Monday, December 19, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা২২ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

৩। সেনা বাহিনী ব্যবস্থাপনা
কর্ণাটকের সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহের অধীনে কাজ করার সময়, বিপুল সুলতানি সেনা বাহিনী ছাড়াও, মীরের নিজস্ব সেনা বাহিনীর বহরও খুব কম ছিল না। আওরঙ্গজেবের বাখানে আমরা জানতে পারছি, মীর জুমলা তার বিপুল বাহিনীকে কর্ণাটকে পাঠিয়েছিলেন। বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় বিশাল পরিমান এলাকা দখল, দেখাশোনা এবং সেনা বাহিনী বজায় রাখা সহজ হয়ে গিয়েছিল মীর জুমলার পক্ষে। ওয়াল্টার লিটন এবং ভেঙ্কট ব্রাহ্মণ(১৭ জানুয়ারি ১৬৫১) সূত্রে জানছি যে মীর জুমলার বাহিনীতে ছিল ৩০০ হাতি, ৪০০-৫০০ উট এবং ১০,০০০ যাঁড়(অক্সেন)। ১৬৫২ সালের বিজাপুরের সেনা অভিযানে তিনি উদ্যম নিয়ে মুঘল, আফগান, পাঠান এবং রাজপুত সেনা সংগ্রহ করে বিপুল বাহিনী তৈরি করেন এবং তার জন্য তিনি গর্বিতও ছিলেন। ক্রমে ক্রমে নিজেকে জোরদার এবং আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে তিনি কুতুবশাহী সেনাবাহিনীর বহু সেনা নায়ককে(সেনাপতি) ‘অপূর্ব অমায়িক ব্যবহার এবং আনুকূল্য’ প্রদর্শন করে নিজের দিকে টেনে এনে পুরোনো অভিজ্ঞ শাহী সেনার মত সেনা বাহিনী গঠন করেন। মীর জুমলার কাজ সম্বন্ধে সংবাদ সংগ্রহ করতে আওরঙ্গজেব মহম্মদ মুনিমকে পাঠিয়েছিলেন(১৬৫৩-৫৪) – তার বক্তব্য ছিল, মীর জুমলার বাহিনীতে রিসালা (ঘোড় সওয়ার) ছিল ৯০০০ - যার মধ্যে ৫০০০ নিজের আর ৪০০০ কুতুব শাহীর, পদাতিক ছিল ২০০০০ – এ ছাড়াও তার বাহিনীতে সম্পদ হিসেবে ছিল নগদ অর্থ, মনমুগ্ধকর অলঙ্কার, প্রশিক্ষিত হাতি, ইরাকি আর আরবি ঘোড়া, এছাড়াও আত্মমর্যাদা, গৌরব আর সম্মান বৃদ্ধির জন্য যা যা কিছু লাগে সব এবং সেই সেনা বাহিনী তাদের সামরিক দক্ষতার চূড়ান্তে পৌঁছেছিল।

দক্ষ সেনানায়ক মীর জুমলার সেনা বাহিনীর খুঁটিনাটির দিকে প্রভূত নজর ছিল। ১৬৪২ সালে তিনি সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিন্ত করেন। তিনি শুধু যে সেনার বা পশুর খাবার মছলিপত্তনম, কোণ্ডাপল্লী এবং কোণ্ডাভিডু থেকে বাজার দরে কেনার উদ্যোগ নেন তাই নয়, তিনি শস্যের দালালদের সেনা বাহিনীর সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিলেন, যাতে বাহিনীর পণ্য সরবরাহে কোন ছেদ না পড়ে। এছাড়াও তিনি চিঠিপত্রের আদানপ্রদান দ্রুত করতে নিয়মিত ডাকচৌকি স্থাপন করেছিলেন; যাতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে রাজসভার মধ্যে রোজ খবর আদান প্রদান হয়, তাঁর জন্য কবুতর এবং ডাকহরকরা নিয়োগ করেছিলেন।
যুদ্ধের আক্রমণাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের বিষয়ে তাভার্নিয়ের সূত্রে জানতে পারছি, মাথায় ঝুঁটি বাঁধা পদাতিকেরা কোমরে সুইসদের মত চওড়া তরোয়াল বহন করত, ভালতম ফরাসি কামানের থেকেও মীর জুমলার কামানগুলির মুখ ছিল চওড়া, আরও পোক্ত এবং কামান তৈরিতে সব ভাল লোহা ব্যবহার হত। ঘোড়সওয়ারদের পিঠে তীর ধনুক, যুদ্ধ কুঠার, আর ঢাল থাকত। এবং আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে থাকত বর্ম, শিরস্ত্রাণ, কাঁধে ঝোলানো লোহার বর্ম-জ্যাকেট, বাহুবন্ধ এবং বর্মের মত করে সারা দেহে আবরণ। কিন্তু সাধারণ পদাতিকেদের ৫ গজের মত কাপড় পরানো হত, যা দিয়ে তাদের সামনে বা পিছন কোনটাই ঢাকত না।

গোলান্দাজদের সঙ্গে ছিল কামান আর গুলতি – যা দিয়ে বিশাল বিশাল আগুণের গোলা বিপক্ষের দিকে ছোঁড়া যায় আর ছিল কামানের জন্য গোলার বড় ভাণ্ডার। মীর জুমলার এই বিভাগটা দেখত ফরাসি আর অন্যান্য খ্রিস্টান এবং বার্ণিয়ে বলছেন তাদের দক্ষতা চূড়ান্ত ছিল।

