Sunday, November 7, 2010

বাংলার ভুলে যাওয়া ইতিহাস – পোখন্না গ্রাম


উত্তর বাঁকুড়ার দামোদর সংলগ্ন এক গ্রাম পোখন্না। এক সময়ের বিশিষ্ট জনপদ পুষ্করণা বা পোখন্না অনেক প্রাচীণ জনপদেরমতই আজ তার অতীত গৌরব হারিয়েছে। শেকড়ে ফিরে যাওয়ার ব্রত নেওয়া স্থানীয় কিছু মানুষ আর কিছু উত্সর্গীকৃত মানুষ বা সংস্থা ছাড়া এ নিয়ে মাথাব্যাথা নেই প্রায় কারোরই। ৬৫-৬৬তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগের খননকার্যে এই এলাকার গিধুনিয়া, বাঁকাজোড়, ভরতপুর, বাঘডিহা, রামনাথপুর, শুশুনিয়া, কুশবন্যা, শিউলিবনা, শুয়াবসা, পারুল্যা, পাহাড়ঘাটা, ধানকেড়া, করকাটা, বাবলাডাঙা, নেটেল্যা, শিমুলবেড়া, হাপানিয়া, চাঁদড়া, বিন্দিসাসহ বেশকিছু গ্রামঘিরে বেশ পুরোনো মানব বসবাসের চিহ্ন পাওয়া যায়। এই সব গ্রমে বর্ষাফলক, হাতকুঠার, নানান হাতিয়ার, মসৃণ কুঠার, ছিদ্রযুক্ত ক্ষুদ্রকাকার চক্র পাওযাওয়ায় বাংলার ইতিহাসকে নতুনকরে লিখতে হয়। শুশুনিয়া সংলগ্ন প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকায় নানান বহুবিচিত্র অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যাওয়া। মানিকলাল সিংহ বা পরেশ দাশগুপ্ত মশাইএর অনুসারে আদি প্রত্নশ্মর আমলের ছোট বসতি শুরু হয়, তিন-চার লক্ষ বছর থেকে বাঁকুড়ার শুশুনিয়া, দ্বারকেশ্বর ও কুমারী নদীর এলাকায় তা বাড়তে শুরু করে মানব সমাজের পরিপূর্ণ বসতিতে রূপান্তরিত হয়।
প্রাগৈতিহিসিক শুশুনিয়ার প্রমাণ পাহাড়ের উত্তরদিকের গুহায় লিপিবদ্ধ শিলালিপি
পুষ্করণাধিপতে মহারাজ শ্রীসিঙ্ঘবর্মণঃ পুত্রস্য
মহারাজশ্রীচন্দ্রবর্ণণঃ কৃতিঃ
চক্রস্বামিণঃ দোসগ্রেণতিসৃষ্টঃ।
এই দুই লিপির কাল খ্রীষ্টীয় চতুর্থ দশক – গুপ্তযুগ প্রায় দেড় হাজার বছর আগের। লিপির হরফ ব্রাহ্মী কিন্তু ভাষা সংস্কৃত। এর সঙ্গে পাওয়া গিয়েছে একটি বিষ্ণুচক্রও।
আমাদের আলোচ্য পোখন্না শুশুনিয়ার প্রায় ৪০ কিমি দূরে অবস্থিত। এই গ্রামের ঐতিহাসিকতা সম্বন্ধে আমরা দ্বারস্থ হই রাখালদা, বন্দ্যোপাধ্যায়ের – বঙ্গদেশে বাঁকুড়া জেলার শুশুলিয়ার পর্বতগাত্রে চন্দ্রবর্মার যে শিলালিপি আছে, তাহা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, তাঁহার পিতার নাম সিংহবর্মা এবং তিনি চক্রস্বামী বা বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন।... মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মালবদেশে প্রাচীণ দশপুরের(বর্তমান মন্দশোর) ধ্বংসাহশেষের মধ্যে একটি শিলালিপি আবিষ্কার করিয়াছেন। তাহা হইতে অবগত হওয়া যায় যে, চন্দ্রবর্মার ভ্রাতার নাম নরবর্মা এবং তিনি ৪৬১ বিক্রমাব্দে(৪০৪-০৫ খ্রী.) জীবিত ছিলেন। এই সকন প্রণমানের এপর নির্ভর করিয়া শাস্ত্রী মহাশয় নির্ণয় করিয়াছেন যে, শুশুনিয়া পর্বতলিপির চন্দ্রবর্মা ও দিল্লির লৌহস্তম্ভ লিপির  চন্দ্র একই ব্যক্তি, এবং দশপুর বা মন্দশোরের শিলালিপির নরবর্মা তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা। চন্দ্রবর্মা সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় যাত্রা অব্যবহিত পূর্বে বঙ্গদেশ হইতে বহ্লীকদেশ পর্যন্ত সমগ্র আর্যাবর্ত জয় করিয়াছিলেন। এলাহাবাদের দুর্গমধ্যে অশোকের শিলাস্তম্ভে সমুদ্রগুপ্তের যে প্রশস্তি উত্কীর্ণ আছে, তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায় যে, সমুদ্রগুপ্ত চন্দ্রবর্মা নামে জনৈক আর্যাবর্তরাজকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন। সমুদ্রগুপ্তের প্রশস্তি ও শুশুনিয়া শিলীলিপির চন্দ্রবর্মা এবং দিল্লির স্তম্ভলিপির চন্দ্র যে অভিন্ন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।

