Sunday, June 26, 2016

Anecdotes of Aurangzeb – আহকমইআলমগিরি - আওরঙ্গজেবের উপাখ্যান

প্রথম খণ্ড

২। প্রথম জীবনেই দারার প্রতি আওরঙ্গজেবের ঈর্ষা

দারাশুকোর জন্য আগ্রায় একটি রাজপ্রাসাদ বানানো হয়েছে। সেখানে তিনি শাহ জাহান এবং সম্রাটের অন্য তিন সন্তানকে আহ্ববান করলেন। ভারতীয় গ্রীষ্ম। তাই নদীর কাছাকাছি মাটির তলার ঘর বানানো হয়েছে। মানুষের উচ্চতার থেকেও বেশি বড় আলেপ্পোর আয়নাটা নদীর দিকে মুখ ফেরানো। দারা পিতা আর তাঁর ভাইদের নিয়ে সেই ঘরের সৌন্দর্য দেখাতে নিয়ে গেলেন। মহম্মদ আকবর দরজায় ঢোকা বেরোনোর পথে বসে পড়লেন। দারা সেটা দেখে সম্রাটকে ইশারা করলেন/চোখ মারলেন, যেন বলতে চাইলেন দেখুন কোথায় সে বসেছে। মহামহিম বললেন, ‘পুত্র, আমি জানি তুমি জ্ঞানী এবং সন্তদের মত জীবনযাপন কর, কিন্তু তোমার পদমর্যাদা তোমায় বজায় রাখতে হবে – কথায় বলে যে নিজের মর্যাদা বোঝে না সে নাস্তিক। কি প্রয়োজন ছিল, যে পথে মানুষ যাতায়াত করে, সেপথে তোমার বসার, এবং তাও তোমার ছোট ভাইদের সামনে?’ আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, ‘পরে আপনাকে জানাব কেন আমি এখানে মাটিতে বসেছি’। আরও কিছু সংশ্লিষ্ট কথাবার্তার পর আওরঙ্গজেব উঠে তার সান্ধ্যকালীন নামাজ, জুহরের জন্য তৈরি হতে লাগলেন, এবং সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। সম্রাট শুনলেন, এবং আওরঙ্গজেবকে সাত মাসের জন্য সভায় এসে দর্শকাসনে বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। সাত মাসের পর সম্রাট সাম্রাজ্ঞী জাহানারাকে বললেন, ‘তুমি তার বাড়ি যাও, শুনে এস সে কেন সেদিন মাটিতে বসেছিল’। বেগম সাহেবা গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি উত্তর দিলেন, ‘যে দিন দারা শুকো আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল, সে পিতা আর তিন ভাইকে একদরজাওয়ালা মাটির তোলার ঘরে বসাবার উদ্দেশ্যপূর্ণ পরিকল্পনা করে, বার বার আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য সেই ঘর থেকে ঢুকছিল আর বেরোচ্ছিল, আমার সন্দেহ/ভয় হচ্ছিল, সে হয়ত আমাদের ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে রেখে দেবে তাহলেই সব শেষ(দরজা বন্ধ করে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে)। সে এতবার উদ্বেগহীনভাবে ঘরবার করছিল, যে আমার মনে হচ্ছিল, যে আমাকে কাজটা করতেই হবে(দরজা আটকে বসাটা), যাতে সে নিজে ঘরের মধ্যে থাকে(আর আমরা বাইরে)। কিন্তু মহামহিম নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাকে ভর্তসনা করলেন। এবং আমি সর্বশক্তিমানের কাছে মার্জনা চেয়ে বেরিয়ে আসি’। এটা শোনার পরেই সম্রাট শাহজাদাকে আদর করে ডেকে দয়া দেখালেন। শাহজাহা প্রধানমন্ত্রী শাহদুল্লা খাঁকে বললেন, ‘আপনাদের ইচ্ছা মত আপনি রাজধানী থেকে যে কোন জায়গায় যে কোন কাজের জন্য আমায় নির্বাসন দিন, আমি রাতের ঘুম আর মনের শান্তি হারিয়েছি’। তাঁকে মহামহিম তাঁর ইচ্ছেতেই লাহোর থেকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার করে পাঠিয়ে দেন।

মন্তব্য – শেষ স্তবকে উল্লিখিত লাহোর আসলে মুলতান। আওরঙ্গজেব লাহোর(পাঞ্জাব)এর সুবাদার কখোনোই ছিলেন না। ১৪ জুলাই ১৬৫২তে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত হন, মুলতান থেকে ওখানে যান।
১ ডিসেম্বর ১৬৪৫ দিল্লির যমুনার তীরে বাড়ির জন্য দারাকে ৪৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়(আবদুল হামিদের পাদশানামা)। এই প্রাসাদ শাহ জাহান প্রথম ঘুরে দেখেন ১৪ মার্চ ১৬৪৩। যমুনার পাশের আগ্রার এই বাড়িতে সম্রাট থাকেন ২০ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ১৬৪৪ পর্যন্ত। ২৮ মে থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত আওরঙ্গজেবকে আগ্রায় উক্তভাবে অপমান করে সভায় যোগ দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, এর পরে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৬৪৫ গুজরাটের সুবাদার করে পাঠানো হয়। সেই বছর সম্রাট আগ্রায় দারার প্রাসাদ যান ২ জানুয়ারিতে।
(চলবে)

Anecdotes of Aurangzeb – আহকমইআলমগিরি - আওরঙ্গজেবের উপাখ্যান



হামিদুদ্দিন খাঁ বাহাদুরের আচার্য যদুনাথ সরকারের আহকমইআলমগিরির ইংরেজি অনুবাদের বাংলা অনুবাদ
সঙ্গে আওরঙ্গজেবের জীবন এবং কিছু ঐতিহাসিক মন্তব্য
আচার্য যদুনাথ সরকার
তৃতীয় সংস্করণ, পরিমার্জিত এবং সংযোজিত
এম সি সরকার
কলকাতা
১৯৪৯

