাতে পারবেন তিনি তাদের শুভ চিন্তক এবং কোন ঝামেলায় পড়লে তিনি তাদের আনুগত্য ব্যবহারও করতে পারবেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি ১৬৫১ সালে দূত এবং কাউন্সিল উভয়েই মীর জুমলার উদ্দেশ্য, চুক্তি সম্বন্ধে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হতে পারল না। তারা সিদ্ধান্ত করল, তারা শুধু একটি বিষয়ে মীর জুমলার সঙ্গে একমত হচ্ছে, দাম পরে ঠিক করার শর্তে ইওরোপ থেকে আসা সব পণ্য মীর জুমলা নিলে তাঁর বদলে তাঁর গুদামের কাপড় ব্রিটিশ কিনবে। তবে যত দিন না প্রেসিডেন্ট বেকার সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, ততদিন তাঁরা কোন চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হবে না। এবং যদি কোম্পানি মীর জুমলার প্রস্তাবে সম্মত হয়, তাহলে তারা চাইবে কোম্পানি দূত এবং প্রেসিডেন্টকে নবাবের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষমতা অর্পন করুক। ১৬৫১ সালের জানুয়ারিতেই গোলকুণ্ডায় নবাবের সঙ্গে আরেকটা দৌত্যে পাঠানো হল ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে দুটি তথ্য জানতে যে পরের জাহাজে নবাব কি ধরণের ইওরোপিয় পণ্য চাইছেন এবং মীর জুমলা যে কাপড় কোম্পানিকে দিয়েছেন, তাঁর দাম কি হতে পারে।

কোম্পানির জবাব এক এক বছর পর। জাজানো হল মীর জুমলার দালালদের থেকে সমগ্র দ্রব্য কেনার প্রশ্নে তারা কোন প্রতিশ্রুতি দিতে অপারগ। তবুও তারা মীর জুমলার দাদলদের থেকে গুরুত্ব দিয়ে বস্ত্র কেনার সুযোগ খুলে রাখছে, কিন্তু এর জন্য তারা কোন ছাড় দতে রাজি নয়। ১৬৫২র গ্রীষ্মে, লিটলটন এবং ভেঙ্কট আবার দৌত্যে গেলেন মীর জুমলার সভায় যতদূর সম্ভব কোম্পানির উত্তর নিয়ে, এবং সেখানে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সদ্ভাব পেল। তারা জানাল কুঠিয়ালেরা মীর জুমলার দালালদের যে ছাড়গুলি দিয়েছিল, কোম্পানি সেগুলি বাতিল করেছে। কিন্তু মীর জুমলার অনুরোধ যেহেতু তাদের কাছে আদেশের সমান, আগামী দিনে তাদের সমস্ত ভুলগুলিকে সংশোধন করে পুরোনো দামে উপনীত হওয়া যায় কি না সে সিদ্ধন্তে তারা উপনীত হতে চাইছে।

১৬৫১-৫২ সালে ডাচেরা ড্রিক স্টুয়ারের দৌত্যে একলপ্তে বিপুল পরিমান অর্থ দিয়ে নতুন কিছু শহর ভাড়ায় তাদের আওতায় আনা যায় কি না, বাণিজ্যে তাদের আরও ছাড় দেওয়া যায় কি না এবং আগামী দিনে তাদের বাণিজ্যে কাস্টম শুল্ক ছাড় দেওয়া যায় কি না সেবিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালাতে আসে। মীর জুমলা নিজে কোন সিদ্ধন্ত না নিয়ে সে সময়ে গাণ্ডিকোটায় থাকা সুলতানের দরবারে তাদের সমস্ত আবেদন বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে পুলিকটে আরও বেশি সুরক্ষা বাড়ানোর প্রশ্নে সটান না করে দিলেন। অথচ তিনি ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সেন্ট জর্জকে আরও সুরক্ষিত করার সম্মতিও দিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিও থাকল ব্রিটিশরা যাতে তার ক্ষমতাকে প্রতিস্পর্ধা দেখানোর মত করে বেড়ে উঠতে না পারে। এর প্রতিফলন ঘটল তাদের ব্যাঙ্কশাল তৈরির জরিমানায়। যদিও ব্রিটিশদের মীর জুমলা খড়ের বদলে চুনা পাথরের ব্যাঙ্কশাল করতে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তারা তা করেও ফেলেছিল, সেই জন্য তাদের তিনি ২০০ প্যাগোডার মত বড় জরিমানা করেন। প্রথম এংলো-ডাচ যুদ্ধে, পারস্যে, বাংলায়, জাপানে ডাচেদের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। ১৬৫৪ সালে তিনি ডাচেদের ছাড়পত্র ছাড়াই ভারতীয় জাহাজ শ্রীলংকা, আচে এবং অন্যান্য এলাকায়, যেখানে ডাচেরা প্রায় একচেটিয়া ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, পাঠানোর উদ্যম নিলেন। ডাচেরা পর্তুগিজ নিরাপত্তায় যাওয়া তাঁর একটি জাহাজ দখল করে। ডাচেদের সঙ্গে মীর জুমলার এবং মাকাসসারের রাজার সম্পরক দূষিত হয়ে পড়ে(এপ্রিল ১৬৫৪)। তাঁর জাহাজ ছাড়া না হলে তিনি পুলিকট আক্রমণ করার হুঁশিয়ারি দিলেন। তারা তাঁর জাহাজ ছেড়ে দিলে এবং অন্যান্য এলাকায় ভারতীয় জাহাজ যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁর রাগ বিন্দুমাত্র পড়ে নি। পারস্যের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা কোম্পানিকে পারস্যে আরও বড় জাহাজ পাঠিয়ে ডাচেদের বাজার মারার অনুরোধ করল।

