Tuesday, September 3, 2013

সোনার বাঙ্গলা – নিখিলনাথ রায়১, Sonar Bangla - Nikhilnath Ray1

সোনার বাঙ্গলা - আমাদের ভাবনা
নিখিলনাথ রায় এই পুস্তকখানি লিখেছিলেন বাংলার বিদেশী দ্রব্য বর্জনের সময়ের দাবির প্রেক্ষিতে। সেটি ছিল তেতে থাকা বাঙলা নামক দেশটির শেকড়ের সন্ধানে যাওয়ার সময় যে মধ্যবিত্ত এতদিন শাসক বণিক  ইংরেজের অভয়হস্ত মাথায় রেখে চাকরি, উমদোরি, দালালি, ব্যবসা ইত্যাদিতে ফুলে ফেঁপে উঠে দেশের গ্রামীণদের সমস্ত কষ্ট, দুঃখ, বেদনা, সংগ্রাম উপেক্ষা করে নিজেকে কালো ইংরেজ ভাবতে ভালবাসত, ইংরেজরা না এলে দেশের কী দুর্দশা হত তা নিয়ে চায়ের কাপে তুফান তোলা আলোচনায় মগ্ন থেকে ইংলন্ডের ভূমিকে নিজের মাতৃস্থানীয়া, ইংলন্ডের সমাজকে নিজের সমাজ ইত্যাদি ভেবে আনন্দলাভ করত, বিংশ শতকে তাঁরা হঠাৎ জেগে উঠে দেখল, যে সাম্রাজ্য বিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল পলাশীর ৫ বছর পরে ১৭৬৩ থেকে ফকির-সন্ন্যাসী স্বাধীনতা সংগ্রামের তুমুল লড়াইতে, সেই যুদ্ধের আগুনের তেজ সে সময়ে এসে লাগেছে নিজের গায়ে, আগুন ঢুকে আসছে নিজের ঘরে, নিজের সন্তান সন্ততিদের সে আঁচ থেকে সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। নতুন প্রজন্ম নতুন ভাবে বাঁচতে চায়, দেশকে জানতে চায় এতদিনের তৈরি করা কুয়াশা সরিয়ে। প্রৌঢ মধ্যবিত্ত আন্দাজ করতে পারছে এখন জন অরণ্যে না মিশলে ভবিষ্যতের ক্ষমতার দণ্ডটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
সেই ১৯০৫ আর ১৯১১, এতদিনকার তৈরি করা বোধ বুদ্ধি চেতনা হিসেব সমস্ত  কিছু পাল্টে দিল। তখনও নিখিলনাথেদের দ্বিধা ছিল না এমন নয়। হয়ত এই কিস্তিগুলোয় প্রকাশ পাবে না, কিন্তু নদিয়া কাহিনীর লেখক সোনার বাঙ্গলা বইয়ের শেষের দিকে কিছুটা দ্বিধা জড়ানো গলায় বলছেন রাণীর অভয় হস্তের কথা, কার্জনের দেশীয় শিল্পে সাহায্যদানের আশার কথা। কিন্তু তবুও প্রায় পুরনো দেড়শ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর চেতনাকে কোথায় যেন ঘা দিয়ে বলে আর কিছু ঠিক হবার নয়। হাল ধরো বন্ধু। মায়ের ডাকে, সকলে আবার নতুন করে তাঁকে খোঁজার চেষ্টা কর।
সেই এত্ত জোর দিয়ে, এত্ত ভালবাসায়, এত্ত আবেগ মথিত করে, পাঠকের এত চোখের জল ফেলে এর আগে বোধহয় কেউ বাংলার ছারখার হয়ে যাওয়াকে তাঁর লেখার আঙটপাতে বলেন নি। তবুও মনে পড়ে সখারাম, দাদাভাই বা রমেশ দত্তের লড়াই দেওয়ার ইতিহাস- কিন্তু সে ছিল মধ্যবিত্ত জাগানোর কাজ। 
সোনার বাঙ্গলায় সেই সময়ের দাবি মেনে কি করিতে হইবে উপদেশও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন বইতে আজ সেটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই বিশ্বায়নের মুখে বোধহয় সেই সময়ে তাত আমরা আজ আমরা দাঁড়িয়ে টের পাছি।  সুযোগ পেলে অন্য কোনও দিন তাকে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা যাবে। 
আমরা নিখিলনাথমহাশয়ের প্রথম পর্বটি কয়েক কিস্তিতে এখানে তুলে দেব। 
নিখিলনাথেরা ছিলেন বলে, এই কাজগুলো অকপটে করে গিয়েছিলেন বলেই, আজ এই টালমাটাল সময়েও লোকফোক নিজেরমত করে দেশের মাটি দেখতে চায়, ছুঁতে চায় সেই সব কাজ যা এক সময়ে বাংলার হৃদয়াবেগের উৎস্রোতকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। 
নিখিলনাথেরা তার অনেক আগে থেকেই সোনার বাংলারমত অজস্র পুস্তক লিখে চলেছিলেন বলেই আজও আমরা আমাদের শিকড়ের টান অনুভব করি, ভারতের এই মাঝরাতে বসে বিশ্বকে নিখিলনাথদের দুঃখ কষ্ট জানাবার উদ্যম অর্জন করি

নিখিলনাথের একটি লেখার চুম্বকটুকু প্রকাশের মাধ্যমে প্রত্যেক নিখিলনাথকে প্রমাণ জানাই।
জয় গুরু!!!



