Wednesday, December 21, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৬ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৪। অবস্থা সামাল দিতে কোম্পানির চেষ্টা
মছলিপত্তনমের হতবুদ্ধিকর অবস্থা সামাল দিতে বিজয়নগর রাজ্যের তটের আরও দক্ষিণের নিরাপদ এলাকায় দিকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ব্রিটিশেরা এবং তাঁর জন্য প্রয়োজন সুলতানের থেকে নতুন করে ফর্মান সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত হল, যাতে তারা নতুন এলাকায় অবাধে ব্যবসার সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। এর প্রথম পদক্ষেপ হল ফোর্ট জর্জের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনা এবং দ্বিতীয়টি, সুরাট থেকে গোলকুণ্ডায় এন্ড্রু কোগানের আগমন।

এন্ড্রু কোগানকে যথেষ্ট সম্মান দেখিয়ে নানানভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন মীর জুমলা, সরইখাহিল। মীর জুমলার এই চরিত্র কোগানের কাছে নতুনভাবে প্রতিভাত হল; বিশেষ করে মছলিপত্তনমের কুঠিয়ালেরা তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে এত দিন তাঁকে যা জানিয়েছিল, তিনি দেখলেন মীর জুমলা তার বিপরীত চরিত্রের। কোগান, মীর জুমলাকে একটা দামি রত্ন দিলেন(আম্বারগিজ) এবং বিরক্ত হয়ে লিখলেন(বান্টামকে ৩ সেপ্টে ১৬৩৯) কোন দিন যদি কোম্পানির সরইখাহিলকে দরকার পড়ে তাহলে তিনি(মীর) তাদের হয়ে কথা কইবেন। মীর জুমলা মছলিপত্তনমের প্রশাসককে একটি বিশেষ পত্র লিখলেন এবং কোগানকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করার আদেশ দিলেন।

৫। কর্ণাটক দখলের পরে ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক
কর্ণাটক দখলের পরে পূর্ব উপকূলের ইওরোপিয় বণিকদের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্কের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। ব্রিটিশেরা হঠাই দেখল এতদিন যে ব্যক্তি তাদের প্রশাসক এবং বাণিজ্য প্রতিযোগী ছিল, তিনি হঠাতই তাদের রাজা হয়ে বসেছেন। মীর জুমলার ভয়ে এবং তাঁর মন্ত্রীদের ঘন ঘন নজরদারির ফলে তারা ঠিক করল সেন্ট জর্জের প্রতিরক্ষা বাড়ানোর দরকার। কিন্তু মীর জুমলা তক্ষুনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোন আক্রমনের ইঙ্গিত না দেখিয়ে তাদের প্রতি বন্ধু ভাবাপন্ন মনোভাব দেখালেন। ব্রিটিশদের পক্ষেও মীরের পক্ষ্মপুটে আশ্রয় নেওয়া জরুরি ছিল। অতীতের হিন্দু শক্তি তাদের যে সব ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধে দিত, সেগুল্কি নতুন সরকার তাদের দেবে কিনা এই প্রশ্নে তারা খুবই চিন্তিত ছিল। যুদ্ধের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল যে কর্ণাটকে ক্ষমতার ভার কেন্দ্র বিজয়নগর থেকে গোলকুণ্ডায় স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে এবং সেই তত্ত্ব বুঝেই মাদ্রাজে ব্রিটিশ দূত আইভি(আগস্ট ১৬৪৪-সেপ্ট ১৬৪৮), তড়িঘড়ি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চাইলেন। ১৬৪৬ সালে মীর জুমলা যখন মাদ্রাজের কাছে স্যান থোম অবরোধ করেছেন তখন ব্রিটিশেরা তাকে গোলান্দাজ এবং পদাতিক সেনা দিয়ে সাহায্য করে। প্রতিসৌজন্যে মীর জুমলা গোলকুণ্ডার সুলতানের পক্ষ থেকে বর্তমান কাউল(মাদ্রাজ দখল রাখার ফর্মান) এবং অন্যান্য সাহায্য দেওয়ার ঘোষণা করেন(জুন ১৬৪৭)।

পুলিকটের ডাচেরা তাদের বাণিজ্য সুবিধে বজায় রাখল মীরেরে নতুন আমলে সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে পেল আররও বেশি কিছু অর্থের সুযোগ সুবিধে। আর হিন্দু রাজত্বের তুলনায় তাঁর সময়ে পর্তুগিজেরাও অতিরিক্ত কিছু সুযোগ পায়। ১৬৪৮ সালে মছলিপত্তনমে মীর জুমলার একটি জাহাজ ঝড়ে ভেঙ্গে পরায় তিনি ব্রিটিশ বা ডাচ জাহাজগুলিকে তাঁর ব্যবসায় কাজে লাগাতে উদ্গ্রীব ছিলেন।