অন্যান্য ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক এতটা তিক্ত ছিল না। তাভার্নিয়ে এবং তাঁর দলবল গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করেন ১৬৫২ সালের সেপ্টেম্বরে, সুলতানকে কিছু রত্ন বেচার জন্য। উলটে মীর বলেন তাঁর পাঁচটি রত্নভরা পুঁটলি কি ইওরোপে তাভার্নিয়ে বেচে দিতে পারবেন? এবং তিনি তাদের হয়ে গোলকুণ্ডায় তাঁর পুত্রকে চিঠ লিখে দেন।
(চলবে)

Tuesday, December 20, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৫ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

বিভাগ ৩

ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক(১৬৫৫ পর্যন্ত)

১। তাঁর নিজের পদের ভারকে কূটনীতির কাজে ব্যবহার

১৬৩৫-৩৬ পর্যন্ত মছলিপত্তনমের প্রশাসক হিসেবে মীর জুমলা ব্রিটিশেরা যে ব্যবসার সুযোগ লাভ করেছে তা উতসাহী হয়ে নজর করতেন। ১৬৩৪ সালের স্বর্ণ ফর্মান অনুযায়ী, কয়েকটি শর্তে গোলকুণ্ডা রাজ্যের সমস্ত কাস্টমস শুল্ক ছাড়ের অনুমতি পেয়েছিল তারা। এই ঘাটতি উসুল করতে মছলিপত্তনমের কৃষকদের পণ্য রপ্তানি করতে বছরে ৮০০ প্যাগোডা (৪০০ ডলার) দিতে হত। তি৮নি জানতেন এই ফর্মানটি অকার্যকর হতে পারে যদি ব্রিটিশদের ৮০০ প্যাগোডার বেশি দেয় শুল্ক হয়। তো স্বর্ণ ফর্মান হাতে নিয়ে বিনা শুল্কে ব্যবসা চালানো কোম্পানি আর তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মীর জুমলা পদক্ষেপ নিতে শুরু করলেন। তিনি ডাচেদের সঙ্গে নিয়ে এই ফর্মান অপব্যবহারের দায়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করলেন গোলকূণ্ডা রাজদরবারের সরইখাহিল আবদুল্লা খান মুজানদারানি এবং দবীর, মুল্লা ওয়ায়িসের আদালতে। তাঁর অভিযোগ ব্রিটিশদের ব্যবসাজাত কর বছরে ৮০০ প্যাগোডার বেশি। অথচ তারা ফার্মানের সুযোগ নিয়ে তা তারা দিচ্ছে না।

১৬৩৭ সালে গোলকুণ্ডার সরইখাহিল হিসেবে তাঁর রাজ্যের এই ক্ষতি পূরণের উদ্যোগ নিয়ে কঠোরভাবে স্বর্ণ ফরমানে নজরদারি চালানোর ব্যবস্থা করলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী বাস্তব এবং যুক্তি সম্মত। কিন্তু তাঁর উদ্যোগে মিশেছিল নিজের স্বার্থ সাধন, সে উদ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতি করে হলেও। গোলকুণ্ডার আধিকারিকদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও ফর্মান নিয়ে দুর্নীতি চালিয়ে গেল ব্রিটিশেরা। এই অবস্থায় দুপক্ষই অনৈতিক এবং অসাধুভাবে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে উদ্যোগী হল। কিন্তু এই অবস্থায় লাভ করলেন সব থেকে বেশি মীর জুমলাই। তাঁর সর্বময় ক্ষমতা বেআইনিভাবে প্রয়োগ করে, মীর জুমলা ব্রিটিশদের হুঁশিয়ারি দিতে শুরু করলেন, এবং ব্রিটিশেরাও বুঝতে পারল(১৬৩৮, ১৮ মে) যে তিনি সেটি করছেন শুধুই অর্থ লালসায়।

ডেনেরা সরইখাহিল মীর জুমলার বাণিজ্য জাহাজ দখল করে। তাঁর প্রতিশোধ হিসেবে ১৬৪১এর সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাস ধরে, মছলিপত্তনমের প্রশাসক সমস্ত ব্রিটিশ জাহাজ বন্দরে ভেড়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করল। ১৬৪২ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের চাহিদা পূরণ হয়ে যাওয়ায় ডেনেরা তাঁর জাহাজ ছেড়ে দিলে মছলিপত্তনমে প্রবেশ করার মীর জুমলার নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ডাচেরা এ ধরণের অবস্থা ঘটতে পারে ধারনা করেই, সবসময় নিজেদের পণ্য জাহাজঘাটায় তৈরি রাখত এবং ছোট ছোট ছিপে করে সেগুলি নিয়ে গিয়ে জাহাজ ভরত বা পাড়ে তুলত। সেন্ট ফোর্ট জর্জের কুঠিয়ালরা (সেপ্ট ১৬৪২)পরবর্তীকালে এ ধরণের ব্যবস্থা নিতে শুরু করে।