জানি না, ভগবানের কোন অভিশাপে তাঁহার এরূপ দুর্গতি ঘটিল? ভগবানের যে অভিশাপ থাকে, থাকুক, কিন্তু ইহার প্রত্যক্ষ কারণ ইংরেজবণিকের আসুরিক স্বার্থপরতা ও আমাদের অকর্মণ্যতা। এই সোনার বাঙ্গলা পুর্ব্বেই বা কেমন ছিল, আর ইংরেজবণিকই বা কেমন করিয়া ইহাকে ছারখার করিল আমরা সংক্ষেপে তাহাই দেখাইতে চেষ্টা করিব।
বৈদিককাল হইতে এই বঙ্গভূমির অস্ত্বিত্বের বিষয় অবগত হইতে পারা যায়। ঐতরেয় আরণ্যক প্রভৃতিতে ইহার উল্লেখ আছে। যে বিস্তীর্ণ ভূভাগ এক্ষণে সোনার বাঙ্গলা বলিয়া পরিচিত তাহার প্রধান অংশ ছিল । তাহার সন্নিহিত পুণ্ড্র, অঙ্গ প্রভৃতির কিয়দংশ এক্ষণে ইহার সহিত মিলিত হইয়াছে, বৈদিকগ্রন্থে সেই সমস্ত স্থানেরও উল্লেখ দৃষ্ট হইয়া থাকে।
মনুসংহিতায়ও বঙ্গ প্রভৃতির উল্লেখ আছে। তাহার পর, রামায়ণের সময় হইতে ইহাকে প্রকৃত সোনার বাঙ্গলা বলিয়া জানিতে পারা যায়। সেই সময় বঙ্গভুমি ধনধান্যে পরিপুর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। মহাভারতের সময় ইহা একটি বিস্তৃত জনপদ হইয়া উঠে। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয়যজ্ঞকালে বঙ্গাধিপতি সমুদ্রসেন ভীমের নিকট পরাজিত হইয়াছিলেন। পাণ্ডবেরা গঙ্গাসাগরসঙ্গমে স্নান করিয়া কলিঙ্গ বা বর্ত্তমান উত্তর উড়িষ্যায় গমন করিয়াছিলেন। তাহার পর বিষ্ণু, গরুড়, মৎস্য প্রভৃতি পুরাণেও ইহার উল্লেখ আছে। মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণ প্রভৃতিতেও ইহার নামকরণেরও বিবরণ দৃষ্ট হয়।
ইহার পরে বৈদেশিকগণের বিবরণ হইতে সোনার বাঙ্গলার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রীক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিসের বর্ণনায় বঙ্গরাজ্যের সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকিলেও গঙ্গারিডি বা গণকরের উল্লেখ আছে। এই গঙ্গারিডি বা গণকরদেশ গঙ্গার পশ্চিমে ব’দ্বীপের শীর্ষভাগে অবস্থিত ছিল। মুর্শিদাবাদজেলার জঙ্গীপুর উপবিভাগে অদ্যাপি গ্যাঙ্গারিডি ও গণকর নামে দুইখানি গ্রাম বিদ্যমান আছে। এরিয়ান কটডুপানগরের নিকটস্থ আমিষ্টিসনদীর উল্লেখ করিয়াছেন, এই কটডুপা কটদ্বীপ বা কাটোয়া ও আমিষ্টিসই অজয়াবতী বা অজয়। টিলেমি ‘ব’দ্বীপের বিশেষরূপে বিবরণ প্রদান করিতেছেন। এই সমস্ত বিবরণ হইতে জানিতে পারা যায় যে, গ্রীকদিগের নিকট সোনার বাঙ্গলা বিশেষরূপেই পরিজ্ঞাত ছিল। তাহার পর যখন ইউরোপভূখণ্ড রোমকসভ্যতায় আলোকিত হইয়া উঠিল, তখন এই প্রাচ্যদেশের পণ্যদ্রব্যে তাহার বিলাসভাণ্ডার পরিপূর্ণ হইয়া উঠে। রোমক বণিকগণের ভারতের সহিত বাণিজ্যসম্বন্ধে রোমের সৌভাগ্যলক্ষ্মীও শ্রীসম্পন্না হইয়াছিলেন। এই সমস্ত পণ্যদ্রব্যের মধ্যে যে সকল মসলিন, রেশম, ও রেশমীবস্ত্র নীত হইত, তাহার অধিকাংশই বঙ্গদেশ হইতে সংবাহিত হইত। রোমকমহিলাগণ সে সমস্ত সুচিক্কণ মসলিনের অন্তরাল হইতে আপনাদের অঙ্গসৌষ্ঠব প্রকাশ করিতেন। প্রসিদ্ধ রোমক লেখক প্লিনি বাঙ্গলার শ্রেষ্ঠবন্দর সপ্তগ্রামের কথাও উল্লেখ করিয়াছেন।
