Thursday, December 22, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২৯ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

এদিকে গোলকুণ্ডায় ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, যার বলে আওরঙ্গজেবের পক্ষে সেই ঘটনায় আরও তাড়াতাড়ি অংশগ্রহণ করার সুযোগ এসে যায়। কুতুব শাহের সঙ্গে মীর জুমলার মতবিরোধ যখন তুঙ্গে, সুলতান তাকে চক্রান্ত করে গোলকুণ্ডায় ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। পুত্রের সহায়তায় নিজেকে অস্ত্রের সাহায্যর মুক্ত করে মীর জুমলা সশরীরে কর্ণাটকে ফিরে যান এবং আর কোন দিন গোলকুণ্ডায় ফিরে যাবেন না সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর গোপন সিদ্ধান্ত বুঝে তাকে বার বার গোলকুণ্ডায় আনানোর চেষ্টা করতে থাকেন সুলতান। এই সবেতেই সুলতানের উজিরের সন্দেহ আরও বাড়তে থাকে এবং তিনি গোলকুণ্ডায় না যাওয়ার সিদ্ধন্তে অনড় থাকেন। শেষ পর্যন্ত সুলতানের ভালমানুষির মুখোশ খুলে যায় এবং তিনি মীর জুমলাকে গ্রেপ্তার করে তাকে ধ্বংস করার সিদ্ধন্ত নিয়ে ফেলেন।

পাদশাহ বুঝলেন মীর জুমলার সঙ্গে ঠিক মত ব্যবহার করা হয় নি। এবং অবস্থা অনুধাবন করে আওরঙ্গজেব মার্ফত খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলেন কেন মীর জুমলা কর্ণাটকে ফিরে গেলেন। আওরঙ্গজেব সমস্ত অবস্থা পর্যালোচনা করলেন, এবং সম্রাটকে বোঝালেন মীর জুমলা বাধ্য হয়েছেন কর্ণাটকে ফিরে যেতে, কেননা মুঘল সাহায্য তাঁর কাছে আসে নি। আর তাঁর মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বাধা দেওয়ার কেউ নেই বর্তমানে; যত তাড়াতাড়ি তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে তত শীঘ্র যোগ দেওয়ার জন্য ইচ্ছুক হয়ে রয়েছে। শুধু মাত্র মৌখিক সমঝোতার প্রতিশ্রুতিতে কোন কাজ হয় না। আওরঙ্গজেব অনুভব করলেন খুব শীঘ্রই তাকে কাজে নামতে হবে এবং তাঁর আধিকারিক সঈদ আহমেদ মার্ফত তিনি মীর জুমলাকে একটি চিঠি লিখলেন এই মর্মে যে তিনি যেন খোলাখুলিভাবে মুঘল সাম্রাজ্যে যোগ দেন এবং তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন যে তিনি নিজে পাদশাহের সঙ্গে দেখা করে তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ব্যবস্থা করবেন। এছাড়াও পাদশাহ মহম্মদ মুনিমকে সাম্রাজ্যের পক্ষে, সাম্রাজ্যের ফার্মান নিয়ে তাঁর নিজের হয়ে শ্রীরঙ্গর সঙ্গে এবং সরাসরি মীর জুমলার সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দিলেন। মীর জুমলা একজন সাম্রাজ্যিক মধ্যস্থতার জন্য দূত প্রার্থনা করে সম্রাটের কাছে আবেদন পাঠালেন এবং সেটি প্রত্যায়িত করে দিলেন আওরঙ্গজেব নিজে।