ক্রমে ক্রমে মীর জুমলা রাজ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী হিসেবে পরিগণিত হতে শুরু করলেন, যার বন্ধুত্ব আর সাহায্য যেমন ব্যবসার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির সূচক আবার তাঁর ক্রোধ ঠিক বিপরীত ক্রিয়ারও জন্ম দিতে পারে – ঠিক সেই জন্যই ইওরোপিয় কুঠিয়ালরা তাকে খুসী রাখলে যে রাজনৈতিকভাবে এবং ব্যবসায়িকভাবে ফায়দা হতে পারে তা বুঝতে পারল। ১৬৪২ সালে মীর জুমলা ডাচেদের কুঠির কাজকর্ম বন্ধ করে দেন, তাদের মশলা বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও তারা তাকে ৯জন নাবিক এবং দুটি কামান, এবং গোলকুণ্ডা রাজসভাকে ৮০০০০ রিয়াল দিল তাঁর জাহাজকে পরস্য ব্যবসার জন্য। তাঁর উত্তরে ব্রিটিশেরা তাঁর জাহাজের জন্য বিভিন্ন ধরণের পেশাদার এবং তাঁর পণ্য বিনা শুল্কে বয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। মীর জুমলা তাঁর পক্ষ থেকে তাদের বহু সময়ে নানান ধরণের সাহায্য করেছেন, কখনো অর্থ ধার দিয়েছেন, কখনো তাদের সুযোগ সুবিধে প্রত্যয়িত করেছেন, এবং কখনো কখনো তাঁর নিজের জাহাজ ব্যবহার করতে দিয়ে তিনি যে তাদের প্রতি সদয় সেই বার্তা দিতে চেয়েছেন। এইভাবে তিনি তাঁর পদকে নিজের ব্যবসার কাজে লাগিয়েছেন বিদেশিদের থেকে অনেক বেশি সুবিধে নেওয়ার জন্য।

২। ব্রিটিশদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক

মীর জুমলা কখোনো কখোন ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের থেকে অর্থ ধার করতেন, নিজের ব্যবসার ঘাটতি পূরণ করতে(যেমন হিরের খনির কাজে, ব্যবসার জন্য, জাহাজ তৈরির জন্য ইত্যাদি) এবং তাঁর নিজের জোরদার সেনা বাহিনী তৈরির স্বপ্ন সার্থক করতে। ধার উদ্ধার করা ব্রিটিশদের পক্ষে খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। ১৬৩৮র শুরুর সময় থেকে ব্রিটিশেরা মীর জুমলার থেকে ৩০০০ প্যাগোডা বা ১০৫০০ টাকা পেত। ১৬৩৯ সালের আগস্ট মাসে মছলিপত্তনমের কুঠিয়াল, গোলকুণ্ডার কুঠিয়াল এন্ড্রু কোগানকে বকেয়া উদ্ধার করতে চাপ দেয়। কোগানের বিশ্বাস ছিল নবাবকে এটি আইন মোতাবেক ধার দেওলয়া হয়েছে, যথা সময়েই পাওয়া যাবে। ১৬৪০ সালের নভেম্বরে, মীর জুমলা ধারের বন্ধক স্বরূপ তিনিটি দামি গয়না পেলেন, ২০৯৯ প্যাগোদা ধারের মধ্যে ১৯১৯ প্যাগোডা ধার শুধতে অস্বীকার করলেন।

অন্য দিকে তাঁর সম্পদের ভাণ্ডার ঠিকঠাক থাকলে মীর জুমলা ব্রিটিশদের ধার দিতে কসুর করতেন না। ১৬৪২-৪৩ সালে মীর জুমলার একচেটিয়া কারবারের দরুণ মছলিপত্তনমের ধারের বাজার প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল, তখন ব্রিটিশেরা সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা গোলকুণ্ডায় মীর জুমলার দপ্তর থেকে ৪ থেকে ৫ হাজার প্যাগোডা ধার নেবে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদে এবং এটি তারা নভেম্বর নাগাদ ফিরিয়ে দেবে। তিনি মাদ্রাজে ব্রিটিশদের, ৯ মার্চ, ১৬৪৬ থেকে, ১০০০০ নতুন প্যাগোডা ধার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, সম্ভবত এটি কর্ণাটক লুঠের সম্পদ। ১৬৪৭ সালের ২৯ জুনের আগে তারা সেটা শোধ করতে পারে নি, কিন্তু তাঁর পরে শোধ দিলে তিনি কিছু সুদ মাফ করে দেন এবং তাদের থেকে ৬৪১ প্যাগোডা দামের কাঁসার বন্দুকের মত কিছু উপহারও পান।

৩। মীর জুমলার সঙ্গে ব্রিটিশদের ঝগড়া

মীর জুমলার সঙ্গে ব্রিটিশদের সম্পর্ক শুধু উত্তমর্ণ-অধমর্ণের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল না। মীর জুমলা যেহেতু কর্ণাটক রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক ছিলেন, সেহেতু ব্রিটিশেরা মনে করত স্থানীয়দের থেকে ধারগুলি উসুল করতে ঝামেলা পোয়াতে হবে। তারা তা উসুল করতে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৬৪০ সালে গোলকুণ্ডা এবং ভিরাভাসরম থেকে দেয় ১০০০০ প্যাগোডা উদ্ধার না হওয়ার দায় চাপায় মীর জুমলার ওপর। মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালেরা তাঁর ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করতে তাঁর জাহাজ দখল করারও পরিকল্পনা নিয়ে ফেলেছিল।