অনুবাদকের মন্তব্যঃ দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন অনুবাদ করতে গিয়ে বহু জায়গায় আচার্য যদুনাথ সরকার আহকমইআলমগিরির দাদ দিয়েছেন, লক্ষ্য করেছি। আচার্যদেব পাটনায় অধ্যাপনা করার সময় নিজের হাতে আহকম অনুবাদ করেছেন। সেই অনুবাদের সঙ্গে জুড়েছেন খ্রিষ্টিয় তারিখ সহ আওরঙ্গজেবের জীবন ইতিহাস এবং বিশ্লেষণ করেছেন সম্রাটের চরিত্র। যাদের একটু ভারতের ইতিহাস নিয়ে উৎসাহ রয়েছে, আবছা আবছা হলেও – কারোর কাছে তিনি নায়ক, আবার কারোর কাছে খলনায়ক – এটা আবছা হলেও জানা। আহকমইআলমগিরি অনুবাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধুই প্রাধান্য পেয়েছিল কেবল সেই সাহিত্যটিরই অনুবাদকর্ম – আওরঙ্গজেবের জীবনী আর চরিত্র নয় – তাই কিছুটা খোদার ওপর খোদকারি করে, আওরঙ্গজেবের জীবন আর চরিত্র বিশ্লেষণ না করে সরাসরি আহকমইআলমগিরিটাই অনুবাদের দুঃসাহস করা গেল।
আচার্য মুঘল আমলের শেষ সময় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অক্ষদণ্ড রূপে ধরেছেন আওরঙ্গজেবকে, কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণের স্নেহচ্ছায়া মুঘল আমলের শেষ সম্রাট পাননি, এমন কি যারা দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশনএর অনুবাদের শেষ পর্বটি পড়ার কষ্ট করেছেন, তারা নিশ্চই লক্ষ্য করেছেন, আবুলফজলের ঐতিহাসিক আখ্যান আইনিআকবরিকে কী তীক্ষ্ণ সমালোচনায় ভরিয়ে দিয়েছেন তিনি। সেই সমালোচনার সুরটি কিন্তু ধার করেছেন এক ইংরেজ ঐতিহাসিকের লব্জ থেকে। মুঘল আমলের অন্যতম তথ্যআকরভরসাস্থল তাঁর আনুকূল্য অর্জন করতে পারে নি কেন, তা তিনি কিন্তু খুব একটা খোলসা করে জানান নি, তাঁর সমালোচনার লব্জের মত ওপর ওপর থেকে গিয়েছেন। যে অভিযোগে তিনি আইনিআকবরি বিদ্ধ করেছেন, সেই অভিযোগের তীরটির মুখ ঘুরিয়ে দেওয়াই যেতে পারে তাঁর বিশ্লেষণের দিকে আজ – কেন তিনি বিশদে তা বললেন না, ঢাল করলেন এক ব্রিটিশ ঐতিহাসিককে?
ভারতের ইতিহাস বিশ্লেষণে অধিকাংশ গবেষণামূলক কাজই কোম্পানি বা রাজ আমলের নানান বড় ছোট ঘটনা, তথ্য বিশ্লেষণ নিয়ে ব্যস্ত – তার কারণ খুব স্পষ্ট, এ ধরণের কাজে অর্থ সাহায্য এবং পিঠ চাপড়ানি আর সংবাদমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতা খুব সহজে মেলে, তাই প্রায় এই ধরণের সব কাজেই ভারতে সাম্রাজ্যের সুফল দেখানো স্বাভাবিক ফল। ফলে আমরা যারা বিকারগ্রস্তভাবে ব্রিটিশ-পূর্ব সময়কে ধরার চেষ্টা করছি, তারা যখন দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন অনুবাদ করতে যাই, তখন দেখতে পাচ্ছি, মুঘল আমলের প্রশাসনতন্ত্রের নানান কুড় আজও এই স্বাধীন ভারতে চারশ বছর পরেও প্রশাসনিক কাজে অনুসৃত হচ্ছে। তাই সেই সাম্রাজ্যের শেষ বর্ণিল সম্রাটের সময়কাল আলোচনা অন্তত ভারত ইতিহাসে ব্রিটিশ-পূর্ব সময় আলোচনায় অনন্য মর্যাদা পায়। ভারত স্বাধীনতাহরণের প্রায় অর্ধশতাব্দ পূর্বে মৃত্যু বরণ করা শেষতম মুঘল বীর এবং তাঁর সময়কে সম্মান জানালাম আহকম অনুবাদের মধ্যে দিয়ে। 
জয় বাংলা, বঙ্গমাতরম।

Saturday, June 25, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার - শেষ কিস্তি

চতুর্দশ অধ্যায়

৪। অন্যান্য সূত্র
মুঘল সাম্রাজ্যের রাজসভার বিভিন্ন বাৎসরিক ইতিবৃত্ত ষোড়শ শতের আকবরনামা দিয়ে শুরু শেষ হয় ১৭০৯ সালের বাহাদুর শাহনামা দিয়ে, যেখানে রাজসভার পরিবর্তন, নতুন রীতিনীতির বিকাশ এবং প্রশাসনিক রীতিনীতি আর পদ্ধিতিগুলি বিশদে বর্ণিত হয়েছে।

নিগারনামাইমুন্সী বা ইসসাইহরকরন নিয়ে আগে(চিঠিপত্র বিভাগে) বর্ণনা করেছি। এছাড়া আকবরের রাজসভায় ফাদার মসেরাতে এবং দি লায়েতের খুব কম সময়ের জন্য উপস্থিত হওয়ার খুব কম তথ্য আর ওপর ওপর বর্ণনা পাই। মানুচির স্তোরিয়া দি মোগোরএ মোটামুটি ওপর ওপর রাজসভা এবং সামাজিক খুব অপর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তাঁর সমালোচনা আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জন্য। আওরঙ্গজেব এবং তাঁর উত্তরাধিকারীদের সভার খবরকাগজ আখবারতইদরবারিমুয়ালা-য় আমরা পাই প্রশাসনিক পরিবর্তনের উদ্ভাবনের এবং তাঁর ফলে কি ধরণের প্রভাব পড়ছে নানান কথা। মারাঠি নথিগুলি(মূলত বিভিন্ন ব্যক্তির আইনি সিদ্ধন্ত এবং রায়) ছেপেছেন রাজওয়াদে বহু খণ্ডে, সপ্তদশ শতের শেষের দিকের সময়ের বর্ণনা করে।

আবু ইয়ুসুফ য়াকুর(হারুণ অল রশিদের সময়ে বাগদাদের কাজি)এর কিতাবউলখরাজএ আমরা পাই ইসলামি গোঁড়া হানিফি প্রথার ইসলামি নানান কাঠামোর বর্ণনা।
(শেষ হল)

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

চতুর্দশ অধ্যায়

৩। আধিকারিকদের কাজের নীতি(ম্যানুয়্যাল)
একটি পার্সি পাণ্ডুলিপি থেকে গুরুত্বপূর্ণ মুঘল প্রশাসনের বিশদ বর্ণনা পাই, এটি কোনভাবেই অষ্টাদশ শতের পরের রচনা বলাযাবে না। এটি আমি পাই পাটনা জেলার পুরোনো কায়স্থ পরিবার থেকে। ১৪৮ পাতার ছোট বই, প্রত্যেক পাতায় ১১ পংক্তি রয়েছে, কোন কোন পাতায় আবার ১২ বা ১৩ পংক্তিও আছে। প্রথম এবং ষষ্ঠ পাতা এবং শেষের একটি/দুটি পাতা অদৃশ্য। আমি একে ম্যানুয়্যাল অব অফিসার্স ডিউটি বলব।

আরব সাম্রাজ্যের অধীনে মিশর বেশ কিছু প্রশাসনিক পুস্তক তৈরি করেছিল, এবং প্রশাসনের ইতিহাসের ছাত্রদের কাছে এই পাণ্ডুলিপিগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম বলছে, ‘মুসাব্বিহি আমাদের প্রচুর নথির সঙ্গে পরিচয় ঘটায় ... ইবন তুয়ারের ফাতিমি রাজসভায় কি ধরণের আদব কায়দা মেনে চলা হত, তাঁর নথি পাওয়া যাবে রাজসভার আদবকায়দা সংক্রান্ত বইতে। ইবন মাম্মাতি দেওয়ান হসেবে কাজ করার তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এবং পরের দিকে আল-ওমরি, একটি দেওয়ানি নীতিপুস্তকে বিশদে প্রশাসনের কাজ বলছেন, তবে দেওয়ানি নীতির সব থেকে ভাল কাজ হল কালকাষান্দিরটা... ইবন দুকমাক এবং ইবন দিজান সরকারি সমীক্ষার নানান নথি প্রকাশ করেছেন’।

