Monday, August 27, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - নৌবিদ্যা, অঙ্ক এবং জ্যোতির্বিদ্যা – একটি পাগান(জনজ্ঞান – লৌকিক) জ্ঞান১

ডি পি আগরওয়াল, লোকবিজ্ঞান কেন্দ্র, আলমোড়া
জানি মারতে উঠবেন। যদি বলি কলম্বাস এবং ভাস্কোদাগামা দক্ষ নাবিক ছিল না। সে সময় ইওরোপিয়রা মূলত সমুদ্র চিনত মানচিত্র এবং চার্ট নির্ভর ডেড রেকনিং প্রযুক্তি নির্ভর করে। ফলে তারা অজানা অচেনা সমুদ্রে পথ খুঁজে পেত না। এই প্রহেলিকার মধ্যে আদতে লুকিয়ে আছে ইওরোপিয়দের অঙ্ক না জানার গপ্পটা। ইওরোপে সময় মাপন – সে পঞ্জিকাতেই হোক বা ঘড়িতেই হোক ষোড়শ শতকে এক্কেবারেই ইনএকিউরেট ছিল। এটা রাষ্ট্র এবং চার্চ উভয়ের কাছে খুব এমবারাসিং অবস্থা। সে তুলনায় উপমহাদেশ সে সময় অনেকটাই এগিয়েছিল। ইওরোপে সে সময় সব থেকে ধনীতম অঞ্চল ছিল মুসলমান শাসন অবসান হওয়া স্পেন আর পর্তুগাল। তারা সম্পদ সংরহে বিশ্বের কারখানা চিন আর ভারতের সঙ্গে ব্যবসা করতে উঠেপড়ে লাগল। সে সময়ে গরীবি হঠানোর একমাত্র রাস্তা ছিল উপমহাদেশ এবং চিনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য – কিন্তু সেটাও চরমতম বিপসসঙ্কুল কাজ। সে সময় ভারতের দিকে যাত্রা করা প্রত্যেকটা সফল সমুদ্র অভিযানে এক তৃতীয়াংশ বণিক পথেই প্রাণ হারাত। প্রাকৃতিক কারণে বা জলদস্যু, প্রাইভেটিয়ার্স ইত্যাদির হামলার জন্যে প্রচুর জাহাজ ডুবে যেত, লুঠ হত – এর আরেক অর্থ জাহাজে ব্যবসার জন্যে নিয়ে আসা পণ্যের সলিল সমাধি অথবা তার বিনিময়ে অর্থ না পাওয়া। ফলে ইওরোপিয়রা বাণিজ্য পথ এবং ইওরোপ এশিয়ার যাত্রাপথ সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিতে থাকে। এর একটা হাতিয়ার হল এশিয় অঙ্কের জ্ঞান আহরণ করা, এবং সেই জ্ঞান সম্বল করে ইওরোপিয় প্রাথমিক স্বচ্ছলতার দিকে যাত্রার পথ নির্নয়।
হ্যাঁ কলম্বাস বা ভাস্কো হয়ত দক্ষ নাবিক ছিল না, কিন্তু তারা ভয়ডরহীন অভিযাত্রী ছিল। এদের কেউই ভারত আরব বা চৈনিকদের মত মহাকাশ নির্ভর নৌবিদ্যা জানত না। তারা শুনেছিল আরবি নাবিকেরা এই ধরণের জ্ঞান অর্জন করেছিল, কিন্তু তারা বুঝতে পারে নি।
অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ নির্ভর করে কলম্বাস যাত্রা শুরু করে কিউবার পৌঁছবার চেষ্টা করে পৌঁছলেন কেপ কডেএ। ভুল কলম্বাস বোঝনি শুধু নয় বরাবরই দাবি করেছে সে তার গন্তব্যে পৌঁছেছেন। এর থেকে প্রমান হয় কলম্বাসের জ্ঞানহীনতা। এরপরেও যত কটা সে চেষ্টা করেছে, সব ভুল দিক নির্দেশ করে ভুল যায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।
একইভাবে ভাস্কো ভারতীয় মুসলমান নাবিক মালামো কানার দিক নির্দেশিকা না পেলে তাকে চিরতরে আফ্রিকার মেলিন্দে উপকূলেই ঘুরতে হত। মালামো সদ্মুদ্রের অক্ষাংশ মাপার জন্যে কমল নামে একটি খুব সাধারণ দেখতে – একটা কাঠের চাকতির সঙ্গে গিঁটলাগা একটা দড়ি জোড়া একটা যন্ত্র ব্যবহার করত যার নাম কমল বা রূপলাগি। The local latitude is almost the same as the altitude of the pole star, or its angular elevation above the horizon. To determine the altitude of the pole star, the wooden board is held in front of the eye, at an appropriate distance, so that it blocks the portion between the horizon and the pole star, and the distance from the eye is measured. Holding the string between the teeth, and counting the number of knots, one measures the distance. In the Arabic-Malayalam language, the pole star is hence called kau, which also means 'teeth'. Vasco da Gama, not understanding the principle of the instrument, thought the pilot was telling the distance with his teeth! He further recorded that he carried back a couple of copies of the instrument to get it graduated in inches! (The instrument involves a harmonic scale, whereas inches refer to a linear scale, so that graduating it in inches is intrinsically impossible.)

Sunday, August 26, 2018

আবহমান

বাংলার কারিগরদের আমি দেখিয়াছি, তাই আমি ভদ্রবিত্তের রূপ
খুঁজিতে যাই না আর; আজও জেগে থাকে পলাশীর বিশ্বাসঘাতক
অভিজাত মুখ; রিক্ত বাংলায় তাকিয়ে থাকে সিরাজের অতৃপ্ত
হৃদয় ভোরের দোয়েলের ডাকে; জেগে দেখি ৭৬এর বাঙ্গালির লাশ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশ্বত্থের তলে হয়ে আছে স্তুপ
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে নবজাগরিত ডেপুটিদের ছায়া পড়ে;
মধুকর ডিঙা চিরস্থায়ী ডুবেছে সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে;
এমনই হিজল-বট-তমালের অতীত সোনা-বাংলার অপরূপ রূপ
দেখেছিল; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে
দেখেছিল থালা হাতে ৪৯এর মা ফ্যান চায়; সোনালি ধানের পাশে
অশ্বত্থ বট দেখেছিল, অসংখ্য বেওয়ারিশ লাশ; তবুও আউল বাউল
খন জারি সারির গান আজও তারা পালে পোষে উত্তুঙ্গ হৃদয়ে;
আগ্রাসী কর্পোরেট - রিক্ত নিঃস্ব ছোটলোকেরা কোমর বাঁধে গ্রাম গঞ্জে
বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল অগণন কালের মতো পাশে থাকে তার।

Saturday, August 25, 2018

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - গ্রান্ট মিল মেকলের উপমহাদেশ - ঔপনিবেশিক ভদ্রলোক বনাম ছোটলোকেদের লড়াই

সে সময়টা পলাশীর একশ বছর হতে যাচ্ছে; তার ঠিক ১১০ দশ বছর আগে ফকির-সন্ন্যাসীরা শুরু করেছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই এবং ১৮৫৫ সালে সিদী-কানহো-চাঁদের নেতৃত্বে সাঁওতালেরা একশ বছর ধরে চলা অনির্বান লড়ায়ের মশাল বয়ে কোমর বেঁধে দামিনিকোহ মুক্তির জন্যে অবহেলে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছেন...
সে সময়টা গ্রান্ট মিল মেকলে - তিন উচ্চপদস্থ চাকুরের উপমহাদেশের অতীত পড়ে কলকাতার ভাগ্যবান উদারমনারা বড় হচ্ছেন, বিদ্যাসাগরএর মত মানুষ বড় হয়ে পড়ছেন - আর সাম্রাজ্যের ভিত্তপ্রস্তর আরও গভীরে পোঁতার জন্যে "কেবা আগে প্রাণ করিবেক দান"এর জন্যে ধুম লেগেছে লেগেছে হৃদকমলে। বিদ্যাসাগর মিলএর দর্শন পড়ানোর নিদান দিচ্ছেন...
আজও নবজাগরণ অবশ্যপুজ্য, গাঁইয়া লড়াইকে বাঁহাতে পুজো দিয়ে...