মীর জুমলার সঙ্গে ওপর ওপর সুন্দর ব্যবহার করলেও তারা মনে মনে মীর জুমলাকে ঘৃণা করত এবং তিনি যে তাদের ওপর সরাসরি চাপ দিয়ে তার কাজ উসুল করে নিতে পারেন, তাও তারা বুঝত। গোলকুণ্ডার কর্মচারীরা ব্রিটিশদের স্থানীয় উতপাদকের কাছ থেকে চুক্তি মত দাদন দেওয়া পণ্য কিনতে বাধা দিত এবং এই দীর্ঘকালীন বিবাদ তিক্ততা এবং প্রায় হাতাহাতিতে গিয়ে থামত। গোলকুণ্ডার কুঠিয়াল এবং মাল্লুভুল শহরের কিছু বিষয় নিয়ে মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালের সঙ্গে মীর জুমলার বিরোধ ঘটে(ফেব্রুয়ারি ১৬৩৮)। ব্রিটিশদের সব অভিয়োগ যে খুব একটা যুক্তিযুক্ত ছিল তা নয়। মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালের অভিযোগ ছিল যে মীর জুমলা শহরের প্রশাসককে(জুলাই ১৬৩৮) কোর্টিন এসোসিয়েশনের ক্যাপ্টেন ওয়েডেল এবং মন্টিনির বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আদতে ব্রিটিশদের দাবি ছিল স্থানীয় প্রশাসন তাদের তটভূমি দখলে বাধা দেওয়ায়, তারা যে কামান দিয়ে সেই প্রশাসনের সদর দপ্তরে হানা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই কামানের গোলা মছলিপত্তনমে আমদানির ওপরে তাদের ছাড় দেওয়া হোক।

(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৫। মীর জুমলার কর্ণাটক দখলে ধর্মীয় প্রভাব
কুতুব শাহ মীর জুমলাকে একটি চিঠিতে লিখলেন, ‘হিন্দু কর্ণাটক অঞ্চলের গ্রাম থেকে দূর্গ পর্বত আমার শাসনাধীন। মুসলমান ধর্মের প্রচার সেখানে শুরু হয়েছে। ধর্মাচারের জন্য মন্দির, মূর্তি ইত্যাদি সব ইসলামি রীতি অনুযায়ী পাল্টানো আর বিশ্বাসীদের ধর্মাচারণের সুযোগ দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। একটি শহরের অধীনে তিনিটি কুইট(?) গ্রাম শারিয়িতি আইনের অধীনে আনা এবং নজফের অধিবাসীদের বাসের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে। এই এলাকাটি যেহেতু মীর জুমলার উদ্যোগে অধিকৃত হয়েছে তাই তাঁর এবং তাঁর পরিবারের অধীনে অঞ্চলের গ্রামগুলির অসীম সময়ের জন্য মোতোয়ালি দেওয়া হল। এই অঞ্চলের মোট রোজগার নজফে পাঠাতে হবে। আমার উত্তরাধিকারীদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছি এই নির্দেশের কোন ব্যত্যয় যেন না হয়’।

কর্ণাটকের বিজয়ের পরে মীর জুমলা পারস্যের উজির নবাব খলিফাইসুলতানকে লিখলেন, ‘সর্বশক্তিমানের সদিচ্ছায় এবং পাদসাহীর ভাগ্যক্রমে এই অবিশ্বাসীদের দেশ কর্ণাটকে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয়েছে এবং হিন্দুস্তানও একদিন পদানত হবে... ইসলামের বাণী এবং সুফিদের কাজকর্ম এখানে প্রতিভাত হচ্ছে।’ ধর্মীয় স্থান মন্দির থেকে মসজিদে রূপান্তরিত করার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, ১৬৫৩ সালে হাবিলদার রুস্তম বেগ, পুনামাল্লি দূর্গের মাথার মন্দিরটির ওপরের অংশটি ভেঙ্গে ফেলে মসজিদে রূপান্তরিত করে।

মীর জুমলা মন্দিরগুলি লুণ্ঠন করে তাঁর মূর্তি, সোনাদানা, রূপা, তামা ইত্যাদি সংগ্রহ করে কামান বানানোর কাজে লাগিয়ে দেন।

অন্যদিকে লিপিসূত্রে(এপিগ্রাফিক) জানা যাচ্ছে, হিন্দুরা ভগবান এবং পুরোহিতকে কিন্তু তাঁর পরেও দান দিতে থাকেন। তেলুগুতে পাথরলেখতে জানা যাচ্ছে ১৫৭২ শকে/১৬৫০ সালে গ্রামের বৈশ্য, নাগর এবং গ্রামের অন্যান্য জাতিরা ভগবান গোপালস্বামী এবং হনুমন্তরায়া আর পুরোহিত গোপালভট্টকে নানান দান দিয়ে গিয়েছেন।

৬। মীর জুমলার অবস্থা দৃঢ হল
পক্ষপাতহীন লেখক বিশেষ করে বিদেশি বণিকেরা মীর জুমলার ক্ষমতা আর তাঁর সম্পদের ভার দেখে অবাক হয়ে গিয়েছেন। ওল্টার লিটন এবং ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে ব্রিটিশেরা তাদের স্বার্থ দেখতে নবাবের কাছে পাঠিয়েছিল(জানু ১৬৫১)। তারা লিখছেন, ‘সমগ্র গোলকুণ্ডা রাজ্যটা তিনিই শাসন করেন। রাজার সামনে যেমন করে ভয়ে মানুষ উঠে দাঁড়ায়, সেই ঘটনাটি ঘটত ঠিক তাঁর রাজ্যতেও।’ ১৬৫৪ সালে এমনকি আওরঙ্গজেবও সম্রাটকে লিখলেন, ‘মীর জুমলা দূর্গ, বন্দর এবং খনি সমৃদ্ধ মাঝারি গোছের জনবহুল রাজ্যের নিয়ন্ত্রক। তাঁর ব্যবহার আরামদায়ক এবং সুন্দর, তিনি জ্ঞানী এবং সুন্দর মুখাবয়বযুক্ত, ইঙ্গিতেই বুঝতে পেরে যাওয়ার ক্ষমতাযুক্ত। তাঁর মত দক্ষ মানুষের নিয়ন্ত্রণে বহু উপযুক্ত কর্মচারী রয়েছে। ছোট করে বললে, যদিও মীর জুমলার অবস্থানটা অনেকটা অভিজাতদের স্তরেই, কিন্তু ক্ষমতা, সম্পদ এবং প্রাচুর্যে তিনি যে কোন শাহজাদার সমতুল’। হায়দ্রাবাদে মুঘল অভিযানে মীর জুমলার বিদ্রোহ, এবং মুঘল প্রধান রূপে তাঁর প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল কর্ণাটক দখলের পরবর্তী ঘটনাবলী রূপেই।