ম্যানুয়্যাল অব অফিসার্স ডিউটিতে বিশেদে বর্ণনা দিচ্ছে, কিভাবে মুঘল সরকারির বিভিন্ন আধিকারিক নিজেদের পরিচালনা করতেন, তাদের কি কি কাজ করতে হত, তাদের কি সতর্কতা অবলম্বন করতে হত, তারা কোন কোন নথি নকল করাতেন ইত্যাদি। এটি কথোপকথনের আঙ্গিকে লেখা। প্রত্যেক অধ্যায়ের শুরু হয়েছে কোন এক দপ্তরে(ধরা যাক ফৌজদারি) কাজ চাইতে আসা একজন নবাগত যুবকের সঙ্গে সেই দপ্তরের একজন অভিজ্ঞ করণিকের, ‘আমি কি করে আমার মালিক, দপ্তরে কাজ নিয়ে আসা মানুষকে সন্তুষ্ট করব, একই সঙ্গে নাম কামাব এবং আমার জীবন সুখের করার চেষ্টা করব’। উত্তরে সেই অভিজ্ঞ করণিকটি তাকে একে একে বর্ণনা করে জানায় নতুন একজন কাজ পাওয়া কর্মীর কি কি করা উচিত, তার প্রলোভন কি কি এবং তার বিপদগুলিও কি কি। এই উত্তরের একাংশ খুব আদর্শবাদিতার প্রজ্ঞার উপদেশ রয়েছে যেমন, কিন্তু তার সঙ্গেও রয়েছে কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অমূল্য কথা, এবং দীর্ঘ দিন ধরে মুঘল প্রশাসনকে দেখার অভিজ্ঞতার কথা। এবারে আপনাদের সামনে উপস্থিত করব সেই বইএর অংশ যা কোন নীতিমালা শেখাতে পারে না।

ম্যানুয়্যাল অব অফিসার্স ডিউটির সূচীপত্র- সর্বশক্তিমানের উদ্দেশ্যে অর্জি(দুটি পাতা অদৃশ্য) – সূচিপত্র পাঁচটি বাবএ এবং ৪৯টি ফাসালাতে বিভক্ত, ১। আদর্শ মানব(ইনসানইকামিল)এর বর্ণনা, দরবেশ, সুলতান(দুটো পাতা নেই), উকিল আর উজির, খানইসামান, বক্সী, গোসলখানা আর দিওয়ানখানার দারোগা, সুবাদার, ফৌজদার, অস্ত্রখানার দারোগা, মিংবাসী(বন্দুকধারী সৈনিকদের প্রধান), ২। সদর, কাজি, মুফতি, মুহতসিব এবং বাজার দরের নিয়ন্ত্রক, খবরলেখক, বক্সীদের পেশকার, বিভিন্ন ভৃত্য, আমিন এবং ক্রোড়ি, কোতোয়াল, মীরইইমারত(বাড়ি পরিদর্শক), মুশরিফ, ৩। কাছারির এগারো রকম দারোগা, ৪। সঙ্গী(মোসাহেব), মালিক তাঁর ভৃত্য আর পিতামাতারা তাঁর সন্তানদের সঙ্গে কিভাবে আচরণ করবেন, অন্যদের সঙ্গে কি আচার আচরণ করা উচিত, আদালতে হাজিরা দেওয়া ইত্যাদি, জীবনধারণের রীতি এবং খরচ, পরিধেয়, ৫। ভ্রমণ, জমাদার, নাজির, দপ্তরের করণিক, মুস্তাফি, কানুনগো, জমিদার, বিভিন্ন প্রদর্শনীর দর্শক, শেষ দুটি বিষয় নাই।
(চলবে)

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

ত্রয়োদশ অধ্যায়
মুঘল সাম্রাজ্য – এর অর্জন এবং ব্যর্থতা
পুরো অধ্যায়টি বাদ দিয়ে গেলাম। এর সঙ্গে বইটির শিরোনামের কোন যোগ নেই।

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন
যদুনাথ সরকার

চতুর্দশ অধ্যায়

সূত্রের আকর

১। আইনিআকবরি, সমালোচনা

মুঘল সাম্রাজ্যের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রট হল আবুলফজলের আইনিআকবরি। ইতিহাস রচনায়, আঙ্গিকে, পরবর্তীকালের আধিকারিকদের লেখার আঙ্গিকে এর গুরুত্ব থাকলেও, কিন্তু এর কিছু অপূর্ণতাও রয়ে গিয়েছে। ভারতে এটি এ ধরণের প্রথম রচনা, এবং যখন মুঘল সাম্রাজ্য ধুঁকছে, নতুন করে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, তখন এধরণের রচনা প্রশাসনক দিশা দেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। তাই আবুলফজল বলেছেন, একজন আধিকারিকের কি করা দরকার, তিনি বলতে পারেন নি দীর্ঘকাল ধরে চলা এক শাসনতন্ত্রে থাকা একজন আধিকারিকের কি করা আবশ্যিক। আর তিনি তাত্বিক হিসেবে অসহ্যরকমের, যখন কোন তথ্য উপস্থাপন করতে হয়, তিনি আড়াল নেন একবোঝা সংখ্যাতত্ত্বের আড়ালে এবং সেটাও হয়, সেটাও হয় এমন অনুভূতি উপস্থাপন করেন। ফলে তাঁর কাজ আমাদের সে সময়ের প্রশাসনিক পরিকাঠামোর সঠিক চরিত্র উপস্থাপন করে না, যদিও সংখ্যাতত্ত্বে তিনি বিশদ এবং যথাযথ। আইনিআকবরির বিভিন্ন বর্ণনাত্মক অধ্যায়ে নানান ধরণের অস্পষ্টতার এবং অবাস্তবতার চিত্র দেখার অনুভূতি হয়।

ডব্লিউ ক্রক লিখছেন, ‘মুঘল আমলের এই সর্ববিদ্যাবিষয়ক বইটিত যেই পড়তে যাবেন, তিনি অনুভব করবেন প্রেক্ষিতের অভাব। আকবর বিশদ বর্ণনার গুরু ছিলেন, সেই বিশদে যাওয়ার প্রবণতাটি আইনে শেষপ্রান্ত পর্যন্ত ধাক্কা দিতে দিতে নিয়ে ফেলা হয়েছে। বিভিন্ন শিবির এবং প্রাসাদের বিশদ বর্ণনা রয়েছে, আস্তাবল থেকে পোষাকের আলমারি, অস্ত্রাগার থেকে শিকারের অস্ত্রশস্ত্র পর্যন্ত...কিন্তু আজকে আমরা যাকে প্রশাসন বলতে বুঝি, আরক্ষা, বিচার সেবা, প্রাকৃতিক সম্পদের বিকাশ, মন্বন্তর-ত্রাণ, বা শিক্ষা বা চিকিৎসা ব ব্যবস্থা, তা পাইনা’। ‘আইনিআকবরির তথ্যগুলিতে কতটা বিশ্বাস করা যায় তা বলা দুষ্কর...রাজস্ব তথ্য বিষয়ে এই প্রশ্নটা করা যায়, সেটা হল, যেটা বলা হয়েছে সেটা কি, কতটা আদায় করা যাবে তার আদর্শগত হিসেব, না কতটা আদায় করা হয়েছে তার বাস্তব হিসেব’।

২। দস্তুরউলআমল
অবাস্তব, বাস্তবিক আকামের বই, এবং তার বিষয়বস্তুটি এতই বেহুদা যে আইনিআকবরির পরে আকবরের উত্তরাধিকারীরা এই ধরণের বই লেখার খুব বেশি উৎসাহ বোধ করান নি। তাদের দপ্তর বোঝার কাজে যে নীতিবইটি কাজে দেয়, তার নাম দস্তুরউলআমল, ঠিক যেন আবুল ফজলের লেখার আঙ্গিকের তাত্ত্বিক বিরোধে বইটি তৈরি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সারাংশ, তথ্যে ভাণ্ডার, তথ্য এবং তালিকা, বর্ণনাহীন তথ্য এবং বহু স্থানে বাক্য শেষই হয় নি। এই ধরণের ছোট্ট কার্যকর পুস্তক প্রায় প্রতিটি সম্রাটের রাজত্বকালে সম্পাদনা করা হয়েছে। প্রত্যেক সম্পাদনা কালে বইটির প্রতেক পরিচ্ছদে নতুন তথ্য যোগ হয়েছে যাতে তথ্যগুলি সময় সাপক্ষ থাকে।