৬। মীর জুমলার কাছে ইওরোপিয় কোম্পানিগুলির দৌত্য
১৬৫০-৫১ সালের কাছাকাছির সময়ে তিনি নিজের বস্ত্রের একচেটিয়া বাণিজ্য সফল করতে গিয়ে ডাচেদের নাছোড় বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় বিরক্ত হয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে উপনীত হলেন। ঠিক হল এবার থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি তাঁর দালাল মার্ফত বস্ত্র কিনে পারস্য এবং অন্যান্য এলাকায় বাণিজ্য করে তাঁর সঙ্গে লভ্যাংশ ভাগ করে নেবে।

গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলা ১৬৫০ সালে ডাচ দূতের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করেন; কিন্তু ভেঙ্কট ব্রাহ্মণের ব্রিটিশ দৌত্য স্বীকার করলেন। তিনি ব্রিটিশদের বললেন তাঁর সঙ্গে বাণিজ্যের হাত বাড়ালে ব্যাপক লাভ করতে পারবে এবং সমগ্র বাণিজ্যকেও খবরদারি করতে পারবে – অর্থাৎ সেভাবে তিনি এলাকার সমগ্র বস্ত্র উতপাদন নিজের আওতায় নিয়ে এসেছেন, দাম এবং উতপাদন নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক সেইভাবেই ব্রিটিশেরা তাঁর গুদাম থেকে কাপড় নিয়ে একচেটিয়াভাবে সেই কাপড় উপকূল জুড়ে ব্যবসা করতে পারে। এ ছাড়াও তিনি সূক্ষ্মভাবে ব্রিটিশদের সঙ্গে ডাচেদের লড়িয়ে দিতে বললেন, ডাচেরা করমণ্ডলের বস্ত্র উতপাদনের পুরোটা কিনে নিয়ে এবং সেগুলি কম বিক্রি করে ব্রিটিশদের ভাতে মারতে চাইছে। কুঠিয়াল গ্রেনহিল মীর জুমলার উত্তরে একই দূত ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে এবং আরও একটা দৌত্যে ওয়াল্টার লিটলটনকে পাঠালেন ১৬৫০এর ডিসেম্বরে। তাদের যৌথ সমীক্ষায়(১৭ জানু, ১৬৫১) অঙ্গীকার করে জানালেন যে মীর জুমলার ব্রিটিশদের প্রতি আগ্রহ, ভালবাসা আন্তরিক, এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকালীন চুক্তিতে যেতে চান। এবং কোম্পানির ব্যবসাকে সুদ-মুক্ত অর্থ ধার(৫০ থেকে ৬০ হাজার প্যাগোডা) দিয়ে সাহায্য করতে চান। তাদের ধারণা হল মীর জুমলার সঙ্গে এই চুক্তিতে যাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানির পক্ষে শুভকর হবে এবং ডাচেদের বাণিজ্য উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যে লেখা একটি চিঠি এবং উপহারস্বরূপ ৩০০টি লং ক্লথ এবং সালামপুর কাপড় দূতেদের দেন।

এতদিন ডাচেদের ব্যবসা সঙ্গ করে হঠাতই তিনি সিদ্ধন্ত নিলেন ব্যবসায় ব্রিটিশদের হাত ধরার। কর্ণাটক লুঠের সম্পদে তিনি এখন ব্রিটিশদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারেন, যা তাকে আরও বেশি লাভের মুখ দেখতে সাহায্য করবে। এবং এইভাবে তিনি কোম্পানিকে বোঝাতে পারবেন তিনি তাদের শুভ চিন্তক এবং কোন ঝামেলায় পড়লে তিনি তাদের আনুগত্য ব্যবহারও করতে পারবেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি ১৬৫১ সালে দূত এবং কাউন্সিল উভয়েই মীর জুমলার উদ্দেশ্য, চুক্তি সম্বন্ধে খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হতে পারল না। তারা সিদ্ধান্ত করল, তারা শুধু একটি বিষয়ে মীর জুমলার সঙ্গে একমত হচ্ছে, দাম পরে ঠিক করার শর্তে ইওরোপ থেকে আসা সব পণ্য মীর জুমলা নিলে তাঁর বদলে তাঁর গুদামের কাপড় ব্রিটিশ কিনবে। তবে যত দিন না প্রেসিডেন্ট বেকার সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, ততদিন তাঁরা কোন চরম সিদ্ধান্তে উপনীত হবে না। এবং যদি কোম্পানি মীর জুমলার প্রস্তাবে সম্মত হয়, তাহলে তারা চাইবে কোম্পানি দূত এবং প্রেসিডেন্টকে নবাবের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষমতা অর্পন করুক। ১৬৫১ সালের জানুয়ারিতেই গোলকুণ্ডায় নবাবের সঙ্গে আরেকটা দৌত্যে পাঠানো হল ভেঙ্কট ব্রাহ্মণকে দুটি তথ্য জানতে যে পরের জাহাজে নবাব কি ধরণের ইওরোপিয় পণ্য চাইছেন এবং মীর জুমলা যে কাপড় কোম্পানিকে দিয়েছেন, তাঁর দাম কি হতে পারে।