(চলবে)

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৩ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। মীর জুমলার বৈদেশিক বাণিজ্য
দৈনন্দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ডুবে থেকেও মীর জুমলা তাঁর অমিত সম্পদ, তাঁর সমৃদ্ধি, তাঁর ক্ষমতার উৎস - বৈদেশিক বাণিজ্যের দিকে নজর দিতে ভুলে যান নি। প্রাথমিকভাবে খুব ছোট্ট করে শুরু করেছিলেন তাঁর ব্যবসা। ১৬৫০এর শেষের দিকে সেই দেশিয় এবং বৈদেশিক ব্যবসা বিপুল কলেবর লাভ করে। ১৬৫১সালের জানুয়ারির হিসেবে তাঁর ব্যবসায় কাজ লাগত ৪০০-৫০০ উট, ৪০০০ ঘোড়া এবং ৩০০টি হাতি আর ১০,০০০ যাঁড়। এই ব্যবসা-বাহিনী তাঁর পণ্য গোলকুণ্ডা এবং বিজাপুরে এমনকি মুঘল সাম্রাজ্যে পৌঁছে দিতে সাহায্য করত। প্রায় প্রত্যেক(ব্যবসায়িক) যায়গায় তাঁর নিজস্ব দালাল এবং নিজস্ব ব্যবসায়ী বসানো ছিল। এছাড়াও তিনি বাণিজ্য করতেন ১) বর্মা – আরাকান, পেগু, টেনাসেরিম(মারগুই দ্বীপপুঞ্জ), ২) আচে, পেরুক, মাকাসসার এবং মালদ্বীপ, ৩) পারস্য এবং আরব, ৪) বাঙলার সঙে। তাঁর সামুদ্রিক বাণিজ্যের জাহাজ ছিল ১০টি, এবং ক্রমশঃ তার সংখ্যা তিনি বাড়াতে থাকেন, পূর্ব উপকূলের নর্সাপুরে তাঁর বিপুলাকায় জাহাজগুলি তৈরি হত। ১৬৩৮ সালের জুলাই মাসে ৮০০ টনের একটি বিশাল জাহাজ (জাঙ্ক) তৈরি করেন পারস্য বা মোকায় পণ্য রপ্তানি করার জন্য এবং তাঁর কারখানার চিঠিচাপাটিতে এই জাহাজটির নাম উল্লিখিত ছিল সর-ই-খাহিলের ‘বিশাল’ জাহাজ হিসেবে।

যেহেতু তাঁর ধারণা ছিল বিজয়নগরের নাবিকেরা বিশ্বাসঘাতকতা করতে জন্য তিনি তাঁর জাহাজে ব্রিটিশ আর ডাচ নাবিক নিযুক্ত করেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল, রজার এডামস(১৬৪২), রিচার্ড ওয়ালউইন(১৬৪৭), জন গাইটন(১৬৪৬), টমাস বোস্টক(১৬৫০)। কিছু মুসলমান নাবিকও ছিল – মুবারক টুকিল জাহাজের নেতৃত্বে ছিল মুহম্মদ বেগ পেগু যেতেন, ছিল নাখুদা নুরা, যেতেন আচে, নাখুদা মুল্লা হাসান যেতেন গম্ব্রুন।

সামুদ্রিক সওদাগরি ক্রমশ বাড়তে থাকা সত্ত্বেও সব থেকে বড় দুর্বলতা ছিল, সমুদ্র সেনাবাহিনীর অভাব এবং নির্ভর করতে হত ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির ছাড়পত্রের ওপর। ১৬৫১ সালে মীর জুমলা এবং গোলকুণ্ডার সুলতান পর্তুগিজদের থেকে সামুদ্রিক ছাড়পত্র নেওয়া বন্ধ করে দিলেও মাদ্রাজ ঘেরাওয়ের সময়ে(১৬৫৭, সেপ্ট – ১৬৫৯ এপ্রিল), মীর জুমলা নিজের সমুদ্রগামী জাহাজের জন্য ছাড়পত্র চাইলে ব্রিটিশেরা তা দিতে অস্বীকার করে।

মীর জুমলা বার্মার সঙ্গে বড় করে ব্যবসা করতে চাইতেন। বার্মাতে ছিল সারাবিশ্বের চাহিদাবন্ত সব থেকে ভাল চুণি আর নীলকান্তমণি। বার্মার গালা(গামল্যাক)র গুণমান ভারতের তুলনায় উচ্চশ্রেণীর ছিল। মারটাবান জার, সোনা, তামা, টিন, কুইকসিলভার, গানজা(কাঁসা) এবং বেনজয়েন(লাবান?) এখানে পাওয়া যেত। গোলকুণ্ডার মন্ত্রী থাকার সময় তিনি হাসান খানকে পেগু পাঠিয়েছিলেন শ্বেত হাতির দেশের রাজার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য। পরের দিকে তিনি বার্মার রাজাকে অনুরোধ করেন, গোলকুণ্ডার নাবিক, মুহম্মদ বেগ এবং তাঁর নিজের জাহাজকে পেগুতে বাৎসরিক ব্যবসার সুযোগ দিতে। মীর জুমলা অনেক সময় ব্রিটিশ ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী(১৬৪৭ সালে রিচার্ড কোগান)দের পেগুতে তাঁর হয়ে ব্যবসা করার জন্য নিযুক্ত করতেন, যা ব্রিটিশদের ব্যবসার থেকে অনেক বেশি লাভজনক ছিল। মীর জুমলার নিজস্ব অতিকায় জাহাজ মছলিপত্তনম থেকে নিয়মিত পেগুতে যেত এবং তাঁর কর্মচারী এবং দালালেরা অনেকসময় ডাচেদের জাহাজে(১৬৫৩) যাতায়াত করে পেগুর সঙে ব্যবসায়িক সম্বন্ধ বজায় রাখত। ১৬৫১ সালে পেগু চিনা আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে গেলে মীর জুমলা আর ডাচেদের বিপুলভাবে ব্যবসা মার খায়। ১৬৫৩ সালে পেগুর রাজা অচেনা(বিদেশি?)দের টিন আর হাতির দাঁত বিক্রি বন্ধ এবং কাঁসা রপ্তানি ব্যবসা কতিপয় ব্যবসায়িদের দখলে দিয়ে দেন।