শুশুনিয়ার পাথর শিল্প


বাঁকুড়ার ছাতনা থানার এক গ্রাম শুশুনিয়া। এখানেই রয়েছে ৪৪০ মিটার উঁচু শুশুনিয়া পাহাড় – এটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় তিন কিলোমিটার লম্বা। ১৯৬৫-৬৬তে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ খননকার্য করে এই এলাকার গিধুনিয়া, বাঁকাজোড়, ভরতপুর, বাঘডিহা, রামনাথপুর, শুশুনিয়া, কুশবন্যা, শিউলিবনা, শুয়াবসা, পারুল্যা, পাহাড়ঘাটা, ধানকেড়া, করকাটা, বাবলাডাঙা, নেটেল্যা, শিমুলবেড়া, হাপানিয়া, চাঁদড়া, বিন্দিসাসহ বেশকিছু গ্রামে। এই সব গ্রমে বর্ষাফলক, হাতকুঠার, নানান হাতিয়ার, মসৃণ কুঠার, ছিদ্রযুক্ত ক্ষুদ্রকাকার চক্র পাওয়া যায়। শুশুনিয়া সংলগ্ন প্রায় ৬০ বর্গমাইল এলাকায় নানান বহুবিচিত্র অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যাওয়া। মানিকলাল সিংহ বা পরেশ দাশগুপ্ত মশাইএর অনুসারে আদি প্রত্নশ্মর আমলের ছোট বসতি শুরু হয়, তিন-চার লক্ষ বছর থেকে বাঁকুড়ার শুশুনিয়া, দ্বারকেশ্বর ও কুমারী নদীর এলাকায় তা বাড়তে শুরু করে মানব সমাজের পরিপূর্ণ বসতিতে রূপান্তরিত হয়।
প্রাগৈতিহীসিক শুশুনিয়ার প্রমাণ পাহাড়ের উত্তরদিকের গুহায় লিপিবদ্ধ শিলালিপি
পুষ্করণাধিপতে মহারাজ শ্রীসিঙ্ঘবর্মণঃ পুত্রস্য
মহারাজশ্রীচন্দ্রবর্ণণঃ কৃতিঃ
চক্রস্বামিণঃ দোসগ্রেণতিসৃষ্টঃ।
এই দুই লিপির কাল খ্রীষ্টীয় চতুর্থ দশক – গুপ্তযুগ প্রায় দেড় হাজার বছর আগের। লিপির হরফ ব্রাহ্মী কিন্তু ভাষা সংস্কৃত। এর সঙ্গে পাওয়া গিয়েছে একটি বিষ্ণুচক্রও। পুষ্করণা বা আজকের পোখন্না নিয়ে বারান্তরের কোনও প্রবন্ধে আলোচনা করব। এটি কোনওভাবেই এই প্রবন্ধের আলোচ্য অংশ হতে পারে না।
কবেকার শুশুনিয়ার আজকের খ্যাতি পাথর শিল্পে। শুশুনিয়া, নামো শুশুনিয়া, ছাতাতলা, কামারপাড়া গ্রামগুলির প্রায় শতাধিক পরিবার এই ঐতিহ্যশালী পাথরের শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। এই শুশুনিয়ারই নরম সাদা পাথরে ছেনি, বাটালি, হাতুড়ি, উকো দিয়ে খোদাই করে তৈরি করেন নানান মায়াময় পাথুরে শিল্প।
আমরা অনেকেই হয়ত জানি অতীতে গ্রামীণ বাজারের ওপর ভর দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে টিকেছিল বাংলার লৌকিক শিল্প তার নিজস্ব গতিতেই। পুরোনো প্রজন্মের মানুষের মুখে শোনা, সে সময় তৈরি হত থালা, বাটি, জল খাওয়ার তৈজস(গ্লাস), প্রদীপ, চন্দনপিঁড়ি, রুটির চাকি, শিবলিঙ্গ। তালিকা থেকে পরিষ্কার এই কাজের শিল্পীদের প্রধান বাজার ছিল গ্রামের জীবনযাত্রা নির্বাহ করা মানুষজন। আজ অন্তঃত বিগত ৪০-৫০ বছরে বাজার পাল্টেছে, গ্রামের মানুষদের চাহিদা পাল্টেছে, জীবনযাত্রায় এসেছে শহুরে টান। তাই টান পড়েছে লৌকিক শিল্প ঘিরে বেঁচে থাকা মানুষজনের। তাঁরা হাজার হাজার বছর ধরে নানান রাষ্ট্রবিপ্লব দেখেছেন, দেছেছেন সহ্যকরেছেন নানান সামাজির-রাষ্ট্রীয় ঝড়ঝঞ্ঝা। তবুও শিল্পীর অদ্যম্য বিশ্বাস আর নিজের বাপ-দাদার শিল্পের প্রতি ভালবাসায় পড়ে থেকেছেন আরও নিবীড় শিল্পচর্চায়, আরও নতুন নতুন দ্রব্য উত্পাদনের লক্ষ্যে।
অদ্যম্য এই শিল্পীরা তাই চিরাচরিত বাজার হারানোর আশংকা থেকে বেরিয়ে আসতে তৈকর করছেন নতুন শহুরে বাজারের উপযোগী নানান শিল্পদ্রব্য – নানান দেবদেবীর মূর্তি, পশুপাখি, ফুল, ধূপদানি, নানান খ্যাতকীর্তির মূর্তি ও আরও হাজারো দ্রব্য। ভারতের বিভিন্ন মন্দিরের নানান শিল্পকীর্তিরও অসম্ভব নকলও তাঁরা তৈরি করছেন অসাধাণ শৈল্পিক দক্ষতায়। এশিয় এবং ভারতীয় শিল্পকৃতির ধারা পালন করে কোনও তৈরি ব্লু-প্রিন্ট আর প্রায় বিদ্যুত্ ছাড়াই কর্মকার, সিংহ, দত্ত পদবীযুক্ত শিল্পীরা যে শিল্প দ্রব্য তৈরি করেন তা এককথায় আসামান্য।

Friday, November 5, 2010

জলদেগে জলাইশোরী


পশ্চিম দিনাজপুরে জলদেগে জলাইশোরী নামে একটি আচার অনুষ্ঠান আজও প্রচলিত আছে। এটি আদতে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা গান আর কিছুটা নাচও। এই গান নাচে কেবল মেয়েরাই অংশগ্রহণ করেন। খরায় যখন এলাকার মাঠঘাট জ্বলে, মেঘের লেশমাত্র থাকেনা তখন গ্রামের মেয়েরা বিবস্ত্রা হয়েই একটি ঘট নিয়ে গ্রামজুড়ে প্রার্থনায় বের হন। কোনো একটি মেয়ের মাথায় থাকে ঘট তাই তার নাম হবে ঘটধরি। ঘটধরি কন্যার হাতে থাকবে পুরোনো একটি ছাতা আর তার সখির হাতে থাকবে একটি বড় ধামা। এই ধামায় থাকে নানান পুজো উপাচার। এই আচার-অনুষ্ঠানের পরিচালিকার কাছে থাকে সকলের পরিধেয় বস্ত্র। বিবস্ত্রা রমনীরা গান গাইতে গাইতে একের পর এক গৃহস্থের বাড়ি আঙিনাতে প্রবেশ করেন। এই গান চলাকালীন কোনো পুরুষের প্রবেশ নিষেধ – এবং চিরাচরিত ঐতিহ্যশালী সমাজের প্রত্যক সদস্যেরমতই এই সমাজের সদস্যরা এই সামাজিক বিধিনির্দেশ কড়ায়-গণ্ডায় মেনে চলেন। ঘট নামানো হলে চলে চাষের অভিনয়। তারপর ব্রতচারিনী আর গৃহস্থ রমনীরা সকলে মিলে গান গাইতে থাকেন – সঙ্গে চলে নাচও।
আইস মেঘা বইস কাছে
খাও বাটাং পান
তোমার জন্য বাটাং পান
সাজাইয়ে রাখিছি
বরসিয়া খাওরে
----
মোঘো ওদে নাগায় ভাইরে
মেঘে অন্ধকার
মেঘের ভিতি দেখি ভাইরে
হালি ছাড়ে হাল
জমীতে পানি নাইরে
কিসে বহিম হাল
বাসুয়া বলদিয়া বইছে হাল
ওমোর গসাই রে
তাহনে দুব্বা নোতা ওঠে
এপ পাট মই দুই পাট মই
তাহনে দুব্বা নোতা ওঠে।