এই পুস্তকটি শাহজাহান এবং আওরঙ্গজেবের সময় লিখিত হয়, এবং সে সময়ে বহু পাণ্ডুলিপি আজও পাওয়া যায়। টমাস এগুলির পাঁচটি ব্যবহার করেছেন, আমি ইন্ডিয়া অব আওরঙ্গজেবঃ স্ট্যাটিস্টিক্স, টপোগ্রাফি এন্ড রোড গ্রন্থ লিখতে অন্যান্য সূত্র ছাড়াও এই পাঁচটির মধ্যে একটি(এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের) পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করেছি। 

তবে ভালটি আমি নিজে নকল এবং পড়াশোনা করেছি। তার মধ্যে একটি রয়েছে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিসে ৩৭০ নম্বর, যার সামনে পিছনের পাতা নেই। আরেকটি রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে, ওরিয়েন্টাল নম্বর ১৬৪১, পুরোটা রয়েছে, কিন্তু চিহ্নিত হয়েছে যাওয়াবিতইআলমগিরি বা আওরঙ্গজেবেত সময়ের নীতি নামে। নাম আলাদা হলেও দুটি একই পাণ্ডুলিপি, সেগুলি ভিন্ন পাণ্ডুলিপি থেকে অনুদিত হয়েছে। দুটিই সম্রাটের ৩৩ তম রাজত্ব বছর – যখন বিজাপুর, গোলকুণ্ডা এবং মারাঠা রাজধানী রায়গড় দখল করে দিল্লির অধীন করে মুঘল সাম্রাজ্য এবং সেই সময় পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য দেয়। অষ্টাদশ শতের মধ্য পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য ভাণ্ডার পাওয়া যাবে জগজীবন দাস এবং রায় চন্তরমল্লের কাজে, যেগুলির অনুবাদ আমি করেছি ইন্ডিয়া অব আওরঙ্গজেবএ।

এই দস্তরউলআমল বা সরকারি নীতিমালা(হ্যাণ্ডবুক) পুস্তকে খুব কম কথায় বলে বিভিন্ন সুবার রাজস্ব, বিভিন্ন বিভাগের সংখ্যা, রাজত্বের বিভিন্ন শহরের দূরত্ব, রাজসভায় সরকারি নথিপত্র পাঠাবার প্রক্রিয়া, যে সব নথি বিভিন্ন দেওয়ানের দপ্তরে আসা দরকার, রাষ্ট্রের মোট খরচ, মনসবদারদের সংখ্যা এবং অন্যান্য সেনাবাহিনী, মুসলমান এবং হিন্দু অভিজাতদের সাধারণ উপাধি, সঙ্গীতকার এবং লিপিকারদের নাম, বক্সী আর দেওয়ানদের কাজের বিভাগ, খানইসামান, বুয়ুতাত, মীর আতীশ, বরকন্দাজদের মুশরিফ সহ অন্যন্য বিশেষ বাহিনীর কাজ এবং দায়-দায়িত্ব, আহদির বক্সীরদের কাজ এবং দায়িত্ব, প্রধান দেওয়ানের দপ্তরের বিশদ বিবরণ এবং তাঁকে কোন কোন দপ্তর কি কি নথি পাঠাবে, কিভাবে সংগ্রহ করবে, কোন নথি উত্তর দেবে, তৈরি এবং স্বাক্ষর করে সম্রাটের কাছে জমা দেবে তার বর্ণনা, শাহজাদা এবং মনসবদারদের নগদ বেতন দেওয়ার নিয়ম, অশ্বারোহী বাহিনীর ঘোড়া নাল পরানো এবং ঘোড়ার গায়ে ছাপমারার নীতি, ছুটি পাওয়া আর ছুটি বাড়ানোর নীতি, অস্ত্র অনুযায়ী আধিকারিকদের শ্রেণী বিভাগ, আধিকারিক শ্রেণীর কাউকে জাগিরপদ দেওয়ার বিশদঅনুপুঙ্খ তথ্য রাখা(মিনিট), অনুচরদের বেতন, বিভিন্ন মনসবদারের যানবাহনের পশুখাদ্য বিষয়ক ইত্যাদি।

তারপরও আছে ওজনের তালকা(বর্তমান সময়ের বিভিন্ন এলাকার), ভারতের বাইরের দেশগুলির মুদ্রার বিনিময় মূল্য, সাম্রাজ্যের দুর্গ, বিভিন্ন শ্রেণীর মনসবদার, পদোন্নতির নীতি, পদচ্যুতি এবং রোগের ছুটি – অরায় সব ধরণের বেতন বিষয়ক নীতি, ইওরোপিয় বন্দুকবাজ, গোলান্দাজ এবং স্যাপার্স(খনি শ্রমিক?)দের বিশেষ বেতন, বন্দুকের বারুদ সরবরাহ, বিভিন্ন অস্ত্রের শ্রেণীবিভাগ, জাজিয়ার হার, সমুদ্রে যাওয়ার উচিত মরশুম, বিভিন্ন শাহজাদা, অভিজাতদের দখলি সম্পত্তি, পারস্য থেকে প্রাপ্ত উপহার, সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ধনাগার, কারখানাগুলির তালিকা, যে সব আবওয়াব আওরঙ্গজেব নিষিদ্ধ এবং বেআইনি ঘোষণা করেছেন, বিজাপুর, গোলকুণ্ডা ইত্যায়াদি দখল করার জন্য শস্ত্রাদি, দাক্ষিণাত্যের কিছু দুর্গের বর্ণনা, এবং সম্রাটের দাক্ষিণাত্য বিজয়, রাজ্য সম্পর্কে নানান তথ্য।

ওপরের বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, কি বিশাল পরিমান উপযোগী তথ্য ঠুসে দেওয়া হয়েছে দস্তুরউলআমলএ। কিন্তু দুটো যে পাণ্ডুলিপি বললাম সেগুলি খুব খারাপভাবে লেখা হয়েছে। 

আনন্দের কথা হল, পরবর্তী কাজে আমরা দস্তুরের অনুলিপি এবং সঠিক তথ্য পাই ইন্দো-পার্সি সাহিত্যে যা খুব ব্যতিক্রমী বলা যায়। সুবার দেওয়ান আলি মুহম্মদ খাঁয়ের লেখা মিরাটিইআহমদি বা গুজরাটের ইতিহাস লেখা শেষ হয় ১৭৬১ সালে। লেখক তার দপ্তরে রাখা প্রায় প্রত্যেক আধিকারিককে লেখা সরকারি ফরমানের বিশদ নকল দিয়েছেন সেই পাণ্ডুলিপিতে। এই প্রথম মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনের সঠিক বিশদ বর্ণনা পাওয়া গেল কোন ইতিহাস বইতে।
(চলবে)