আরাকান হাতির জন্য বিখ্যাত ছিল। মীর জুমলা আরাকান রাজ, ধর্মরাজকে অনুরোধ করেন তাঁর কর্মচারীদের আবাধে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার জন্য। তাঁর বিশেষ অনুরোধে রাজা, শাহজাহানের চর সন্দেহে কারাগারে বন্দী সাত ইরাকিকে ছেড়ে দেন। এছাড়াও দীর্ঘদিন আরাকানের কারাগারে কিছু মুঘল বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ারও এবং আরাকানকে মুক্ত বাণিজ্যের নীতি লাগু করতে অনুরোধ করেন। তাঁর যুক্তি তা হলেই আরাকান বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠতে পারে। মীর জুমলা পূর্ব উপকূলে পাঠানো সে দেশের চারটি হাতি কেনেন এবং তাঁর সঙ্গে রাজার পাঠানো একটি অতরিক্ত হাতিও উপহার পান।

পূর্ব উপকূলের ক্যালিকোর বদলে মীর জুমলা ইস্ট ইন্ডিজের মশলা, দাস, মাকাসসারের চাল, পেরুকের টিন এবং মালদ্বীপের কড়ি সংগ্রহ করতেন।
তাঁর বাণিজ্যের শৃংখলে পারস্য খুব বড় অংশ ছিল। প্রত্যেক বছর বিভিন্ন আকারের জাহাজে তিনি বিপুল পরিমানে পণ্য ভারতের পূর্ব উপকূল থেকে পারস্যের পানে পাঠাতেন। যতক্ষণনা সর-ই-খাহিল বা উজিরের সব ক’টি জাহাজ পণ্যে পূর্ণ না হচ্ছে, ততক্ষণ কোন জাহাজেরই বন্দরে ভেড়ার নির্দেশ দেওয়া হত না। গোলকুণ্ডার মন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জেরে তিনি বহু সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানির বহু জাহাজ, কোন রকম কর আর শুল্ক না দিয়েই পারসিক ব্যবসার কাজে (যেমন ১৬৩৭, এবং ৪০ সালে চিনি পাঠানো) ব্যবহার করতেন। ১৬৫১-৫২ সালে একটি জাহাজ মছলিপত্তনম থেকে মারাকান উপকূলের গদর বন্দর হয়ে গম্ব্রুন পৌঁছয় এবং সেই জাহাজে কোম্পানির পণ্যের সঙে তাঁরও শুল্ক মুক্ত ২০০ টুনাম পরিমান পণ্য ছিল। ১৬৫৩ সালে গাম্ব্রুনে ব্রিটিশ ফ্যাক্টরেরা আশংকা করলেন, তাঁর শুল্ক মুক্ত দুই বেল গাঁটরির খবর যদি শাহবান্দার পায় তাহলে ঝামেলা হতে পারে – কেন না শাহবান্দারের দায়িত্ব ছিল, তাদের দেশে মুসলমানেদের পাঠানো গাঁঠরি খুলে তল্লাসি করা। মাদ্রাজের ফ্যাক্টরেরা ব্রিটিশ বণিকদের জানালেন, যদি এই দেশে যদি তাদের কাজ করতে হয়, বাণিজ্য সুবিধে পেতে হয়, তাহলে তাদের মীর জুমলার মতানুযায়ী কাজ করতে হবে। মীর জুমলা বাঙলার সুবাদার হয়েও এই ভাবেই শুল্কমুক্ত পণ্য পাঠাতেন বিদেশে।

১৬৪২, ৪৬ এবং ৪৮ সালে ব্রিটিশ নাবিকের নেতৃত্বে তাঁর জাহাজ মোকায় ব্যবসা করতে গিয়েছিল।

বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ব্যবসার পতনের ফলে মীর জুমলা ক্রমশ তাঁর বিদেশি ব্যবসার বহর বাড়িয়ে তাদের ছেড়ে যাওয়া বৈদেশিক ব্যবসার দেশগুলি – আরাকান, পেগু, টেনাসরিম, মালয় উপদ্বীপ, পারস্য এবং আরব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ষোড়শ শতে পর্তুগিজেরা আরবি বণিকদের সমুদ্র বাণিজ্য কর্ম থেকে হঠিয়ে দিতে থাকে। সপ্তদশ শতের প্রথমার্ধে পর্তুগিজ এবং বিজয়নগরের বাণিজ্যকর্মের পতন ঘটতে থাকায়, এই শূন্যস্থান পূরণ করতে উদ্যমী হয়ে ওঠেন মীর জুমলা। এর সঙে যুক্ত হয় ব্রিটিশ এবং ডাচেদের পারস্পরিক লড়াই এবং প্রত্যেকেই তাঁর আনুকূল্য চাইতে থাকায়, তাঁর ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠতে থাকে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পারসিক এবং বার্মা বাণিজ্যেরও প্রতিযোগীরূপে নিজেকে উপস্থিত করতে থাকলেন মীর জুমলা। মছলিপত্তনম থেকে মীর জুমলার পারস্য বাণিজ্যে পাঠানো শুল্কমুক্ত পণ্য থেকে ব্রিটিশেরা কিছুতেই শুল্ক নিতে পারছিল না, ফলে তারা বঙ্গোপসাগরীয় অন্যান্য বাণিজ্য কেন্দ্র থেকে যতটা পারা যায় শুল্ক আদায় করত। এছাড়াও পেগু এবং বার্মা সমুদ্রেও যতটা পারা যায় ব্যবসা মুনাফা নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা করত।
(চলবে)