৩। মহম্মদ মুমিন দৌত্য
এত দিনে, ১৬৫৩-৫৪ সালে শ্রীরঙ্গর ইসলামে পরিবর্তিত হওয়ার আবেদনের খবর এবং মুঘল রাজসভায় তাঁর হয়ে একজন প্রাজ্ঞ মুঘল কূটনীতিবিদ মহম্মদ মুনিম সফদরখানির দৌত্যের খবর পৌছল সুলতানদের কানে। তাঁদের আশংকা হল যে তারা কর্ণাটক হারাবেন। ‘আদিল শাহ মনে করলেন এত দিন তারা কর্ণাটকে যা ভোগ করে এসেছেন, তা মুঘলেরা দখল করে নিতে পারে, তিনি মীর জুমলার বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অন্য দিকে কুতুব শাহ মীর জুমলাকে বাবা বাছা করে শান্ত করে তাঁর পুরোনো পদ এবং মহাল দেওয়ার সিদ্ধন্ত নিলেন। কিন্তু ততদিনে খুব দেরি হয়ে গিয়েছে। যদিও মুঘলেরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করেছে, কিন্তু শিরদাঁড়া সোজা রাখা উজির, মীর জুমলা ঠিক করেই নিয়েছেন, যে দু বছর পেরিয়ে গেলেই তিনি হয় কুতুব শাহের দরবারে উপস্থিত হবেন, না হয় তীর্থে চলে যাবেন।’ মহম্মদ আমিন হায়দ্রাবাদের মীর জুমলার পুত্র, এবং তাঁর অধীনস্থ আধিকারিক, মহম্মদ আমিন নিজেদের কুতুব শাহের অধীনে থাকাকে খুব একটা সুরক্ষিত বোধ করছিলেন না, এবং সুলতানকে দিয়ে ওপরে বর্ণিত শান্তি চুক্তি করে সাময়িকভাবে সুরক্ষিত বোধ করলেন। এই ঘটনাপ্রবাহে উদ্বিগ্ন আওরঙ্গজেব সম্রাটকে আবেদন করে বললেন যে সাম্রাজ্য যেন মীর জুমলাকে সরাসরি সাহায্য করবে এমন একটা প্রকাশ্য ইঙ্গিত দিক এবং তিনি যেন যে কোন মুহূর্তে সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে পারেন সে ব্যবস্থাও করা হোক।

আওরঙ্গজেব যা চেয়েছিলেন তা রূপায়ন করা বাস্তবে খুব সহজ কাজ হল না। কুতুব শাহকে ঠেকিয়ে রাখার যে কূটনীতি নিয়েছিলেন মীর জুমলা, ঠিক সেই নীতি তিনি নিলেন আওরঙ্গজেবের সঙ্গেও। আওরঙ্গজেব মহম্মদ মুনীমকে তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালাবার জন্য দায়িত্ব দিলেন এবং নির্দেশ দিলেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে যেতে যতক্ষণনা তিনি মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পাকা সিদ্ধন্ত নিচ্ছেন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে ইতোমধ্যে চিঠি লিখেছেন এবং সঈদ আহমেদকে কাজে লাগিয়েছেন এবং তাঁর বিশ্বাসের প্রশংসা করেছেন এবং সুলতান যে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, তাও সেই চিঠিতে তিনি নিন্দা করেছেন। তিনি লিখলেন তাঁর বিশ্বাস বাইরের সব ঝঞ্ঝাট মিটে যাবে এবং মীর জুমলা যেন সাম্রাজ্যে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করেন, কেননা তাকে সেই সিদ্ধান্ত লাভবান করাবে। তিনি বললেন মীর জুমলা যেন তাঁর দূতের কাছে নিজের মনের কথা খুলে বলেন এবং সাম্রাজ্যে উঁচু পদ লাভের সুযোগ না হারান। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে দুজন সুলতান জোর বদ্ধ হয়েছে; তাই সম্রাটের থেকে সঠিক প্রতিশ্রুতি না পেয়ে, মীর জুমলা দূতের কাছে মুখ খুললেন না। মুনিম তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি আওরঙ্গজেবের মার্ফত সুলতানকে একটা আবেদন পেশ করলেন। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন, যতক্ষণতা সাম্রাজ্য মীর জুমলার সুরক্ষা বিষয়ে কোন স্থায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ততদিন মীর জুমলা কোন স্থায়ী সিদ্ধন্ত নেবে না, এবং সেই জন্য তিনি চাকরির শর্ত – যেমন তাঁর পদ বৃত্তান্ত, তাকে রক্ষার জন্য নিরাপত্তার বিষয় এবং সেই জন্য অতিরিক্ত সেনাবাহিনী বরাদ্দ করার ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু তবুও শাহজাহান সিদ্ধন্ত নিতে না পারায় মীর জুমলা সতর্ক হয়ে গেলেন এবং তিনি পাদশাহের মনোভাব বিষয়ে শংকিত হয়ে পড়লেন। ফলে আওরঙ্গজেব চেষ্টা চালালেন তাঁর আশংকা দূর করার। দূত মার্ফত গোপন কথাবার্তা বিনিময় হতে থাকল। মীর জুমলাকে শান্ত করতে আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে নিশান পাঠানো হল। কুড়ি দিন পরে মীর জুমলা দুজন সেনাদূত মার্ফত একটি চিঠি পালটা আওরঙ্গজেবকে পাঠালেন। আওরঙ্গজেব সেটি সম্রাটের বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেন এবং মীর জুমলাকে লেখেন, মীর জুমলা যেন তাঁর জীবনের সব থেকে বড় চমক পুরষ্কার স্বরূপ পাওয়ার জন্য ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রাখেন।

