Sunday, December 25, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩৫ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। মীর জুমলার পৃষ্ঠপোষকতা
সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় মীর জুমলা অনুগ্রহ বিতরণের প্রভূত ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি যেহেতু সম্রাটের কৃপাদৃষ্টির ভাগিদার ছিলেন, এবং শাহজাহানের ওপর তাঁর প্রভাব অসীম ছিল, তাই আওরঙ্গজেব চাইতেন তাঁর পছন্দের আমলাদের হয়ে তিনি যেন সম্রাটের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেন। দাক্ষিণাত্যের বক্সী, সাফি খানের ওপরে সম্রাট অপ্রসন্ন ছিলেন, তাকে সভায় ডাকিয়ে এনে শাস্তিও দিয়েছিলেন। তাঁর শাস্তির বিষয়টি নিয়ে তিনি মীর জুমলাকে জানান পাদশাহের অপ্রীতির বিষয়টাই ভিত্তিহীন এবং তাঁর শাস্তি অন্যায় অবিচার হয়েছে। তাঁর মত আমলার দক্ষতা প্রশ্নাতীত, তাঁর মত যোগ্য প্রার্থীর জন্য দাক্ষিণাত্যে বক্সী বা ওয়াকিয়ানবিস ছাড়া অন্য পদ নেই। এরকম যোগ্য মানুষকে কোন কারণ ছাড়া শাস্তি দেওয়া এবং অপমান করা হয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন এবং একটি চিঠি লিখে বলেন, খান, মীর জুমলাকে উঁচু দৃষ্টিতে দেখেন, ফলে তাঁর হয়ে ওকালতি/মধ্যস্থতা করা যুক্তিযুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে জুড়লেন, ‘...তোমার দপ্তর থেকেই এই জটিলতা কাটাতে হবে।’ এছাড়াও দাক্ষিণাত্যের দক্ষ এবং অভিজ্ঞ দেওয়ান মুর্শিদকুলির বিষয়টিও মাথায় রাখতে বললেন। এছাড়াও পরলোকগত পয়নঘাটের দেওয়ান আজম খানের পুত্র আহমদ নগরের সার্বিক দায়িত্বে থাকা মুলতাফত খানের(১৬৫৬) বিষয়টিও হিসেবে রাখতে বললেন।

একই সঙ্গে উজিরকে মুনসি কাবলি খান, উপযুক্ত এক আধিকারিক এবং অসাধারণ সেনানী আদম খান খেসগির কথাটাও হিসেবের মধ্যে রাখতে অনুরোধ করলেন। মুরাদকে বহুকাল সেবা করে খেসগি বিজাপুর সরকারে যোগ দিয়েছে এবং সে তার কাজ দায়িত্ব সহকারে সম্পাদন করে। আওরঙ্গজেব তাকে ডেকে পাঠান কিন্তু তাকে সাধারণ ৫০০ জাট এবং ১০০ সওয়ারের মনসব পদ দেন। তিনি এতে সুন্তুষ্ট নন, তাঁর লক্ষ্য সম্রাটের সভা।

৪। আওরঙ্গজেবের অসাধারণ সঙ্গী মীর জুমলা
সম্রাটের দরবারে মীর জুমলার উল্কাস্বরূপ উত্থান আওরঙ্গজেবের নিজের অভিপ্সা এবং উচ্চাশা পূরণের সূচকের সিঁড়ি তৈরি হল বলা যেতে পারে। মীর জুমলার দায়িত্ব এবং তাঁর ভাগ্যের উড়ানে যে প্রতিশ্রুতি আওরঙ্গজেব তাকে দিয়েছিলেন, তা সত্য হওয়ায় তার প্রতি আওরঙ্গজেবের ভালবাসা আরও বাড়ল। আওরঙ্গজেবের শিবির থেকে মীর জুমলা চলে যাওয়ার পর চিঠির পর চিঠিতে দাক্ষিনাত্যের সুবাদার তাঁর প্রতি গভীর ভালবাসা, বন্ধুত্ব আর বন্ধু বিচ্ছেদে তীব্র বেদনার প্রেমানুভূতি - একজন প্রেমিক তাঁর প্রেমিকাকে ছেড়ে গেলে যে ভাব উদয় হয় তা বারবার আকুতি সহকারে জানিয়েছেন। ‘তোমার সঙ্গে থাকার আকুল ইচ্ছে থাকলেও নিষ্ঠুর সময় আমাদের মধ্যে একটা বিচ্ছেদের কঠোর দেওয়াল তুলে দিয়েছে। (কবিতা) সে এল আর গেল। আমার হৃদয়কে সমবেদনা জানাতে কিন্তু সে বেশিক্ষণ বসল না। সর্বশক্তিমান (আমাদের)মিলন ঘটাবার পথ উন্মুক্ত করে দিন...’। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে বললেন তিনি তাঁর চিরকাল বাধ্য হয়েই থাকবেন। ২৭ জিকাদা/৬ সেপ্টেম্বর ১৬৫৬(?) সালে মীর জুমলার চিঠির উত্তরে তিনি লিখছেন, ‘শুধু সাদায় কালোয়, হৃদয় থেকে উৎসারিত প্রেমানুভূতি আর বন্ধুত্বকে বিচার করা যায় না। যে অকপট উদ্দেশ্য তুমি চিঠিতে প্রকাশ করেছ, এবং আজকাল করে চলেছ, তাতে আমার প্রতি তোমার বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখছি। আমি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে সেটা অনুভবও করছি। আমি নিশ্চিত জানি, সব পরিকল্পনা ভাবনাচিন্তা রূপায়নে ভাগ্য তোমার সাথে থাকবে। সর্বশক্তিমান তোমায় সেই শক্তি প্রদান করুণ।’ এই উচ্ছ্বসিত ভাবের প্রকাশে একটা বিষয়ই নিশ্চিত করে, উজির মীর জুমলা দাক্ষিণাত্যের দেওয়ানের অমূল্য জোটসঙ্গী ছিলেন।