তাঁর বাহিনীতে বহু ইওরোপিয়, ফরাসী, ব্রিটিশ, পর্তুগিজ, ইটালিয় সেনা চাকরি করত – বিশেষ করে গোলান্দাজ বাহিনীর নানান পদেতে। ১৬৫০-৫২ সালে ব্রিটিশরা তাঁকে ৬জন গোলান্দাজ – জেরিমি রুট, হিউ ডিক্সন, রিচার্ড এমার্সন, জন কাউহিল, রবার্ট ব্রিংবোর্ণ এবং রিচার্ড হলকে ধার দিয়েছিল। সেন্ট ফোর্ট জর্জের গোলান্দাজ সেনাপতি জেরিমি রুটকে মীর জুমলা খুব গুরুত্ব দিতেন। ১৬৫৩ সালে আরও দুজন গোলান্দাজ সেনা সেন্ট জর্জ থেকে মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেয়। এছাড়াও বহু গোলান্দাজ সেন্ট জর্জ থেকে পালিয়ে তাঁর বাহিনীতে যোগ দিতে আসত এবং তিনি তাদের সুরক্ষা দিতেন – এ মর্মে বহু চিঠচাপাটি উদ্ধার করা হয়েছে। ১৬৫২ সালে গোণ্ডিকোটায় মীর জুমলার বাহিনী দেখতে এসে তাভার্নিয়ে এবং তাঁর বন্ধুর(দু জার্ডিন) সঙ্গে একজন ব্রিটিশ গোলান্দাজ আর তাঁর ইতালিয় বন্ধু, নৈশভোজে যোগ দিয়েছিল। একজন ফরাসি কামান তৈরির জন্য খ্যাত গোলান্দাজ, শল্যচিকিতসক, ক্লদ মিলে, মীর জুমলার গোণ্ডিকোটার দুর্গের জন্য ১০টি ৪৮ পাউণ্ডের এবং ১০টি ২৪ পাউণ্ডের কামান তৈরি করছিলেন। বিভিন্ন যায়গা থেকে তামা যোগাড় করে এবং গাণ্ডিকোটার মন্দিরগুলির মধ্যে মাত্র ছটি বিখ্যাত মন্দিরের মূর্তি বাদ দিয়ে, সবগুলি গলিয়ে তামা জোগাড় হল। কিন্তু তিনি একটাও কামান তৈরি করতে পারলেন না এবং নবাবের সেনা বাহিনী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন। শ্রীরঙ্গ, দামরালা ভেঙ্কটাপ্পাকে পদচ্যুত করায়, মীর জুমলার বাহিনীতে যোগ দেয়। কর্ণাটকের হিন্দু বিদ্রোহের সময় জিঞ্জির টুপাক্কি কৃষ্ণাপ্পা নায়ক, মীরের সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর বাহিনীর আর এক হিন্দু সেনাপতির নাম ছিল ছিন্নাতাম্বি মুদালিয়ার।

বিভিন্ন জাতি সমন্বয়ে গঠিত তাঁর বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মীর জুমলা সতর্ক থাকতেন। ১৬৫২ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাভার্নিয়ে দেখলেন পেন্নার নদীর তীরে মীর জুমলার সমগ্র বাহিনী পাহাড়ের তলায় সমবেত হয়েছে, এবং ঘোড়সওয়ার নজরদারি সবে শেষ হয়েছে এবং তাঁকে বেশ চৌখস(স্মার্ট) লাগছে। পরের নজরদারির তারিখ ঠিক হল ঐ মাসের ১৪ তারিখে।

বেতনের বিষয়ে কিছুটা সামন্ততান্ত্রিক পদ্ধতিতে এবং কিছুটা নগদে বিদায়ের প্রথা ছিল। প্রথমটির উদাহরণ পাওয়া যায় মুকাসদার বা জায়গির দেওয়ার প্রথায়, যারা সেই জায়গির থেকে রোজগারের টাকায় বেতন দিত। তারা সেনা সরবরাহ করত কি না জানা যায় না। পেশাদার সেনাদের সেনাপতি মার্ফত রাষ্ট্র নগদে বেতন দিত। তাভার্নিয়ে বলছেন, ১১ সেপ্টেম্বর ১৬৫২ সালে ফরাসী গোলান্দাজেরা মীর জুমলার তাঁবুতে গিয়ে তাদের চার মাসের বকেয়া দাবির জন্য বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল, না পেলে তারা তাকে ছেড়ে চলে যাবে, হুমকিও দিয়েছিল। নবাব তাদের পরের দিন আসতে বললেন, তিন মাসের বাকি দিলেন এবং এক মাসের বাকিটা মাসের শেষে দিয়ে দেওয়া হবে আশ্বাস দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই টাকার অর্ধেক তারা নাচনেওয়ালি এনে আমোদ ফুর্তি করতে উড়য়ে দিল।

পাহাড়ি দুর্গ ছাড়াও, আমরা জনতে পারছি জিঞ্জি গাণ্ডিকোটা, উদয়গিরি পাহাড়ের শীর্ষের দুর্গ আর রায়পুর ছিল বন ঘেরা দুর্গ। এছাড়া নেল্লোর দুর্গ ছিল সমতলে অবস্থিত।
(চলবে)
Post a Comment