জাগ গান


জাগ গান
উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় মদনকাম পুজোর সময় জাগ গান অনুষ্ঠিত হয়। রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকায় বসন্তকালে ব্যাপক ভাবে বাঁশ পুজো করা হত। এখনও এই পুজোর রেশ চলে আসছে। চৈত্র মাসের মদন চতুর্দশীর তিথিতে কামেরদেবতা মদনকামদেব পুজো হয়। এ উপলক্ষে লম্বা লম্বা বাঁশের মাথায় চামর বেঁধে বাঁশগুলোকে লাল শালু দিয়ে মুড়ে তুলসী তলায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। বাঁশ হাতে নিয়ে চলে নৃত্যগীত। কামকে জাগানোর জন্য বা কামসংক্রান্ত কথা বা অঙ্গভঙ্গীর প্রচলন আছে বলেই এই গানের নাম জাগ গান। গানে ঘট সৃজন, কামদেব সৃজন, প্রভৃতি বর্ণনা আছে। বহু পূর্বসূরী গবেষক এ ধরনের গানকে অশ্লীল, আশ্রাব্য ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেছেন - যারা এক কথায় বলা চলে ভিক্টোরিয় সংস্কৃতির প্রতিভূ – দেশজ সংস্কৃতির মূল বিষয় নিয়ে যাঁদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই।
জাগ গানের দুটি রূপ – পালা গান আর মাঙনের গান বা ছুট গান। কামদেবের গান ও বাঁশ পুজার গানকে জাগ গানের দুই অঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করা যায়। অনেকে বলেন পালাগানগুলির ছুটগান পরবর্তী কালে ভাওয়াইয়া-চটকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। মনেরাখতে হবে তথাকথিত কলকাত্তাই বা শিষ্ট বাংলার সঙ্গে এ অঞ্চলের কামরূপী ভাষার একটি মৌল প্রভেদ রয়েছে। যে সব বাগরীতি সাধুভাযায় মেলে, সে বাগরীতি কামরূপীতে পাওয়া যায়। এখানে একটি তাত্বিক কথা স্পষ্ট করে পরিষ্কার করা দরকার - কলাবতী মুদ্রা এখানে কামরূপী ভাযাকে কলকাতার পণ্ডিত সমাজে প্রচলিত একটি শব্দবন্ধ - বাংলার অন্যতম কামরূপী উপভাষা বলার প্রবণতা থেকে আলাদা করছে।
এই ভাযায় রচিত কামদেবের কয়েকটি গান – কামদেবের জন্মগীত, বাঁশ সৃজন ও পুজোর গান, কামদেব বন্দনা প্রভৃতি। বহুকাল আগে রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় যাদবেশ্বর তর্করত্নসহ কয়েকজন সংগ্রাহক জাগ গান প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধে রাধার শাক তোলা, কৃষ্ণের বঁড়শিতে মাছ ধরা, রাস, কুলটা রমনীক উপপতি বর্ণনা, কৃষ্ণের বংশী সৃজন প্রভৃতি প্রকাশ পায়। এগুলি লীলা ধেমালি নামে পরিচিত। মনেরাখতে হবে রংপুর সাহিত্য পরিষদ পত্রিকার সন্পাদক ছিলেন কোচবিহার জেলার রাজনৈতিক ও সামাজির ব্যক্তিত্ব ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা। এই মানুযটি রাজবংশী ক্ষত্রিয় মহামিলন আন্দেলনের পুরোধা, সেই তত্বের উদ্গাতা ছিলেন রতিরাম দাস। ১৭৮১-৮২তে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলা লুঠের সময়ে গুডল্যান্ড সাহেবের ইজারাদার দেবী সিংএর অত্যাচারের বর্ণনা পাওয়া যায় রতিরামের জাগ গানে। জমিদার শিবচন্দ্র আর জয়দুর্গা দেবীচৌধুরানীর প্রতিবাদ আন্দেলনও সেই সাহিত্যে ঠাঁই পায় –
শিবচন্দ্রের হুকুমেতে সব প্রজা খেপে।
হাজার হাজার প্রজা যায় এর ক্ষ্যাপে।।
নাঠি নিল খল্তি নিল নিল কাচি দাও।
আপত্য করিতে আর থাকিলনা কাও।।
ঘাড়েতে বাকুয়া নিল হালের জোয়াল।
জাঙলা বলিয়া সব চলিল কাঙাল।।
এবং সবশেষে -
খিড়কি দুয়ার দিয়া পালাইল দেবী সিং।

পশ্চিম রাঢ়ের জিহুড় দিন

পশ্চিম রাঢ় এলাকায় আশ্বিন সংক্রান্তিকে বলে জিহুড় দিন। 
এই দিনটিতে স্থানীয় মানুষেরা আতপ চালের গুঁড়ি জলে গুলে ছিটা দেন ধান্য ক্ষেত্রকে, গাঠপালাকে, আসবাবপত্রকে, রান্নাঘরের বাসনপত্রকে। আদতে তাঁদের জীবনযাত্রার পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান বন্ধুবান্ধবকে তাঁরা এদিন শৈল্পিকভাবে, মাথা নামিয়ে অনন্ত শ্রদ্ধারভাবে স্মরণ করেন। এর সঙ্গে গোলার ধান-চালকে জাগানো হয় বা প্রস্তুত করা হয়, খেতের আসন্ন ফসলকে আহ্বান ও অর্চনা করা হয়। বাড়িতে খামারে যে আরলনা দেওয়া হয়, সেই সাদা চালগুোঁড়োর আলপনার মাঝে থাকে ছোট্ট একটি লাল টিপ। সাদা আলপনার মাঝে যারা সেই লাল টিপের মাহাত্ম্য দেখেন নি, তাঁরা জীবনে অনেক কিছুই হারিয়েছেন। 
পশ্চিম রাঢ়ে আশ্বিন সংক্রান্তিকে বলে জিহুড় দিন। এই দিনে স্থানীয় মানুষেরা আতপ চালের গুঁড়ি জলে গুলে ছিটা দেন ধান্য ক্ষেত্রকে, গাঠপালাকে, আসবাবপত্রকে, রান্নাঘরের বাসনপত্রকে। আদতে তাঁদের জীবনযাত্রার পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানান বন্ধুবান্ধবকে তাঁরা এদিন শৈল্পিকভাবে, মাথা নামিয়ে অনন্ত শ্রদ্ধারভাবে স্মরণ করেন। এর সঙ্গে গোলার ধান-চালকে জাগানো হয় বা প্রস্তুত করা হয়, খেতের আসন্ন ফসলকে আহ্বান ও অর্চনা করা হয়। গান গেয়ে বাড়িতে খামার বাড়ির সঙ্গে নানান স্থানে আলপনা দেওয়া হয় – জাগো গো জাগো মা দেবি, জাগো লক্ষ্মীঠাকুরাণী, বন্দনা জানাই গো মা অর্চনা করি তোমায়, আবাহন জানাই তোমায় মা, আরতি করি গো তোমায়। অচলা হয়ে থাকো মা গো আলোকিত করে আমাদের ছোটো কুঁড়ে। জাগো গো জাগো মা দেবি, লক্ষ্মীঠাকুরাণী।
লক্ষ্মীকে আবাহন আর অলক্ষ্মীকে ঝেঁটিয়ে হেনস্থা করে বিদায় দিতে ভাঙা হাঁড়ি, পুরোনো ঝাঁটা, ভাঙা কুলো আর কেঁদ কাঠের লগুড় রাখা হয়। জিহুড় দিনে ২১ রকমের শাক-পাতা রান্না করে খাওয়ার বিধি সর্বজনমাণ্য – আজও এই পশ্চিমি ধারাকে মাথায় নিয়ে দেশজ চিকিত্সা ধারায় অবিশ্বাসের দিনেও গুরুজনেরা জানেন এই শাক-পাতার ঔষধিগুণ। ভারতীয় চিকিত্সা শাস্ত্রের হাত ধরে আর গ্রামীণ গৃহচিকিত্সার টোটকা বিধি ধরে মেনেই গ্রামীণেরা বেঁচে এসেছেন হাজার হাজার বছর। এটি এমন এক দিন যে দিন সমগ্র ভৌগোলিক সমাজ নতুন নতুন করে স্মরণ করেন চিরাচরিত নানান ঐতিহ্যবাহী আচার আচরণ আর বিধিগুলোকে। এই ২১টি শাক-পাতাগুলির নাম হল – ওল, কেঁউ, বেতো, সরিযা, কাল কাসুন্দে, নিম, জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, পলতা, শোলফা, গুলঞ্চ, ভাঁট পাতা শুশুনি, কলমি, কুদ্রুম(কুদ্রুং), কুলেখাড়া, থানকুনি, ব্রাহ্মী, কালমেঘ, বাসক।
সমগ্র সমাজের বিশ্বাস এই জিহুড়ের রাতে সার্পকূল গর্তে প্রবেশ করে মুদ নেয়, আবার তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে জৈষ্ঠের ১৩ তারিখে। জিহুড় দিনে আরও একটি কাজ করা হয়, মা মনসার প্রতি পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয় কোনো মানসার মন্দিরে নয়, নিজের বাড়ির তুলসি মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে। এদিন থেকে আর্থাত্ আশ্বিন সংক্রান্তি থেকে কার্তিক সংক্রান্তি পর্যন্ত পূর্বপুরুষের স্মরণে আকাশ প্রদীপ দেওয়া হয়। পুরুলিয়ায় বনাঞ্চল সে অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবিকার সংস্থান। সেদিন সমগ্র মানভূম এলাকায় বনদেবীর পুজো করে লাক্ষার চাষ শুরু হয়।
প্রবীণরা বলেন জিহুড়ের রাতে হালকা বৃষ্টিপাত হয় – এই বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় মুখে নিলে সৌভাগ্যলাভ সুনিশ্চিত। অনেক বিশ্বাসী মানুষ তাই বৃষ্টি পেতে সারারাত মাঠে অপেক্ষা করেন। সমাজের প্রবীণদের আরও বিশ্বাস জিহুড়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী গভীর রাতে তিনবার ডাক দেন – একে বলে জিহুড়ের ডাক – সেই ডাক শোমার জন্য বৃদ্ধবৃদ্ধারা সারারাত উত্কীর্ণ হয়ে থাকেন।

