Saturday, July 14, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - দেশিয় শিল্পচর্চা প্রবাহ - গৌরব, গুরু কিঙ্কর, মধুমঙ্গল মালাকার

পরম্পরার জ্ঞান, দক্ষতার অমৃতের সন্ধান
গাঁইয়া কারিগরদের কাজকে কোন দিন সংখ্যালঘিষ্ঠ প্রমিতবাদী ঔপনিবেশিক শহুরে পাশ্চাত্য-শিক্ষিত, শিল্পকলার জ্ঞানচর্চা খুব বেশি গুরুত্ব দেয় তো নিই, বরং ইওরোপের নবজাগরণ যে পাগান কৃষ্টি ধ্বংস করে, যে ভাবে এদের গাঁইয়া জাদুঘরিয়ে তকমা এঁটে ফোক বা লৌকিক শিল্পচর্চা করেছিল, বাংলার ইওরোপের গলবন্ধ পরা প্রাতিষ্ঠানিক লোকশিল্পতাত্ত্বিকেরা দেশের পাগান কৃষ্টি প্রযুক্তি জ্ঞানচর্চা ধ্বংস না করতে পেরে গাঁইয়াদের অশিক্ষিত, অদক্ষ, অশিক্ষিতের পটুত্ব ইত্যাদি ধরণের ছাপ মেরে ঠেলে দিয়েছে বেড়ার ওপারে। সংখ্যাগুরু কারিগরদের কিস্যু যায় আসে নি - বরং যখনই লুঠেরা নবজাগরণের হোতাদের পশ্চিমি অনুপান বিস্বাদ ঠেকেছে তখনই তাদের দক্ষতা ধার নিতে হয়েছে গাঁইয়াদের থেকেই।
এই গাঁইয়া কারিগরেরা শহুরে শিল্পী, নাটুকে বা সিনেমা করিয়েদের মত সরকারি দাক্ষিণ্য, সংরক্ষণ, দাবি করেন নি, কোনদিন অভিমানভরা ফোলানো ঠোঁট নিয়ে বলেন নি কেন তাঁদের তথাকথিতভাবে শিল্পীরূপে গণ্য করে এই কমিটি ঐ কমিটিতে নেওয়া হচ্ছে না, বা নাটক করিয়েদের মত দাবি তোলেন নি কেন তথাকথিত জাতীয় শিল্প করার জন্য বিনামূল্যে জমি, কম পয়সায় প্রেক্ষাগৃহ, নাটক তৈরির জন্য দান বা নিদেনপক্ষে কিছু হাবিজাবিমার্কা উপাধি দেওয়া হচ্ছে না, বা সমাজপাল্টাতে মন প্রাণ ঢেলে দেওয়া বড় পুঁজির 'যোগ্য সন্তান' সিনেমার বাংলার মাটিতে শেকড় গজিয়ে ফেলতে ব্যস্ত পরিচালকদের মত দাবি করেন নি, কেন তাঁদের বিপ্লবাত্মক সমাজপরিবর্তনের সিনেমায় সরকার কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ঢালছে না।
না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ১৪১৭ সালে লোকপ্রসার প্রকল্প নেওয়ার আগে, কিছু গবেষক, কিছু সরকারি আমলা, কিছু প্রগতিশীল রাজনীতির কারবারি এদের নিয়ে দাবা খেলাখেলি করা ছাড়া, কেউ এদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করে নি - স্থায়ীভাবে এদের পিঠে 'লুপ্তপ্রায়' শব্দবন্ধটি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোন শহুরে কোনদিন এই শিল্পগুলিকে সাহস করে বোঝার চেষ্টা না করেন- তাঁদের মাথায় গুঁজে দেওয়া পড়েপাওয়া চৌদ্দআনা ইওরোপিয় সংস্কৃতির চৌহদ্দির বাইরে এসে।
----
আমার ভাগ্যভাল, বঙ্গীয় পারম্পতিক কারু ও বস্ত্র শিল্পী সঙ্ঘে এই মানুষজন জুড়ে নেওয়ার যোগ্য মনে করেছিলেন। দেখছিলাম, কি করে কয়েকশ বছরের বাংলার, হ্যাঁ খুব বড়ভাবে বলছি, গ্রাম-বাংলার শেকড়ের মুখে বসে থাকা একটা পরম্পরার পরিবার শিল্প সৃষ্টি করে।দেখলাম, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, দেখলাম সেই পরিবারের এক প্রজন্ম কি করে এই ভেঙ্গে পড়া হাহুতাশি সময়ে তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা, পরম্পরা, তাঁদের মূল্যবোধ, তাঁদের শিল্প ভাবনা চারিয়ে দিয়ে যান পরের প্রজন্মের মধ্যে। দেখলাম আর শিক্ষিত হয়ে বুঝলাম, গ্রামবাংলা শত ধ্বংস, শত লুঠ, শত ব্যভিচারী তত্ত্বের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে গেলেও কি করে তার মৌলিকতার কুড়টি টিকিয়ে রাখে নিজের মত করে।
ঘটনাটা হল স্ক্যান্ডিনেভিয়ার একটি দেশ থেকে গরুর মূর্তি তৈরি করে দেখানোর আহ্বান পেয়েছেন মুষ্কিপুরের মালাকার পরিবার। শর্ত, প্রবীন মধুমঙ্গল মালাকার যাবেন - তিনি অর্থ পাবেন। কিন্তু সামান্য মধুদার শর্ত হল, তার অর্থের প্রয়োজন নেই, তার সঙ্গে যেতে দিতে হবে, না তার একমাত্র শিল্পী সন্তান নয়, তার ভাই, গুরুকিঙ্করের সন্তান গৌরবকে।
নিজের চোখে দেখলাম কি করে একটা প্রজন্ম নব ইংরেজিশিক্ষিত কারিগর প্রজন্মকে হাতে ধরে জ্ঞান, দক্ষতা আর প্রজ্ঞান প্রবাহিত করান, পাশে দাঁড়িয়ে নয়, সাধারণ কিছু নির্দেশ দিয়ে। মধুদা তখন তার দোকানে, গৌরব বাড়িতে গরুটি তৈরি করছে - কিন্তু গলাটা ঠিক মত যা সে চাইছে হচ্ছে না - মধুদা দুপুরে এলেন - নিজের হাতে ঐটুকু অংশ দেখিয়ে দিলেন। তারপর কারিগরের বংশ পরম্পরার রক্ত পুরো ব্যাপারটাকে এঁচে নিয়ে নামিয়ে দিল সেটা দরকার।
এই ঘটনাগুলোর কিছু বিরল ছবি তুলে নিয়ে এসেছি - আমার নিশ্চিন্তিভাবটা কিছুটা চারিয়ে দিতে চাইছি কিছু বন্ধুর মধ্যে যারা আম ইংরেজি শিক্ষিত ইওরোপনম্য শহুরে মানসিকতার বাইরে বেরোতে চাওয়া মানুষদের জন্যে, যাঁরা এই না দেখা, না জানা, না বোঝা, না পড়া নিজের দেশ, গ্রাম, মানুষ, শিল্পকে বুঝতে চান। আবারও বলি আমার ভাগ্য ভাল এই অসামান্য মানুষদের সঙ্গ করতে পেরেছি, তারা কোন বাধা ছাড়াই সযত্নে অশিক্ষিত এই মানুষটিকে তাঁদের কর্মতত্ত্ব বোঝার সুযোগ করে দিয়েছেন।
সেই দীর্ঘদিনধরে সঞ্চিত অমৃতের কিছু ফোঁটা আপনাদের সক্কলের জন্য বেঁটে দেওয়া গেল, গ্রামশিল্পে কোথাও কোন বাধাবন্ধ নেই - সব কিছু বাতাসের মত সূর্যের আলোর মত উন্মুক্ত।
জয় বাংলা!
জয় বাংলার দক্ষতার!
জয় বাংলার জ্ঞান, প্রযুক্তির!
জয় বাংলার পরম্পরার পরিবারগুলোর!