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

৬। শাহজাদা বা অভিজাতদের সচিবদের চিঠির বই

শাহজাদা বা অভিজাতদের মুন্সির চিঠির বই এইভাবে সাজানো থাকত –
তার মালিক থেকে সম্রাটের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠি(কখোনো কখনো তাঁর পাঠানো উত্তর সহ)(কিছু কিছু চিঠি গোপনীয় লব্জে – পার্সিতে যার নাম মুর্মুজ আর হিন্দিতে অঙ্কপল্লবী – লেখা হত, এর কিছু পাঠোদ্ধারকৃত উদাহরণ পাওয়া যাবে আদাবইআলমগিরি আর হাফত আনজুমএ) লেখা হত,
তাঁর মালিক থেকে শাহজাদার উদ্দেশ্যে লিখিত চিঠি
তাঁর মালিক থেকে বিভিন্ন মন্ত্রী, অন্যান্য উচ্চপদের আমলা, মালিকের নিজের উচ্চ আমলা এবং সাধারণ কর্মচারীদের কাছে পাঠানো চিঠি
মালিকের বন্ধুদের, আত্মীয়দের এবং দালাল-উকিলদের কাছে পাঠানো চিঠি
মুন্সীদের থেকে, তাঁর মালিকদের হয়ে, ক। ওপরে উল্লিখিতদের কাছে পাঠানো চিঠি, যেমন হাসবউলহুকুম জাতীয়(কিন্তু আঙ্গিক নয়) চিঠি খ। মুন্সির পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠি
মুন্সিদের থেকে তাঁর আত্মীয়দের পাঠানো চিঠি
মুন্সিদের থেকে অন্য মুন্সি বা কবির কাছে ফুলেল ভাষায়, পদ্যে, খুব কম ভাবনার, কিন্তু বিস্তৃতভাবে লেখা – যার অর্থ, নিজের কাজের মুন্সিয়ানা দেখানোর চিঠি
অধঃপতিত অষ্টাদশ শতে বিভিন্ন চিঠির সংগ্রহর শেষের দিকে সম্রাট, নবাবকে ধন্যবাদ জানিয়ে, তাঁর সিংহাসনে ওঠার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, জয়ের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, বা কাউকে তাঁর পদে নিযুক্ত হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে, পুত্র হওয়ার বা পুত্রের বিয়ে বা পুত্রের সাহসিকতার জন্য(এখানে যুক্ত হত বিখ্যাত বিখ্যাত কিছু কবিতার উদ্ধৃতি বা চিঠির বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় নানান নামের স্থান ফাঁকা রেখে) ধন্যবাদ জানিয়ে বা ঈদের উতসবের উপলক্ষ্যে, ধন্যবাদ জানানোর জন্য লেখা নানান চিঠির খসড়া জোড়া থাকত। বিভিন্ন খসড়া নিয়োগ পত্রও উল্লিখিত হত, এবং তাতে সেই কর্মচারীর দায়-দায়িত্ব ইত্যাদি উল্লিখিত থাকত। নিগারনামাইমুন্সি এবং ইনসাইহরকরন এধরনের দুটি উদাহরণ। বিভিন্ন উপাধি, বিভিন্ন ঠিকানার সঠিকতা, বিভিন্ন পদের মানুষদের নাম ও দপ্তর ইত্যাদি উল্লিখিত থাকত।
(দ্বাদশ অধ্যায় শেষ)
(চলবে

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

৫। সরকারিভাবে ফরমান লেখা আর স্বাক্ষরের আঙ্গিক

শাহজাহানের সময়ের সরকারি বিশ্লেষক, আব্দুল হামিদ লাহোরি এ বিষয়ে লিখছেন, ‘দেওয়ানি খাসে সম্রাট তাঁর নিজের হাতে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লেখেন, সভায় থাকা অভিজাতদের বিভিন্ন আধিকারিক, উকিল যে সব চিঠি তাঁর সামনে জমা দেন সেসবের জবাবও তিনি নিজের হাতে লেখেন; বা বহু সময় সুবাদারদের সম্রাটকে লেখা ডেসপ্যাচ(আরিজা-খোয়াঁ) পড়ার জন্য নির্দিষ্ট আধিকারিকেরা সেই সমস্ত চিঠি পড়লে মৌখিকভাবে সম্রাট তাঁর আনন্দ প্রকাশ করেন এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী সচিব ফরমানটি লেখেন। তাঁর খসড়া তাঁকে দেখানো হয়, তিনি কিছু কিছু যায়গা ঠিক করে দেন বা ভাব, ভাষা বদলে দেন।
‘যে সব শাহজাদাকে রিসালার(মধ্যস্থতার) ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তারা তাঁর বক্তব্য বা রাসালাতুন, ফরমানের পিছনের পিঠে লিখতেন, এবং নিজের সিলমোহর লাগাতেন। তাঁর তলায় দেয়ান ফরমানটি তাঁর হাতে এসে পড়েছে, লিখে সিলমোহর করতেন(এই মন্তব্য ছাড়া যে কোন ফরমানের কোন ব্যবহারিক মূল্য থাকত না, আওরঙ্গজেবের রাজত্বের শেষের দিকে এটা সুরাটে ব্যবসা করা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন)। এর পরে ফারমান হারেমে পাঠানো হত যাতে সাম্রাজ্ঞী তাঁর আউজাক সিলমোহর লাগাতে পারেন’।

আওরঙ্গজেবের পদ্ধতিটিও প্রায় একই ছিল, এটা আমরা পাচ্ছি তার সময়ে লেখা ইত্যহাস আলমগিরনামায়, ‘বিখ্যাত অভিজাতদের জন্য লেখা কিছু চিঠির মুখড়ায় সম্রাট, তাঁরপ্রতি সম্রাটের দয়া আর আশির্বাদ আছে বোঝাতে, অথবা সেই ফরমানে লিখিত বিষয়টির সমধিক গুরুত্ব বোঝাতে নিজের সিলমোহর সহ প্রাপকের নাম ও ঠিকানা নিজের হাতে লিখতেন, ...আর এটা তিনি করতেন চিঠি মৌলিকত্ব সম্বন্ধীয় যে কোন সন্দেহ নিরসনের জন্যও’।

খসড়ার পরে মূল বয়ানটি, সোনার ধুলো ছড়ানো কাগজে বড় এবং সুন্দর ছাঁদের অক্ষরে লেখা হত, সিলমোহর করা হত, তাকে গোটানো হত, সোনার সুতোর বয়ন করা সরু কাপড়ে তা মোড়া হত, সেই থলেটার মুখটি রঙ্গিন সুতো দিয়ে তাঁর ওপর গলানো মোমের ওপর উজিরের সিলমোহর মেরে সেটি বাঁধা হত। এই থলেটির নাম হত খারিতাস। এ ধরণের বহু ফরমান জয়পুরের প্রাসাদে সংরক্ষিত আছে।

এবারে সিলমোহর। সম্রাটের নামাঙ্কিত গোল ছোট সিলমোহরের নাম আউজাক, শুধু ব্যবহৃত হত সরমানইসিবতি অর্থাৎ উচ্চশ্রেণীর আমলাদের নিয়োগের, বা জায়গিরের দৈনন্দিন হাত খরচের পরিমান লিখতে। মাঝে গোল করা সম্রাটের নাম লেখা বড় সিলের কাজ ছিল বিভিন্ন বৈদেশিক সম্রাটকে চিঠি লেখার জন্য, পরে তা ব্যবহৃত হত যে কোন ফরমানে। গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপনীয় নির্দেশ লিখতে ব্যবহার করা হত ফরমানইবায়জি নামক একটি সিল। অন্য সব পরওয়ানা, ফরমান এবং বারাতএ প্রথমে উজির এবং পরে বিভিন্ন নিম্নস্তরের আধিকারিকদের বহু সিলমোহর লাগানো হত।
(চলবে)