Except a few Brahmins, who consider the concealment of their learning as part of their religion, the people are totally
misled as to the system and phenomena of Nature: and their errors in this branch of science, upon which divers
important conclusions rest, may be more easily demonstrated to them, than the absurdity and falsehood of their
mythological legendsInvention seems wholly torpid among them. No acquisition in natural philosophy would so
effectively enlighten the mass of the people, as the introduction of the principles of Mechanics. Every branch of
natural philosophy might in time be introduced and diffused among the Hindoos. The communication of our light and
knowledge to them, would prove the best remedy for their disorders; and this remedy is proposed, from a full
conviction, that if judiciously and patiently applied, it would have great and happy effects upon them, effects
honourable and advantageous for us.
Charles Grant

The Surya Sidhanta is the great repository of the astronomical knowledge of the Hindus. This book is itself the most
satisfactory of all proofs of the low state of the science among the Hindus, and the rudeness of the people from whom
it proceeds. The observatory at Benares, the great seat of Hindu astronomy and learning, was found to be rude in
structure, and the instruments with which it was provided of the coarsest contrivance and construction. Exactly in
proportion as Utility is the object of every pursuit, may we regard a nation as civilized. According to this rule, the
astronomical and mathematical sciences afford conclusive evidence against the Hindus. They have been cultivated
exclusively for the purposes of astrology; one of the most irrational of all imaginable pursuits; one of those which
most infallibly denote a nation barbarous; and one of those which it is most sure to renounce, in proportion as
knowledge and civilization are attained.
James Mill, 1826

The question now before us is simply whether, when it is in our power to teach this language, we shall teach
languages in which, by universal confession, there are no books on any subject which deserve to be compared to our
own, whether, when we can teach European science we shall teach systems which, by universal confession, wherever
they differ from those of Europe differ for the worse, and whether, when we can patronize sound philosophy and true
history, we shall countenance, at the public expense, medical doctrines which would disgrace an English farrier,
astronomy which would move laughter in girls at an English boarding school
Thomas Babington Macaulay, 1835

উপনিবেশ চিরোধী চর্চা - ঔপনিবেশিকপুর্ব বুদ্ধিজীবি - ঔপনিবেশিক জ্ঞানভাণ্ডারের বিকাশ২

(বিতর্ক - উপনিবেশপূর্ব জ্ঞান সরবরাহকেরা কি সক্রিয় না অক্রিয়। এবারে আমাদেরর মত - সাম্রাজ্য তৈরির কোন পক্ষতেই ছিলাম না। পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ, কোন সাহায্যতেই ছিলাম না। বরং আমরা সাম্রাজ্য উচ্ছেদের রাজনীতি করে গিয়েছি। পলাশীর পাঁচ বছর পর থেকে ফকির-সন্ন্যাসীরা যে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইএর সূচনা করে গিয়েছেন সে লড়াই ক্রমশ আগুণের গোলার মত ছড়িয়ে পড়েছে। সে লড়াই আজও শেষ হয় নি।)
---
দ্বিতীয় স্তরের বৌদ্ধিকদের মতবাদ অনেকটা উত্তরঔপনিবেশিক সংশোধনবাদী প্রতিক্রিয়া থেকেই জন্ম। ইউজিন ইরশ্চিক, সি এ বেইনি, টমান ট্রাউটম্যান, উইলিয়াম পিঞ্চ, রিচার্ড ঈটন, নর্বার্ট পিবয়, মহইম্মদ তাভাকলি-তারঘি এর আগের গবেষকদের উত্তরঔপনিবেশিক অবস্থান থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছেন। যদিও দুই শিবিরই মনে করে জ্ঞানই ক্ষমতা এবং ঔপনিবেশিক জ্ঞান উপনিবেশের ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করেছে, কিন্তু এই দ্বিতীয় দল পূর্বের দলের মত করে মনে করেনা ঔপনিবেশিক মধ্যস্থরা শুধুই নিস্ক্রিয় থেকেছেন, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরিতে যে জ্ঞানচর্চার পরিবেশের প্রয়োজন হয়, সে পরিবেশ বিকাশে এই মধ্যস্থদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল – এ নিয়ে তারা বেশ কিছু উদাহরণও পেশ করেছেন। উত্তরঔপনিবেশিকেরা দেখিয়েছেন এই মধ্যস্থরা শুধুই তথ্য সরবরাহক ছিলেন, তার বেশি কিছুই নয় – এ নিয়ে কোহন দেখিয়েছেন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র পাঞ্জাবিদের সিপাহি হ্যাঙ্গাম উত্তর সময়ে সেনাবাহিনীতে পাগড়ি পড়াবার ব্যবস্থা করেছে – এবং পাঞ্জাবিরা সেই প্রথা নতমস্তকে মেনে নিয়েছে।
কিন্তু দ্বিতীয় শিবিরের গবেষকদের অবস্থান হল এই মধ্যস্থরা কিন্তু শুধুই তথ্যসরবরাহক ছিল না সক্রিয় জ্ঞানকর্মী ছিল, তারা তাদের নিজস্ব জ্ঞানচর্চা নিয়ে উপনিবেশের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরির কাজে যোগ দেন। পিবয়, অর্জুন আপ্পাদুরাইয়ের কাজ উল্লেখ করে বলেন ইওরোপিয়রা ভারতে জাত ভিত্তিক আদমসুমারি চালু করেছিল। পিবয় দেখান ঔপনিবেশিক ইওরোপিয়দের হাতে জাতিবাদী সুমারি শুরু হয় নি, এর উদাহরণ তার আগেই রয়েছে ১৬৫৮ এবং ১৬৬৪ সালে Munhata Nainsiniর একাউন্ট অব দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব দ্য মারোয়াড়এ। তিনি দেখান উপনিবেশের প্রথম দিকের আধিকারিকেরা জাতিভিত্তিক সুমারি করতে খুব একটা ইচ্ছুক ছিলেন না। বরং তিনি দেখান উপনিবেশপূর্ব সময়ে এই ধরণের কাজের অভিজ্ঞতা থাকা আধিকারিকদের কাজের সূত্রে তারা এই বিষয়টা আত্মস্থ করেন। তিনি বলছেন এই জ্ঞানচর্চায় কাজ করছে উপনিবেশপূর্ব কাজের জ্ঞান, এবং সেটাকে উপনিবেশের জ্ঞানচর্চার ওপরে চাপিয়ে দিচ্ছেন দেশিয় কর্মীরা। ফলে এখানে মধ্যস্থরা শুধু তথ্য সরবরাহকই থাকছেন না, তারা ঘটক হয়ে উঠছেন।
এ বিষয়ে কপিল রাজ একটা বই লিখেছেন Relocating Modern Science_ Circulation and the Construction of Knowledge in South Asia and Europe, 1650-1900। তার অনেকগুলি অধ্যায় নিয়ে আমরা এর আগে আলোচনা করেছি বিশেষ করে রেনেলের উপমহাদেশজুড়ে মানচিত্র তৈরির যে কাজ হয় তাতে মোগল যুগের মানচিত্র তৈরির জ্ঞানকে ব্যবহার করেছিলেন।তিনিও যুক্তি দিয়েছেন দেশিয় কোলাবরেটররা সক্রিয়ভাবে জ্ঞানচর্চা বিকাশে অংশ নিয়েছিলেন।

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - ঔপনিবেশিকপুর্ব বুদ্ধিজীবি - ঔপনিবেশিক জ্ঞানভাণ্ডারের বিকাশ১