Monday, December 19, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২২ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। সেনা বাহিনী ব্যবস্থাপনা
কর্ণাটকের সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহের অধীনে কাজ করার সময়, বিপুল সুলতানি সেনা বাহিনী ছাড়াও, মীরের নিজস্ব সেনা বাহিনীর বহরও খুব কম ছিল না। আওরঙ্গজেবের বাখানে আমরা জানতে পারছি, মীর জুমলা তার বিপুল বাহিনীকে কর্ণাটকে পাঠিয়েছিলেন। বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় বিশাল পরিমান এলাকা দখল, দেখাশোনা এবং সেনা বাহিনী বজায় রাখা সহজ হয়ে গিয়েছিল মীর জুমলার পক্ষে। ওয়াল্টার লিটন এবং ভেঙ্কট ব্রাহ্মণ(১৭ জানুয়ারি ১৬৫১) সূত্রে জানছি যে মীর জুমলার বাহিনীতে ছিল ৩০০ হাতি, ৪০০-৫০০ উট এবং ১০,০০০ যাঁড়(অক্সেন)। ১৬৫২ সালের বিজাপুরের সেনা অভিযানে তিনি উদ্যম নিয়ে মুঘল, আফগান, পাঠান এবং রাজপুত সেনা সংগ্রহ করে বিপুল বাহিনী তৈরি করেন এবং তার জন্য তিনি গর্বিতও ছিলেন। ক্রমে ক্রমে নিজেকে জোরদার এবং আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে তিনি কুতুবশাহী সেনাবাহিনীর বহু সেনা নায়ককে(সেনাপতি) ‘অপূর্ব অমায়িক ব্যবহার এবং আনুকূল্য’ প্রদর্শন করে নিজের দিকে টেনে এনে পুরোনো অভিজ্ঞ শাহী সেনার মত সেনা বাহিনী গঠন করেন। মীর জুমলার কাজ সম্বন্ধে সংবাদ সংগ্রহ করতে আওরঙ্গজেব মহম্মদ মুনিমকে পাঠিয়েছিলেন(১৬৫৩-৫৪) – তার বক্তব্য ছিল, মীর জুমলার বাহিনীতে রিসালা (ঘোড় সওয়ার) ছিল ৯০০০ - যার মধ্যে ৫০০০ নিজের আর ৪০০০ কুতুব শাহীর, পদাতিক ছিল ২০০০০ – এ ছাড়াও তার বাহিনীতে সম্পদ হিসেবে ছিল নগদ অর্থ, মনমুগ্ধকর অলঙ্কার, প্রশিক্ষিত হাতি, ইরাকি আর আরবি ঘোড়া, এছাড়াও আত্মমর্যাদা, গৌরব আর সম্মান বৃদ্ধির জন্য যা যা কিছু লাগে সব এবং সেই সেনা বাহিনী তাদের সামরিক দক্ষতার চূড়ান্তে পৌঁছেছিল।

দক্ষ সেনানায়ক মীর জুমলার সেনা বাহিনীর খুঁটিনাটির দিকে প্রভূত নজর ছিল। ১৬৪২ সালে তিনি সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিন্ত করেন। তিনি শুধু যে সেনার বা পশুর খাবার মছলিপত্তনম, কোণ্ডাপল্লী এবং কোণ্ডাভিডু থেকে বাজার দরে কেনার উদ্যোগ নেন তাই নয়, তিনি শস্যের দালালদের সেনা বাহিনীর সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিলেন, যাতে বাহিনীর পণ্য সরবরাহে কোন ছেদ না পড়ে। এছাড়াও তিনি চিঠিপত্রের আদানপ্রদান দ্রুত করতে নিয়মিত ডাকচৌকি স্থাপন করেছিলেন; যাতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজসভার মধ্যে রোজ খবর আদান প্রদান হয়, তাঁর জন্য কবুতর এবং ডাকহরকরা নিয়োগ করেছিলেন।
যুদ্ধের আক্রমণাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের বিষয়ে তাভার্নিয়ের সূত্রে জানতে পারছি, মাথায় ঝুঁটি বাঁধা পদাতিকেরা কোমরে সুইসদের মত চওড়া তরোয়াল বহন করত, ভালতম ফরাসি কামানের থেকেও মীর জুমলার কামানগুলির মুখ ছিল চওড়া, আরও পোক্ত এবং কামান তৈরিতে সব ভাল লোহা ব্যবহার হত। ঘোড়সওয়ারদের পিঠে তীর ধনুক, যুদ্ধ কুঠার, আর ঢাল থাকত। এবং আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে থাকত বর্ম, শিরস্ত্রাণ, কাঁধে ঝোলানো লোহার বর্ম-জ্যাকেট, বাহুবন্ধ এবং বর্মের মত করে সারা দেহে আবরণ। কিন্তু সাধারণ পদাতিকেদের ৫ গজের মত কাপড় পরানো হত, যা দিয়ে তাদের সামনে বা পিছন কোনটাই ঢাকত না।