রাঢ়ের ডাক সংক্রান্তি


আশ্বিন সংক্রান্তি প্রায় সমগ্র রাঢ় বাংলায় সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার সময়। এর পোষাকি নাম ডাক সংক্রান্তি। আশ্বিনে মাঠে মাঠে সবুজ ধানের গাছে ফুলে ভরে ওঠে। এই অবস্থায় সম্পদের দেবীর আগমন বার্তা পোঁছে যায় চাষী গৃহস্থের কাছে। আদতে চাষ শুধুই এক জীবিকাই নয়, বিশ্বের মানুষের মুখে খাদ্যতুলে দেওয়ার কাজ করেন, ফাঁকা মাঠে জীবনের অনুষঙ্গ ফুটিয়ে তোলেন। সেই চাষী-গৃহস্থ-প্রধান শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে এক গাছি শর গাছ নিয়ে বিকেলে ধানখেতে ঈশান কোণে প্রথিত করেন। একইভাবে শরগাছ সারগাদাতেও প্রথিত করতে হয়। আতপচাল, নানান ফল, মিষ্টি আর তালের শাঁস এক সঙ্গে মেখে দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে হয়। এই নিবেদন আদতে ক্ষেতে যাতে ফসলের চারা ফলে ফুলে ভরে যায় সে উদ্দেশ্যে নীরব প্রার্থনা – ধান-ফুল-ফুল। শেষে এক ঘটি জল মাঠ থেকে নিয়ে এসে গৃহস্থের সবার মাথায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। অবশিষ্ট জল ঘরের চালে ছড়ানো হয়। মোয়োরা ছড়া কাটেন – লোকের মাঠ আলথাল, আমার মাঠে শুধুই চাল।

হাপুগান

বাঁকুড়া-বর্ধমান-বীরভূম জেলার হাপুগান একসময় গাইতেন বাজিকর, মাল, বাইতি, কাকমারা, বেদে, পটুয়া সম্প্রদায়। এ ধরনের প্রায় প্রত্যক সমাজ মূলতঃ ভ্রাম্যমান জীবনযাপন করতেন। দেশিয় রোগএর নানান দেশজ ওষুধের –স্থানীয় ভাষায় টোটকা(আজকের নিন্দিত অর্থে নয়) – খনি ছিলেন এঁরাই। এরাই গৃহস্থকে রোগ থেকে বাঁচবার নানান টোটকাও বলতেন নিজেদের গানে, উঠে আসত নানান সামাজিক রীতিনীতিও।
এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যখন এ্যালোপাথি জাঁকিয়ে বসেনি, যখন দৈত্যসম ওষুধ সংস্থাগুলোর স্বার্থই রোগীর স্বার্থের ওপরে ওঠেনি, ডাক্তারেরা লক্ষ লক্ষ কাঞ্চনমুদ্রা ব্যয় করে ডাক্তারি পড়ে রুগিমার ডক্তার হয়ে বহুজাতিক ওষুধ সংস্থার অদৃশ্য ক্যানভাসারের কাজে দামি গাড়ি বাড়ি হাঁকিয়ে বড়লোক হবার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেননি, যখন পূর্ব ভারতের গ্রামে গ্রামে নাথ কবিরাজেরাই চার-পাঁচ হাজার বছর ধরে দেশের মানুষের রোগ সারাবার মহত দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ছিলেন, সে সময়ই সেই কবিরাজকুলের সাহায্যে এগিয়ো আসতেন এই বাজিগরেরা – বিশেষ করে এই কাজে সেই সমাজের মেয়েদের ভূমিকা ছিল অগ্রণীর। হাপু গানের সঙ্গে নাচ দেখিয়ে তারা ঢুকে যেত অন্তরপুরে তাঁদের ওষুধের সামগ্রী নিয়ে। ওষুধের সঙ্গে থাকত নানান ধরনের বিক্রির জিনিসপত্র। যে নৌকো করে এঁরা দেশে দেশান্তরে ঘুরতেন তাকে বলাহত বেদে নৌকো।
বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাদেশের সঙ প্রসঙ্গে নামক পুস্তকে বেদে গানের নানান উদাহরণ পাওয়া যাবে। এই গানে তাল রাখতে ঘুঙুর, খঞ্জনি আর ডাবকি ব্যবহৃত হত। দ্রুত উচ্চারনের জন্য গানের আগে মুখে এক ধরনের শ্বাস নেওয়ার ধরণটাই হাপু গানের নিজস্ব ধারা। স্ত্রী আর ছোটছোট ছেলেমেয়েরা বগল বাজিয়ে হাত দিয়ে শরীরের নানান অঙ্গে আঘাত করে বিচিত্র শব্দ তুলে, নানান অঙ্গভঙ্গীকরে গান পরিবেশন করতেন। চিরকালেরমতই যদিও পশ্চিমি ঢংএ লোকসাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা হাপুকে মোটাদাগের, অশ্লীল বা অশ্রাব্যসব অভিধা দিয়েছেন, তবুও বলা যায় হাপুর তুলনা হাপুই – অশিক্ষিত-অমার্জিত জনগণই দেশের সংস্কৃতির হকদার, রক্ষাকর্তা। যে সব মানুষ এধরনের সংস্কৃতিকে মোটাদাগের, অশ্লীল বা অশ্রাব্য রূপে গালি পাড়ছেন পেড়েছেন, তারাই নিজের দেশের সম্পদের প্রতি অশ্রদ্ধাজ্ঞাপণ করছেন – এ কথা বলার আজ সময় হয়ে এসছে, একথা আজ কম্বুকণ্ঠে বলতে হবে - নিজের সমাজ বাঁচাবার জন্য, নামং কেনার জন্য, সরকারি-বেসরকারি অর্থ রোজগারের জন্য জ্ঞানে অজ্ঞানে যে ক্ষতি মধ্যবিত্ত লৌকিক সমাজের করেছেন, আজও করছেন - সে ক্ষতি প্রায় অপূরণীয়। 
সঙ্গীত প্রেমীদের জন্য আরও কিছু সংবাদ – হাপু গান শুনলে মনে হবে যেন পশ্চিমি দ্রুত উচ্চারণে গান গাওয়া হচ্ছে।
কয়েকটা হাপুগানের নমুনা
হাপু আতা পাতা লো,
হাপু সর্ষে পাতা লো,
হাপু আম খাবি জাম খাবি,
তেঁতুল খাবি লো,
তেঁতুল খেলে প্যাট গুলোবে ছেলে হবে না,
হাপু কাকে খেলে লো,
হাপু ক্যা ঝাড়ুনি লো,
হাপু বেদের মাকে লো
ই ডাঙাড়ে ঐ ডাঙাড়ে শালিক বস্যেছেঁ
বেদের মাকে বিয়া করতে পাল্কী আস্যেছেঁ
হা ফুঃ কদম ফুঃ
বুঢ়াতে বুঢ়ীতে লড়াই লাগ্যেঁছে
বুড়া কপালে বুঢ়ী পাদ্যেঁ দিয়েঁছে
হা ফুঃ কদম ফুঃ – ইত্যাদি