Friday, July 13, 2018

প্রাতিষ্ঠানিক ঔপনিবেশিক জ্ঞানচর্চার বাইরের গুরুরা - হকার, কারিগর, কলিম খান - ছকে বাঁধা উপনিবেশের শেকড় উপড়োবার হাতিয়ার

গুরুপ্রতীম কলিম খানএর স্মরণ সভায় উদ্যোক্তারা আমায়(আদতে কারিগরদের) বলতে ডেকেছিলেন, তার জন্যে Narayan Chandra Das, Samik Saha Debasish Das এবং আরও অনেকেকে প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। অনুষ্ঠানে দুর্গাপুর থেকে এসেছিলেন Subhrajyoti Basu, খড়গপুর থেকে Somnath Roy Subhas Das Dhritiman Bhattacharjee এবং আরও অনেকে। দুএকজন আলাপও করলেন। সমস্যা হল আমি নতুন চেনা মানুষদের নাম মনে রাখতে পারি না। তাদের থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমরা একসঙ্গে বসব। আদান-প্রদান জরুরিতম কাজ।
---
আমরা কলিম খানকে দেখছি উপনিবেশ বিরোধী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থেকে। গোটা শিক্ষা জগত ছেয়ে আছে উপনিবেশিক জ্ঞানর্চায়। যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্তরউপনিবশিক জ্ঞানচর্চা আলোচনা করেন, তারাও এক পক্ষে মোটামুটি ঔপনিবেশিক পশ্চিমের কথাই বলেন, তাদের লেখায় পশ্চিমের পথেই মুক্তির তত্ত্ব উঠে আসে, উপনিবেশের ধারণা থেকে মুক্তির পথ নয়। পশ্চিমের উতপাদন ব্যবস্থা, লুঠেরা বড় পুঁজির বিনিয়োগ, তার কেন্দ্রিভূত জ্ঞানচর্চা, উপনিবেশ সম্পর্কে প্রাচ্যবাদীদের তত্ত্ব আর অপচয়ী জীবনযত্রাকে মান্যতা দিয়ে উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন লড়া যায় না, দেশের মানুষ আর তার দর্শনকেও বোঝা যায় না।
এখানেই কলিম খনের তত্ত্বের সঙ্গে আমাদের হকার কারিগরদের উতপদন কৃষ্টি আর দর্শনে মিল। তত্ত্ব এবং প্রয়োগে হাতে কলমে কাজ করে আমরা বুঝেছি আড়াইশ বছর ধরে আমাদের মনে যে ধারনাগুলোর চাষ হয়েচলেছে সেগুলো শেকড় গেড়ে বসেছে বংশ গুরু এবং রাষ্ট্র পরম্পরায়, সেই থানা গেড়ে বসে থাকা উপনিবেশের উতপাটন না হলে ওনার তত্ত্বে ঢোকা মুশকিল, আর উপনিবেশের নিগড় থেকে মুক্তি মুশকিল।
এই উপনিবেশিক তত্ত্ব আমাদের মনে প্রবেশ করিয়েছে কোম্পানির প্রথম দিককার ভারতে আসা প্রাচ্যবিদেরা। নম নম করে দেশিয় ভাষা এবং প্রায় সংস্কৃত না জানা, ভারতীয় সমাজ না জানা, বোঝা জোনস, কোলব্রুক, প্রিন্সেপ ভারতে এসে সংস্কৃত শিখেছেন কয়েক বছর মাত্র, তাদের লুঠের কাজ সম্পন্ন করেই( প্রাচ্য বিদদের সংস্কৃত জ্ঞান বিষয়ে আমাদের দলের সাথীর লেখাটা কৌলাল পত্রিকায় পড়তে পারেন koulal.com/2018/07/10/প্রশ্নঃ-ইংরেজ-আমলের-ইয়োর/)। যতটূকু হাতে বাড়তি সময় ছিল, সে সময়ে সংস্কৃত শিখে এবং সেই ভাষা জ্ঞান নিয়ে তারা নানান প্রাচীন বই অনুবাদ এবং সেই সঙ্গে আমাদের কৃষ্টিকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের সেই বিশ্লেষণ অবলম্বন করে আজও প্রাচীন ভারত বিশ্লেষণের জ্ঞানচর্চা চলছে।
এই তত্ত্ব উপড়িয়ে ফেলার কাজে কলিমখানের তত্ত্ব আমাদের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হতে পারে। কিছু কিছু বিষয়ে মতভেদ আছে। থাকুক। সেটা স্বাস্থ্যকর। তবে মতভেদ এমন নয় যে আমরা কিছুটাও একসঙ্গে হাঁটতে পারব না। একসঙ্গে হাঁটতে আমাদের হবেই।
বাংলার কারিগর হকার সংগঠন মনে করে ধরমপাল, চন্দ্র কান্ত রাজু, ক্লদ আলভারেজ, আশিস নন্দী, অনুপম মিশ্র, জয়া মিত্রদের সঙ্গেই উপনিবেশিক জ্ঞানচর্চা থেকে মুক্তির পথের অন্যতম দিশারী কলিম খান।
জয় বাংলা!