১৬৫৪ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে, আওরঙ্গজেবের নাছোড়বান্দা মনোভাবে প্রভাবিত হয়ে অবশেষে পাদশাহ মীর জুমলাকে আওরঙ্গজেবের সুরক্ষায়, এবং একমাত্র আওরঙ্গজেবের উপস্থিতিতে রাজধানীতে আনার সম্মতি দিলেন। তিনি দুটি ফর্মান জারির প্রস্তাব দিলেন একটি গোপনে মীর জুমলাকে তাঁর সামনে আসার অন্যটি কুতুব শাহকে লেখেন যাতে তিনি তাঁর উজির এবং পুত্রকে মুঘল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা না হয়ে দাঁড়ান।

মীর জুমলা ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে হঠাতই এক বছর সময় চাইলেন। উদ্দেশ্য বিভিন্ন বন্দরে ছড়িয়ে থাকা তাঁর সম্পদ উদ্ধার করা। এবং তিনি তাঁর প্রাক্তন চাকুরিদাতার সঙ্গেও কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন যাতে তারা তাঁর বিরুদ্ধে না যান এবং মুঘলদের সঙ্গে তাঁর চুক্তি যাতে গোপন থাকে এই প্রস্তাবও দিলেন।
মীর জুমলার মনোভাবে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন এক্ষুনি তাঁর উদ্দদেশ্যে কোন দূত না পাঠাতে এবং মহম্মদ মুনিমের ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। মুনিম ফিরে গিয়ে মীর জুমলার এই অবস্থা সম্রাটকে বর্ণনা করবেন। তিনি সম্রাটকে এই আলোচনা বা পদক্ষেপ গোপন রখতে অনুরোধ করলেন, কারণ দুজন সুলতান যদি মীর জুমলার উদ্দেশ্য জানতে পারেন, তাহলে তারা যে কোন ছলে বলে কৌশলে এই উচ্চপদ পাওয়া থেকে বাধা দেবে(অর্থাৎ মেরে ফেলা) এবং তখন সুলতানদের বাধা দেওয়া অতীব অসুবিধে হবে কেননা এই বিষয়ে দু জন একমত হয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি মীর জুমলাকে বললেন(১৩ জানুয়ারি ১৬৫৫) তাঁর বকেয়া কাজগুলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পাদন করতে এবং মন থেকে সাম্রাজ্যের সেবায় যোগ দেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না করতে।

রাজধানীর পথে যাওয়া মুহম্মদ মুনিমের হাত দিয়ে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে লিখলেন, ‘বাস্তব হল মীর জুমলার আর সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে না এসে গতি নেই। সেটা সে আমায় জানিয়েছে। সম্পত্তি উদ্ধার করা তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য। এখন সে যে প্রকাশ্য কূটনৈতিক চাল চেলেছে সেটা তাঁর মনের কথা নয়। দূর্গ, বন্দর এবং খনি সমৃদ্ধ এই জনাকীর্ণ রাজ্যে(জোরদার সেনাবাহিনী, আতুল ঐশ্বর্য এবং কার্যকরী আধিকারিক সমৃদ্ধ) সে তাঁর সম্পদ উদ্ধার পুরোনো আশ্রয়দাতা বিজাপুরের সুলতানের কাছে ফিরে না গিয়ে মুঘল বাহিনীতে যোগ দেবে। সাম্রাজ্যের রাজসভায় যোগ দেওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। বর্তমানেরটি কূটনৈতিক চাল এবং ততক্ষণ সে দুই সুলতানকে চটাতে চাইছে না তাঁর নিরাপত্তার জন্য... এবং সেজন্য সে এখুনি এই দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাইছে না... সুন্দর ব্যবহার এবং ছলে বলে কর্ণাটকের জমিদারদের বশ্যতা অর্জন করে এবং ইখলাস হাবসির বন্ধুত্ব অর্জন করে... মীর জুমলা সুচতুরভাবে শুধু সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে।’
(চলবে)

Post a Comment