যে সময়ে চীনপরিব্রাজকগণ ভারতের নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিতে আরম্ভ করেন। সেই সময় তাঁহারা সোনার বাঙ্গলায় উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে ধনধান্যে পরিপুর্ণ দেখিয়াছিলেন। ভারতাগত প্রথম চীনপরিব্রাজক ফাহিয়েন্‌ বাঙ্গলার তৎকালীন প্রসিদ্ধ বন্দর তাম্রলিপ্ত বা তমলুকে উপস্থিত হইয়াছিলেন ও প্রসিদ্ধ বণিকগণের সমাগম দেখিয়াছিলেন। তাম্রলিপ্ত হইতে তিনি বাণিজ্যযানে আরোহণ করিয়া সিংহলযাত্রা করেন। সুপ্রসিদ্ধ চীনপরিব্রাজক হিউয়েন্‌সিয়াং বাঙ্গলার নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন। তিনি পুণ্ড্রবর্দ্ধন বা বরেন্দ্রভুমি, সমতট বা পূর্ব্ববঙ্গ, কর্ণসুবর্ণ বা পশ্চিমমুর্শিদাবাদ ও তাম্রলিপ্ত বা মেদিনীপুর প্রদেশে আগমন করিয়া অনেক দিন অবস্থিতি করেন। তাঁহার বিবরণ হইতে জানা যায় যে, তৎকালে আমাদের সোনার বাঙ্গলা ‘সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা’ই ছিলেন। ইহার অধিবাসিগণ স্বগীয় স্বাস্থ্য লাভ করিয়া কৃষিবাণিজ্যে তাহাদের মাতৃভূমিকে স্বর্ণপ্রসবিনী করিয়া রাখিয়াছিল। তাঁহার পুণ্ড্রবর্ধনের বিবরণ হইতে জানাযায় যে, তথায় নানা প্রকার শস্য জন্মিত। হিউয়েন্‌সিয়ং তথাকার পনসফলের অত্যন্ত প্রশংসা করিয়াছেন। তাঁহার মতে পুণ্ড্রবর্ধণের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ ও অধিবাসিগণ বিদ্যোৎসাহী ছিল। সমতটের বর্ণনায় তাঁহাকে উর্ব্বর, শস্যপরিপূর্ণ ও ফুলেফলে সুশোভিত বলিয়া প্রতীত হয়। তিনি তাহার জলবায়ুকে কোমল ও অধিবাসিগণের ব্যবহারকে মনোজ্ঞ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইহার কষ্ট সহিষ্ণু, খর্ব্বকায়, কৃষ্ণবর্ণ অধিবাসিগণ বিদ্যার সমাদর করিত। তাম্রলিপ্তির বর্ণনায় লিখিত আছে যে, উক্ত দেশও উর্ব্বর ছিল ও অপর্য্যাপ্ত ফলফুল উৎপাদন করিত। বায়ু উষ্ণ, অধিবাসিগণ ক্ষিপ্র ও সাহসী। হিউয়েন্‌সিয়াং এখান হইতে অর্ণবপোতে সিংহল যাত্রা করেন। কর্ণসুবর্ণের বিবরণে তাহাকে উর্ব্বর ও পুস্পশালী বলিয়া জানা যায়। লোকের ব্যবহার নম্য ও মনোজ্ঞ, জলবায়ুও তৃপ্তিকর। অধিবাসিগণ বিদ্যার সমাদর করিত। হিউয়েন্‌সিয়ঙের বর্ণনা হইতে সুস্পষ্টরূপে বুঝিতে পারাযায় যে, আমাদের সোনার বাঙ্গলা ফলশস্য-পরিপূর্ণ হইয়া সুস্থকায় ও বিদ্যোৎসাহী সন্তানের মাতৃভূমিরূপে বিরাজ করিত। 
Post a Comment