Friday, June 24, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

৪। চিঠির শ্রেণীবিভাগ, নাম
মুঘল সাম্রাজ্যের চিঠিগুলি নানান শ্রেণীতে পড়ত, প্রত্যেকটির আলাদ আলাদা নাম ছিল –
১। ফারমান, শুক্কা, আহকম(বহুত্ববোধক বিশেষ্য ভুল ভাবে একবচনে লেখা হয়, না এটা বহুবচনীয় মহিমাবাচক?) এবং আওরঙ্গজেবের চিঠিপত্রের একটিইমাত্র সংগ্রহ রয়েছে তার নাম রামজওয়াইশারা। এটির মানে হল, সম্রাট নিজে লিখেছেন সরাসরি, নিজের রক্তের সম্পর্কের কেউ বা প্রজা বা বিদেশি সম্রাটকে লেখা(রুকা আধুনিক বহুত্ববাদী শব্দ, তখন ব্যবহার হত না)
২। নিশান শাহজাদার চিঠি সম্রাট ছাড়া রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়কে
৩। আর্জদাস্ত (আর্জি থেকে), প্রজাদের থেকে সম্রাটকে দেওয়া আবেদনপত্র বা শাহজাদার সম্রাটকে দেওয়া চিঠি। যুদ্ধ জেতার ডেসপ্যাচের নাম ফাতনামা
৪। হাসবউলহুকুম(নির্দেশক্রমে) কোন মন্ত্রী সম্রাটের নির্দেশক্রমে নিজের হাতে চিঠি লেখা, বা তার নির্দেশ প্রচার করতে চিঠি লেখা
৫। আহকম এবং রামজ(বহুবচনে রুমুজ) – এগুলি সম্রাট পারমার্থিকভাবের কবিতার আকারে কিছু লিখিত ভাবনা চিঠিতে পরিবর্তিত করার জন্য তার সচিবকে দিতেন। আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যের শেষের দিকে সেই লিখত ভাবনাগুলি সংরক্ষিত হয়েছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ চিঠিগুলি নয়
৬। সনদ, কর্ম নিয়োগ পত্র। ফরমান ব্যবহৃত হত একমাত্র দেওয়ান নিয়োগের জন্য
৭। পরওয়ানা, বিভিন্ন নিম্নপদস্থ আধিকারিকদের জন্য প্রশাসনিক নির্দেশনামা, মূলত আদালতের মামলা বিষয়ে
৮। দস্তক, কোথাও কিছু নিয়ে যেতে গেলে যে সরকারি ছাড়পত্র(পাস/পারমিট) প্রয়োজন হয়
৯। রুকা, ব্যক্তিগত চিঠি – বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর
(মজহরনামা এখানে যুক্ত করলাম না। এটা একটা আইন সমীক্ষা, কোন স্থানীয় জমি বিষয়ক তদন্ত বা ফৌজদারি তদন্ত সমীক্ষা, সঙ্গে জুড়ে দেওয়া থাকে বিচারক এবং সাক্ষীর উপস্থাপনার সাক্ষ্য এবং প্রমানের সংক্ষিপ্তসার। রাজওয়াদেতে মহারাষ্টের এইটির বহু নিদর্শন দেওয়া আছে।)
(চলবে)

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

৩। চিঠিলেখা এবং সিলমোহর করার আঙ্গিক

চিঠিলেখার আঙ্গিক নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, সম্রাট যে চিঠি বা ডেসপ্যাচেস পাঠাতেন বা তার কাছে যে সব আবেদন-নিবেদন আসত, সেগুলি দীর্ঘ, সুচিত্রিত, দলিলের মত প্রায়-অপ্রয়োজনীয়, বাগবহুল, গুণবাচক পরমতার উক্তিতে ভরপুর। মুন্সীরা আবুল ফজলের সম্রাট আকবররের উদ্দেশ্যে চিঠি লেখার আঙ্গিকটি অনুসরণ করার অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজনীয়তাটি নতমস্তকে মেনে নিয়েছিলেন। চিঠি লেখার এই খারাপতম আঙ্গিকটির সঙ্গে জুড়েছিল সরকারি প্রথা অনুযায়ী মুন্সিদের শৃঙ্খলাবদ্ধ বাগবহুল, গুণবাচক পরমতার নির্দিষ্টকর উক্তি – যা অনেক সময় সিংহাসনে বসা সম্রাটদের জন্য চিঠি লেখার ক্ষেত্রে অন্তত ছয়স্তবকের এবং মন্ত্রী এবং উচ্চতম আমলাদের জন্য অন্তত তিন স্তবকের বক্তব্য। প্রত্যেক সরকারি চিঠির শুরুটা ছিল হয় ‘আমি বিনীতভাবে মহামহিমকে সম্মান জানিয়ে বলতে চাই...’ বা ‘আপনার সম্মানিত সব থেকে অনুগত ভৃত্য...’ ইত্যাদি – যা আজও আমিরা অনুসরণ করে চলি, তার সঙ্গে জুড়ে থাকত যা বলার আছে সেই বক্তব্যগুলি। সাধারণত সমগ্র চিঠিটি অনুবাদ করা খুব ঝকমারি কাজ, দেখাগিয়েছে বহু পুঁথি থেকে অনুবাদকেরা ফুলেল অবোধ শব্দবন্ধগুলি বাদ দিয়ে শুরু করেছেন মি-রসনদ কে...বা জানাচ্ছি যে...থেকে...।

সপ্তদশ শতে চিঠ লেখাটা খুব কেজো কাঠ কাঠ কাজ ছিল। উচ্চতম পদের সম্রাট থেকে একেবারে সাধারণ মানুষকে সম্বোধন করতে বিভিন্ন ধরণের লব্জ ব্যবহার করা হত এবং সেগুলি বিশদে নীতিপুস্তকমালায় (ম্যানুয়্যাল) লিপিবদ্ধ করা ছিল। উচ্চতমের নির্দেশে সময়ে সময়ে সেই লব্জগুলি যখন কিছুটা পাল্টাত, সেই পরিবর্তনের নির্দিষ্ট লিখিত নির্দেশ দিতে হত কেরাণীবাবুকে। সে সময় কাউকে সর্বশক্তিমানের ছায়া বা তার সন্তান বলা হত তা খুব একটা অশোভনতা ছিল না(যেমন সম্রাটের কন্যাদের বলা হত সতীত্বের প্রতিমূর্তি বা তার সময়ের রাবিয়া বা আড়ম্বর এবং মহত্বের পিছনে থাকা ছায়া ইত্যাদি, ইত্যাদি ইত্যাদি)। তারা তাদের জীবনে খলিফা বা সর্বশক্তিমানের ছায়া হয়েই কাটাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং মৃত্যুর পরে বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব এবং প্রথম বাহাদুরশাহ জাফরের স্মৃতিচিহ্নকে অভিধা দেওয়া হয়েছে ফিরদৌস-মাকানি, জিন্নত-আশিয়ানি, আর্শ-আশিয়ানি, জিন্নত-মাকানি, আলা হজরত ফিরদৌস-আশিয়ানি, খুলদ-মকান এবং খুলদ মঞ্জিল – সব কটি লব্জের মানে হল বেহস্তে বসবাস করা। জীবিত যুবরাজদেরও কিছু বিশেষ উপাধি ছিল দারাশুকোহর জন্য শাহইবুলন্দ ইকবাল, শাহ আলমের জন্য মিহিরপুরীখলিফা বা মহম্মদ আজমের জন্য শাহইআলিজা ইত্যাদি। জাহানারা মৃত্যুর পরে যে সম্মানে ভূষিত হন তা হল, তার সময়ের আধ্যাত্মিক গুরু। যুবরাজ মহম্মদ আকবর, তার বিদ্রোহ আর পরে সাম্রাজ্যের আক্রমনরীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরে সরকারি নথিতে বলা হল, বাগি বা আকবরইঅবতার(অবতার মানে একদিকে হয় মহান অন্য দিকে খারাপতম)।

