Thursday, September 26, 2013

আমাদের ছোট নদীরা ছিল, সত্যিই২

সত্তরের দশক থেকে একটু একটু করে জায়গা নিল নতুন কৃষি। যত বেশি জমিতে উচ্চ ফলনশীল ধান লাগানো হবে, তত বেশি বিক্রি হবে রাসায়নিক কীটনাশক। ধান বিক্রি করে নগদ টাকা পেয়ে সার-বীজ-কীটনাশক বিষের ব্যবসায় লাভ জোগাবেন চাষি। যত জমি, তত বেশি অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা। অর্থ হাতে এলে বাজার ঘরে আসবে আরও ধান, আরও অর্থ, আরও বাজার। বিশ্বময় দিয়েছে তারে ছড়ায়ে। বীরভূম বর্ধমান নয় গাঙ্গেয় হিউমাস সমৃদ্ধ মাটির ধান ফলে না বীরভূমে। বর্ধমানের মতো করে নিতে দোষ কী? উঁচু-নিচু জমিতে সুবিধা মতো চাষ হয় না, সেচ দেওয়া যায় না। পর পর বাঁধ দেওয়া হল নদীতে নদীতে। লম্বা লম্বা সেচ-খাল হল, কিন্তু উঁচু-নিচু জমি দিয়ে সে-জল চাষের জমিতে যাবে কী উপায়ে? পঞ্চায়েতে প্রধান কার্যসূচি নেওয়া হলজমি চৌরস করা কী রকম সেই চৌরস করা? যত উঁচু মাঠ ছিল, ছোট-বড় টিলা ছিল, সব কেটে ফেলা শুরু হল। কোথাও কোথাও এক-দেড় তলা উঁচু টিলা কেটে সেই মাটি ঢেলে দেওয়া হল নিচু জায়গাগুলোতে। খেত বড় হতে লাগল আর জঙ্গল ছোট হতে লাগল। ছোট হয়ে আসা জঙ্গল ভরে উঠল লক্ষ-লক্ষ ইউক্যালিপটাসে, তার পর সেই সব খেত-মাঠ-বন জুড়ে বৃষ্টি নামল। প্রকৃতির লক্ষ-কোটি বছরে গড়ে ওঠা শৃঙ্খলা ভেঙেচৌরস করা জমি ওপর গড়িয়ে আসার সময় বৃষ্টিজল ধুয়ে আসতে লাগলটপসয়েল’-এর সম্পূর্ণ আস্তরণ। এখন আর সে জল এঁকেবেঁকে সরু পথে নিচ দিকে নেমে নদী-কাঁদরে গিয়ে জল মেশায় না। আর জল জমা করে না জঙ্গলে, মাটির নীচে, পাতার বৃক্ষমূলের স্তরে স্তরে। বরং সমতল হয়ে যাওয়া মাঠের ওপর থেকে সমস্ত মিহি মাটিটুকু ধুয়ে নদীতে এনে ফেলে। ফেলে ঝুরো মোটা দানার মাটিও। নদীস্রোতের যত ক্ষণ জোর থাকে, মিহি মাটিটুকু জলের পিঠে করে হালকা ভেসে যায়। মোটা ভারী দানা পড়ে থাকে। জমা হতে থাকে। নদীর বুক ক্রমশ ভরাট হয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রায় প্রতিটি ধারার ওপর জল আটকে ছোট-মাঝারি বাঁধ। তাদের রিজার্ভারও মোটা দানার বালিতে ভরে উঠছে দ্রুত। ১৯৯৪ সালে বোলপুর ব্লক ওয়ানে অজয় নদীর পাশবাঁধ আশ্বিনের জলের ধাক্কায় ভেসে গেল। বড় বড় আম গাছের মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেল প্রলয়ঙ্কর জল। পাশবাঁধের ঠিক পেছনে অন্তত আটখানা গ্রামের ধানজমি চার-পাঁচ হাত মাটিবালির নীচে চাপা পড়ল