৫। উজির মীর জুমলার শাহজাদা দারার বিরুদ্ধাচরণ
তাঁর নিজের স্বার্থপূরণে উজিরকে ব্যবহার করা আওরঙ্গজেবের মূল উদ্দেশ্য ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে রাজসভায় দারাকে রুখতে পারলেই একমাত্র তাঁর উচ্চাশা পূরণ হতে পারে। কিন্তু মীর জুমলা সবে দিল্লিতে এসেছেন এবং সঙ্গীসাথী হীন, তাই আওরঙ্গজেব জাহানারাকে অনুরোধ করলেন, মীর জুমলার প্রতি সদয় ব্যবহার করতে এবং তাকে প্রত্যেক বিষয়ে সমর্থন করতে। জাহানারা সম্মতি জানালে তিনি মীর জুমলাকে বললেন অবিলম্বে ঈশা বেগের মাধ্যমে জাহানারাকে ‘অদেখা’ সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ জানানো দরকার এবং তাঁর সমর্থন জোগাড়ের জন্য তাকে বলা, এই রাজসভায় জাহানারা ছাড়া মীর জুমলার অন্য কোন গতি নেই, তিনি তাঁর সম্মান জাহানারার পায়ের কাছে লুটিয়ে দিচ্ছেন। অন্যান্য অভিজাতর সঙ্গে ভাল ব্যবহার করতে পরামর্শ দিলেন, বললেন, জ্ঞানীর থেকে দূরে থাকা জরুরি কাজ নয়।

দিল্লির রাজসভায় মীর জুমলার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রভাব দেখা গেল অবিলম্বেই। আমরা আগেই দেখেছি, কর্ণাটকে থাকাকালীন তিনি, বিজাপুরী সুলতানের প্রতি বিদ্বিষ্ট শাহজী ভোঁসলাকে মুঘলদের পাশে দাঁড়াবার জন্য রাজি করেয়েছিলেন। মীর জুমলা শাহজীকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রত্যায়িত করেন আওরঙ্গজেব। রাজসভায় মুঘল উজির হিসেবে এসে দারার ইচ্ছের বিপক্ষে গিয়ে শাহজীর প্রতি পুরোন প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে তিনি সম্রাটকে সেই বিষয়ে এগোতে পরামর্শ দিলেন। তাঁর প্রস্তাবে আওরঙ্গজেব সম্মতি দিলেন এবং বললেন, শাহজীর প্রতি যে সব মিথ্যে অভিযোগ এসেছে তা যেন খণ্ডানোর চেষ্টা মীর জুমলা করেন।

বিজাপুরের উপঢৌকনের প্রভাবে দারা যেভাবে সম্রাটকে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে মীর জুমলা যেভাবে সম্রাটের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় আওরঙ্গজেবের পক্ষ ধরে সওয়াল করেন, তা আওরঙ্গজেবের কাছে চিত্তগ্রাহী বিষ্ময় রূপে উপস্থিত হয়েছিল। নিজের উকিলের কাছে সেই সংবাদ জেনে আওরঙ্গজেব, মীরজুমলার মুন্সি কাবলি খানকে তাঁর প্রভু সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। ‘আমি এর থেকে বেশি মীর জুমলার থেকে প্রত্যাশা করি (চশমাদস্ত মা আজ ইশান পেশ আজ ইন অস্ত)। আমি জানি আমার ভালর জন্য সে প্রত্যেক পদক্ষেপ করা থেকে নিজেকে বিচ্যুত করবে না। এবং আমি যা বলছি, তাঁর থেকেও বেশি কাজ সে করবে এটা আমার বিশ্বাস। তিনি মীর জুমলাকে জানালেন যে সাম্প্রতিক অতীতে আদিল শাহ সম্রাটকে এমন কিছু চোখ ধাঁধানো পেশকাশ পাঠাতে পারেন নি, পাঠিয়েছেন মাত্র ৪ লাখ টাকা(প্রতিশ্রুত ৯ লাখ টাকার পরিবর্তে) এবং আবুল হাসান এটি সম্রাটের সামনে উপস্থিত করবে। এই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করতে উজিরকে বললেন, এবং যদি এই প্রশ্নটা যদি আবার ওঠে, তাহলে উত্তরটা এমন দিও যাতে শত্রুরা(এক্ষেত্রে দারা) পস্তায়।
(চলবে)
Post a Comment