Monday, September 16, 2013

রস-রত্ন-সমুচ্চয় বা ত্রয়োদশ শতকে ভারতের প্রাচীন উচ্চমার্গের ধাতু প্রযুক্তির বর্ননা৫, Rasa-Ratna-Samuccaya and mineral processing state-of-the art in 13th century a.d. india5

ধাতু নিষ্কাশন
আ কনসাইজ় হিস্ট্রি অব সায়েন্স ইন ইন্ডিয়া(ডি এম বোস, এস এন সেন, বি ভি সুব্বারায়াপ্পার সম্পাদনায়) এবং আচার্য্য পি সি রায়ের হিস্ট্রি অব কেমিস্ট্রি ইন এনসিয়েন্ট অ্যান্ড মেডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, সম্পাদনা পি রায়, বিশদে প্রাচীন ভারতের রসায়ন এবং ধাতুবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর প্রবন্ধে, অরুনবাবু ররস থেকে শুধু কতগুলি ধাতু সংক্রান্ত বিষয় আলোচনা করেছেন।
অয়সেরমত লোহাও বহু সময় সাধারণভাবে ধাতুর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। লোহা কথাটা লুহা শব্দ থেকে আহরিত হয়েছে, যার মানে, যা নিষ্কাশিত হয়েছে, ধাতুর্লোহে লুহা ইতি ...। ধাতু শব্দটি কখনো ধাতু হিসেবে ব্যব্যহৃত হচ্ছে, কখনো বা খনিজ দ্রব্য হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে, অর্থাৎ ‘যা শরীরকে ধরে রাখে’। খনিজ চূর্ণের যে শব্দ বন্ধ পাচ্ছি, তার প্রতিশব্দ হল, সত্ত্ব, যার মানে ধাতুই। সত্ত্ব থেকে কয়েকটি ধাতুকে আলাদা করে রাখা হয়েছে, কেননা, সেগুলি গরম করলে কোনও ধাতুর অধঃপাত পড়ে থাকে না। তাই ধাতু নিষ্কাশনকে বলে হচ্ছে সত্ত্বপাতন। সোনা, রূপা, পারদ, কপার, টিন, লোহা, লেড, দস্তার মত আরও অনেক ধাতুতে রয়েছে সত্ত্বপাতন ধর্ম।
খনিজ ধাতু চুর্ণকে নানান ধরণের জ্বালানি যেমন, ঘুঁটে, কাঠকয়লার মাধ্যমে উচ্চচাপের চুল্লি ক্রুসিবল (মুসা) বা চুল্লিতে(কোষ্ঠী) বড়(অঙ্গার কোষ্ঠী) বা ছোট(পাতলা কোষ্ঠী) জ্বালানো হয়। সালফাইডিক খণিজ চুর্ণ জ্বালানোর চুল্লির নাম হল পুত, কেননা এগুলি পড়ানোর সময় খুবই কটূ গন্ধ বের হয়(পুতি গন্ধ)। ররস ধাতু গলনে ৫১ রকম ব্যবহার্য্যের(উপকরন) কথা বলছে। ৩৬টি যন্ত্র, ১৭ রকম উচ্চচাপের চুল্লি ক্রুসিবল(মুসা), ৯ ধরণের চুল্লি(পুত)। সংকলকের এই বিশদ বর্ননা, তৎকালীন যে কোনও ধাতুবিদ্যার গ্রন্থকে ছাড়িয়ে সেই যুগের আকর গ্রন্থের মর্যাদা অর্জন করেছে।
এর সঙ্গে চুল্লি তৈরির পদ্ধতি এবং ফ্লাক্স(ধাতু পরিস্কার করার সময়ে যুক্ত অনুঘটক) সম্বন্ধে কিছু বলা প্রয়োজন। চুল্লিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা ছিল। গলিত ধাতুর তারল্য (ফ্লুইডিটি) বাড়ল বোরাকসএরমত (টঙ্কন) অনুঘটক বা ফ্লাক্স(দ্রবণ বর্গ) যোগ করার থেকে। বলা দরকার সোডিয়াম এবং বি, বোরাক্স শুধুই পুর্ব ভারতের কপার বর্জ্যের মধ্যে পাওয়া গিয়েছে।