(বিতর্ক - উপনিবেশপূর্ব জ্ঞান সরবরাহকেরা কি সক্রিয় না অক্রিয়। আমাদেরর মত শেষ পর্বে)
সম্প্রতি ওয়েলেসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ বি ওয়াগানার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলির জ্ঞানভাণ্ডারের চরিত্রটি কি, এবং সেটি বিকাশের কার কত যোগদান তাই নিয়ে সুন্দর একটি প্রবন্ধ তৈরি করেছেন(প্রিকলোনিয়াল ইন্টালেকচুয়ালস এন্ড দ্য প্রোডাকশন অব কলোনিয়াল নলেজ)। তিনি বলছেন, যে উপনিবেশ তৈরি হল বিশ্বাসঘাতকতা, লুঠ গণহত্যা অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে, সেই উপনিবেশ চালাতে যে জ্ঞানভাণ্ডার তৈরি/বিকাশ ঘটল, অর্থাত সাম্রাজ্যবাদীরা যে উপনিবেশ তৈরি করল, তাতে কি উপনিবেশপুর্ব সাবজেক্টরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, নাকি তাদের অংশগ্রহণ ছিল না, মোটামুটি উপনিবেশিক শাসকেরা যা ঠিক করে দিয়েছিলেন তাই হয়েছে।
এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করেব কয়েক পর্বে। বলা দরকার এটা আমাদের ভাষ্য নয়। আমরা দেখব এই অংশগ্রন বিষয়ের বিতর্কে দুটি পক্ষ আছে। আমরা এই দুপক্ষের মতবাদ তুলে দেব। বলা দরকার আমরা কোন পক্ষই নই। আমাদের বক্তব্য শেষ পর্বে থাকবে। মোটামুটি তিনটে পর্বে এটা সমাধা হবে বলে ধারণা হচ্ছে।
এক পক্ষের ভাবনা উপনিবেশ তৈরির জন্যে যে জ্ঞানভাণ্ডার প্রয়োজন ছিল, সেই জ্ঞানভাণ্ডারের বিকাশে উপনিবেশের মানুষদের অংশগ্রহণ প্রায় ছিলই না, খুব বেশি হলে তাদের নিস্ক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল, তারা বড়জোর এই কাজে মধ্যস্থ হিসেবে কাজ করেছে। তারা সাম্রাজ্যকে তাদের কাছে থাকা যে তথ্যভাণ্ডার ছিল সেগুলি সরবরাহ করেছে। সেই তথ্য নিয়ে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সাগরপারের প্রযুক্তি/পদ্ধতি ব্যবহার, ব্যবস্থাপনা করে সাম্রাজ্য চালানোর নানা রেণু তৈরি করেছে। উল্টোদিকে আরেক গবেষক দলের বক্তব্য ব্যাপারটা মোটেই তাই নয় উপনিবেশের বুদ্ধিজীবিরা শুধুই ইনফরট্যান্ট হিসেবেই কাজ করে নি, তারা সক্রিয়ভাবে সাম্রাজ্য তৈরি করার কাজে জটিল উপায়ে অংশগ্রহণ করেছে এবং সাম্রাজ্য তৈরির কাজে তাদের জ্ঞান সক্রিয়ভাবে কাজে লেগেছে। যদিও এই বিতর্কটা শুরু হয়েছিল ভারতের ঔপনিবেশিক সময় আলোচনায় কিন্তু ক্রমে এটি সাধারণ বিশ্বজোড়া উপনিবেশের জ্ঞানচর্চা বিষয়ক আলোচনায় রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রথম মতবাদের পক্ষে মধ্যে প্রখ্যাতরা হলেন এডওয়ার্ড সঈদ, রোনাল্ড ইন্ডেন, বার্নার্ড কোহন, নিকোলাস ড্রিকস, গৌরী বিশ্বনাথন, টমাস মেটকাফ ইত্যাদি। এঁদের প্রচুর গবেষণা করে শেষমেশ গ্রামশি আর ফুকো নির্দেশিত পথে এসে পড়েন এবং বলেন ইওরোপিয় সাম্রাজ্য স্থাপন শুধু উন্নত সেনাবাহিনী, উন্নত রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিকশিত আর্থিক ক্ষমতার জোরে হয় নি, এর সঙ্গেও যোগ হয়েছিল জ্ঞানের ক্ষমতার জোরটুকুও – ড্রিকস যাকে বলছেন কালচারাল টেকনলজিস অব রুল। এই গবেষকেরা দেখাচ্ছেন কিভাবে গোটা ঔপনিবেশিক জ্ঞানএর চরিত্র – প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা – যেমন দৈনন্দিন কর্মের আদমসুমারি থেকে ইতিহাস বা জাতিতত্ত্ব বিষয়ের মত মৌলিক জিজ্ঞাসা শুধু অব্জেক্টিভ বাস্তবতা বিকাশেরর জন্যে ছিল না বরং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে ছিল। তারা বলছেন এই ঔপনিবেশিক জ্ঞানের সঙ্গে সাম্রাজ্যের বিজয় মিলেজুলে, পরস্পরের সঙ্গে দেওয়া নেওয়া করে যে নতুন জ্ঞান তৈরি হল, সেই জ্ঞান ব্যবহার করে উপনিবেশের ভিত্তিভূমি তৈরি হয়। সেই ভিত্তিটিকে আরও জোরদার করার জন্যে আরও জ্ঞান বিকাশের প্রয়োজন অনুভূত হল, এবং এর ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতা জোরদার হল। যদিও এই ঔপনিবনেশিক জ্ঞান উপনিবেশেই বিকাশ ঘটেছে, কিন্তু এটা শুধুই আর উপনিবেশের জ্ঞান হয়েই থাকল না – বরং এটি সাগরপার থেকে চলে আসা প্রিডিফাইনড ইওরোপিয় জ্ঞান হিসেবেই চিহ্নিত হল, কোহনের যাকে বলছেন ইনভেস্টিগেটিভ মোডালিটিজ – যেখানে পাতি সামাজিক এবং কৃষ্টিগত তথ্য সরবরাহকারক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ঔপনিবেশিক সমাজ। অন্য ভাষায় বলতে গেলে উপনিবেশ তৈরি করা ইওরোপিয় সমাজ, ঔপনিবেশিক নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিজীবিদের ব্যবহার করেই ঔপনিবেশিক জ্ঞান তৈরি করছে। ড্রিকস আর কোহন বলছেন, উপনিবেশের সাব্জেক্টসরা ইতিমধ্যে তাদের অধিকার হারিয়ে ফেলেছে শুধু নয়, দেশিয় জ্ঞানকে ঔপনিবেশিকরা তুচ্ছ জ্ঞান করে তাকে পিছনের সারিতে সরিয়ে দিয়ে, সেই ফাঁকা যায়গায় আমদানিকরা ইওরোপিয় জ্ঞান হিংসকভাবে সবলে ঢুকিয়ে দ্যায়। একে এরা বলছেন জ্ঞানচর্চাগত হিংসা, যা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র উপনিবেশের ওপর চাপিয়ে দ্যায়। এর আরেকটা সিদ্ধান্ত হল উপনিবেশ তার সাবজেক্টসদের তার শেকড়ে ফরতে বাধা দ্যায়, সব ধরণের দেশিয় জ্ঞান, কৃষ্টি প্রথার সমূলে উচ্ছেদ চালায়।
(চলবে)

Friday, August 24, 2018

হস্তলেখাবিদ

হস্তলেখাবিদ হলেন সেই সব করণিক যাঁরা কলমের মোচড়ে লেখায় শিল্প ফুটিয়ে টোলার কাজে আত্মনিয়োগ করতেন। তারা শুধু যে পুথি নকল করতেন তাই নয়, তারা সেই পুথির লেখাটার সৌন্দর্যকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলার কাজে তাদের অর্জিত দক্ষতাকে নিবেদন করতেন।
হস্তিলেখবিদের প্রাথমিক কাজ লেখার সৌন্দর্যবর্ধন। ইসলামি যুগে হস্তলেখার বিপুল বৈচিত্র উদ্ভাবন হতে থাকে। এবং সমাজের সর্বস্তরে এই শিল্পকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া হত।
১২০৩ খ্রির এক প্রখ্যাত হস্তিলেখবিদের নাম তাকত মুস্তাসামি এবং নকশ লেখক হিসেবে তাঁর বিপুল সম্মান ছিল। ১৩২৪ সালে তিনি আভেন্নার শাফা নকল করে মহম্মদ তুঘলককে পাঠান। রাজা ব্যাপক খুশি হয়ে তাঁকে ২০০ মিলিয়ন মিসকুয়াল মূল্যের সোনা পাঠান। হস্তিলেখবিদ এই দান তুচ্ছ মনে করে ফিরিয়ে দ্যান।
প্রখ্যাত হস্তলেখাবিদ খালিলুল্লা সাহ নউ-রসের একটি নকল দাক্ষিনাত্যের আদিলশাহকে পাঠান। এই কাজে তিনি এতই মুগ্ধ হন যে তিনি শুধু তাকে কলমের রাজা উপাধি দ্যান তাই নয়, তার সিংহাসন শিল্পীর বসার জন্যে কিছু সময়ের জন্যে ছেড়ে দ্যান।
নানান মুসলমান দেশের মতই ভারতে হস্তরেখাশিল্প যথোচিতভাবে বিস্তারলাভ করে। তবে তার আগের সময়ের কিছু নিদর্শন সময়ের ভ্রুকুটি সয়েও থেকে গিয়েছে।
হস্তলেখাশিল্প মুঘল সময়ে শৈল্পিক দক্ষতার চূড়ান্ত শীর্ষে ওঠে। উপমহাদেশ সে সময় বিপুল পরিমান দক্ষ ও যোগ্য হস্তলেখাবিদ তৈরি করেছিল যাদের কাজ আজও বিশ্বজুড়ে নানান জাদুঘর গ্রন্থাগার এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহে শোভা পাচ্ছে।
দক্ষ এবং যোগ্য হস্তলেখাবিদ তাদের দক্ষতা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানিত হতেন। তাদের যে সব উপাধি দেওয়া হয়েছে, সেগুলির মধ্যে ছিল জারিন-রাকম(সোনার লেখক), শিরিন-রাকম(মিষ্টি লেখক), রৌশন-রাকম(উজ্জ্বল লেখক) মুসকিন-রাকম(সুগন্ধিত লেখক)।
শাহজাহানকে যে সব হস্তলেখাবিদ নানান ধরণের উপহার দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি ঈয়াক-সুতি (শতজীবি) উপাধি দিয়েছেন।
হস্তলেখার উচ্চাঙ্গের শিল্প হিসেবে যখন সমাদৃত হচ্ছে সে সময় বহু অনামী এবং ছাত্র প্রখ্যাত শিক্ষকদের নাম ধার করে লেখা তৈরি করতেন। জইনুদ্দিনের মোসলেমএর ক্যালিগ্রাফি বইতে আমরা পাচ্ছি, মুল্লা মীর আলির নামে বহু নকল তৈরি করেছিলেন মৌলানা খ্বাজা মুহম্মদ। তার ছাত্র সম্বন্ধে, ছাত্রদের কাছে লিখিতভাবে মীর আলি অভিযোগ করছেন, কিছু সময়ের জন্য খ্বাজা মুহম্মদ আমার ছাত্র ছিল, যতক্ষণ না তার হাতের লেখা একটা স্তরে বিকাশ লাভ করছে। আমি তার বিরুদ্ধে যাই নি, সেও আমার কোন ক্ষতি করে নি, কিন্তু সে প্রচুর ভাল খারাপ লেখালিখি করে আমার নামে স্বাক্ষর করে।
হস্তলেখাবিদ যারা তাদের কাজ চরম দক্ষতায় তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন, তারা তাদের দক্ষতা সম্পর্কে প্রভূতভাবে সচেতন ছিলেন। তার জন্যে তাঁরা জানও দিতে প্রস্তুত থাকতেন। জাহাঙ্গীরের প্রাণের হস্তরেখাবিদ মুল্লা মীর আলি লিখছেন - আমার কলম চমতকার সৃষ্টি করে, এবং সে শিল্প শব্দের মানের থেকেও অতিরিক্ত স্তরে উঠে যায়। আমার অক্ষরের বাঁক শেখানো আদে স্বর্গীয় দাসত্ব স্বীকার করে নেওয়া, এবং প্রত্যেক রেখার মূল্য অসীমের দ্যোতক।