তার পরও চৌরস হল আরও আরও উঁচুনিচু জমি। ভরাট হল আরও নদীর খাত। বাঁধের পেছনের রিজার্ভারে যে মাটি জমে, স্বাভাবিক নিয়মেই তার সবচেয়ে মোটা দানা বালি জমা হয় সবচেয়ে নীচে।ডেড স্টোরেজ’-এর ঠিক উপরে স্লুইস গেট যেই খুলে দেওয়া হয় জলের চাপে, সেই মোটা বালিই নদীতে নেমে আসে, সেচখালে যায়। ২০০০ ২০০২ সালের ওখনও ভুলতে না-পারা বন্যায় বীরভূমের প্রত্যেকটি নদী এখন মাঠের একেবারে সমতল। যখন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে মাঠভরা হাজার হাজার জলটানা পাম্পের শব্দে উচ্চ ফলনশীল ধান গাছের মাথা দোলে, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বর্ধমানে, নদিয়ায়, বীরভূমে কোনও তফাত দেখা যায় না, যত ক্ষণ না শ্রাবণ মাস আসে। মাঠের মাটি সারা বছর নদী ভরাট করে সেখানে ধানজমি বানায়। তার পর এই ঘনবর্ষার দেশে দুদিন বৃষ্টি হলেই খাতহীন নদীর জল দুধারে ছড়িয়ে যায়। সঙ্গে যায় নদীতে জমা বালি। কেবল অজয় নয়, ছোট-বড় প্রতিটি নদীর বুক থেকে জমা বালির অভিশাপ উঠে আসে ধান খেতে। চার-পাঁচ-এগারো ফুট বালির নীচে চাপা পড়েছে একরের পর একর জমি
জেলা জুড়ে মোট কত চাষের জমি নদীর বালিতে চাপা পড়েছে, তার হিসেব হয়তো নির্ণয় হবে কোনও দিন, কিন্তু তাতে চাষির কী হবে? কী হবে সেই কয়েক লক্ষ মানুষের, যাঁরা ওখানে বহু বহু বছর ধরে বাস করেছেন? কী হবে জলমাটির সেই সুশৃঙ্খল সংস্থানের, যা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল তার জটিল, সূক্ষ্ম, পূর্ণতাময় জীবনজাল নিয়ে? কিন্তু এখনও তো বন্ধ হয়নি সেই কাজ। দিঘি-বাঁধ-পুকুরবহুল বীরভূমের গ্রামে গ্রামে জলাশয়গুলো কেন মাটিতে ভরে যাচ্ছে, তা বোঝবার কিছুমাত্র চেষ্টা না করে এন আর জি নামের আশ্চর্য কর্মপ্রকল্পে যেখানে-সেখানে আরও অনেক গর্ত তৈরি হয়েছে। শোনা যাচ্ছেপুকুর কাটা কর্মসূচি পুরো হয়ে গিয়েছে, বার পরবর্তী অনুষ্ঠানজমি চৌরস করা ফের। কালভার্ট থেকে ঘরমোড়া কাঁদরের গভীরতা এখন এক বিঘত। দুঘণ্টা বৃষ্টি হলে কালভার্টের উপর দিয়ে তীব্র স্রোতে জল যায়। পাশের চার-পাঁচটা গ্রামের যাতায়াত বন্ধ। প্রায় আঠেরোটা গ্রামের লোক এই ছোট নদীটিতে স্নান করত, কাপড় ধুতো, মাছ ধরত। খুব গরমেও কাঁদরে দুটো গভীর জলের কুণ্ডি ছিল, শুকোত না। এখন ঘরমোড়া শুয়ে থাকে পূর্ব তীরে মাঠ আর পশ্চিম তীরে খেতের মাঝখানে। হয়তো ওর মনে পড়ে স্বপ্নের মতো, অচেনা লোকেরাও যখন গ্রামে ঢুকবার আগে কলকল করে বয়ে যাওয়া সুন্দর নদী দেখে, ঢালু পাড় দিয়ে নেমে হাতমুখ ধুয়ে নিত, আরাম পেত



আনন্দবাজার পত্রিকা
Post a Comment