Thursday, December 22, 2016

বাংলা যখন বিশ্ব সেরা৩০ - লাইফ অব মীর জুমলা, জেনারেল অব আওরঙ্গজেব

জগদীশ নারায়ণ সরকার

বাস্তবে মীর জুমলা কিন্তু কূটনৈতিকভাবে জোরালো অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আওরঙ্গজেব বিষয়টা সম্যকভাবে বুঝেছিলেন এবং তিনি এই অবস্থাটি পাদশাহকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন। মহম্মদ মুনিমের ফেরার পরেও মীর জুমলার সঙ্গে তাঁর চিঠি চাপাটিতে বোঝা যাচ্ছে ক্ষুরবুদ্ধি উজিরকে তিনি খুব সহজে বশ করতে পারেন নি এবং মুঘলদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে মীর জুমলা কিছুটা ইতস্ততও করছিলেন, বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখছিলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে লিখলেন, ‘(সাম্রাজ্যকে)সেবা করার ইচ্ছের ওপর জোর রেখে নিজের ওপর আস্থা বজায় রাখ, এবং মনে রাখ তোমার জন্য অনন্ত ভাগ্যবান ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে (দৌলত সরমাদল(না সারমাদি?))।’

৪। ইখলাস খান, শাহজী ভোঁসলে এবং রয়াল ত্রয়ীর সঙ্গে মীর জুমলার কূটনৈতিক সম্পর্ক
মীর জুমলার জোরদার কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল করতে দুই সুলতান মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করলেন। শাওয়াল ১০৬৪(১৬ আগস্ট-১২ সেপ্ট ১৬৫৪)এ আওরঙ্গজেব, মুনিমকে নির্দেশ দিলেন যেহেতু কুতুব শাহ পুরোনো চুক্তি নবীকরণ করতে চাইছে, তাঁর সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যাক। বীজাপুরও এই ভাবে মুঘলদের সঙ্গে দরকষাকষি, গা ঘষাঘষি সুরু করল। পাদশাহ যাতে রয়ালকে নিরাপত্তা না দেন তাঁর জন্য তাকে প্রচুর পরিমানে উপঢৌকন দেওয়া হল। সুলতানদের বিরুদ্ধে যত চক্রান্ত হবে, সেটি তত মীর জুমলার পক্ষে যাবে এটা তিনি বুঝলেন। এই উদ্দেশ্যে বাধ্য হয়ে মীর জুমলা তাঁর কূটনৈতিক চক্রের জাল আরও বেশি এলাকায় বিছোনোর কাজ শুরু করলেন। আদিল শাহের বিরোধিতার ধার নষ্ট করতে বিজাপুরী কর্ণাটকের হাবসি প্রশাসক ইখলাস শাহের সঙ্গে দহরম মহরম শুরু করতে দুজনের মধ্যে আশ্চর্য জনক কিছু চিঠ চাপাটি আদান প্রদান শুরু হল। এছাড়াও তিনি আদিল শাহের বিরোধী মারাঠি নেতা শাহজী ভোঁসলার বন্ধুত্বও চেয়ে বসলেন আওরঙ্গজেবের পক্ষ থেকে। আওরঙ্গজেবের ইচ্ছে তাকে বীজাপুরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, তাই তিনি মীর জুমলার এই পদক্ষেপকে জোরদার সমর্থন জানালেন এবং মীর জুমলার থেকে জানতে চাইলেন শাহজীর মনোভাব, যাতে তাকেও তিনি এই শিবিরে নিয়ে আসতে পারেন। মীর জুমলা মুঘলদের সঙ্গে রয়ালের হয়ে দৌত্য আর বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলেন, তার দীর্ঘদিনের বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার বিরোধিতাকে ধুনো দিতে এবং নিজের অবস্থাকে আরও দৃঢ করতে। কিন্তু আমরা আগেই দেখেছি সম্রাট রয়ালকে নিরাপত্তা দিতে আস্বীকার করলেন। তাই মীর জুমলা তাঁর সুরক্ষার স্বিতীয় স্তর গড়ে তুলতে দ্বিতীয়বারের জন্য রয়ালের হৃদয় জিততে চেষ্টা চালালেন। তিনি আওরঙ্গজেবকে বললেন রয়াল কিন্তু তাঁর মতিতে স্থির রয়েছে এবং তাকে রয়ালের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন যেহেতু মীর জুমলা এর আগে রয়ালের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন, তাই তাকে নতুন করে পাদশাহের সামনে বিষয়টা পেশ করতে হবে।