হর্টাস মালাবারিকাস - মালাবারের বাগান - ডাচ নথিকরণে মালাবারের গাছগাছালি

পশ্চিমঘাট পর্বতমালার তিন রাজ্য কেরল, কর্ণাটক এবং গোয়ার গাছগাছড়ার বিবরণ। প্রথম উদ্যমটি নেন মালাবারের ডাচ প্রধান কুঠিয়াল হেন্ড্রিক ভন রিডি(Hendrik van Rheede)। হর্তাস মালাবারিকাস আদতে গড়ে ২০০ পাতাওয়ালা ২০টি নথিকরণের বইএর সমাহার। এতে ৭৯৪টি তামার প্লেটে(ডাচেরা ভারতে জাপান থেকে তামা আনত পাইকারিভাবে) এনগ্রেভিং করা ছবি রয়েছে। প্রথমটি বেরোয় ১৬৭৮ সালে, শেষটি ১৬৯৩। যতসূর সম্ভব এশিয় ছাপা সর্বপ্রথম গাছগাছালির নথিকরণ।
গোয়া থেকে কণ্যাকুমারী পর্যন্ত বিপুল পরিমান গাছের বর্ণনা নথিকরণ করা হয়েছে এতে। ৭৪২টা দেশি প্রজাতির বিশদ বিবরণ রয়েছে এই খণ্ডগুলোয়। প্রজাতিগুলি এই অঞ্চলের পরম্পরার জ্ঞানীদের শ্রেণিবিন্যাস নির্ভর করে রচিত। ল্যাটিন ছাড়া উদ্ভিদের নামগুলি কোঙ্কণি, মালায়ালম, আরবি আর ইংরেজিতে লিখিত হয়েছে। বইটি প্রথম আলোচনা করেন হিস্টোরিক্যাল নোটিসেস অব কোচিনে, টি হোয়াটহাউস ১৮৫৯ সালে।
পুরো ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজ করানো হয়েছিল স্থানীয়দের দিয়ে। তারা সেই নথিগুলি এনে দিতেন কোচিনে, কার্মেলাইট ম্যাথায়াস সেগুলি আঁকতেন। প্রথমে মালায়লম এবং পরে কোঙ্কনি(সে সময় ব্রাহ্মণাচি ভাষ নামে পরিচিত ছিল) এবং তারপরে পর্তুগিজ ভাষায় অনুদিত হত। পর্তুগিজে অনুবাদের কাজটা করতেন কোচিনের এমানুয়েল কারনেইরো। সরকারি সচিব হারম্যান ভন ডুয়েপ এটা ল্যাটিনে অনুবাদ করতেন যাতে সারা ইওরোপে বিনাবাধায় পঠিত হতে পারে। গোটা কাজটা শেষ হলে সমগ্র কাজটি যেত আরেক ডাচ চ্যাপলেইন এবং জ্ঞানী ক্যাসিয়ারিয়াসের কাছে, যিনি যতদূর সম্ভব ভ্যান রিডির বন্ধু।
এই কাজটি যে মানুষেরা করেছিলেন - বৈদ্য ইত্তি আচুডেন এবং তিনজন ব্রাহ্মণ রঙ্গা ভাট, বিনায়ক পণ্ডিত এবং অপু ভাট। এছাড়া উদ্ভিদিবিদ্যা নিয়ে কাজ করা অপেশাদার, অধ্যাপকেরাও এর সঙ্গে জড়িয়েছিলেন - যেমন আর্নল্ড সেইন, থিওডোর জানসন, পল; হারম্যান, যোহানস মুন্নিকাস, জোয়ানস কমেলিনাস।
এই কাজে ভ্যানরিডিকে সাহায্য করেন কোচিনের রাজা এবং কালিকটের জামোরন। ভারতীয়দের মধ্যে ছিলেন মালাবারের এজাভা বৈদ্য ইত্তি অচুডেন, থিয়া বৈদ্যন। গোটা কাজটার শংসাপত্র দিয়েছিলেন ব্রাহ্মণ রঙ্গা ভাট, বিনায়ক পণ্ডিত এবং অপু ভাট দুই গোটা বছর সকাল থেকেও রাত পর্যন্ত খেটে।
অধ্যাপক কে এস মণিলাল ৪০ বছরের বেশি হর্টাস মালাবারিকাসের অনুবাদ, গবেষণা এবং ব্যাখ্যা নিয়ে কাজ করছেন। গবেষনা করছেন যাতে ইংরেজিভাষী মানুষ এই বইটার স্বাদ পেতে পারেন।

আমাদের শিক্ষক

আমাদের শিক্ষক, খেঁটো ধুতি লুঙ্গি বা নিচে ওপরে দুফালি সাধারণ আবরণী পরা গাঁইয়া পুরুষ-নারীরা। এরাই বিশ্বকে বয়ে নিয়ে চলেন তাঁদের প্রজ্ঞায়, দক্ষতায় জ্ঞানে আর বুদ্ধির জোরে। তারা চুপ থাকেন তাদের দর্শন কপচানোয়। আমরা যেহেতু ভদ্র পরিবার-সমাজ থেকে তাঁদের সঙ্গ করতে যাওয়া, তাই ফাঁকা কলসির ঢপ ঢপ আওয়াজ দিয়ে যাই।
তথাকথিত আন্দোলন, বিপ্লবে, মিছিলে গাঁইয়ারা সুন্দরভাষী, ক্ষমতার দালালদের হাতে দাবার বোড়েমাত্র।গাঁইয়ারা এটা জানেন এবং শহুরেদের কিছুটা প্রশ্রয়ও দেন। তারা তাঁদের জোর জানেন - আর জানেন বিপক্ষের ভদ্রবিত্ত সমাজের সার্বিক দুর্বলতা। শহুরে সাজানো-গোজানো তত্ত্বগুলি বুদবুদের মত ফাঁকা, কয়েক দশকের কারবারী। টিকে থাকে বিকেন্দ্রিত, নিয়ন্ত্রণবিহীন, ভদ্রবিমুখ, নিজের বাজারকৃষ্টি ভিত্তিক, পরিবেশ রক্ষক, গ্রামীন উতপাদক সমাজ - যাকে সহজে দেখা যায় না, বোঝা যায় না, অনুভব করা যায় না - এতই পরিব্যপ্ত সে।
ভদ্র পরিচালিত কর্পোরেট বা শহুরে সমাজ-আর্থিক-কৃষ্টিগত কেন্দ্রিভূত ক্ষমতা নির্ভর সমাজ চলে যে সব বিভিন্ন মনোহারিনী তত্ত্বের আড়ালে সেগুলি গ্রাম প্রজ্ঞা, দক্ষতার কবরস্থল - কর্পোরেটদের হাতের পুতুল। বিপ্লব নামটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভদ্র পোষার আর তাদের তৈরি নানান তত্ত্ব প্রয়োগের কাণ্ড।
এগুলি গ্রামীনেরা জানেন।
তাঁরা জানেন বাচ্চারা বাবা-মাদের তাদের অপুষ্ট হাতে খুব দুষ্টু-মিষ্টি ঘুঁষি-চড়-থাপ্পড় মারে আর তাদের মা-বাবারা তা হাসি মুখে সহ্যও করেন।

