Sunday, December 25, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩৪ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

২। রাজস্ব প্রশাসন এবং আর্থিক বিষয়
দেওয়ানি দপ্তর মীর জুমলা সামলেছিলেন ১৫ মাসের কাছাকাছি সময় ধরে – ১৭ জুলাই তাঁর পদ পাওয়ার দিন থেকে ১৬৫৭র সেপ্টেম্বরের পদচ্যুতির দিন পর্যন্ত। ওই সময়ে তিনি পাঁচ মাস দিল্লিতে কাটান, বাকি দশ মাস তাঁর কাটে বিজাপুরের বিরুদ্ধে অভিযানে। উজির পদে কাটানোর সময় – সে রাজধানিতেই হোক বা যুদ্ধ ক্ষেত্রেই হোক, মীর জুমলা কিন্তু যুদ্ধে বা প্রশাসনে তাঁর বন্ধু, দার্শনিক এবং পথ নির্দেশক, যিনি তাঁর নিরাপত্তার ভার নিয়েছিলেন, আওরঙ্গজেবের হয়ে কাজ করার এবং তাঁর মাহাত্ম্য প্রচার করার ভূমিকাই পালন করে গিয়েছেন।

মীর জুমলার যে প্রশাসনিক ঝামেলার ব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেই অসুবিধেগুলি কি ছিল আর এখন বিশদে জানা যায় না। আদাবইআলমগিরিতে কয়েকটা রাজস্ব এবং আর্থিক ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা মূলত দাক্ষিণাত্যের। এর থেকে পরিষ্কার যে আওরঙ্গজেব চেয়েছিলেন মীর জুমলা তাঁর পক্ষের সওয়াল স্বয়ং পাদশাহের সামনে করুণ। তিনি মীর জুমলাকে বলেন যে রামগীর(আজকের মানেকদুর্গ এবং চিন্নুর) এলাকার রোজগার হিসেবে, মুঘল হাজিব কাবাদ বেগের সামনে কুতুব শাহ বলেছিলেন মহম্মদ নাসির ১,২০,০০০ হুণ রাজস্ব দেবেন, সেই তথ্যটা বিলকুল সত্য নয়, সেটা অর্ধেক, ৮০,০০০ হুণ হবে; কুতুব শাহের হিসেব সর্বৈব মিথ্যা।

দাক্ষিণাত্যের আর্থিক বিষয়ে আওরঙ্গজেব খুব আর্থিক টালমাটাল অবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন। সেই সঙ্কট আরও বেড়ে গিয়েছিল সম্রাটের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে। জাগিরের মূল্য থেকে মাত্র একাংশ উদ্ধার হচ্ছিল সাম্রাজ্যের। বছরের ক্ষতি বেড়েই চলছিল, যা জাগিরদারদের আঘাত করছিল ফলে দাক্ষিণাত্যের সেনা বাহিনীর অবস্থা চরম দুর্দশার মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিল। আওরঙ্গজেবের একটা প্রস্তাব ছিল যে জাগিরের একাংশ তাকে এবং অন্য প্রদেশের সর্বোচ্চ আধিকারিককে দেওয়া হোক, সেটা সম্রাট মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রস্তাবটা, তাঁর বেতনের নগদটি মালওয়া আর সুরাট থেকে দেওয়া হোক, সেই প্রস্তাবটি কিন্তু তিনি মানেন নি। ব্যাপক যুদ্ধ চলতে থাকায় কৃষি জোর মার খেল, জনসংখ্যা কমল আর স্থানীয় প্রতিশোধের সংঘর্ষ বাড়ল। শাহজাহান আওরঙ্গজেবের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেন কৃষকদের এবং কৃষির অবস্থা উন্নতির জন্য সচেষ্ট হতে।