অথবা
হাই লো বামুন দিদি
বাগদি ঠাকুরঝি
আমি কেলে গয়লার বেটার
ঠিয়ে কখন হাঁস্যেছি-
হাঁস্যেছি বেশ করেছি
তর বাপের কী
যখন ছিলাম ছ বছরের
তখন উঠে নাই গা
এখন আমি বছর তেরো
হব ছেলের মা
মাছ ধরতে গিলাম আমি
কুঁয়ে লুদির কুলে
দেখি এ্যাক মিনসে
রসির লাগর
ডাঁড়া ফেলছে চারে
জলে নেমে জাল ছাঁকি
আর মিনসে থাকে চেঁয়ে
ভাল্ কেনা তুই ঢ্যামনা মিনসে
থানা কেনা চেয়ে
তাকে দেখে উচএ যাব
নইক তেমন মেয়ে
মাছ ধরছি চিংড়ি চাঁদা
গচি মাগুর গাগর
কার্তিক মাসে মাছের রসে
বলবো কি বুন্ বলবো কিলো
আমার প্যাট হয়েঁছে ডাগর
খোসার দুম খোসাক দুম
কাঁথা চাপা দিঁয়ে মারব ঘুম – ইত্যাদি

বছর পনের আগে বীরভূমের নলহাটিতে শুনেছিলাম এঁদের গান আর চমত্কৃতও হই ।

Thursday, November 4, 2010

মেচ রমণীদের নাচ

জলপাইগুড়ির আলিপুরদুয়ারের নারারথুলি আর খোয়ারাডাঙায় মেচ সমাজের বাস। এঁদের সমাজে সকলেরই ভাতমাছের বাঙালিদেরমতই খাদ্যাভ্যাস। অন্যান্য উত্তরপূর্বের নানান আদিবাসী সমাজেরমতই মেচ সমাজও মহিলাপ্রধান। বাংলা নববর্ষে সমাজের ভাষায় বৈশাংগুরং জনাইএর দিন ইষ্টদেবতা খরাইএর পুজো উপলক্ষে ঢাল আর থুংগ্রী(তরোয়াল) নিয়ে যে যুদ্ধনৃত্যের আয়োজন করেন তার নাম ঢাল থুংগ্রী গেলে নায়। এতে গান নেই, তাল বাদ্য দিয়েই এই নৃত্যর আয়োজন হয়। থাকে লৌকিক বাদ্যযন্ত্র অসমের বিহুতে ব্যবহৃত টেপারমত বাঁশের খোলথেকে তৈরি ওয়াখোলঠপ, মন্দিরা, সারিন্দারমত চার তারের সারজা আর তালযন্ত্র হেম বা ঢোলের অনুষঙ্গে চলে নাচ। যন্ত্র বাজান পুরুষেরা। এই সমাজের আর একটি যুদ্ধনৃত্য চত্রালি – দুহাতে তরোয়াল নিয়ে নাচ। যুদ্ধের মহড়া নৃত্য মশাখাওরী মশা নায়-ও উল্লেখযোগ্য। বসন্ত উত্সবের সময় মেচ রমণীরা আয়োজন করেন শৃঙ্গারধর্মী বাগারুম্বা নাচ। শরীরের পাঁচটি অংশ – হাত, গলা, মুখ, কোমর আর বুক দিয়ে প্রেমের উছ্বাসকে প্রকাশ করেন তাঁরা। একটি সামাজিক আচারের নাচ বৈরাথী – আজতে বধুবরণ নৃত্য। আরও একটি নাচ খুরৈ লানান গেলে নায় বা বাটি্ হাতে নাচ - ইষ্টদেবতা বাটোর উদ্দেশ্যে উত্সর্গীকৃত।