Thursday, July 12, 2018

ইউরো-মেট্রো কলোনিয়াল ইউনিভার্সিটি

ব্রেকিং নিউজ
জিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে উপমহাদেশের উপনিবেশের প্রাক্তন রাজধানী, একদা সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর, কলকাতায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত অভিজাত, ঔপনিবেশিক বুদ্ধিজীবিদের উদ্যোগে অতি শিগগিরি ভদ্র ছানাদের জন্যে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে চলেছে
নাম হবে ইউরো-মেট্রো কলোনিয়াল ইউনিভার্সিটি
ছাত্র-ছাত্রীদের যোগ্যতা
কর্পোরেটিয় ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা,
নবজাগরণে অচলা আস্থা,
ইওরোপিয় ভাষায়(আপাতত ইংরেজি) স্বপ্ন দেখা,
ইওরোপ বা আমেরিকামন্যতা,
গ্রামকে প্রতিক্রিয়ার গড় হিসেবে দ্যাখা,
গরীব গাঁইয়াদের অজ্ঞ, মুর্খ, অশিক্ষিত, অসভ্য, অদক্ষ দাগিয়ে দেওয়া,
কেন্দ্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থাই মুক্তির পথ হিসেবে দেখেও বিশ্বায়নকে তেড়ে গালাগালি দেওয়া
পারিবারিক যোগ্যতা
ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের ইওরোপ আমেরিকায় বিদ্যালয়/কর্পোরেটে চাকুরি
আবশ্যিকভাবে মেকলেবাদী,
স্বচ্ছল/ধনী উচ্চবর্ণ,
অন্তত তিন প্রজন্মের সরকারি চাকুরে অথবা পশ্চিমি পেশাদার পরিবার।

Wednesday, July 11, 2018

বিদ্যালয় ছুট বনাম মেধাবী - কারিগরদের ভাবনা

বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় যে কেন্দ্রিভূত কাঠামোয় চলে সেখানে শহুরে আনন্দবাজারী ইংরেজি শিক্ষিত ঔপনিবেশিক ইওরোপমন্য উচ্চবর্নিক ভদ্রছানার বাইরে গাঁইয়াদের প্রবেশ দুস্কর, যে জন্যে ২৫ লক্ষ প্রাথমিকে ভর্তি হলেও মাত্র ৮০ হাজার স্নাতক পরীক্ষায় বসে, স্নাতকোত্তরে কত বসে সে হিসেব কষা হয় নি। বাকি সব স্তরে স্তরে বিপুলাকারে খসে যায়। কেন? নিজেকে প্রশ্ন করুন যারা পেরেছেন আর যারা পারেন নি তারাও - আমি প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করি আর শিখি হকার আর কারিগরদের জ্ঞান, জীবন আর কর্ম দক্ষতা থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ব্যবস্থায় ছাত্রদের ঔপনিবেশিক পাঠের ছাঁকনিতে ছেঁটে ফেলে যে আনন্দবাজারী ইংরেজি শিক্ষিত ঔপনিবেশিক ইওরোপমন্য উচ্চবর্নিক মাঠাদের পাওয়া যাচ্ছে তারাই কি মেধাবী?
উদ্দীপন চাইছেন/ভাবছেন এই ছেঁটে যাওয়া গাঁইয়াদের একাংশ কারিগরদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়ে আসতে।এটা করতে গেলে শুধু ঔপনিবেশিক পড়াশোনার কাঠামোর তাত্ত্বিক অবস্থান বিরোধিতা করলে হবে না অথবা পাঠ্যক্রমও বদল করলে হবে না, গোটা পাঠ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রবিরোধিতা জরুরি। বিদ্যালয়কে মানসিকভাবে সমস্ত গুমোর ছেঁটে ফেলে যেতে হবে পড়ুয়ার কাছে তবেই সে পড়তে পারবে - ছাত্রদের চারদিকের চারটে দেওয়াল তুলে দিতে হবে। গাঁইয়া কারিগর পরীক্ষা দেয় রোজ, তার ক্রেতার কাছে, সমাজের কাছে। সে পাঠ নেয় সমাজ, পরিবার গুরুর কাছে, তার মত করে। তাকে সিলেবাস গিলিয়ে দেওয়া হয় না। এই যে ঔপনিবেশিক কেন্দ্রিভূত পাঠ ব্যবস্থা তার জীবনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখে না। পাঠটা তৈরি হয়েছে কর্পোরেট বা রাষ্ট্রের কেন্দ্রবদ্ধতা মেনে নিয়ে চাকরি দালালি করার জন্যে, সামাজিকভাবে উদ্যমী হতে তাকে পড়াশোনা উতসাহ দেয় না।
এগুলি না হলে কোন গাঁইয়ার প্রাতিষ্ঠনিক পড়াশোনা ব্যবস্থা ব্যর্থ হবে।
সে তার মত করে টিকে থাকবে গাঁইয়া অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান দক্ষতা চর্চা নিয়ে। আর শহুরেরদের জন্যে থাকবে বর্তমান ইওরোপিয় ব্যবস্থা।