সম্রাট বা শাহজাদাদের উদ্দেশ্যে লেখা কোন চিঠিতে স্বাক্ষর থাকত না, এমন কি যদি খুব বড় আমলা তা লিখে থাকুক না কেন, শুধু সিলমোহর থাকত।
ফরমানের মাথায় সাম্রাজ্যের সিলমোহর থাকত, নিচে থাকত উজিরের সিলমোহর। আর বিশেষ দয়া জানাতে বা জমি দানের ক্ষেত্রে সিঁদুরে ডোবানো সম্রাটের পাঞ্জার ছাপ দেওয়া থাকত(এটা আদতে একটা থলেতে করে সম্রাটের পাঞ্জার নকল ছাপ রবারে নেওয়া থাকত, তা তার বগলের তলায় লুকোন থাকত)। শাহজাদারা সুবায় দেওয়ান থাকার সময়েও একই নিয়ম কাজ করত। যখন কোন খসড়া চিঠি/নির্দেশিকার চূড়ান্ত নকল সম্রাট অনুমোদন করতেন, তিনি সবার তলায় লিখে দিতেন সাদ(সহি বা ঠিকএর ক্ষুদ্রাংশ – আমি কয়েকটি ফরমান দেখেছি, যেখানে সম্রাট চিঠির তলায় খুব মোটা মোটা অক্ষরে সাদ লিখেছেন, তবে শব্দটা কিন্তু লেখা শেষ করেন নি, একটা টান দিয়েছেন। এর সরকারি আমলাতান্ত্রিক ব্যখ্যা হল, এর মাধ্যমে চিঠি বা নির্দেশিকা শেষ হল। আজকেও বাংলার জমিদারেরা তাদের দালাল বা ভাড়াটেদের জন্য লেখা চিঠিতে নাম লেখেন না, লেখেন শ্রী-সহি এবং সেই শব্দটা লেখা শেষ করে একটা সাপের লেজের মত আঁকাবাঁকা টান জুড়ে দিতেন। এটি মুঘল সাম্রাজের চিঠি লেখা শেষ করার অপভ্রংশ রূপ) যা তার অনুমতিসূচক। সাধারণত সম্রাট বা শাহজাদা তাদের চিঠিটির মাথার ওপরে নিজেদের হাতে লেখা কিছু স্তবক জুড়ে দিতেন, যাতে চিঠিটির আসলত্ব প্রমান হয়, বা যাকে চিঠি লিখছেন তার প্রতি তার অনুগ্রহসূচক অনুমোদন হিসেবে; আদতে এই চিহ্নগুলি ছিল, যে নির্দেশগুলি সম্রাট দিচ্ছেন, তা যেন খুব তাড়াতাড়ি পালন করে ফেলা হয়, এমন এক অব্যক্ত বক্তব্য। কিন্তু বাস্তবে চিঠিটি উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছত সচিবালয়ের মুন্সির হাতে মুসাবিদা আর সুন্দর লেখকের(খুশনবিশ) হাতের লেখার নকলের পর। নানান সাম্রাজ্যিক নাম-উপাধি-যোগ বিশদে দেওয়া হয়েছে আদাবইআলমগিরিতে।

সরকারি চিঠিপত্রতে সম্রাটের(বা শাহজাদার) নাম চিঠির মূল বক্তব্য থেকে বার করে চিঠি কাগজের ঠিক মাথায় সম্মানসূচক লেখা হত, যেভাবে চিঠির শিরোনামে হিন্দুরা যে ভগবানের পুজা করেন, তার নাম স্মরণ করে চিঠি লেখা শুরু করেন। যেখান থেকে সেই নামটি তুলে নেওয়া হয়েছে, ঠি সেই জায়গায় ফাঁকা রেখে দেওয়া হত।

একটি চিঠি উপযুক্ত প্রাপকের কাছে পৌঁছলে, সেই ব্যক্তির সচিব সেই চিঠি পৌঁছবার তারিখ লিখে চিঠিটির পিছনে লিখতেন আর্জ দিদা শুদ। জমি পাওয়ার বা বিশেষ দয়া দেখানোর ফরমান বা সাধারণত কোন মধ্যবর্তীর মন্ত্রী বা সভার কোন বিশেষ অভিজাতর মাধ্যমেই অনুরোধেই করা হত, তারা সম্রাটকে প্রভাবিত করতেন। এবং এই ধরণের মাধ্যমের নাম ফরমানের পিছনে লেখা থাকত, তার সঙ্গে জোড়া থাকত রাসালাতুন(এনার মাধ্যমে হল) শব্দটি। এই প্রসঙ্গে আমি নিশ্চই বলব প্রাচীন কালের জমিদানের লিপিগুলির শেষে মধ্যশ্রেণী বা দূতকএর নাম উল্লেখ থাকত।

কোন রাজকীয় ফরমান পাওয়ার জন্য যে বিপুল সমারোহ হত, বহুদূর থেকে আসা মানুষটি সেই ফরমানটি প্রথমে তার মাথায় পরে তার চোখে বোলাবেন, সেই প্রথাটি নিশ্চই এখানে বিশদে বর্ণনার প্রয়োজন নেই।
(দক্ষিণের কিছু করদ রাজা রাজধানীর ছয়-আট মেইল দূরে ফরমান-বাড়ি বানিয়েছিলেন, তাদেরকে ফরমান পাঠানো হয়েছে জানলে তারা সেই বাড়িতে গিয়ে সেটি নিতেন।)
(চলবে)

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

২। হিন্দু মুন্সি এবং তাঁদের কাজ

মুঘল আমলের সপ্তদশ শত থেকে দেখা যায় অধিকাংশ মুন্সিই হিন্দু, এবং তাঁদের সংখ্যা দ্রুতহারে বেড়েছে। টোডরমল্ল(আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী)এর বহু আগে থেকেই, হয়ত ভারতে মুসলমান সাম্রাজ্য শুরুর সময় থেকেই রাজস্ব(দেওয়ানি) দপ্তরের অধিকাংশ নিম্নস্তরের কেরাণি ছিলেন হিন্দু। টোডলমল্ল প্রত্যেকটি নথি পার্সিতে লেখার নির্দেশ দিলে(শের শাহর আমলে একটি লেখা হত পার্সি, অন্য নকলটি হিন্দিতে) হিন্দু দপ্তরীরা পার্সি শিখে নেওয়ার চেষ্টা করে, এবং এই পরিবর্তনের প্রভাবটি পরবর্তী শতে লক্ষ্য করা যায়, যখন হিন্দুরা রাজস্ব দপ্তরের পাশাপাশি হিসাবকিতাব দপ্তরটি ভরিয়ে ফেলে। এমনকি নায়েব এবং ব্যক্তিগত সহায়তাকারী(পেশদাত) পদে, এবং অন্যান্য দপ্তরের প্রধান হিসেবে উঠে আসতে শুরু করে তারা। সপ্তদশ শতের শেষের দিকের অধিকাংশ অভিজাত এমন কি শাহজাদারাও(রাজপুত্র) তাঁদের পার্সি চিঠি লেখানোর ব্যক্তি, মুন্সিরূপে হিন্দুদের নিয়োগ করা শুরু করলেন। সহজবশ্য এবং সংযতচিত্ত কুশলী হিন্দুদের হাতের লেখা শস্তায় সাম্রাজ্যের নানান কাজ সম্পাদন করত। পারস্যজন্ম বা পারস্যে শিক্ষিত মুসলমান করণিক হয়ত আরও শুদ্ধ বাগধারা ব্যবহার করতে পারত, কিন্তু ভারতের অভিজাতদের পক্ষে তাঁদের নিয়োগ করা খুব খরুচে হয়ে পড়ত। এছাড়া, সপ্তদশ শতে পারস্যে রাষ্ট্রবিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে এই ধরণের দক্ষ করণিকের সংখ্যা কমে যেতে শুরু করে। আর ভারতীয় মুসলমানেরা করণিকের কাজে খুব দক্ষ ছিল না।