মুঘল আমলের শেষের দিকে সাধারণ শিল্পকলা উৎসাহিত করা হতে থাকে। বাহাদুর শাহ নিজে শিল্পকলার অনুগামী ছিলেন, এবং দাক্ষিনাত্যের সুলতানেরা যে ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন তা হায়দারাবাদের নিজাম বহুকাল পর্যন্ত বহন করে এনেছেন। 

নকলনবিশ

উপমহাদেশে ছাপাখানা আসার আগে পুঁথি নকল করা বহু মানুষের জীবিকা ছিল। সব থেকে পুরোনো যে সাহিত্যে নকলনবিশদের নাম পাওইয়া যায় সেটা হল জাতক, লেখক নাম সেখানে উল্লিখিত হয়েছে। অর্থশাস্ত্রেও একই নাম পাচ্ছি। তারপরে অশোকের ১৪তম শিলালেখতে লিপিকার বা লিবিকার নাম পাচ্ছি। সিদ্দপুর লেখতে লেখ লেখক নিজেকে লিপিকার বলছেন। সাঁচী শিলালিপিতে দেখছি রাজলিপিকার পদ। এই পদটা পাণিনিতেও পাচ্ছি(৪খ্রীপূ)।
ফারসি দেবির অর্থাৎ লেখক পশ্চিমভারত আত্তীকৃত করে। বহু ৭-৮ শতকের পহলবি লেখতে দিবীরা বা দিবীরাপতি শব্দটা পাচ্ছি।
হিউএনসাং কাশ্মীরে গেলে সেখানকার রাজা ২০জন লিপিকার নিযুক্ত করেছিলেন, তার থেকে জ্ঞানার্জন করে পুঁথি তৈরি করতে। কাশ্মীরে লেখকদের দিবীরা নাম ১১ শতকের রাজতরঙ্গিনীতে পাচ্ছি আর ১২ শতকে ক্ষেমেন্দ্র লোকপ্রকাশে দিবীরাকে কয়েকটিভাগে ভাগ করেন গঞ্জ দিবীরা, গ্রাম দিবীরা, নগর দীবিরা, খাসা দিবীরা ইত্যাদি।
৮শতে উত্তর এবং পূর্ব ভারতে লেখকেরা কায়স্থ নামে পরিচিত হলেন। যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে এই শব্দটা প্রথম পাচ্ছি। লেখকদের অন্যান্য নামগুলিও করণ, করণিকা, করনিন, সাসনিকা এবং ধর্মলেখিন মাঝে মধ্যে ব্যবহৃত হত।
সমাজে কায়স্থরা বেশ ভাল সম্মান অর্জন করতেন। চান্দেলা লেখতে বুঝতে পারি ১১ শতে তারা বেশ গুরুত্বপুর্ণ পদ হয়ে উঠছেন। এই সময়ে চান্দেলা দেশে তারা কিরকম শক্তি হয়ে উঠছে তা নিচের লেখাতেই বোঝা যাবে – মোট ৩৫টা শহর; সত্যি বলতে কি লেখক জাতিরা সেই শহরগুলিতে বাস করেন(করণ-কর্ম-নিবসপুত) (এবং) তারা(অন্যান্য শহরেও) বেশ স্বচ্ছলভাবে বাস করে। তাদের মধ্যে প্রখ্যাততম হলেন তক্ষরিক, যিনি অন্যদের কাছে ঈর্ষার পাত্র... (এবং) শহরগুলির (ছাত্রদের) ভিড়েতে বেদের শ্লোকের উচ্চারণ শোনা যায়, ...যে সব কায়স্থ বাস্তব্য পরিবারে জন্মেছেন তাদের সৌরভ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, অন্ধকার দূর করছে।
গুজরাটের জৈন শ্রীসিদ্ধরাজা ছাত্রদের মধ্যে ১ লক্ষ ২৫ হাজার সিদ্ধহেম ব্যাকরণ বিতরণ করার জন্যে ৩০০ লিপিকার নিয়োগ করেছিলেন। প্রভাকর চরিত্র এবং কুমারপাল-প্রবন্ধে ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে গরীব ছাত্রদের বিনামূল্যে পুস্তক সরবরাহের।
তুর্কি-আফগান সুলতান এবং অভিজাতরাও জ্ঞান, বিদ্যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে সময় বিপুল পরিমান পুথি লিখত, নকল এবং অনুদিত হয়েছে। তারা বিপুল পরিমান লেখক নিযুক্ত করতেন এবং বহু সময় দাসেদের শিক্ষিত করিয়ে রোমা্নদের মত নকলনবিশের কাজে নিযুক্ত করতেন।
বিপুল পরিমান কাগজের ব্যবহারের জন্যে মুঘল রাষ্ট্র কাগজনির্ভর রাষ্ট্র নামে পরিচিত ছিল। এই যুগে বিপুল পরিমান নকলনবিশ, করণিক এবং খবর লেখক বা ওয়াকিয়া নবিশ নিযুক্ত হন। কারকুনদের মাসে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হত।
প্রত্যেক গ্রামের গ্রাম প্রধান পাতিলের সঙ্গে একজন করে করণিক দেওয়া হত। এদের নাম কুলকার্ণি বা গ্রাম-লেখক। তাদের সম্মান পাতিলদের পরেই। গ্রামের রাজস্ব দিয়েই তাদের বেতন হত। এছাড়াও তেল থেকে কালি পর্যন্ত নানান দৈনন্দিনের দ্রব্য গ্রামীনেরা তাদের দিয়ে সাহায্য করতেন।
আসামের রাজারা তাদের প্রাসাদে গ্রন্থাগার রাখতেন। রাজার প্রধান গ্রন্থাগারের প্রধানের নাম হল গান্ধিন বড়ূয়া। সরকারির হিসেবে তার ব্যাপক সামাজিক সম্মান। তার পরের আধিকারিকের নাম হল লিক্ষকর বড়ুয়া – তিনি বিশাল সংখ্যক লেখক, করণিকের ব্যবস্থাপনা করতেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি ছাপাখানা আসার আগে রাইটার বা করণিক নিযুক্ত করত। বাংলা, মাদ্রাজ এবং বম্বের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শুধু আর্থিক লেনদেনের কাজগের পরিমান ছিল ১৩০০ বিশাল খণ্ড – এই কাজে বিপুল সংখ্যক দেশিয় করণিক নিযুক্ত হত। 