সুভাষ, গর্বাচভ আর সপ্তাহ - টুকরো কিছু স্মৃতি

স্মৃতি কথা লেখার বয়স চলে এল। আমার যৌবন সুভাষময় বলা ঠিক হবে না, কিন্তু তাঁর অমেয় সান্নিধ্য পাচ্ছি। আলাপের আগে বইপাড়ার এক বইপোকা বন্ধুর কাছে দুটো গপ্প শোনা ছিল - সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন প্রণাম নেওয়ার মানুষের সংখ্যা, তুই সম্বোধন করা মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমছে, আর যতদূর সম্ভব দেজএর শ্রেষ্ঠ কবিতার বই হাতে নিয়ে স্বতঃসিদ্ধ ভঙ্গীমায় তিনি বলেছিলেন আমি কি তাহলে শ্রেষ্ঠ কবিতা সব লিখে ফেললাম? এবার কি অবসর?
---
১৯৮৮, ১৩৯৫।
আমার মা-বাবা বহুদিনের সিপিয়াইএর সদস্য। ততদিনে শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে সিপিআই থেকে অপসারিত। সিপিআইএর ভেঙ্গে এআইসিপি - পরে সিপিএম বিতাড়িত গৌরী আম্মা ইত্যাদিদের নিয়ে ইউসিপিআই হবে। বাংলায় সিপিআই তখন দৌর্দণ্ডপ্রতাপ বামমন্ত্রীসভায়। সেই প্রতাপ হাতে কলমে দেখেছি বছর ছিয়াশি সালে ঘাটালে, চন্দ্রকোণা টাউনে। যে এলাকার মসলিন এক সময় রপ্তানি হত কাঁহাকাঁহা মুলুক, সেখানে কংগ্রেস সমর্থনে দলীয় প্রার্থী সাহিত্যিক সত্য ঘোষালের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরছি ছোটছোট মিটিং করে। সেই প্রথম যৌবনে সিপিএমের অস্ত্র মিছিল দেখা, নির্বিচার রোজ পরোক্ষে খুনের হুমকি শোনা আর অল্পসল্প গায়ে হাত বুলোনোর মত করে মার খাওয়া। তখনও নারায়ণ চৌবের দুই মৃত পুত্রের একজন গৌতমদা আমাদের হিরো। পূর্ব ইওরোপে পড়তে যাওয়া গৌতমদার নানান গপ্প শুনছি।
নাহ, তখনও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয় নি। আকাশেবাতাসে ভাসছে গর্বাচেভ গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রৈকা। ইয়েলসিন মস্কোর সর্বেসর্বা। ব্রেজনেভের সময় বেশ কিছু কাল শেষ। প্রবীন প্রখ্যাত বাম-পার্লামেন্টারিয়ান-বাগ্মী একগাছি মোটা পৈতে হাতে - আমি যদি ব্রাহ্মণ হই, পৈতে তুলে গর্বাচভকে তিন অভিসম্পাত দিচ্ছি তোর পতন হোক, পতন হোক, পতন হোক - ঐতিহাসিক বাণী সাংবাদিক সম্মেলনে উচ্চারণ করেন নি। বিশ্ব ইতিহাস ওলটপালট করে দেওয়া সেই অসম্ভব সম্ভব হতে তখনও তিন তিনটে বছর বাকি।
তখনও যতদূর সম্ভব সুভাষ মুখোপাধ্যায় রোজ পাড়ায় প্যারাম্বুলেটার নিয়ে বাজার যাওয়ার মত করে আসছেন যাচ্ছেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। আমি, বন্ধু নিখিলেশ রায়চৌধুরী এবং আরও কয়েকজন তরুণ, সুভাষবাবু, তরুণ সান্যাল এবং আরও অনেক গুণীর যৌথ সম্পাদনায় সপ্তাহ পত্রিকায় হাত পাকাচ্ছি। আন্দাজ করতে পারছি সত্তর বছরের রাষ্ট্রীয় সাম্যবাদের যুগ শেষ। বাটা দোকানের ম্যানেজারদের নিয়ে ইউনিয়ন করা গৌর গোস্বামী সপ্তাহে নিয়মিত আসতেন। তিনি এবং আমরা গর্বাচেভ বিরোধী। লড়ুয়ে হাভানার ফিদেলের পক্ষে। কেন যেন মনে হচ্ছে গর্বাচভ পশ্চিমি জাতভাইদের হাতে হাত মিলিয়ে সাত দশক ধরে বোনা কোটি মানুষের স্বপ্ন খুন করতে উদ্যত। তরুণবাবুর কাছে সবে অর্থনীতির পাঠ শেষ হয়েছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মায়াময় গলায় মাঝেমধ্যে শুনি, সাম্যের দেশে দুটো শ্রেণীর মানুষের নির্বিচারে স্বার্থ দেখা হয়, শিশু আর বৃদ্ধ। আর শুনতাম রুশীদের বই পড়ার নেশা নিয়ে তাঁর প্রশ্রয়ী গলার হাজারো চুটকি।
জীবনের পথ বাঁকছে একটু একটু করে। ভাবনায় ফিসফসিয়ে আঁচড় পড়ছে, অন্য পথ, অন্য কোন খানে। পথ সত্যিই ভাঙবে সোভিয়েত উঠে যাওয়ার আরও তিন বছর পর। শহুরে সাম্য আন্দোলন থেকে বিচ্যুত হয়ে থেকে গ্রামের অবস্থার দিকে দৃষ্টি ঘোরাবার সময় হবে।
---
এত সব কথা লেখার সুযোগ হল, ফোর্ট উইলিয়ামের প্রথম দিককার সময় জানতে গিয়ে পাক্কা ৩০ বছর আগের ঘোর বাম জমানায় ২৭/১২/৮৮ তারিখে শিক্ষিকা মা'র কেনা অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্তর খণ্ডগুলি হাতে পেয়ে। যৌবনে বইএর দোকান বলতে মনীষাই বুঝতাম। কিন্তু মডার্নের রসিদটা পঞ্চম খণ্ডে থেকে গিয়েছিল।ঐতিহাসিক সে সময়ে পাঁচটি খণ্ডের মোট দাম ছিল ১৭৪ টাকা ২৫ পয়সা। পাঁচ নম্বরটা পড়তে পড়তে মা সব কটা খণ্ড এনে দিলেন। আজও বইগুলো সোভিয়েত দেশ আর সোভিয়েত নারীর সেই অমূল্য কাগজ দিয়ে মোড়া।
---
স্মৃতি কথা লেখার বয়েস হয়ে গেল।

কেন এলোপ্যাথি এই বিনিয়োগ, রাষ্ট্রীয় মদত সত্ত্বেও পরম্পরার চিকিৎসার সাথে পেরে উঠছে না?