১৬২৩এর হরকণ ইতিবারখানির পর সব থেকে প্রখ্যাত যে হিন্দু মুন্সির নাম আমার মনে আসছে সে হল, শাহ জাহানের উজির শাদুল্লা খাঁএর হাতে তৈরি চন্দ্রবদন(শৈল্পিক/কাব্যিক নাম ব্রহ্মণ), যিনি প্রচুর পার্সি পদ্য এবং সুন্দর প্রচলিত কবিতা লিখেছেন, কিন্তু যে চিঠি লিখেছেন তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বড় কম। অথচ সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে অভিজাতদের দপ্তরে হিন্দু করণিকেদের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে, এমন কি অষ্টাদশ শতের শেষ প্রান্তে, সম্রাট মহম্মদ শাহের অধীনে মীর মুন্সি(বা প্রধান সচিব) পদ অলঙ্কৃত করেন এক হিন্দু – এমন এক মানুষের নাম আনন্দ রাম, যার ছদ্মনাম মুখলিস।

মুঘল সাম্রাজ্যের করণিক এবং অন্যান্য নিচুপদে কাজ করতেন হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, এঁরা নিজেদের মধ্যে একটি সুফি-দর্শনের ডোরের অদৃশ্য বন্ধনে ভাইচারা তৈরি করে নিয়েছিলেন। সপ্তদশ থেকে অষ্টদশ শত পর্যন্ত এই দুই সম্প্রদায়ের ভাল লাগার একটাই সম্পদ ছিল সেটা সুফি সংস্কৃতি। অধিকাংশ চিঠিখণ্ড শেষ হত হয় মুন্সির নিজের সুফিবাদী কবিতা দিয়ে না হয় তার শ্রেষ্ঠ বন্ধুর কবতায়।
(চলবে)

Thursday, June 23, 2016

দ্য মুঘল এডমিনিস্ট্রেশন - যদুনাথ সরকার

দ্বাদশ অধ্যায়

চিঠ আর সিলমোহরের দপ্তর

১। কিভাবে সচিবেরা চিঠি সংগ্রহ করতেন

মুঘল সাম্রাজ্যে চিঠিপত্র বিভাগ(দারউলইনসা) খুব বড় এবং বিস্তৃত ছিল, এই দপ্তরের যেসব কাগজপত্র বেঁচে গিয়েছে সেগুলি ইতিহাসের ছাত্রদের ইতিহাস রচনায় অভূতপূর্ব সাহায্য করেছে। আওরঙ্গজেব বা তাঁর পরবর্তী রাজসভা সময়ে বা রাজসভার বাইরে ফেলা তাঁবু থেকে বিভিন্ন করদ রাজাদের এবং বিভিন্ন সুবার রাজপ্রতিনিধিকে পাঠানো আখবার বা ইস্তেহারও (নিউজবুলেটিন) প্রথম শ্রেণীর তথ্যের আকর হিসেবে, কোন সন্দেহই নেই, ঐতিহাসিকদের অমিত সাহায্য করেছে। কিন্তু আওরঙ্গেজেবের সময়কে বুঝতে গেলে তাঁর সময়ে লেখা চিঠিগুলির সঙ্গে যদি পূর্বে উল্লিখিত আখবারের নানান তথ্য মিলয়ে পড়া যায়, তাহলে সেগুলি তাঁর সময়ের ইতিহাসের তথ্যাবলীর অন্যতম আকর রূপে গুরুত্ব পাবে। এই চিঠিগুলি কোন সম্রাট বা কোন মহাফেজখানা সংরক্ষণ করে নি, বরং বিভিন্ন ব্যক্তি, বিশেষ করে সচিব(মুন্সী), যারা এই চিঠিগুলির মুসাবিদা করতেন, তাদের সূত্র থেকে পাওয়া গিয়েছে। প্রত্যেকে তাঁর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কি লিখছেন, তাঁর প্রত্যেকটির নকল রাখতেন, এবং পরের দিকে এগুলি একত্রে মিলিয়ে, সঠিক মুখবন্ধ সহ, খণ্ডের শেষ পৃষ্ঠা সহ একএকটি খণ্ডে বাঁধিয়ে বিশ্বের দরবারে উপস্থিত করেছিলেন; আমি যা বলতে চাইছি তা হল, তারা সেই চিঠিগুলি পড়া এবং সেগুলির নকল করার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন, যেহেতু, সে সময় ছাপাখানার ভাবনা দূরঅস্ত ছিল। বহু সময়ে দেখা গিয়েছে এই চিঠির বইগুলি সেই মুন্সির পুত্র বা ভক্ত-বন্ধু সেই মৃত মুন্সীর সাহিত্য হিসেবে সংরক্ষিত করে রেখেছেন। যখন এগুলি ছাপা হল, এগুলি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিঠিসাহিত্যের অনুলিপি হিসেবে নকল হতে শুরু হল। আজও সেই সব কিছু কিছু চিঠি পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু যেসব চিঠির খণ্ডতে এইগুলি রাখা ছিল সেগুলির অনেকটাই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। ঐতিহাসিক মূল্যযুক্ত বহু আলগা হয়ে পড়া থাকা চিঠি একখনও কোন সংগ্রহে অন্তর্ভূক্ত হয় নি(হয় সেগুলি একই মানুষের লেখা ছিল না, বা এত চিঠি লেখা হত, সবগুলিকে খণ্ডে সংগ্রহ করা হয়ত সম্ভব ছিল না)। সেই চিঠিগুলি বেঁচে গিয়েছে।

এই চিঠির বই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সাহিত্যক মূল্যের জন্য, কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক মূল্যের জন্য নয়। মুন্সিরা সেই সময়ে ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক হয়ে উঠবেন, এটা সেসময় ভাবা যায় নি, কিন্তু তাদের সময়ের মার্জিত সমাজ নিজেদের মত করে ভেবেছিল, কি করে তাঁদের এই দক্ষতাটাকে কাজে লাগানো যায়। তাদের উদ্দেশ্য এমন ছিল না যে, ঐতিহাসিক তথ্য ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রহ করা দরকার, বরং, অলঙ্কারশাস্ত্রের চিঠবিদ্যা সংক্রান্ত ছাত্রদের চিঠি লেখার দক্ষতা, মুসাবিদার ঐশ্বর্য বাড়াবার/শেখাবার জন্য এই খণ্ডগুলি বারবার ব্যবহার করেছে সেযুগের মার্জিত সমাজ। বহু মুন্সি, তাঁর পরিবারের উত্তরাধিকারীদের পেশা হিসেবে চিঠি লেখার দক্ষতা শেখাবার জন্য এই চিঠিগুলি বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত করে রেখেছিলেন। বাস্তবিক, প্রত্যেক মুন্সিই, পার্সি বয়েত বা সরস শ্লেষাত্মক ক্ষুদ্র কবিতা লেখার জন্য প্রখ্যাত ছিলেন, এবং প্রত্যেক চিঠিতে আরবি অক্ষরে তারা সেই সময়ের নানান ঘটনার এবং সময়ের স্বাক্ষর পেশ করতেন।
কিছু চিঠির সংগ্রহ আজ চিঠিলেখার কায়দাকানুনের পাঠ্যপুস্তক হিসেবেগণ্য হতে পারে। চিঠিগুলি শুরু হয় পদ্য ছন্দে কলমের স্তুতি বা চিঠি লেখার স্তুতির(ইনশা) মধ্যে দিয়ে, তাঁর পরে অক্ষর উদ্ভব আর বিকাশের পৌরাণিক গল্প দিয়ে, এবং বিভিন্ন লেখনির আঙ্গিক এবং তাঁদের পূর্বপুরুষের স্তুতি দিয়ে; তাঁর পরে শুরু হত চিঠির বয়ান। তবে এই চিঠির বইগুলি কিন্তু এমন সময়ের প্রামান্য চিঠির উদাহরণ যখন বলা যায় মুঘল রাজসভা তাঁর ঐশ্বর্যমণ্ডিত ঐতিহাসিকতাকে পিছনে ফেলে এসেছে।
(চলবে)