জলপাইগুড়ির রাভা সমাজের মহিলাদের নৃত্য

জলপাইগুড়ি জেলার আলিপুরদুয়ার বনাঞ্চলের আধিবাসী রাভা সমাজ। এই সমাজে মাতৃতান্ত্রিক রীতিনীতি বহুদিন ধরেই প্রচলিত ছিল বলে রাভা সমাজে মেয়েদের ভূমিকী শুধু ঘরকন্নার কাজে আটকে ছিলনা – চাষবাস, সমাজশাসন, এলাকার এবং সমাজের সুরক্ষায়ও মেয়েদের ভূমিকা ছিল সক্রিয়(যদিও অনেকে জানেন তবুও বলি, একসময় বাংলায় তন্ত্রসভ্যতার রমরমা থাকায় বাংলার সমাজের বিভিন্ন কাজে মেয়েদের ভূমিকা সেদিন পর্যন্ত ছিল অতীব কর্মদ্যোমের – নদিয়ার সীমান্ত এলাকায় অন্ততঃ ১৫ বছর আগে শুনেছিলাম, যে পরিবারের মেয়ে বুনতে জানেন না বা (ধান)রুইতে জানেন না সে মেয়ের বিয়ে হওয়া মুশকিল ছিল। পাঠকেরা এর থেকে কোনো সূত্র উদ্ধার করতে পারলেন কী)। শত্রুর বিরুদ্ধে রাভা রমণীদের ভূমিকা ইতিহাসে লেখা থাকেব। আজ মতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই রণসজ্জার অভ্যাস রূপান্তরিত হয়েছে যুদ্ধনৃত্যে। হাণ্ডাবারু রাভা সমাজের এক আকর্ষণীয় যুদ্ধ নৃত্য। আজকের রাভা মহিলারা আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণাত্মক যুদ্ধভঙ্গিমা নৃত্যকলার মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন। সমাজেই তৈরি বিশলকায় তালযন্ত্র হেম গলায় জড়িয়ে দুইহাত যতদূর সম্ভব প্রসারিত করে শ্রীখোলেরমতকরে বাজানোহয়। এর সঙ্গে থাকে ছড়িটানা বাদ্যযন্ত্র বাক্্গডিং, সুষির জাতীয় বাদ্য বাবংশী আর বা-ডাংসী, আর ঘণবাদ্য চিলিংগী আর মুর্শৃংএর মত ট্যাংট্যাং। যন্ত্রীরা সবাই পুরুষ। কৃষিনৃত্য হাঙ্গাই শানিতে মেয়েরা কাঠা দিয়ে শাড়ি আর ফতুয়া পরেন – মাথায় দেন পাগড়ি। কোদাল, কাস্তে আর ঝুড়ি নিয়ে চলে চাষ প্রক্রিয়ার নাচ – যার বিষয়বস্তু চাষের বীজবোনা, চারাফেলা ইত্যাদি নানান প্রক্রিয়া। সাধারণতঃ ভাদ্রমাসে রোয়ার শুরুরদিনই মাঠে এই নাচ হয়।

ষাইটোল ব্রত

ষাইটোল ব্রত
উত্তবঙ্গের কোচবিহার জেলারই ব্রত। কোচবিহার যেহেতু এক সময় নৃপতি শাসিত রাজ্য ছিল তাই এই ব্রতটি নিয়ে বহু আলোচনা বয়ে গিয়েছে। সাধারণতঃ সন্তান কামনা আর সন্তান কল্যানে এই ব্রত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে আজও। ষাইটোল এক লোকদেবী। হয়ত ষষ্ঠী ঠাকরোনইবা। কেননা ষাইটোলের বহু গানে তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায় – ষষ্ঠী মায়ের জন্মরে হইল নন্দী গোয়ালের ঘরে, কি ষষ্ঠী মা মনদিসে ঘোরে। বন্ধ্যা নারীর সন্তান লাভসহ সন্তান ঘিরে নানান সাংসারিক আকাঙ্খা ষাইটোলের ব্রতের ধারাভষ্যে সহজেই উঠে আসে। এই ব্রতে লোক কাহিনীর নায়িকা লীলাবতী বা নীলা স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে যখন দিন কাটান তাঁর জবানে উঠে আসে যেন ফুল্লরার বরোমাস্যা। 
ব্রতটিতে গ্রাম্য কিশোরীরা হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পরে প্রথমে ঢাকিকে বন্দনা করেন – ভাল্ কইরা বাজান রে ঢাকুয়ার সুন্দর কমলা নাচে। সঙ্গে দোতরা, বাঁশী, মন্দিরাও বাজানো হয়। ঢাকীকে সামনে রেখে ষাইটোলের নানান বৃত্তান্ত গাওয়া হয়। কয়েক বছর আগে ফুলতি গিদালি বর্মণ কলকাতায় এই নাচ দেখিয়ে যান।

জলমাঙন ব্রত


জলমাঙন ব্রত
প্রায় সমগ্র উত্তরবঙ্গ জুড়ে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মহিলারা জলমাঙন ব্রত পালন করেন – আদতে বৃষ্টি জলের আশায় এই ব্রত। দেবতা যিনিই হেন না কেন, এই ব্রতের উপাস্য ঘন কৃষ্ণ মেঘ আর তার সঙ্গে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। জলঘটের ধান দুর্বা আমের পল্লব হল উপাসনার মাধ্যম। পুরুষেতন্ত্রের বাইরে গিয়ে সৃষ্টির প্রতীর মহিলারা মাথায় ঘট নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্যান্যদের সঙ্গে নাচ গান করতে থাকেন। সর্বপ্রথম লক্ষ্য সবথেকে সম্পন্ন গৃদস্থের বাড়ি। সেখানে পুরুষ গৃহস্থকে উদ্দেশ্য করে গায় – কালা মেঘাক দিম কালা পাঁঠা, ধলা মেঘাক দিম ধলা(পাঁঠা), ওরে সুন্দরিয়া মেঘ মোর বাড়ি যাইস, ভাঙা খলটা দিম চাউল ভাইজে খাইস। এর পর গৃহিনীকে বলে – হামারা জলমাঙারা আইসাইছি গো, জলাইশরি, জল দিয়া কর কেনি বিদায়গে জলাইশরি। আবার অন্য বাড়িতে গিয়ে হয়ত গায় – সনার হাল গসাই উপার ফেল হে গসাই, দুই পাটিয়া মই তাহে নি মরে দুবরা বনরে, পানি আয় রে আয়। অথবা ম্যাঘা ম্যাঘা ডাক পাড়ছে ম্যাঘা নাই মোর ঘরেরে, ম্যাঘা গেছে শ্যাল বাড়ি জঙ্গলত্ রে। সব শেষে স্খানীয় কোনো নির্জন মাঠে গিয়ে ব্রতীনিরা গরু সাজে। সাজে হালুয়া(চাষী – যে হাল দেয়), কেউ লাঙল চালানোর ভঙ্গীতে কেউ বীজ বোনার ভঙ্গীতে নাচে। উত্তর দিনাজপুরের চাপদুয়ার গ্রামের রূপে বর্মণের দলের জলমাঙন ব্রতের নাচ দেখেছিলাম কয়েক বছর আগে।