দাক্ষিণাত্যের খুব কুশলী দেওয়ান মুর্শিদকুলি, কেন্দ্রকে লিখে জানালেন যে জুলুসের ২৮ তম বছরে(১৬৫৫) বীর পরগণাটি বাতসরিক রোজগারের দুই-তৃতীয়াংশ আয় দিচ্ছে এবং তিনি আশা করছেন, পরের বছরে এই পরিমানটি বাড়তে পারে। এই পরগণার আওরঙ্গজেবের উকিলের বেতন বছরে ২ কোটি দাম, এটিকে তাদের জাগিরের মধ্যে ধরেন নি, কিন্তু মালুজি এবং অন্যান্য জাগিরের হিসেব বিবেচনা করেছেন এবং আশা করছেন ছাড়(তাখফিফ) দেওয়ার পরে সেই পরিমান ছমাসের মধ্যে উদ্ধার হবে। সম্রাট মীর জুমলাকে প্রশ্ন করলেন মুর্শিদ কুলির রাজস্ব সমীক্ষা সত্যি কি না, এবং শাহ বেগ খান বীর না নিয়ে অন্য পরগণা কেন নিলেন এবং তিনি মুর্শিদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবকে এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিতে বললেন, কেন শাহ বেগ খান বীর নিল না।
উত্তরে আওরঙ্গজেব সেই বছরের এবং আগের বছরের আয়ের উতপাদনের বিস্তৃত সংখ্যাতত্ত্ব পাঠালেন, যাতে মীর জুমলা এই বিষয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারেন। তিনি জানালেন শাহ বেগ বীর নেন নি বীরের দুর্দশা বা কৃষির অব্যবস্থার(খারাবি ও বিরাণি) কারণে নয় বরং অন্য কোন কারণের জন্য। গোলকুণ্ডা দখলের লড়াইতে শাহ বেগ খানকে আহমদ নগর থেকে ডেকে পাঠানো হল। তিনি তাঁর পরিবারের জন্য আলাদা আলাদা ছড়য়ে ছিটিয়ে থাকা জাগির না দিয়ে ঠিকঠাক একটি পরগণা চাইছিলেন যেখান থেকে তিনি রোজগার করতে পারবেন। আওরঙ্গজেব তাকে ঐ পরগণাটি দিলেন বার্ষিক সাড়ে তিন কোটি দামের বিনিময়ে, যেটি খতিয়ানে(লেজারশিট বা আফ্রাদিতাউজি) দেখানো ছিল। গোলকুণ্ডা থেকে ফিরে আওরঙ্গজেব দেখলেন বীর পরগনা জুড়ে দিয়ে তাঁর মনসব বাড়ানোর প্রস্তাব সম্রাট অনুমোদন দেন নি। ফলে এটি তিনি শাহ বেগের থেকে কেড়ে নেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে করলেন না। মুর্শিদ কুলি খানের সম্বন্ধে শাহজাহানের মনে ওঠা কোন রকম দ্বিধা দূর করতে তিনি মীর জুমলাকে লিখলেন, ‘মুর্শিদ কুলি একজন শিরদাঁড়া সোজা আর কর্মদক্ষ (রাস্তওদুরস্তি অস্ত) আমলা। তিনি এই মিথ্যে সমীক্ষা লিখতে পারেন না। তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, তার সপক্ষে বলার কোন প্রয়োজন পড়ে না। তিনি সেবাপরায়ণ(কর-আমাদান) আধিকারিক। যদি তাকে না বসিয়ে দিয়ে সাম্রাজ্যের কাজে লাগিয়ে রাখা যায় তাহলে ভাল হয়।’ আওরঙ্গজেব প্রস্তাব দিলেন, তবুও যদি মনে হয় মুর্শিদ কুলির কার্যকলাপে প্রশ্নবোধক চিহ্ন মুছে ফেলা যাচ্ছে না, তাহলে একজন আধিকারিক পাঠিয়ে তাঁর কাজগুলি তদন্ত করে দেখা হোক। তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘পাদশাহকে এটা জানিও... জানিও আমি যেমন করে বিষয়গুলি উপস্থাপন করে ঠিক সেই ভাবে কাজটা কোরো।’