গ্রন্থাগার কর্মী

১০৫৮খ্রির নাগাই লেখ আমাদের চালুক্য সময়ের গ্রন্থাগার কর্মীদের পদমর্যাদা এবং তাদের বেতন সম্বন্ধে জানতে সাহায্য করে। এই লেখতে নাগাই অঞ্চলের একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে কিভাবে জমির উদ্বৃত্তে শিক্ষকদের এবং গ্রন্থাগারিকদের বেতন কাঠামো হবে সেই তথ্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, শিক্ষক এবং গ্রন্থাগারিক উভয়েই একই সম্মান পেতেন, যে বেতন শিক্ষকদের দেওয়া হত সেই পরিমান বেতন গ্রন্থাগারিকেরা পেতেন।
সুলতানি আমলে রাজারা তার নিজের বাড়িতেই একটা আলাদা গ্রন্থাগার বা কিতাব খানা রাখতেন, যে সচিবের অধীনে তা থাকত তার পদের নাম ছিল কিতাবদার।
খলজি বংশের সুলতান জালালুদ্দিন জ্ঞানচর্চার উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক হিসেবে প্রখ্যাত কবি আমির খুসরুকে নিযুক্ত করেন। সে সময় গ্রন্থাগারিকের বিপুল সম্মান ছিল। তাই আমীর খুসরুকে গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিযুক্ত করতে গিয়ে তিনি তাঁকে তার দরবারের রত্ন ঘোষিত করে তার সম্মান বৃদ্ধি করেন।
মুঘল আমলে নিজাম ছিলেন গ্রন্থাগারের সর্বোচ্চ পদাধিকারী। মুল্লা পীর মুহম্মদ এবং শেখ ফৈজী পরপর আকবরের রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হয়েছিলেন। জাহাঙ্গিরের সময় তাঁর দরবারের প্রখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ অভিজাত মুক্তব খানও গ্রন্থাগারিক নিযুক্ত হন।
তবে দিনে দিনে গ্রন্থাগারের আকার কাজকর্মের বহর বাড়তে থাকায় মুঘল এবং মুঘল পরবর্তী সময়ে গ্রন্থাগারের নানান ধরণের উপযোগী কর্মী/পদাধিকারী নিযুক্ত হতে শুরু করেন। পদগুলি নিচে বর্ণিত হল –
১) কিতাবখানার প্রধান দায়িত্বে যে সচিব ছিলেন তার পদের নাম ছিল নিজাম। আজকের দিনের বড় রাষ্ট্রপোষিত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁকে অবশ্যই বিদ্বান এবং উপযুক্ত প্রশাসকও হতে হবে।
২) তাঁর অধীনে ছিলেন দারোগা – প্রশাসনিক এবং প্রযুক্তিগত বিভাগ দেখার জন্যে। তার দায়িত্ব ছিল বই নির্বাচন, শ্রেণীবিন্যাস এবং খরিদ।
৩) সাহাফ এবং ওয়ারাক দারোগার নির্দেশে কাজ করতেন। তাদের কাজ ছিল গ্রাহককে বই দেওয়া এবং বইটি পেলে সেটিকে ঠিক জায়গায় আবার রাখা।
৪) পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, দেখাশোনা, পরিমার্জনকরার কাজ করতেন মুসাহিহ। পুঁথি পোকায় কাটিলে সেটিকে পূর্বাবস্থায় ফেরত দেওয়ার দায় ছিল এই পদাধিকারী ব্যক্তির। তিনি অবশ্যই একাধারে বিদ্বান এবং প্রযুক্তিবিদ। না হলে তার পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পুঁথিটিকে সঠিকভাবে মেরামত করা অসম্ভব হত। খানখানানের কিতাবখানায় মৌলানা সুফিী এই পদ অলঙ্কৃত করতেন।
৫) অনুবাদক।
৬) কাতিব বা সাধারণ নকলনবিশ যিনি দুর্লভ পুঁথি নকল করতেন।
৭) খুশনবিশ বা হস্তলিপিবিদ।
8) কাতিব আর খুশনসিবের কাজ নিরীক্ষণ করতেন মুকাবিলানবিশ। তিনি নকল পুঁথি মুল পুঁথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেন।
৯) বইবাঁধাইকার
১০) চিত্রশিল্পী
১১) কাগজের প্রান্তে নানান রকমের কাজ করার জন্যে দক্ষ কারিগরের পদের নাম ছিল জিদওয়াল সাজ
১২) করণিকের কাজ ছিল হিসাব করা ও মোট বইএর হিসাব রাখা

১৩) ধুলা ও অন্যান্য কিছু পরিষ্কারের জন্যে ছিল ভৃত্য। 

Thursday, August 23, 2018

কিতাবিফিয়ালটিব্বঅলমনসুরিতে পাঞ্জার ছাপ মুঘল আমলের গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

কিতাবিফিয়ালটিব্বঅলমনসুরি (Book on Medicine Dedicated to al-Mansur) পাণ্ডুলিপিটির একটি সংস্করণ বর্তমানে আছে আমেরিকার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের জিম্মায়। পাণ্ডুলিপিটির রচয়িতা মুহম্মদ জাকারিয়া অল রাজি(মৃ ৯২৫)। বইটিতে অল রাজি চিকিৎসা, খাদ্য, স্বাস্থ্যবিধি, শারীরবিদ্যা, দেহতত্ত্ব, সাধারণ রোগবিদ্যা এবং প্রায়োগিক শল্যচিকিৎসা বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এই বইটি ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দে আবার নকল করা হয়।
এই নকলটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে বেশকিছু চিত্রাঙ্কন ব্যবহৃত হয়েছে যার সঙ্গে বইটির মুল ভাবের কোন সাযুজ্য নেই। কারণ জানা নেই। কিন্তু অনেকের ধারণা বইটির দাম বাড়াতে এই চিত্রগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল। এই জন্যে বইতে কিছু শুদ্ধ কবিতাও ঢুকে পড়ে। যদিও এই বিষয় বর্তমানে আমাদের আলোচ্য নয়।
আমাদের কাছে বইটি আকর্ষণীয় তার ঐতিহাসিক মূল্যে - কিতাবিফিয়ালটিব্বঅলমনসুরির দুই মলাটে যে সব পাঞ্জার ছাপ্পা দেখা যায়, তা দিয়ে বইটির হাত বদলের ইতিহাস আমরা বুঝতে পারি, আমরা বুঝতে পারি কোন কোন পদাধিকারী গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় থকতেন। এই দুই মলাটে যে বারোটি পাঞ্জা পড়েছে, তাতে সর্বশক্তিমান ইয়া করিম থেকে শুরু করে শাহজাহানের সময় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগারিক-অভিজাত ইনায়েত খানের অলহজজ্ব ১০৬৮/১৬৫৭ খ্রির পর্যন্ত অনেকের ছাপ আছে। বইটির পাঞ্জার লেখাটি মুঘল দরবারের ভাষা ফারসিতে একটু বাঁকা অক্ষরের টানে লিখিত, যা দিয়ে বইটির মুল লেখার সঙ্গে আলাদা করা চলে। অলহজজ্ব ১০০২/১৫৯৪খ্রিতে কিতাবঘর পরিদর্শক মুহম্মদ হোসেইনের পাঞ্জার ছাপ আছে। এছাড়াও নাজিম, দারোগা ইত্যাদির নাম তারিখ সহ পাঞ্জার ছাপ বইটিতে রয়েছে।
ঠিক এই সময়ের গ্রন্থাগ্রিকেরা যেভাবে বই হাতবদলের সময় নথিকরণ/ভুক্ত করেন, ঠিক সেইভাবেই মুঘল আমলেও কাজ হত। একটি সাধারণ লব্জ ব্যবহৃত হত vared arz shud বা (বইটি) গ্রন্থাগারে ঢুকল। এই লব্জের সঙ্গে পুথি গ্রহণের তারিখ, যে পদাধিকারী এই হাত বদলের কাজ করছেন তাঁর নাম লিখিত হত। tahwil বা ঠিক আছে লব্জের পড়ার অর্থ বইটি অবস্থা দেখে পরিদর্শক সন্তুষ্ট হয়েছেন – এখানে আবার গ্রন্থাগারিকের নাম এবং তারিখ উল্লিখিত হত। মুঘল আমলে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার যে সব পদাধিকারীর স্তর আমরা এর আগে আলোচনা করেছি, শাহজাহানের সময় কিন্তু সেই স্তরের একটা ছাপ দেখতে পাচ্ছি এই টিব্ব বইটির আলোচনায়।
শাহজাহাননামা সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি রাষ্ট্রের গ্রন্থাগারের সার্বিক দায়িত্ব(darugha-yi kitabkhana) পেয়েছিলেন ইনায়েত খান আলহজ্জ্ব ১০৬৮/১৬৫৭খ্রি। এই বইতে তার পাঞ্জাওয়ালা স্বাক্ষর রয়েছে। ইনায়েত খানের অর্থ সর্বশক্তিমানের স্নেহপ্রাপ্ত। এই উপাধিটি দেওয়া হয় মুঘল দরবারের অন্যতম উচ্চপদস্থ(sahib mansab) অভিজাত মির্জা মহম্মদ তাহির আশেনাকে(মৃ ১৬৭০)। তাঁর পিতা জাফর খান আশান কাবুল আর কাশ্মীরের প্রশাসক(wali) ছিলেন। তাঁর মা বুজুর্গ খানুম, শাহজাহানের স্ত্রী মুমতাজ মহলের বোন।
ইনায়েত খান আবদুল হামিদ লাহোরির রচনা এবং অন্যান্য ইতিহাস অবলম্বনে কিতাবইমুলখাস্তাভারিখশাহজাহান (Extracts from the History of Shah Jahan) রচনা করেন। ইনায়েত খানের পাঞ্জারছাপ্পা যে তারিখে পড়েছে, তাতে পরিষ্কার, তার পদ গ্রহণের পরে পরেই এই বইটি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকেছে। ঠিক তার বারো মাস পরে ১৬৫৮ খ্রি আওরঙ্গজেব ক্ষমতায় আরোহন করলে ইনায়েত খান কাশ্মীরে একাকী জীবন কাটাতে চলে যান।