বহুকাল এবং আজও কেন ঔপনিবেশিক চিকিৎসা এবং ওষুধ উপমহাদেশিয়দের মনে দাগ কাটতে পারে নি তার একটা যুক্তিঙ্গত বর্ণনা দিচ্ছেন ডেভিড আর্নলড, কলোনাইজিং দ্য বডিতে।
কেন এলোপ্যাথি এই বিনিয়োগ, রাষ্ট্রীয় মদত সত্ত্বেও পেরে উঠছে না? গোটা ধারণাটা উপনিবেশিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই সাধারণ মানুষের আস্থা সে অর্জন করতে পারে নি। তাই ঔপনিবেশিক সময়ে বৈদ্য, হাকিম, কবিরাজ এমন কি ইওরোপ থেকে আসা হোমিওপ্যাথির সঙ্গে লড়ায়ে পেরে উঠছিল না, তাই তারা চিকিতসায়, চিকিতসকেদের, চিকিৎসা শিক্ষায় বৈধতা অবৈধতা, চিকিতসকেদের পঞ্জীকরণ ইত্যাদির ধারণা তৈরি করতে থাকলেও লড়ায়ে হারতে থাকে। বঙ্গভাগের পরও মূলতঃ এটি টিকেছিল সেনা ব্যারাকে, ইওরোপিয়দের বসতিতে। রাষ্ট্রীয় পুঁজির মদতে (বর্তমানে কবিরাজীও অনেকটা বড় পুঁজির অনুসারীভাবে বেড়ে উঠতে চাইছে) সে ঠিক করে কে চিকিতসক আর কে চিকিতসক নয়। সম্প্রতি ভুয়ো ডাক্তার ধরা পড়া সেই উদ্যমের একটি নমুনা।
আমরা কারিগরের সঙ্গঠনের পক্ষ থেকে যে দেশিয় চিকিৎসা এবং ওষুধের প্রচার প্রসারের কাজ করছি গত আধ দশক ধরে তাতেও এটা পরিষ্কার আজও কিছু হাতে গোনা ভদ্রবিত্ত বাদ দিলে অভদ্রবিত্ত সমাজ এখনও নির্ভর বিশ্বাস করে এই ব্যবস্থার ওপর।
The vexing question of medical registration brought to the fore many of the underlying contradictions and dilemmas in the checkered career of Western medicine in nineteenth-century India. After one hundred and fifty years of British rule, Western medicine was still struggling to establish itself among the people of India. Medicine had been far less successful in this regard than the legal profession which, with a minimum of state sponsorship and regulation, had flourished like a hothouse plant in the steamily litigious atmosphere of colonial India. Why had Western medicine, comparatively speaking, been left out in the cold? One explanation was that it had remained too closely identified with the requirements of the colonial state and so was remote from the needs of the people. It had failed to make the transition from state medicine to public health. Another explanation was that the mass of the population remained content with the innumerable and readily accessible practitioners of indigenous medicinethe kavirajas, the vaidyas, and the hakimsand either saw no reason to seek out the few Western-trained practitioners who were available or could not afford their fees. In 1900 even Calcutta, second city of the British Empire and a colonial metropolis of a million people, could support barely a hundred practitioners of Western medicine Despite the influential patronage of the colonial state, despite its own scientific claims and monopolistic aspirations, Western medicine had singularly failed to displace its indigenous rivals. Indeed, by 1914 the cohorts of a reformed and revitalized Ayurvedic and Yunani medicine were mounting a fresh assault on the privileged status of Western medicine in India, and even homeopathy, despite its European origins, seemed to be winning more adherents, especially in Bengal, than orthodox allopathic medicine. It is not surprising, then, that Western medicine is often seen as having had only a superficial impact on India, confined to the small "enclaves" of the army and the European community in India and, even as late as the 1940s and 1950s, as having made little impression upon the beliefs and practices of the great majority of the Indian population.
David Arnoldএর .Colonizing the Body : State Medicine and Epidemic Disease in Nineteenth-century India

উপনিবেশ চায় ভোক্তার দেহ আর মনে দখলদারি

আদতে উপনিবেশ এবং তার কৃষ্টি-প্রকাশ আধুনিকতা, ভোক্তার দেহ, মনের ওপর দখলদারি চায়। একইভাবে চিকিৎসাও। দুনিয়াজুড়ে বেড়ে চলা এককেন্দ্রিকতার একচেটিয়ামি দিয়ে বড় পুঁজি তার আধুনিকতার ধুয়ো তুলে 'অন্য'দের লৌকিক, ফোক, ভুডু, টোটকা, অবৈজ্ঞানিক (আধুনিকদের খুব প্রিয় লব্জ) ইত্যাদি শব্দে দাগিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত থেকে বার করে তার উপনিবেশ সৃষ্টির হাতিয়ার এলোপ্যাথিকে একমেবদ্বিতীয়মরূপে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ঘটনা ইওরোপে আমেরিকায় ঘটে গিয়েছে কয়েকশ বছর আগে।
কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকার আজও ঔপনিবেশিক হত্যালীলা চালিয়ে এদেরকে এলোপ্যাথির উপনিবেশ বানানো যাচ্ছে না। তাই সে রোগীর দেহএর একচেটিয়া অধিকার চায়। এই লড়াই চলছে।
There is, indeed, a sense in which all modern medicine is engaged in a colonizing process. The history of medicine in European and North American societies over the past two hundred years has been a history of growing intervention and a quest for monopolistic rights over the body. It can be seen in the increasing professionalization of medicine and the exclusion of "folk" practitioners, in the close and often symbiotic relationship between medicine and the modern state, in the far-reaching claims made by medical science for its ability to prevent, control, and even eradicate human diseases. It has aptly been said that the position of medicine today is "akin to that of state religions yesterday." It has acquired an "officially approved monopoly of the right to define health and illness and to treat illness.
ডেভিড আর্নল্ডের কলোনাইজিং দ্য বডি থেকে

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ইংরেজি শিক্ষিত বামেরাও মনে প্রাণে ঔপনিবেশিক - কোথায় ম্যাকলে আর কোথায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়?