হুদুমদেও ব্রত


জলের সঙ্গ পাওয়ার আশার উত্তবঙ্গের একটি ব্রতের নাম হুদুমদেও ব্রত। কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর জেলায় এই ব্রত নিষ্ঠাসহকারে পালিত হয়। হুদুম আর্থে উদুম বা উলঙ্গ। প্রচণ্ড খরা থেকে রেহাই পেতে জলের দেবতা বরুনদেবকে তুষ্ট করতে নানান দৈহিক আচার উপাচার প্রদর্শণ করে থাকেন মহিলারা। যদিও ব্রত সাধারণতঃ মহিলামহলেরই কর্মকাণ্ড, কিন্তু প্রায় সব ব্রতে পুরুষের অক্রিয় সহযোগিতা থাকে। কিন্তু হুদুমদেও ব্রতে সেটুকুও প্রবেশাধিকার নেই। তাই এই ব্রত ঘিরে নানান লোককাহিনী গড়ে উঠেছে। সঠিক তথ্য পাওয়া আজও দুষ্কর। অংশগ্রহণকারী মহিলাদের বয়স নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে গবেষক মহলে। কারোরমতে এই ব্রত বর্ষীয়সী মহিলাদের অংশগ্রহণে জেগে ওঠে আবার কারোরমতে এটিতে অংশ গ্রহণ করেন কুমারী আর আবিবাহিতরাই। এই ব্রতের নাচের মধ্যে যে যৌনক্রিয়ার অভিব্যক্তি ফুটেওঠে সেবিষয়ে কিন্তু গবেষক মহলে কোনো দ্বিমত নেই - শিশির মজুমদারের জবানে শুনেছি এই ব্রতপালনে মহিলারা সারিবদ্ধ হয়ে ঘড়া ঘড়া জল নিয়ে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে ঘুরে নাচেন। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মহিলারাই এই ব্রতে অংশগ্রহণ করেন। রাজবংশী ভূমিপুত্র সুখবিলাস বর্মা বলছেন বাল্যবয়সে তিনি তাঁর দিদিমার সঙ্গি হন এই নাচে টিন বাজাতে। তাঁর ভাওয়াইয়া গ্রন্থে হুদুমদেওর বেশকিছু গান সংকলিত হয়েছে। আমি কচুর লতারমত হেলিব না, অল্পবয়লের হুদুমদ্যাও। আরে আয় আয় রে কালা ম্যাঘ আয় পর্বত ধায়য়া। ও মুই মাথা ঘসিয়া রে, আঙছ না চায়য়া রে। অথবা হিলঙি্হাল্যাছে কমোরটা মোর শিরশিরাচ্ছে গাও কোনটে কেনা গেইলে এ্যালা মুই হুদুম নাগাল পাও, পাটনি খান পড়োছে খসিয়া, আইসরে হুদুম দেওয়া তোর বাদে মুই আছোং বসিয়া। বা মুসলিম সমাজের আর্তি এক ঝোরা পানি দে আল্লা ঘরে চল্যে যাই।

তিস্তার ভেদৈ খেলি বা মেছেনি ব্রত

উত্তরবঙ্গের লোকজীবনে তিস্তা নদীর প্রভাব বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে জলপাইগুড়ি জেলায় – কখোনো সে দুকুল ভাসায় কখোনো আবার সবুজে সবুজে ভরে দিয়ে সভ্যতার বিকাশের সঙ্গী হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গে তাই তিস্তার বড় আদর – তাকে সোহাগে রাখার, তাকে আদরে রাখার। তিস্তাকে তাই আদর করে সম্বোধন করা হয় বুড়ি নামসহযোগে। উত্তরবঙ্গীয়রা তাই তিস্তাবুড়ির খ্যাপামি নিয়ে ছড়া কাটে, গান বাঁধে, ঘটা করে পুজো দেয়। তিস্তাবুড়ির এই ব্রত স্থানীয় ভাষায় বরত্ রূপে চিহ্নিত। এই গানের সঙ্গে নাচেন কিশোরীরা। একে বলে মেচেনি বা মেছুনিখেলি। বেত বা বাঁশএর একটি ছোট ঝাঁপি লাল কাপড়ে মোড়া – তার মধ্যে তেল সিঁদুর মাখানো একটি ফুলদিয়ে সাজানো ঘট বসানো। এটি তিস্তা মাই(মাও)এর প্রতীক। একে বড় ছাতা দিয়ে খরবৈশাখের প্রখর রোদ্দুর থেকে আড়াল করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চলে এ নাচ। বয়স্কারা তাঁদের ঘিরে তালি দিয়ে তাল রাখেন। করতালও বাজে। মেয়েরা খাটো শাড়ি পরে তাতেই ঊর্ধাঙ্গ জড়িয়ে কোমর বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচে। সামনের দিকে ঝুঁকে দুই হাতে শাড়ির আঁচল, স্থানীয় লব্জে ফোতা বা পাটানি, মাটিতে ছুঁইয়ে দেয়। আবার সোজা হয়ে উঠে হাতে তালি দেয়। এক তাই থাপুনি(তালি) নাচ বলে। নাচটিকে বলে নাচানিয়া। এচটি গানের কলি – বড় বাড়িখন দেখিয়া আইলম লখমীমাও। বড় পিড়াখন পাতিয়া দাও। লখমী মাওক আমার সিন্দুর দেয় হে। সিন্দুর না থাকে যদি ইট ভাঙিয়া দাও হে। অথবা তিস্তাবুড়ির নামান গেহেচে আনন্দে বরিয়া নেওগে বড়য় হাউসালি, হামার পঞ্চ বাহিনী।

Wednesday, November 3, 2010

মেয়লি ব্রত - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(এই ব্লগে আগের লেখাটিই ছিল ভাঁজো ব্রতের সম্বন্ধে একটি পরিচিতি মাত্র। কলাবতী মুদ্রাতো তুচ্ছ, বাঙালির হৃদয়দেবতা স্বয়ং ব্রত সংগ্রহে ব্রতী ছিলেন এ কথা আজ কম্বু কণ্ঠে ঘোষণার সময় এসেছে। রবি ঠাকুরের এ সম্বন্ধে একটি ছোট প্রবন্ধ তুলে দেওয়া গেল)