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘল মহাফেজখানা

বাগদাদ এবং কায়রোর ঐতিহ্য মাথায় রেখে মুঘল সাম্রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি তথ্যাদি সংরক্ষণ করার সুচারু ব্যবস্থা করেছিল। মুঘল সরকারকে বর্ণনা করতে গেলে একে বলতে হবে কাগজি রাজ, কেননা এই সরকার চালাতে বিপুল পরিমান কাগজ লাগত(যদিও রুশি ঐতিহাসিকেরা সে সময়ের সব কটি রাষ্ট্রের মত মুঘল সাম্রাজ্যকেও সামরিক রাষ্ট্র হিসেবে দাগিয়ে দ্যান, এবং সেই দাগানো আজও বর্তমান। যদুনাথ সরকার সরকারের সামরিক চরিত্র নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু আমরা লেখক বিমল দত্তের মত মনে করি মুঘল সাম্রাজ্যের চরিত্র ছিল লেখ্য সাম্রাজ্য। একটি কাগজের/তথ্যের বিপুল পরিমান নকল তৈরি হত বিভিন্ন দপ্তরে সংরক্ষণ করে রাখার জন্যে - অনুবাদক)।
মুঘল সাম্রাজ্য জুড়ে প্রচুর খবর লেখক এবং করণিক নিযুক্ত ছিল, যারা প্রত্যেক সারকারি তথ্যের এবং নির্দেশনামার প্রচুর নকল বানাতেন। গোটা সাম্রাজ্যে কত পরিমান তথ্য লেখক ছিলেন এই পরিমানটা আন্দাজ করা যাবে, যদি সাম্রাজ্যের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা আকবরের দরবারের তথ্য লেখক সচিবদের হিসেব নিই, দরবারে শুধু ছিল ১৪ জন সংবাদ লেখক। আবুল ফজল এবং ডি জারির দেওয়া তথ্য, সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করে।
সংবাদ লেখক বা ওয়াকিয়ানবিশের দায়িত্ব সম্বন্ধে আবুল ফজল লিখছেন, তাদের দায় ছিল পাদশাহের কর্মকাণ্ড এবং নির্দেশাবলী আর দপ্তরের পরিচালকদের প্রত্যেকটি প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করা। ডি জারি আমাদেরর জানাচ্ছেন, রাজার... সঙ্গে বেশ কয়েকজন সচিব থাকতেন তার বলা প্রত্যেকটি শব্দ তারা লিখে নিতেন। আওরঙ্গজেবকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংবাদ লেখক এবং সচিবদের পাঠানো সাপ্তাহিক প্রতিবেদন প্রতিদিন রাত নটায় একজন মহিলা কর্মচারী পড়ে শুনিয়ে সারা রাষ্ট্র যা ঘটছে সে বিষয়ে তিনি অবগত রাখতেন। ভেনিসের মানুচি বলছেন ঔরঙ্গজেব পারস্যে যে একটি দৌত্য দল পাঠিয়েছিলেন, সেই দলে একজন ওয়াকিয়ানিবিশ আর একজন খুফিয়ানবিশ ছিল।
মুঘল মহাফেজখানায় যে সব ধরণের রাষ্ট্রীয় তথ্য জমা রাখত, সেগুলি হল
১) দরবারের ওয়াকিয়া বা দৈনিক প্রতিবেদন,
২) রাজকীয় নির্দেশ বা আহকম
৩) সরকারি চিঠিপত্র, রাজপরিপবারের সদস্যদের পাঠানো চিঠি, অভিজাত/প্রখ্যাতদের নিজেদের মধ্যে এবং সম্রাটকে সম্বোধন করে লেখা চিঠি, গুরুত্বপূর্ণ সচিবদের চিঠিপত্র এবং রাষ্ট্রজুড়ে পাঠানো নির্দেশাবলী বা ফতেহানামা তুমহার
৪) বিভিন্ন দপ্তর থেকে বিভিন্ন দপ্তরের জন্যে জারি করা সরকারি নির্দেশাবলী
৫)নানান ধরণের তথ্যাবলী যেমন ইচ্ছাপত্র বা ওয়াসিয়তনামা, সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসেব, সরকারি বাৎসরিক পঞ্জী, সরকারি প্রতিবেদন(নিউজ লেটার্স)
৬) আদালতের কাজকরররমের বর্ননা এবং মুন্সিদের লেখা চিঠি
উল্লিখিত তথ্য এবং নথিগুলি মূলত কেন্দ্রিয় সরকার এবং সুবাগুলির সদরে রাখা হত। সাম্রাজ্যের মুল চ্যানসারি বা দপ্তরখানার দায়িত্বে থাকতেন তথ্যের দায়িত্বে থাকা একজন দারোগা। সুবার দপ্তরখানার দায়িত্বে থাকতেন প্রধানমন্ত্রী বা দেওয়ান।
মুঘল সাম্রাজ্য তার প্রতিবেশি রাজ্যগুলির নানান দ্গরণেরে তথ্যাদি দপ্তরখানায় জমিয়ে রাখত। আকবরের সময় আগ্রয়ার মহাফেজখানায় পারস্যের শাহ তামসের ফারমান অথবা তারিখহীন শাহজাহানী ফরমান বিজাপুর বা গোলকুণ্ডার সুলতানকে পাঠানো হায়দ্রাবাদের বাগানগরের মহাফেজখানায় পাওয়া যাওয়া এই তত্ত্বকে প্রমান করে।
ফতেপুর সিক্রির যে বাড়িটি মহাফেজখানা হিসেবে ব্যবহার হত সেটি আজও আছে এটি একটি বড় সাড়ে আটচল্লিশ ফুট লম্বা এবং সাড়ে আঠাশ ফুট বন্ধ বারান্দাওয়ালা সামনের কক্ষ। আকবর পাদশার শোয়ার ঘরের দক্ষিণ দিকেরে ভিতে করা হয়েছিল।

উইলিয়ান ফিঞ্চ(১৬১১), জোনস ডি ল্যাক্ট(১৫৯৩-১৬৪৯) বা সেবেস্টিয়ান মনরকে(১৬৪০)মত বহু ইওরোপিয় মুসাফির আগরার দপ্তরখানা ভ্রমণ করেছেন। আওরঙ্গজেব বা বাহাদুর শাহের সময় দিল্লি দুর্গেও একই ধরণের মহাফেজখানার বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা করা হত। 

উপনিবেশ বিরোধী চর্চা - কানহাইয়াকুমারের হিন্দি - এক আধ-ওডিয়া-ভাষীর ব্যক্তিগত অনুভব - ভাষার প্রমিত-হিংসা রাজনীতির গল্প