৫। আওরঙ্গজেবের গোলকুণ্ডা অভিযানের পরিকল্পনা
মুঘলদের সঙ্গে গোপনে চলতে থাকা তাঁর দীর্ঘ কূটনৈতিক আলাপ আলোচনা সত্ত্বেও কিন্তু শেষ পর্যন্ত মীর জুমলা বাধ্যবাধকতাটাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারলেন না। মুঘল সম্রাটের সঙ্গে যে তিনি আলাপালোচনা চালাচ্ছেন, সেই খবর প্রকাশ হয়ে পড়ল। সুলতানেরা তাঁর বিরুদ্ধে যৌথ সেনাবাহিনী পাঠানোর পরিকল্পনা করতে লাগলেন। তাঁরা দুজনেই চাইছিলেন না যে মীর জুমলা তাঁর ব্যাপক সম্পদ এবং এই এলাকা সম্বন্ধে খুঁটিনাটি জ্ঞান নিয়ে যেন কোনভাবেই সম্রাটের সেনা বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন। এই গোপন আলোচনা প্রকাশ্যে আসায় চূড়ান্তভাবে বেশি অস্থির হয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিয়ে ফেললেন সুলতান আবদাল্লা কুতুব শাহ। ২১ নভেম্বর ১৬৫৫ সালে তিনি তাঁর অনুপস্থিত আমীরের পুত্র মহম্মদ আমিন, তাঁর মা আর বোনকে গ্রাফতার করে, তাদের সব সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে গোলকুণ্ডার অনতিদূরে কোভিলকোণ্ডা দুর্গে বন্দী করে রাখলেন। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি আওরঙ্গজেব সম্রাটের কর্ণগোচর করলেন এবং বললেন এই খবরে মীর জুমলা উত্তেজিত হয়ে পড়বেন এবং দূরদৃষ্টিবিহীন কুতবুলমুলক মীর জুমলার পুত্রকে হত্যাও করতে পারে, তাই তাকে নির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ করার অনুমতি দেওয়া হোক’।

এই ঘটনায় মুঘলদের প্রতি যে দ্বিধান্বিত অবস্থা ছিল মীর জুমলার সেটি চকিতে উধাও হয়ে গেল। মীর জুমলার ইচ্ছে গোলকুণ্ডার সুলতান তো পূরণ করেনই নি বরং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বন্দী করে রেখে তাঁর হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়ে তাকে সত্যিকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে ঠেকে দিলেন। তিনি সুলতানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। তাঁর নিজের সেনা বাহিনী দুই সুলতানের বাহিনীর সঙ্গে জুঝতে পারবে না, তাই তিনি সরাসরি আওরঙ্গজেবের শরণাপন্ন হলেন, বললেন তিনি সাম্রাজ্যের অন্যতম একনিষ্ঠ সেবক এবং তিনি মহান সম্রাটের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করছেন। স্বীকার করলেন তাঁর একার বাহিনী দিয়ে এই অবস্থার সমাধান হবে না, সুলতানদের বিরুদ্ধে সম্রাটের সরাসরি সাহায্য দরকার। তাঁর চিঠি অনুবাদ সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে আওরঙ্গজেব সরাসরি তাঁর পিতাকে চাপ দিলেন কোন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ করার। আয়ুত সম্পদে ধনী গোলকুণ্ডাকে দখল করার এই যে অবস্থা আওরঙ্গজেবের সামনে উপস্থিত হয়েছে সেই অবস্থাটি এইভাবে তিলে তিলে পেকে উঠুক, সেই মনোভাব বহুকাল ধরে আওরঙ্গজেব পোষণ করছিলেন। এখন তাঁর সাম্রাজ্যবাদী সত্ত্বা শুধু গোলকুণ্ডা দখল করে শান্ত থাকল না, এর সঙ্গে কর্ণাটকের দিকেও নজর পড়ল। পিতাকে তিনি লিখলেন এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না, কেননা গোলকুণ্ডা এবং তাদের হয়ে মীর জুমলা কর্ণাটক দখল করেছে। এই দুটি অঞ্চল সম্পদে অমিত ধনী, নানান ধরণের দুষ্প্রাপ্য পণ্য রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, আরও যে কত কি লুকিয়ে আছে তা জানার বাইরে, আর রয়েছে বিশ্বশ্রুত খনি – এত কিছুর সঙ্গে সম্রাটের হাতে এসে পড়বে কর্মক্ষম কিছু অভিজাত যা সম্রাটের সাম্রাজ্যকে শুধু ঐহিক নয় পারমার্থিক বুদ্ধিবৃত্তিতেও ধনী করবে।

১৬৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর সম্রাট শাহজাহান মীর জুমলার আবেদন শুনলেন এবং আওরঙ্গজেবের অনুরোধক্রমে কাজি মহম্মদ আরিফ কাশ্মীরী(আহদির দ্বিতীয় বক্সী)র মার্ফত মীর জুমলাকে মুঘল সেনাবাহিনীর ৫ হাজারি জাট এবং ৫ হাজার সওয়ার এবং তাঁর পুত্রকে ২ হাজার জাট এবং ২ হাজার সওয়ার পদে নিয়োগ করে অসাধারণ সুন্দর কারুকার্যময় একটি চিঠি এবং খিলাত পাঠিয়ে রাজসভায় হাজির হতে নির্দেশ দিলেন। একই সঙ্গে কুতুব শাহকে একটি চিঠি লিখে মীর জুমলা আর তাঁর পুত্রকে রাজসভায় আসতে বাধা না দেওয়ার এবং তাদের কোন সম্পত্তি অধিকার না করার এবং পরিবারের কাউকে হেনস্থা না করারও নির্দেশ দিলেন। ১৬৫৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর এই চিঠি দুটি আওরঙ্গজেবকে দেন মহম্মদ শরিফ ইসাওয়াল। আওরঙ্গজেব কুতুব শাহকে চিঠি লিখে জানালেন উক্ত দিন থেকে মীর জুমলা এবং তাঁর পুত্র রাজকীয় সেবায় নিযুক্ত হয়েছেন ফলে কুতুব শাহ হয় তাঁর পুত্রকে ছেড়ে দিক না হয় যথোপযুক্ত অবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকুক। এরই সঙ্গে আওরঙ্গজেব রাজস্ব বাকি পড়ার অজুহাতে হায়দারাবাদ অভিযানেরও নির্দেশ দিলেন।
(চলবে)

Post a Comment