গত কালই লিখেছিলাম ইংরেজি শিক্ষিত বর্ণবাদী বাঙালি মনে প্রাণে চরিত্রে ঔপনিবেশিক, মেকলেবাদী। আনন্দবাজারে প্রকাশিত এই প্রবন্ধের লেখক অন্যান্য বামপন্থীর মত জাতিবাদী মেকলে, সাম্রাজ্যবাদী ট্রেভলিয়ানের মধ্যেও প্রগতিশীলতা খুঁজে পেলেন। পাবেনই বা না কেন, মেকলেদের জন্যেই আজকে সঙ্খ্যালঘিষ্ঠ ইংরেজি শিক্ষিত প্রমিত বাঙালি করে কম্মে খাচ্ছে। না হলে অধমর্ণ দশা হত প্রত্যেকের - এটা কেউ না জানুক বাম আর আবাপ জানে।
স্বাভাবিকভাবে আনন্দবাজার এদের মধ্যেই প্রগতিশীলতা দেখবে এতে আর আশ্চর্য কি! এবং আশ্চর্যের নয়, এক প্রবীণ মার্ক্সবাদী এই লেখাটা পড়তে নিদান দিচ্ছেন শিক্ষা বিস্তারের দিনকাল বুঝতে, ঔপনিবেশিকতা("ম্যাকলে এবং আরও অনেকেই আমাদের দেশের শিক্ষার প্রসারের জন্য অনেক কাজ করেছেন") বুঝতে নয়। তারা তাঁদের গুরুর প্রথম বয়সের ঔপনিবেশিক নিদানের মত মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন ব্রিটিশেরা অজ্ঞ, অশিক্ষিত ভারতের উদ্ধারকর্তা হয়ে দেখা দিয়েছিল।
সাম্রাজ্য তাত্ত্বিক ট্রেভলিয়নের নাতি(তিনি আবার বিয়ে করেছেন মেকলের নাতনিকে - বদ্যি, বামপন্থীদের মত সাম্রাজ্যবাদীদেরও পারিবারিক সম্বন্ধ বানাতেন সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে) বইটিতে মেকলে ইত্যাদির নন্দিতবাক্য তুলে দেওয়ার পরে কলমচি তাঁর প্রবন্ধ শেষ করছেন এই বাক্যটি দিয়ে - "কোথায় ম্যাকলে আর কোথায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়? সুদীর্ঘ অবনমনের ইতিহাস!"

Sunday, July 8, 2018

সাম্রাজ্যবাদী খ্রিষ্ট ধর্ম ও পাগান জীবনযাত্রা আর কিছু বই

ইওরোপ-আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী খ্রিষ্টধর্ম(যার সঙ্গে যিশুর বাণীর কোন সম্পর্ক নেই) এবং লুঠেরা নবজাগরণএর বাইরে পাগান জীবনযাত্রা জানার জন্যে কিছু বই।
আমি সদা মনে রাখি, ইওরোপ আমেরিকা যেটা নিজেদের দেশে পেরেছিল, সে কাজটা আজও এসিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকার বহুদেশে পারছে না। তাই আধুনিকতার ঘোমটা।
কবি অমিতাভ গুপ্ত বলেছেন পোস্টমর্ডার্নিজমের অর্থ আধুনিকতাকে নতুনভাবে থানা গেড়ে বসানো, পোস্ট করা; যার প্রাথমিক কাজ পরম্পরা ধ্বংস করা। পোস্ট অর্থ উত্তর নয়।

মধ্যবিত্ত, কারিগর ও গাঁইয়া জীবনযাত্রা

শাহানদাদা নিচের নারানগঞ্জের অভিজ্ঞতার লেখাটা লিখেছেন।তাঁর লেখা পড়ার আগে আমাদের মন্তব্যটা পড়ে নিতে পারেন...
শহুরে চাকরি চাওয়া ভদ্রবিত্ত ছানাপোনাদের জগতের বাইরের জগত, কারিগরদের জগত।
মধ্যবিত্তের স্বপ্ন বড় পুঁজির মালিকদের তুল্য সম্পদশালী হওয়া। তার জন্য তাকে যা বলা হবে, সে করতে ইচ্ছুক।
চাষী, কারিগরের লক্ষ্য স্বাচ্ছন্দ আর সঙ্গে এক মাত্রা সুখ আর স্বস্তি। তাই দৈনিক ৫০০ টাকা রোজগার হলে সে বাড়িতে প্রাণভরে ঘুমায় - ওভারটাইম করে না - পরিবার সমাজকে সময় দ্যায়।
খাটনি তার নিজের, জীবনটাও নিজের - সে এই তত্ত্বটা হাড়ে হাড়ে জানে।তাইসে সম্ভাব্যভাবে ভুতের খাটনি খেটে, তার খাটনির রোজগার ভদ্রবিত্ত আর পুঁজিকে বেগার চুরি করতে দেয় না, নিজে আর পরিবারকে খাওয়ায়। আর আরাম করে।
জয় জীবন!
জয় চাষী কারিগর!
---
শাহানদাদার লেখা---
নারায়নগঞ্জের উকিল পাড়া এবং দেওভোগ এলাকায় দুইটা ছোট ছোট হোসিয়ারি কারখানায় গিয়েছিলাম ।
একটা কারখানায় মালিক সহ ৮ জন মিলে বাচ্চাদের জামা কাপড় বানায় । অন্যটায় দুইভাই ( হুজুর ) আর কর্মচারী মিলে ১০ জন - এরা শুধু মেয়েদের প্যান্টি বানায় ।
অভিযোগ একটাই , লেবার নাই ।
- আইচ্ছা বাই, কন ত দ্যাশে কি উন্নতি হইছে নাকি খারাপ হইছে ?
- উন্নতি তো হয়েছেই , না হলে দেশ চলছে কিভাবে ?
- তাইলে টিভির মদ্দে দিন রাইত হেরা কিল্লিগা কইতাছে উন্নতি হয় নাই ? এই যে দ্যাখেন, আমার এইহানে কাজ করে এক পুলা , ৩ ঘণ্টায় লেবেল লাগাইছে ১২ ডজন । কইলাম, এইভাবে কাম করলে কি কোম্পানি চলব ? ভাত জুটব ?
ব্যস ! পুলায় গেছে গা । ফুন ধরে না । কাম করব না ।
রিকশা ওয়ালা আগে হারাদিন রিকশা চালাইত । ওখন, আধাবেলা চালাইয়া ৫০০ টেকা নিয়া বাড়িত গিয়া ঘুমায় ।
একটা লেবার পাওন যায় না । তারপরো হালার ঘরের হালারা জমি বেইচ্চা, সুদে টেকা নিয়া বিদেশ যায়। হেইখানে গিয়া রাস্তা সাফ করে , বেতন ৭০০০ টেকা। হালারা কি মানুষ না গরু ?
গ্রামের কৃষক , ছোট ব্যবসায়ি আর পরিবহন খাতের সেবাদানকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জানে দেশের কর্ম সংস্থান এর আসল ছবিটা কি রকম ।
দেশে ৫ কোটি বেকার । কিন্তু এই বেকারদের অনেকেই স্বেচ্ছায় বেকার - হয়ত ৩ বা ৪ কোটি বেকার চাইলেই নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারে ।
গ্রামে গঞ্জে ঘুরে, প্রান্তিক মানুষের সাথে মিশে এইটুকু বুঝেছি যে এইদেশের রাজনীতিবিদ, গবেষক , সাংবাদিক এবং বিশেষ করে টকমারানির দল দেশের বাস্তবতার বিন্দুমাত্র জানে না ।
ফলাফল , এরা যতই চেল্লাক , পাত্তা দেই না। মিথ্যুক গাঁজাখুরি গপ্পোওয়ালা একেকটা ।
সমস্যা হল সরকার এখনো বিদেশে লোক পাঠানোকে একটা কৃতিত্ব মনে করছে । আর বিরোধীরা বেকারদের ক্ষেপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে ।