এটা শুধু কঠোরতম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, চলতি প্রমিত ভাষা রাজনীতির চোখে না দেখতে পাওয়া হিংসার গল্প। কলকাতা, লক্ষনৌ, দিল্লির প্রমিত হিন্দি, ইংরেজি এবং বাংলাভাষী ভদ্রলোকেরা নিজেদের রাজনীতি আর মনস্তত্বের ভেতরে ঝুঁকে দেখুন। তারপরে কানহাইয়ার হিন্দি ভাষা নিয়ে সমালোচনা করবেন।
আমি আর আজ বাম রাজনীতি করিনা, কানহাইহা কি বলেন, না বলেন তার সত্য-মিথ্যে জানি না, বুঝি না। কানহাইয়ার হিন্দি বলাটা অনেকটা বুঝতে পারি। আজ কেন কানহাইয়া অঞ্জিকায় বলছে না, সেটা যাঁরা এই লেখার পাঠক, যারা প্রাথমিকভাবে প্রমিতভাষী, তাদের পক্ষে বোঝা মুশকিল।
এটাই আমাদের প্রমিতভাষার ঔপনিবেশিক হিংসার রাজনীতি, হিন্দি আর ইংরেজির চালনোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। যে সব মোটামুটি স্বচ্ছল ভদ্রবিত্ত বা তাদের সঙ্গের জুড়ে থাকা উন্নয়নশীল গ্রামীণ তার অঞ্চল ছেড়ে শহরে আসেন, প্রায় বাধ্য করা হয় সামাজিক ভাবে তার নিজের বোলি, উচ্চারণ ভুলে প্রমিত ভাষা গ্রহণের। আমি তার চলন্ত উদাহরণ।
---
আমি প্রাথমিকভাবে উপকূল মেদিনীপুরের মানুষ। জন্ম সেখানেই। বাবা-মা উভয়েই মেদিনীপুরী। প্রথম যৌবনে বাম রাজনীতির টানে বাবা কলকাতাবাসী। মা বিয়ের পরে। বাবা বড়িশা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মা নুরপুরের সুন্দরিকা গ্রামের মেয়েদের বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষিকা। আমি থাকতাম মাদারমনি যেতে চাউলখোলার পাশের গ্রাম দক্ষিণ শীতলায় মামাবাড়িতে স্বাধীনতা সংগ্রামী দিদার দ্যাখাশোনায়।
তো আমি ছোটবেলা থেকেই কিছুটা মায়ের কাছে, কিছুটা দক্ষিণ শীতলায় দিদিমার কাছে পড়াশোনা করেছি। স্বচ্ছন্দে বাংলা মেশানো ওডিয়া টানেই কথা বলতাম। আমার সঙ্গে সক্কলেই বাংলাই বলত। আমি আমার লব্জটাকেই বাংলা বলে জানতাম। তখনও বোধ হয় নি ওটা প্রমিত বাংলা নয়।
পঞ্চম শ্রেণীতে আমায় কলকাতায় চলে আসতে হল - মা বদলি হয়ে বড়িশা উচ্চ বিদ্যালয়ে এলেন। ৭৭এর পরে মামা-বাবা কলকাতায় যেহেতু দুজনে একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন - এবং তখন আমাদের বিস্তৃত পরিবার - কাকা, জ্যাঠা ইত্যাদি ইত্যাদি - প্রায় ২০ জনের কাছাকাছি রোজ পাত পড়ে, আমিও থাকতে শুরু করলাম। তখনও আমার বাংলায় মেদিনীপুরী টান যথেষ্ট। মা আজও গড়গড়িয়ে মেদিনীপুরী বলেন।
মা-বাবা দুজনেই সিপিয়াই - সবে বামফ্রন্ট এসেছে - সিপিয়আই তখনও বামফ্রন্টে নেই - বিতর্ক শুরু হয়েছে বামফ্রন্টে যোগ দেওয়া হবে কি না। বাবা ছিলেন সক্রিয় কর্মী - ট্রাম কোম্পানির নেতা মহম্মদ ইসমাইলের নির্বাচনী এজেন্ট - ৭৭এর নির্বাচনে বহুদিন একটা সাদা এম্বাস্যাডার বাবার জন্য বরাদ্দ ছিল - আমরা চোখ ফেড়ে ফেড়ে দেখতাম বাবা অতি-সক্কালবেলা বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন আর মাঝরাতে ফিরতেন। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সাধারণ রুটিন ছিল বাবার এটা - শুধু গাড়িটা থাকত না। ৭৭এ নির্বাচনে সময় আমার পক্স, হাম টাইফয়েড পরপর তিন মাসে হল, একাহাতে ক্লাস করতে করতে মা আর জেঠু সামলালেন। তারপর আসতে আসতে জ্যাঠা, কাকারা চাকরি আর কাজে পুনর্বাসিত হয়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন। আমরা কয়েক বছরের মধ্যেই নিউক্লিয়ার পরিবার। আমি আর মা-বাব।
তো আমাদেরর বাড়িতে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা, গানের আসর, কবিতার আসর বসত - মারিচ সংবাদের সিয়া-সিয়া বাবার এক বন্ধু গাইতেন, জগন্নাথ তো তাঁর মুখস্থই ছিল প্রায়। বড়িশা বিদ্যালয়েরই শিক্ষক প্রাক্তন নকশাল নেতা আদিত্য মিত্র আর ব্রজসুন্দর দাসের নেতৃত্বে কলনায়ক নাটকের দল চলত - বাঘ নাটক চলছে - মেদিনীপুরী লব্জ ব্রজস্যর মার থেকে জেনে নিচ্ছেন। গানের স্কোয়াড ছিল - স্বাভাবিক ভাবে আমিও সদস্য ছিলাম। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম সব কিছুর প্রতিবাদেই অংশ নিচ্ছি, মিছিলে যাচ্ছি লাল পতাকা হাতে, নিয়মিত গান বা নাটকে অংশগ্রহণ করতাম কিন্তু কিন্তু ভাষার জন্য আমায় স্টেজে একা কিছুই করতে দিতেন না। পাঁচ শ্রেণীতে ঠিক নয় আট-নয় শ্রেণীতে, আমি তখন বেশ সচেতন, আমার মা-বাবা দুজনের বিদ্যালয়েররর শিক্ষক, শ্রেণীর বন্ধুরা আমায় মেদিনীপুর, কন্টাই ডাকত। এর অনেক আগে, মা যে গ্রামে শিক্ষিকা ছিলেন, কলাতলা হাটের এক কম্পাউন্ডার মায়ের শিক্ষিকা বন্ধুর বাবা, পালান জেঠু বলতেন উড়ে যায় মাটিতে পা। মন খারা হত - অন্য কাউকে এরকম কেন বলেন না তাঁরা? ইডেন গার্ডেনে বিশাল যুব উৎসব হল আমি দর্শক। একমাত্র পাটনায় এন্টিফ্যাসিস্ট কনফারেন্সে আমার অতীত না জানা অজিত পাণ্ডে আমায় স্টেজে উঠিয়েছিলেন।
সিপিয়াইএর কমরেডরা প্রমিত বাংলা বলতেন। আমাদের বাড়ি ছিল কমরেডদের ঘাঁটি। গ্রাম থেকে প্রচুর কমরেড আসতেন - থাকতেন - তারা কলকাতার প্রমিত কমরেডদের হাতে পরোক্ষে বেশ হ্যাটা হতেন, ভাষা, হাঁটা চলা, কাপড়চোপড়ের জন্যে - আজ বুঝি।এক এক জনের কথা হয়ত চেষ্টা করে মনেও করতে পারি। আমার ওডিয়া টান মা-বাবাকে বলতেন শুধরে দিতে। ওঁরা যেহেতু সক্রিয় রাজনীতি করতেন, আমায় খুব একটা সময় দিতে পারতেন না - আমি তো একা থাকতাম। অস্বস্তিতে পড়তেন। আমার বাংলার শুদ্ধতা আসতই না।
বাবার পরের প্রজন্মের এক দাদা, আমার ওডিয়া লব্জ শোধনএর দায় নিলেন। আমি অত ছোট বলে হয়ত তাদের সামগ্রিক আক্রমণের পাত্র হই নি।
সেই কয়েক বছরের মধ্যে দাদার 'যত্নে' আমার ওডিয়া লব্জ গেল, আর ফিরে আসে নি।
শুধু লব্জ গেল না, গ্রামে থাকার সময় মামার সঙ্গে শীতলামঙ্গলের দলে ঘুরেছি, বাসন্তী পুজোয় অংশ নিয়েছি, গ্রামে দেওয়া আমাদের জমিতে বার্ষিক পুজোয় দিদিমার সঙ্গে সঙ্গে ফল কেটেছি, মামার দলের শ্মশান মসান চোখ ফেড়ে দেখেছি, হরির লুঠে বাতাসা কুড়িয়েছি, বিড়ি খেয়ে ধরাপড়ে মার খেয়েছি, দিদার সঙ্গে সুর করে রামায়ন পড়েছি - সে সব গাঁইয়ামি পিছিয়েপড়ামি জলাঞ্জলি গেল রবীন্দ্রসঙ্গীত, গ্রুপ থিয়েটার, শহুরে সাহিত্য আর ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ারের প্রমিততার প্রাবল্যে।
সেগুলোর অনেক কিছুই হয়ত অনেক পরে ফিরে এসেছে আমার জীবনে বহু সংগ্রামী চেষ্টায়। বাম দল করা ছাড়তে হয়েছে, শহুরে জীবনযাত্রা বন্ধুবান্ধব ছাড়তে হয়েছে, যা যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছিলাম সব ভুলতে হয়েছে, গাঁইয়াদের পায়ের কাছে বসতে হয়েছে, হকার, কারিগর দল করতে হয়েছে। কিন্তু ভাষাকে আর ফেরত পাইনি আজও।
এই প্রমিত হিংসার রাজনীতি আধউড়ে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি; কানহাইয়াদের দিল্লিতে বসে রাজনীতি করা আর তাদের মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার রাজনীতি বুঝি।
আমার মত গাঁইয়াদের প্রমিত রাজনীতি শেখাতে আসবেন না।
বলে রেখে দিলাম।

লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া - বিমল কুমার দত্ত - মুঘলযুগে গ্রন্থাগার৯