কোম্পানির জবাব এক এক বছর পর। জাজানো হল মীর জুমলার দালালদের থেকে সমগ্র দ্রব্য কেনার প্রশ্নে তারা কোন প্রতিশ্রুতি দিতে অপারগ। তবুও তারা মীর জুমলার দাদলদের থেকে গুরুত্ব দিয়ে বস্ত্র কেনার সুযোগ খুলে রাখছে, কিন্তু এর জন্য তারা কোন ছাড় দতে রাজি নয়। ১৬৫২র গ্রীষ্মে, লিটলটন এবং ভেঙ্কট আবার দৌত্যে গেলেন মীর জুমলার সভায় যতদূর সম্ভব কোম্পানির উত্তর নিয়ে, এবং সেখানে তারা বন্ধুত্বপূর্ণ সদ্ভাব পেল। তারা জানাল কুঠিয়ালেরা মীর জুমলার দালালদের যে ছাড়গুলি দিয়েছিল, কোম্পানি সেগুলি বাতিল করেছে। কিন্তু মীর জুমলার অনুরোধ যেহেতু তাদের কাছে আদেশের সমান, আগামী দিনে তাদের সমস্ত ভুলগুলিকে সংশোধন করে পুরোনো দামে উপনীত হওয়া যায় কি না সে সিদ্ধন্তে তারা উপনীত হতে চাইছে।

১৬৫১-৫২ সালে ডাচেরা ড্রিক স্টুয়ারের দৌত্যে একলপ্তে বিপুল পরিমান অর্থ দিয়ে নতুন কিছু শহর ভাড়ায় তাদের আওতায় আনা যায় কি না, বাণিজ্যে তাদের আরও ছাড় দেওয়া যায় কি না এবং আগামী দিনে তাদের বাণিজ্যে কাস্টম শুল্ক ছাড় দেওয়া যায় কি না সেবিষয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালাতে আসে। মীর জুমলা নিজে কোন সিদ্ধন্ত না নিয়ে সে সময়ে গাণ্ডিকোটায় থাকা সুলতানের দরবারে তাদের সমস্ত আবেদন বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে পুলিকটে আরও বেশি সুরক্ষা বাড়ানোর প্রশ্নে সটান না করে দিলেন। অথচ তিনি ব্রিটিশ কুঠিয়ালদের সেন্ট জর্জকে আরও সুরক্ষিত করার সম্মতিও দিলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিও থাকল ব্রিটিশরা যাতে তার ক্ষমতাকে প্রতিস্পর্ধা দেখানোর মত করে বেড়ে উঠতে না পারে। এর প্রতিফলন ঘটল তাদের ব্যাঙ্কশাল তৈরির জরিমানায়। যদিও ব্রিটিশদের মীর জুমলা খড়ের বদলে চুনা পাথরের ব্যাঙ্কশাল করতে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তারা তা করেও ফেলেছিল, সেই জন্য তাদের তিনি ২০০ প্যাগোডার মত বড় জরিমানা করেন। প্রথম এংলো-ডাচ যুদ্ধে, পারস্যে, বাংলায়, জাপানে ডাচেদের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। ১৬৫৪ সালে তিনি ডাচেদের ছাড়পত্র ছাড়াই ভারতীয় জাহাজ শ্রীলংকা, আচে এবং অন্যান্য এলাকায়, যেখানে ডাচেরা প্রায় একচেটিয়া ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, পাঠানোর উদ্যম নিলেন। ডাচেরা পর্তুগিজ নিরাপত্তায় যাওয়া তাঁর একটি জাহাজ দখল করে। ডাচেদের সঙ্গে মীর জুমলার এবং মাকাসসারের রাজার সম্পরক দূষিত হয়ে পড়ে(এপ্রিল ১৬৫৪)। তাঁর জাহাজ ছাড়া না হলে তিনি পুলিকট আক্রমণ করার হুঁশিয়ারি দিলেন। তারা তাঁর জাহাজ ছেড়ে দিলে এবং অন্যান্য এলাকায় ভারতীয় জাহাজ যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাঁর রাগ বিন্দুমাত্র পড়ে নি। পারস্যের ব্রিটিশ কুঠিয়ালেরা কোম্পানিকে পারস্যে আরও বড় জাহাজ পাঠিয়ে ডাচেদের বাজার মারার অনুরোধ করল।

অন্যান্য ইওরোপিয়দের সঙ্গে মীর জুমলার সম্পর্ক এতটা তিক্ত ছিল না। তাভার্নিয়ে এবং তাঁর দলবল গাণ্ডিকোটায় মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করেন ১৬৫২ সালের সেপ্টেম্বরে, সুলতানকে কিছু রত্ন বেচার জন্য। উলটে মীর বলেন তাঁর পাঁচটি রত্নভরা পুঁটলি কি ইওরোপে তাভার্নিয়ে বেচে দিতে পারবেন? এবং তিনি তাদের হয়ে গোলকুণ্ডায় তাঁর পুত্রকে চিঠ লিখে দেন।
(চলবে)

Post a Comment