এটা আমরা জেনে গিয়েছি যে উজির মীর জুমলা, খুরদর্দ(তৃতীয় পারসিক মাস) মাস পর্যন্ত ইরাজ খান আর তাঁর ভাইয়ের বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন এবং আওরঙ্গজেব জানিয়ে দিয়েছিলেন এই ব্যবস্থা আগামী দিনেও কার্যকর হবে।
আগামী দিনের ভর্তুকির অর্থনীতিটি সামলাতে সম্রাটের নির্দেশে ‘মীর জুমলা জুমলাতউলমুলক’ দাক্ষিণাত্যের করণিকদের(মুতসুদ্দি) লিখলেন, যাদের মনসব বাড়ানোর দরকার হয়ে পড়েছে, আর যারা নতুন মনসব পাবে, তাদের জাগিরের বেতন অর্ধেক হয়ে যাবে এবং সাম্রাজ্যের সনদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বেতন পৌঁছবে, তাঁর আগে নয়। এই নির্দেশের পরে দাক্ষিণাত্যের দেওয়ানেরা এটি বাস্তবায়িত করার জন্য উদ্যোগী হলেন। কিন্তু এই বেতন পাওয়ার সময় দীর্ঘায়িত করার নির্দেশে দাক্ষিণাত্যের মনসবদারেরা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন এবং যতদূর সম্ভব পাদশাহকে আবেদন করলেন এবং বললেন যে, তারা এতই গরীব তাঁদের পক্ষে একজন করে উকিল পাঠিয়ে তাদের বিষয়টা সম্রাটের সভায় তোলার সামর্থ নেই। অবস্থা বিগড়োচ্ছে দেখে আওরঙ্গজেব তাদের অভিযোগ সংবাদচিঠিতে জুড়ে সম্রাটের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। এটির প্রতিক্রিয়ায় সম্রাট নির্দেশটি বদলে বললেন যে সনদ যাওয়া পর্যন্ত বেতন বাকি থাকবে না। সিদ্ধান্ত হল যে দাক্ষিণাত্যের রাজস্ব আধিকারিককে বক্সী মার্ফত এই অনুমোদিত নির্দেশটি পাঠানো হবে, তখনই অর্ধেক বেতনটি পাওয়া যাবে এবং সনদ স্থানীয়ভাবেই প্রচার করা হবে।

দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের সময়ে যে সব মনসবদার প্রথমবার পদনিয়োগ পেয়েছেন, বা যাদের মনসব বেড়েছে, এবং যাদের নাম বক্সী সাফি খান দিল্লিতে আওরঙ্গজেবের উকিলকে পাঠিয়েছেন, তাদের বিষয়ে আওরঙ্গজেব, দিল্লিতে সম্রাট শাহজাহানের বক্সী ইতিকাদ খানকে সাম্রাজ্যের মহাফেজখানার থেকে তাদেরর সক্কলের নাম এবং তথ্য যাচাই করতে অনুরোধ করলেন এবং তাদের দপ্তরে সরাসরি সাম্রাজ্যের অনুমোদন না পাঠিয়ে, তাদের নামের সঙ্গে সাম্রাজ্যের পাঞ্জা বসিয়ে দেওয়া হোক বললেন। তিনি আরও প্রস্তাব করলেন যে, আগামী দিনে এইভাবে প্রত্যেক মাসে আলাদা আলাদা করে হিসেব পাঠিয়ে দেওয়া হোক যাতে সম্রাটের অনুমোদন নিয়ে সেটি অবিলম্বে আওরঙ্গজেবের উকিলের হাতে পৌঁছে যায়। ফলে তিনি চাইলেন ইস্তিয়াক খান এই বিষয়ে হাত ধুয়ে পড়ে থাকুক, কেননা এই বিষয়টি সাম্রাজ্যের স্বার্থে এবং সংহতির জন্য জরুরি এবং এটি মানুষের ক্ষোভ দূর করবে।
(চলবে)

Post a Comment