 সাধনা পত্রিকা সম্পাদনকালে আমি ছেলে ভুলাইবার ছড়া এবং মেয়েলি ব্রত, সংগ্রহ ও প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত ছিলাম। ব্রতকথা সংগ্রহে অঘোরবাবু আমার প্রধান সহায় ছিলেন, সেজন্য আমি তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞ আছি। অনেকের নিকট এই-সকল ব্রতকথা ও ছড়া নিতান্ত তুচ্ছ ও হাস্যকর মনে হয়। তাঁহারা গম্ভীর প্রকৃতির লোক এবং এরূপ দুঃসহ গাম্ভীর্য বর্তমান কালে বঙ্গসমাজে অতিশয় সুলভ হইয়াছে।
বালকদিগের এমন একটি বয়স আসে যখন তাহারা বাল্যসম্পর্কীয় সকল প্রকার বিষয়কেই অবজ্ঞার চক্ষে দেখে, অথচ পরিণত বয়সোচিত কার্যসকলও তাহাদের পক্ষে স্বাভাবিক হয় না। তখন তাহারা সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকে, পাছে কোনো সূত্রে কেহ তাহাদিগকে বালক মনে করে। বঙ্গসমাজের গম্ভীর-সম্প্রদায়েরও সেই দুর্গতি উপস্থিত হইয়াছে। তাঁহারা বঙ্গভাষা, বঙ্গসাহিত্য, বঙ্গদেশ-প্রচলিত সর্বপ্রকার ব্যাপারের প্রতি অবজ্ঞামিশ্রিত কৃপাকটাক্ষপাত করিয়া আপন প্রকৃতির অতলস্পর্শ গাম্ভীর্য এবং পরিণতির প্রমাণ দিতে প্রয়াস পাইয়া থাকেন। অথচ তাঁহারা আপন অভ্রভেদী মহিমার উপযোগী আর যে কিছু মহৎ কীর্তি রাখিয়া যাইবেন, এমন কোনো লক্ষণও প্রকাশ পাইতেছে না।
য়ুরোপীয় পণ্ডিতগণ দর্শন বিজ্ঞান ইতিহাসে যথেষ্ট মনোযোগ করিয়া থাকেন এবং ছড়া রূপকথা প্রভৃতি সংগ্রহেও সংকোচ বোধ করেন না। তাঁহাদের এ আশঙ্কা নাই, পাছে লোকসাধারণের নিকট তাঁহাদের মর্যাদা নষ্ট হয়। প্রথমত, তাঁহারা জানেন যে, যে-সকল কথা ও গাথা সমাজের অন্তঃপুরের মধ্যে চিরকাল স্থান পাইয়া আসিয়াছে, তাহারা দর্শন, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের মূল্যবান উপকরণ না হইয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, যাহারা স্বদেশকে অন্তরের সহিত ভালোবাসে তাহারা স্বদেশের সহিত সর্বতোভাবে অন্তরঙ্গরূপে পরিচিত হইতে চাহে এবং ছড়া, রূপকথা, ব্রতকথা প্রভৃতি ব্যতিরেকে সেই পরিচয় কখনো সম্পূর্ণতা লাভ করে না।
সাধনায় যখন আমি এগুলি সংগ্রহ ও প্রকাশ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম, তখন আমার কোনোপ্রকার মহৎ উদ্দেশ্য ছিল না। সমাজের সুধাভাণ্ডার যে অন্তঃপুর, তাহারই প্রতি স্বাভাবিক মমত্ববশত আকৃষ্ট হইয়া আমাদের মাতা মাতামহী আমাদের স্ত্রী কন্যা সহোদরাদের কোমল-হৃদয়-পালিত মধুর কণ্ঠলালিত চিরন্তন কথাগুলিকে স্থায়ী ভাবে একত্র করিতে চেষ্টা করিয়াছিলাম এবং অঘোরবাবুকে এই-সমস্ত মেয়েলি ব্রত গ্রন্থআকারে রক্ষা করিতে উৎসাহী করিয়াছি, সেজন্য গম্ভীর-প্রকৃতি পাঠকদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। এবং সেইসঙ্গে এ কথাও বলিয়া রাখি যে, এই-সকল সংগ্রহের দ্বারা ভবিষ্যতে যে কোনোপ্রকার গম্ভীর উদ্দেশ্য সাধিত হইবে না, এমনও মনে করি না।
এই প্রসঙ্গে শ্রীযুক্ত বাবু দীনেন্দ্রকুমার রায় মহাশয়ের নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি। তিনি বঙ্গদেশের জনসাধারণ-প্রচলিত পার্বণগুলির উজ্জ্বল ও সুন্দর চিত্র সাধনায় প্রকাশ করিয়া সাধনা-সম্পাদকের প্রিয় উদ্দেশ্য সাধনে সহায়তা করিয়াছেন। সে চিত্রগুলি বঙ্গসাহিত্যে স্থায়ীভাবে রক্ষা করিবার যোগ্য এবং আশা করি দীনেন্দ্রকুমারবাবু সেগুলি গ্রন্থ-আকারে প্রকাশ করিতে কুণ্ঠিত হইবেন না।

ভাঁজো ব্রত

ভাদ্রমাসের ইন্দ্র দ্বাদশীর ইন্দ্রপুজো উপলক্ষে ভাঁজো ব্রত উদযাপন হয়। গ্রামের বাইরের কোনো স্থানে কিছু মাটির ঢেলা মেয়েরা যথন সংগ্রহ করেন, তখন কাছাকাছি গ্রমের যুবকেরাও উপস্থিত হয়ে দুই দল কপট যুদ্ধে মুখোমুখি হয়। এক দল, সাধারণতঃ মেয়েরাই মাটির স্তুপ দখল করে গ্রামে ফিরে যায়। জড়োকরা মাটি ব্রতীনীরা কোনো দেবস্থানে নিয়ে যায়। এই মাটি পরিস্কার করে মাটির সরাতে নদী থেকে আনা বালি আর গৃহস্থের মাটির ভিত থেকে ইঁদুর মাটি সংগ্রহ করে তাতে যব, কলাই প্রভৃতি পঞ্চশষ্যর বীজ রোপণ করেন কুমারী মেয়েরা। একি শষ্য পাতা বলে। এটি এরপর কোনো পবিত্ত স্থানে রাখা হয়। সাতদিন পর, আটদিনের দিন তা থেকে যে অঙ্কুরোদ্গম হয়, তা নিয়ে নানান ছড়া কেটে ব্রত পালন করেন তাঁরা। সে দিন একটি মাটির মূর্তিকে শাড়ি পরিয়ে তাকে নারী রূপ দেওয়া হয়। সন্ধ্যেবেলা অঙ্কুরিত বীজসুদ্ধ পাত্রকে মাটির মূর্তির চারদিকে রাখা হয়। পুরোহিত এবার অঙ্কুরিত চারাগাছের পুজো সম্পন্ন করেন। পুজে শেষ হলে ব্রতীনিরা মূর্তি আর চারাগাছের আশেপাশে ঘুরে ঘুরে নৃত্য করেন। 
এই পথে যাও ভাঁজো, এই পথে যাও, বেনা গাছে কড়ি আছে দুধ কিন্যা খাও।
ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ের মু্র্শিদাবাদের বিন্দারপুর, জজান প্রভৃতি গ্রামে পালিত হয় এই ব্রত একে বলে ভাঁজো বা ভাঁজুই ব্রত। অনেকে আবার একে শষ্য পাতার ব্রত বা শাষপাতার ব্রতও বলে থাকেন। আদতে এটি একটি পর্যাপ্ত পরিমাণে শষ্যকামনার ব্রত। নাচগানছড়ায় অংশ নেন অঞ্চলের কুমারীরাই। কয়েকটি উদাহরণ – ধূপ দিলাম, ধুনুচি দিলাম ধুপের ধুনো খাও রে ভাঁজু ধুপের ধুনো খাও অথবা ঘি নাও মুটে মুটে জল খাও ঠোঁটে ঠোঁটে অকুমারী মেয়ে ভাঁজুই পেতেছি ইত্যাদি। ঘরের দাওয়ায় আলপনা দিয়ে ভাঁজু পাতা থেকে শুরু করে ভাঁজুর বিয়ে, তাকে নিয়ে নানান রঙ্গ তামাশা এমনকী নদী বা অন্যকোনও জলশয়ে বিসর্জন ঘটনা পর্যন্ত নানান ছড়া বা শোলোক আছে। তার সঙ্গে কাঁসি, ঢোলোক ক্যাওড়া সানাই বাজিয়ে মোয়েদের নাচের প্রচলন ছিল বেশ কিছুদিন আগেও। জনসমাজে বিশ্বাস এই ব্রতে লুকিয়ে থাকে কুমারী মেয়েদের ভবিষ্যত জীবনের নানান ইঙ্গিত। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নানান লেখায় এরই পূর্বসূরী পূর্ববঙ্গের ভাদুলি ব্রতের সঙ্গে এর আগে পরিচিত হয়েছি।