(ছবি - ১৭০২ সালে আওরঙ্গজেবের তৃতীয় উইলিয়ামকে লেখা চিঠি)
এই যুগে আগরা আর দিল্লিতে জেস্বুঈটরা গ্রন্থাগার তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন ফাদারের লেখা বই এবং ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে প্রাচ্য ভাষার বই ছিল এই গ্রন্থাগারে। শাহজাহানের নির্দেশে প্রথমবার লুণ্ঠিত হয় আগরার গ্রন্থাগটি, দ্বিতীয়বার লুণ্ঠিত হয় আহমদ সাহ আবদালির সময় ১৭৫৯ সালে, বই ছাড়া সব কিছুই।
১৬৫০ সালে ফাদার হেনরি বুসি প্রথমবার দিল্লি যান। তার উদ্দেশ্য ছিল দরবারে খ্রিষ্ট মিশন নিয়ে দরবার করা। তার কাজ সম্পাদনের জন্যে তিনি যুবরাজ দারা এবং আরও কিছু অভিজাতর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সে সময় বেশ কিছু মুসলমান অভিজাত ইওরোপিয় ধর্মতত্ত্বের বই তাদের গ্রন্থাগারে রাখতেন। এক বড় গ্রন্থাগারওয়ালা শিক্ষিত মুসলমানের সঙ্গে ফাদার বুসি আলোচনা করেন। তিনি তার বাড়িতে দেখেন, সেই ব্যক্তি, কোন আরবি জ্ঞানীর মত খ্রিষ্ট ধর্ম বিষয়ে প্রচুর বই সংগ্রহ করেছিলেন।
১৬৫৬ সালে আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রের ভার নেন। তিনি অসাধারণ বিদ্বান বুদ্ধিমান ছিলেন, অসাধারণ লেখক ছিলেন, দক্ষ প্রশাসক ছিলেন অসাধারণ সেনানী ছিলেন আর ধর্মীয় রাজা ছিলেন। তিনি ইসলামি শিক্ষার পৃষ্ঠপোষণা করেন। বিভিন্ন বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র খোলেন, পুরোনো মাদ্রাসা সারান। তার প্রশাসকদের হিন্দু মন্দির এবং হিন্দু বিদ্যালয় ধ্বংস করতে আর হিন্দুদের ধর্ম পালনে বাধা দিতে প্ররোচিত করে নির্দেশ দ্যান(যদিও লেখকের এই তথ্যটি সম্বন্ধে উল্টো মত পোষণ করি, এখন অনেক ধারনাই পাল্টে যাচ্ছে। যদুনাথ সরকারের মত ঔরঙ্গজেব বিরোধী ঐতিহাসিকদের কাজে এই সম্পূর্ণ ভুল ধারণাটি জন্মেছে। লেখকের বই যখন প্রকাশ পাচ্ছে ১৯৬০ সালে, এই ধারনাটা তখন প্রবল ছিল - অনুবাদক)।
আওরঙ্গজেব গোঁড়া ধর্মান্ধ ছিলেন। রাত দুটোয় প্রার্থনার পর তিনি কোরাণ অনুবাদ করতেন, তার পর আরবি বিচারব্যস্থার বই বা নানান ধরণের প্রচারপত্র থেকে ইসলামি ধর্ম বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। তার শেষ ইচ্ছাপত্র থেকে পরিষ্কার এই কোরাণ নকলের কাজ বিক্রি করে তিনি ৩০৫ টাকা রেখে যান।
নিজে যেহেতু ধর্মান্ধ মুসলমান ছিলেন, তাই তিনি মুল্লা নিজামকে দিয়ে ফতাওয়াইআলমিগিরি সঙ্কলন করান। এছাড়াও হাদিস, ফিক ইত্যাদির তফসির বইও সংগ্রহ করেতেন। বিদরের মুহম্মদ গাওয়ানের গ্রন্থাগারটি রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে জুড়ে দিয়ে গ্রন্থাগারের আয়তন বাড়ান।
তার পূর্বজদের মতই আওরঙ্গজেব হস্তলেখাবিদদের রাজসভায় সাদরে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। যুবরাজ দারাশুকো বা পাদশাপুত্রী জেবউন্নিসাকে হস্তলেখায় বিশেষভাবে পারদর্শী করে তোলা হয় প্রখ্যাত রেখাবিদ আকা আবদুর রশিদ এবং স্বয়ং সম্রাট নিজে তালিম নেন রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক সৈয়দ আলি তবরেজির অধীনে।
রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের নিজাম ছিলেন মুহম্মদ সালেহ এবং মহম্মদ মনসুর এবং সঈদ আলিঅলহুসেইনি তার মুহতমিম ছিলেন। মহম্মদ মনসুরকে মকরমাত উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
সম্রাটের কন্যা জেবউন্নিসা বিদুষি কৃষ্টিশীল ছিলেন। তিনি নিজে কবি ছিলেন। তাঁর অনুরোধে ইমাম রাজির কবিতা তফসিরেকবীর ফারসিতে অনুবাদ করে নাম দেন জেবুততফসিরে। তিনি পাগলের মত বই সংগ্রহ করতেন। তাঁর নিজস্ব বিপুল বিশাল গ্রন্থাগারের নাম ছিল মাসিরিআলমগিরি এবং সেটি বিদ্বানেরা হামেশাই ব্যবহার করতেন।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কিছুটা চেষ্টা হয় কিন্তু তার সত্তর বছরের মধ্যে বিশ্বে ধনীতম উপমহাদেশটি লুন্ঠনের ক্ষেত্র এবং অজ্ঞান আর মৃত্যুর উপত্যকা হয়ে ওঠে।
।।আপাতত শেষ।।

আকবর এবং উপমহাদেশের শাসকদের বিশ্ববিক্ষা - আকবরের গ্রন্থাগারে ইওরোপিয় পুস্তকের খণ্ডিত তালিকা - আকবরের জেসুঈটদের ইওরোপিয় পুস্তক দান

উপমহাদেশিয় মুঘল ইত্যাদি শাসকদের বিশ্ববিক্ষা নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন ওঠে। মূলতঃ ইওরোমুখ্য আমাদের দিকে এই প্রশ্নগুলি ছুঁড়ে দ্যান। তাঁদের অবগতির জন্যে আকবর পাদশার গ্রন্থাগারের ইওরোপিয় বইএর তালিকা তুলে দেওয়া গেল। যে সব জেসুঈট তাঁকে অবাক করিয়ে দ্যাওয়ার জন্যে উত্তম ছাপা বই নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা যে তাঁরমত অশিক্ষিতর রাজার ইওরোপের ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদিতে জ্ঞান আর তার গ্রন্থাগার দেখে হুব্বা বনে গিয়েছিলেন এটা পরিষ্কার। না হলে তৃতীয় ভারত মিশনে আসা জেসুঈট ফাদারদের, আকবর তাঁর গ্রন্থাগার ঘুরিয়ে দেখিয়ে ইওরোপিয় বই নিতে বলতেন না বা ইয়োরোপীয় বেশ কিছু বই উপহারও দিতেন না।
তার প্রচুর ইওরোপিয় বইএর সংগ্রহ ছিল, সেটা তিনি তৃতীয় মিশনে আসা ফাদারদের ঘুরিয়ে দেখান ১৫৯৫ সালে। তাদের বলেন যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তারা সেই গ্রন্থাগার থেকে কয়েকটি বই নিতে পারেন। ফাদারেরা আকবরের গ্রন্থাগার থেকে রয়্যাল বাইবেল এবং তার নির্ঘন্টু, সেন্ট টমাস একুইনাসের সুমা এবং অন্যান্য বই, বিদ্বান লেখক ডোমিঙ্গো ডি সোটো এবং ফরসগলিওনের এস এন্টনিনো নানান বই, সিলভেস্টার পোপ(মৃ ১০০৩) এবং কার্ডিনাল ক্যাজনট্যান (১৪৭০-১৫৩৪)এর নানান বই, সেন্ট ফ্রান্সিসের ক্রনিকা, হিস্ট্রি অব পোপ, ল’জ অব পর্তুগাল, আলফান্সো আলবুকার্কের কমেন্টারিজ, জেরোম জেভিযার্সের আত্মীয় ব্রাজিলের মিশনারি নাভারের হুয়ান এসপিলেতা(মৃ ১৫৫৫)র বই, সেন্ট ইগনিসাসের এক্সারসিসিয়া স্পিরিচুয়ালিয়া, জেসুঈট ইমানুয়েল আলভারেজের (১৫২৬-১৫৮২) কন্সটিটিউসনস অব দ্য সোসাইটি এবং ল্যাটিন ব্যাকরণ এবং ইত্যাদি সংগ্রহ করেন।
সূত্রঃ বিমল কুমার দত্ত'র লাইব্রেরিজ এন্ড লাইব্রেরিয়ানশিপ ইন এনসিয়েন্ট এন্ড মেডিভ্যাল ইন্ডিয়া বই সূত্রে জ্ঞানচক্ষু উন্মোচন হল