চুল্লিতে তাপমাত্রা বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হত চামড়ার থলে(ভস্ত্রিকা); সেই থলে থেকে চুল্লিতে হাওয়া দেওয়া হত। চুল্লি তৈরির জন্য বিশেষ প্রকার মাটি(তোয়ামৃত্তিক) ব্যবহার হত। চুল্লিতে বহুক্ষন তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য উচ্চতম তাপ সহ্য করারমত হাওয়া আটকানো ছিপি(বানীমৃত্তিকা) ব্যবহৃত হত। চুল্লির আগুনের রঙ নীল(কার্বন মনোক্সাইডের জন্য) থেকে সাদা(শুদ্ধবর্ত, বীজবর্ত) হয়ে যাওয়ার অর্থই হল ধাতু নিষ্কাশন সম্পন্ন হয়েছে, ধাতু গলতে শুরু করেছে।
পারদ(হিঙ্গুলক্রস্ট রস) তৈরি করার সময় পারদের বর্জ্য সিন্নাবার(হিঙ্গুল)কে বিশেষভাবে নজর করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পারদের শুদ্ধকরণ(পাতন) পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া বিশদে বর্ণিত হয়েছে, বলা হয়েছে, এই সময় বাষ্প প্রথমে ওপর পরে পাশাপাশি এবং সব শেষে নীচের দিকে যায়(উর্ধমধশ্চ ত্রিয়ক) এবং টিন, দস্তা এবং অন্যান্য বর্জ্যগুলো পইয়ে নিয়ে যায়(বঙ্গ অহিসম্পর্ক কঞ্চুক ঘননম)। দস্তার বাষ্প বাঁকা নলের মাধ্যমে বইয়ে নয়ে গিয়ে গলানো তামায় ধরে রেখে(নিরবাপন) ব্রাস তৈরি হয়। পাতনের জন্য বিশেষ যন্ত্র(ডেকি যন্ত্র) ব্যবহারের কথা নর্দেশ দেওয়া আছে।
ধাতব ব্যবস্থা(মেটালিক সিস্টেম)
গলিত অবস্থায় দুটি বা তার বেশী ধাতু মিশিয়ে সঙ্কর ধাতু তৈরির পদ্ধতিকে বলা হয়েছে দ্বন্দ্বন। যেসব ধাতু পরস্পরের সঙ্গে খাপ খেয়ে মেলে না, তাদের সঙ্কর করার জন্য বিশেষ যৌগ যোগ করা হত(দুর্মেল লোহাদ্বয় মেলানশ্চ)। নির্দিষ্ট কিছু প্রায়োগিক ধাতব ব্যবস্থা জানা ছিল সে সময়ের প্রযুক্তিবিদদের। দুই ধরণের ব্রাসের অস্ত্বিত্ব জানা ছিল, কম তাপে গলা ধাতু পুটি লোহা, কপার আর লেডের সঙ্করকে সুলভাঙ্গ বলা হয়েছে, সোনার রঙের সঙ্কর, ব্রাশকে বলা হয়েছে সুবর্নক, পাঁচটি ধাতুর সঙ্কর পঞ্চলোহা বা বর্তলোহা, লোহা আর লেডের সঙ্করকে বলা হচ্ছে বরানগ।
ধাতু এবং সঙ্করের কাঠিন্য বাড়াবার জন্য দ্রুত ঠাণ্ডা করার প্রয়োজন হয়ে পড়ে হয় খুব ঠাণ্ডা জল ঢেলে (অভিষেক), বা ধাতু বা সঙ্করে বিশেষ কিছু তরল ফোঁটা ফোঁটা করে ফেলে(পরিবাপ, নির্বাপ)। বিশেষ রঙ আনার জন্য নানান ধরণের রঞ্জক পদার্থ যোগ করা হত(অনুবর্নক)।

আর্য্যরা আসুক ছাই না আসুক, একটা বিষয় পরিষ্কার ভারতের প্রযুক্তিবিদদের ধাতুবিদ্যা শেখাতে ভারতের বাইরের মানুষেরা আসেন নি। ১০০০ খ্রিস্টাব্দের টাডাকানাহাল্লি এবং অন্যান্য প্রত্নতাত্বিক উতখনন থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, অতি প্রাচীন কাল থেকে এটি প্রমাণিত যে, লোহা গলতে শুরু করার তাপমাত্রার আগেই ভারতীয়রা কাঁচা লোহার বর্জ্য বের করে তা ১২০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পিটিয়ে(ফোর্জ-ওয়েল্ডিং) লোহা তৈরি করতে পারতেন। কারবুরাইজেসন এবং কোয়েঞ্চিং প্রযুক্তিও ভারতীয় লৌহ কারিগরেরা অতীব দক্ষ ছিলেন। 
Post a Comment