মাটির বাড়ির রং

Shahinur Rashid Tutul এই দুটো ছবি দিয়েছেন মাটির বাড়ির মাটির রং দেখাবার জন্যে। তিনি লিখেছেন - বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির বাড়ি লেপা হয় লাল (নাল) ও সাদা (ব্যালকা) মাটির গোলা দিয়ে। ছোটকালে সেসব বিক্রয় করা দেখিনি তবে সংগ্রহ করতে খরচ হতো। সারা বছরের জন্য সংগ্রহ করে রাখা হতো।
আমরা লিখলাম
যেমন দিনাজপুরের কুনোর গ্রামের যে পোড়ামাটির পণ্যের ওপর ল্যাপার জন্যে লালা রঙের মাটি সাতবার পাতন করে যে বনক তৈরি হয়, তা আনান হয় আলতা দিঘি নাম দীঘি থেকে। এছাড়াও অন্য নানান মাঠে পাওতা যায়। অনেকটা এই লাল রংটার মত।

সেকুলারিজম এবং উপমহাদেশিয় সংখ্যাগরিষ্ঠরা

উপমহাদেশে মধ্যবিত্তের কাছে যে সেকুলারিজম নিয়ে এসেছিল লুঠেরা, খুনি অত্যাচারী উপনিবেশ এব্বং তার অনুগামী হ্যারো অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজের ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত মনে মনে (আজও)মেকলেবাদী ভারতীয়রা বিশেষ করে নেহরু এবং তাঁর অনুচরবৃন্দ, সেটা উপমহাদেশের সঙ্খ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পথ ছিল না - অথচ সমন্বয়ের পথে তারা বহু শত বছর পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে শীতলা, সত্য নারায়ণ, ওলাবিবি, ওলাচন্ডী, হাজারো পীরের থান নির্ভর করে বেঁচে এসেছেন। 
সেকুলারিজম নামক ইওরোপিয় তত্ত্ব হাতিয়ার করে ছোটলোকেদের প্রকৃতিবান্ধব প্রায়-চাহিদাহীন ক্ষমতার থেকে দূরে থাকার জীবনযাত্রাকে ন্যুন দেখিয়ে তাদের গরীব দেগে দেওয়া, তার উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রান্তিক দাগিয়ে দেওয়া, উপনিবেশের লুঠের সম্পদের ওপর নির্ভর করে অপচয়ী ইওরোপিয় জীবনযাত্রাকে কোয়ালিটি অব লাইফ বলে দেওয়া, কর্পোরেট এবং পশ্চিমি জ্ঞান নির্ভর লুঠেরা কেন্দ্রিভূত অর্থনীতিকে রাষ্ট্রের নীতি বানানো এবং তার প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে ভাবা সারাভাইয়ের মত বড় পুঁজির পরিবারকে আন্তুর্জাতিকভাবে উপনিবেশবিরোধী তাত্ত্বিকতার চর্চায়(বহু আলোচনায় ভাবার উল্লেখ আজও দেখি) লেলিয়ে দিয়ে পশ্চিমি যুদ্ধ নিরভর সামরিক বিজ্ঞান প্রযুক্তিকে সমাজ লুঠের হাতিয়ার হিসেবে নামিয়ে এনে শেকড় ছেঁড়া ভদ্রবিত্তর জ্ঞান, দক্ষতা তৈরি, রোজগারের জন্যে বিশাল বিশাল ভর্তুকিতে চলা ইওরোপিয় জ্ঞানচর্চার কারখানার পরিকাঠামো নির্মান করে বিপুল সংখ্যক গাঁইয়াকে উচ্ছেদ করা হয়েছে হচ্ছে।
এবাবদে ডান, বাম মধ্য সক্কলে একজোট।
বামেরা করেছে প্রথম জীবনের ঔপনিবেশিক মার্ক্সএর নিদানে পশ্চিম প্রযুক্তি তত্ত্ব নির্ভর ভারত উন্নয়নের নামে,
কংগ্রেস করেছে নেহরু আর গান্ধী পরিবারের নামে
আর ভাজপা এটা করছে জাতি রাষ্ট্রের নামে, যা আদতে একটা ইওরোপিয় নবজাগরনীয় ধারণা।
---
উপমহাদেশের গাঁইয়ারা এই বাস্তবতার শিকার।
তবুও তারা বেঁচে থাকবেন অপচয়ী জীবনযাত্রার মুখে দুয়ো দিয়ে।

এক পোয়ার বাটখারা - আগ্রা

এককালে আগ্রা ছিল উত্তরভারতের ব্যবসাবাণিজ্যের অন্যতম পাইকারি এলাকা। ধারণা সেই সূত্রে এই প্রাপ্তি।
কারিগরদের বক্তব্য, বড্ড এই কেজো বস্তুটি যার অন্য কোন উপযোগ নেই শুধু পণ্য মাপন ছাড়া, সেটি তৈরির সৌন্দর্যবোধ লক্ষ্য করুণ আর আজকের পশ্চিমি সূত্রে প্রাপ্ত বাটখারাগুলির চেহারা মিলিয়ে নিন।
গোটা পূর্বপৃথিবীর মানুষের দৈনন্দিন থোড়-বড়ি-খাড়া জীবনে টুকরো টুকরো সৌন্দর্যবোধ বাঁচতে, জীবনকে দেখতে শেখায় নতুন করে।
Soumen Nathদার সৌজন্যে।