গোলান্দাজদের সঙ্গে ছিল কামান আর গুলতি – যা দিয়ে বিশাল বিশাল আগুণের গোলা বিপক্ষের দিকে ছোঁড়া যায় আর ছিল কামানের জন্য গোলার বড় ভাণ্ডার। মীর জুমলার এই বিভাগটা দেখত ফরাসি আর অন্যান্য খ্রিস্টান এবং বার্ণিয়ে বলছেন তাদের দক্ষতা চূড়ান্ত ছিল।

তাঁর বাহিনীতে বহু ইওরোপিয়, ফরাসী, ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, ইটালিয় সেনা চাকরি করত – বিশেষ করে গোলান্দাজ বাহিনীর নানান পদেতে। ১৬৫০-৫২ সালে ব্রিটিশরা তাঁকে ৬জন গোলান্দাজ – জেরিমি রুট, হিউ ডিক্সন, রিচার্ড এমার্সন, জন কাউহিল, রবার্ট ব্রিংবোর্ণ এবং রিচার্ড হলকে ধার দিয়েছিল। সেন্ট ফোর্ট জর্জের গোলান্দাজ সেনাপতি জেরিমি রুটকে মীর জুমলা খুব গুরুত্ব দিতেন। ১৬৫৩ সালে আরও দুজন গোলান্দাজ সেনা সেন্ট জর্জ থেকে মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেয়। এছাড়াও বহু গোলান্দাজ সেন্ট জর্জ থেকে পালিয়ে তাঁর বাহিনীতে যোগ দিতে আসত এবং তিনি তাদের সুরক্ষা দিতেন – এ মর্মে বহু চিঠচাপাটি উদ্ধার করা হয়েছে। ১৬৫২ সালে গোণ্ডিকোটায় মীর জুমলার বাহিনী দেখতে এসে তাভার্নিয়ে এবং তাঁর বন্ধুর(দু জার্ডিন) সঙ্গে একজন ব্রিটিশ গোলান্দাজ আর তাঁর ইতালিয় বন্ধু, নৈশভোজে যোগ দিয়েছিল। একজন ফরাসি কামান তৈরির জন্য খ্যাত গোলান্দাজ, শল্যচিকিতসক, ক্লদ মিলে, মীর জুমলার গোণ্ডিকোটার দুর্গের জন্য ১০টি ৪৮ পাউণ্ডের এবং ১০টি ২৪ পাউণ্ডের কামান তৈরি করছিলেন। বিভিন্ন যায়গা থেকে তামা যোগাড় করে এবং গাণ্ডিকোটার মন্দিরগুলির মধ্যে মাত্র ছটি বিখ্যাত মন্দিরের মূর্তি বাদ দিয়ে, সবগুলি গলিয়ে তামা জোগাড় হল। কিন্তু তিনি একটাও কামান তৈরি করতে পারলেন না এবং নবাবের সেনা বাহিনী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন। শ্রীরঙ্গ, দামরালা ভেঙ্কটাপ্পাকে পদচ্যুত করায়, মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেয়। কর্ণাটকের হিন্দু বিদ্রোহের সময় জিঞ্জির টুপাক্কি কৃষ্ণাপ্পা নায়ক, মীরের সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বাহিনীর আর এক হিন্দু সেনাপতির নাম ছিল ছিন্নাতাম্বি মুদালিয়ার।

বিভিন্ন জাতি সমন্বয়ে গঠিত তাঁর বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মীর জুমলা সতর্ক থাকতেন। ১৬৫২ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাভার্নিয়ে দেখলেন পেন্নার নদীর তীরে মীর জুমলার সমগ্র বাহিনী পাহাড়ের তলায় সমবেত হয়েছে, এবং ঘোড়সওয়ার নজরদারি সবে শেষ হয়েছে এবং তাঁকে বেশ চৌখস(স্মার্ট) লাগছে। পরের নজরদারির তারিখ ঠিক হল ঐ মাসের ১৪ তারিখে।

বেতনের বিষয়ে কিছুটা সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং কিছুটা নগদে বিদায়ের প্রথা ছিল। প্রথমটির উদাহরণ পাওয়া যায় মুকাসদার বা জায়গির দেওয়ার প্রথায়, যারা সেই জায়গির থেকে রোজগারের টাকায় বেতন দিত। তারা সেনা সরবরাহ করত কি না জানা যায় না। পেশাদার সেনাদের সেনাপতি মার্ফত রাষ্ট্র নগদে বেতন দিত। তাভার্নিয়ে বলছেন, ১১ সেপ্টেম্বর ১৬৫২ সালে ফরাসী গোলান্দাজেরা মীর জুমলার তাঁবুতে গিয়ে তাদের চার মাসের বকেয়া দাবির জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল, না পেলে তারা তাকে ছেড়ে চলে যাবে, হুমকিও দিয়েছিল। নবাব তাদের পরের দিন আসতে বললেন, তিন মাসের বাকি দিলেন এবং এক মাসের বাকিটা মাসের শেষে দিয়ে দেওয়া হবে আশ্বাস দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই টাকার অর্ধেক তারা নাচনেওয়ালি এনে আমোদ ফুর্তি করতে উড়য়ে দিল।

পাহাড়ি দুর্গ ছাড়াও, আমরা জনতে পারছি জিঞ্জি গাণ্ডিকোটা, উদয়গিরি পাহাড়ের শীর্ষের দুর্গ আর রায়পুর ছিল বন ঘেরা দুর্গ। এছাড়া নেল্লোর দুর্গ ছিল সমতলে অবস্থিত।
(চলবে)